 |
আমার জীবনে পাখির বিচরণ খুব অল্প সময়ের। পাখিকে খুব ভাল লাগে বিভিন্ন কারণে। ভাল লাগার পিছনে কিছু কারণ, যেমন আমাদের কবে প্রথম দেখা, কবে কোথায় পরিচয়, কতবার দেখা, এধরনের তথ্য তার মুখে মুখে। বলতে গেলে বলতে হয়, মানুষের জীবন নিয়ে আমার এক জীবন্ত উইকিপিডিয়া যেন পাখি। ব্যক্তিগত সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করছে সে। পাখির কথা বলছি এজন্য যে, তার মত আমি এমন হিসাব রাখতে পারি না। মনও চায় না। আমার হিসাব কেউ রাখলেই যথেষ্ট মনে করি। এজন্যই প্রবাসী কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল এর সাথে আমার প্রথম কবে কথা হয়েছে বা কোথায় দেখা হয়েছে সঠিক মনে নেই।
তবে টোকিও থেকে প্রকাশিত প্রথম মুদ্রিত বাংলা পত্রিকা ‘মানচিত্র’র আমি যখন টোকিও এডিটর হিসাবে দায়িত্ব পালন করছি, তখন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল পত্রিকাটির জন্য ঢাকা থেকে লেখা সংগ্রহ, ছাপা ও পাঠানোর দায়িত্ব পালন করছিলেন। তখন আজিজ সুপার মার্কেটে তার একটি অফিস ছিল। মাঝেমধ্যেই ফোনে কথা হত। তখন ফোনের বিলও ছিল অনেক। যে কারণে প্রয়োজনের বাইরে কথা হত খুব কমই। তাঁর সাথে কথা বলে মনে হত, মানুষকে উপরের দিকে নিয়ে যেতে কোনো কার্পণ্য নেই তাঁর।
দেশে থাকতে আমিও কম বেশি সাহিত্যাঙ্গনে দৌড় ঝাঁপ করেছি। যেখানে যাকে সম্ভব নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। যার যে মেধা তাকে সেই ধারার লোকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি বলেই, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের এই গুণ আমার কাছে খুব ভাল লাগে। এই ভাল লাগার কারণেই তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক দৃঢ় হয়। এরপর মানচিত্র ছেড়ে নিজেই ‘বিবেক’ নামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশনার কাজ শুরু করি। এই কাজকে কেন্দ্র করে তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয় গভীর।
১৯৯৯ এর মাঝামাঝি সময় আমি দেশে যাই। সেই যাওয়া ছিল জাপান আসার প্রায় দশ বছর পর দেশে যাওয়া। সে বছর দেশে গিয়েই সম্ভবত সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। বাস্তবে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা ’৯৯-এ হলেও, তাঁর লেখার সঙ্গে কিন্তু পরিচয় হয়েছিল আরও অনেক আগে।
আমি তার লেখা কবিতা পেলেই পড়তাম মন দিয়ে। তাঁর লেখার গভীরে যেতে পারতাম না কখনও। সত্যি কথা বলতে আমি তাঁর কবিতা পড়ি, কিন্তু কবিতা বুঝি কম। তারপরেও সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল বলে কথা। তাঁর লেখা দেখলেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা বা ম্যাগাজিন উল্টাতাম।
২০০৫ এ আমি ঢাকা গিয়ে দেখা করলাম কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে আমার ‘বিবেক’ ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে দেশের খ্যাতিমান লেখকদের কাউকে ‘বিবেক সাহিত্য পুরস্কার’ দেওয়া প্রসঙ্গে কথা বললাম। লেখক নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত পছন্দের তিন জন লেখকের কথা বললাম। এর মধ্যে খ্যাতিমান লেখক নাট্যকার (বর্তমানে দৈনিক কালেরকন্ঠ সম্পাদক) ইমদাদুল হক মিলন এর নাম বলার পর উনি জানালেন লেখক ইমদাদুল হক মিলন এর ব্যপারটা উনি দেখবেন।
পরের দিন আমরা মিলন ভাইয়ের ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির হলাম। মিলন ভাইয়ের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হল। আলোচনার পর মিলন ভাই রাজী হলেন টোকিও এসে ‘বিবেক সাহিত্য পুরস্কার’ গ্রহণের জন্য। মিলন ভাইকে রাজী হতে দেখে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল বললেন, আমাকেও তাহলে সঙ্গে নিও। আমি বললাম মিলন ভাই রাজী হলে আমার কোন আপত্তি নেই। আমি কোন খরচ দিতে পারবো না। এতেই রাজি হলেন। আবার গেলাম মিলন ভাইয়ের কাছে। গিয়ে বিষয়টি জানালাম।
মিলন ভাই সব শুনে রাজি হলে পর, উনি একটা কথাই বললেন, এতদিন ‘মানচিত্র’র সঙ্গে আমি জড়িত, কাজ করেছি মন দিয়ে। আমাকে ওরা এতবার আশ্বাস দিয়েও নিয়ে গেলো না জাপানে। তুমি কাজটি করছ এতে আমি কৃতজ্ঞ। আমি তাঁর কৃতজ্ঞতার কথা শুনলাম। সেবার মিলন ভাই আসলেন। সঙ্গে দুলাল ভাইও। দেশে ফিরে গিয়ে অল্প দিনের মধ্যে আবার আসলেন জাপান। এবার আসলেন আন্তর্জাতিক বই মেলার আমন্ত্রণে।
ঠিক ওই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাপান সফর করলেন। খালেদা জিয়া টোকিওতে শহীদ মিনার উদ্বোধন করার পর বাংলাদেশি কমিউনিটি কর্তৃক আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধণা অনুষ্ঠানে যুবক গ্রুপের চেয়ারমেনের সঙ্গে তাঁর (দুলাল) ঘনিষ্ঠতা দেখে কিছু প্রশ্ন মনে উদয় হল। প্রশ্নর উত্তর খুঁজতে থাকলাম। সেবার দুলাল ভাই আমার বাসাতেই ছিলেন।
দেশে ফিরে যাবার সময় আমার অনেকগুলি লেখার পাণ্ডুলিপি যার কোন কপি রাখা হয়নি, সবগুলি তাঁকে দিয়ে বলেছিলাম, কম্পোজ করে পাঠাবেন প্লিজ। লেখাগুলো অজানা কারণে আর কম্পোজ হওয়া বা হাতের লেখার কোনটিই পেলাম না। এরপর তাঁর কানাডা যাবার আগে পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম তার প্রতিষ্ঠানে জামায়াতের লোকেরা হামলা করেছে।(যদিও সেইসব গল্প সবই লোকমুখে শুনেছি, বাস্তবতা যে ছিল ভিন্ন)। এতে পরে আমার লেখা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলা হল লেখাগুলি নাকি তাঁর অন্যান্য কাগজপত্রের সঙ্গে হামলার কারণে নাই হয়ে গেছে। কষ্ট পেলাম এমন সংবাদে। এরপরেও তাঁর কাছে গেলাম। তাঁর বাসায় দাওয়াত রক্ষা করলাম। কিছুদিন পর উনি আমারই মত প্রবাসী হলেন। মনে হয়েছিল প্রবাসী হবার জন্যই যেন এ কবির এত নাটক লেখা আর নাটকে অভিনয় করা।
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল কানাডা প্রবাসী হবার পর এপর্যন্ত মনে এল কয়েকবার হ্যালো দিয়েছি। উত্তর নেই। আর এবার (২০১২) প্রথম ঢাকা একুশের বই মেলাতে গিয়ে দেখা হয়েছে। দেখা হয়েছে ‘মানচিত্র’ সম্পাদক প্রবীর বিকাশ সরকারের সঙ্গেও। আমার সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে সৌজন্যতার খাতিরে। মনে হল সৌজন্যতার বাইরে বেশি কিছু আর বলতে চাইলেন না। বারকয়েক একটি বই এর কথা জানতে চাইলেও উত্তর দিলেন না। কথা বলার ইচ্ছাই যেন নেই তাঁর। বাধ্য হয়ে তাঁর চোখের আড়াল হলাম।
দুলাল ভাই, প্রতি বছরই আপনাকে বিশেষ ভাবে মনে করি। স্মরণ করার দিনটি হল ৩০শে মে। ২৯ মে আমার জন্ম দিন পালন করার পর, এই নিয়ে যখন ব্যস্ততার সমাপ্তি টানি তখন চোখে ভাসে আপনার জন্মদিনের সংবাদ। আজও বাংলানিউজ-এ আপনাকে নিয়ে ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন এর লেখা পড়ে মনে হল আপনার পুরানো দিনের অনেক কথা। ইচ্ছা হল এক কলম লিখতে।
রিটন ভাইয়ের উদারতার সঙ্গে আপনাকে মিলালাম। মিলল না কিছুতেই। তার লেখার শেষ দিককার অংশটুকু আমাকে টেনেছে খুব। আপনার অনেক কিছুতে আমি আপনার উপর খুশি, কৃতজ্ঞও। কিন্তু আপনি কিছু কথা বলেছিলেন, মনে পড়ে কি আপনার? জাপান নিয়ে আসলে আপনি অন্য কোথাও সহজে ভ্রমণ করতে পারবেন এবং মিলন ভাইয়ের সঙ্গে এপ্লাই করলে ভিসা পেতে সহজ হবে। সবটাই হয়েছে, আপনার ইচ্ছা পূর্ণ করতে আমি সহযোগিতা করতে পেরেছিলাম বলে দাবি করতে চাই। কিন্তু এরপর থেকে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কারণ থাকতেই পারে। টোকিও ঘুরে গিয়ে টোকিওতে শহীদ মিনারের যে ইতিহাস আপনি লিখেছেন ঢাকার পত্রিকায়, সেখানে এর ঘোষক বা প্রস্তাবককে দেখলাম আমাদের দেশের স্বাধীনতার ঘোষকের মতই বিতর্কিত করে ফেলেছেন। কারণ হিসাবে কি বলতে পারি, যুবকের টাকায় জাপান ভ্রমনের কারণেই এটা হল কিনা(এমনই শুনেছি)। এজন্য টোকিওতে কেউ কেউ ভীষণ মনোকষ্ট নিয়ে বসে আছে আপনার উপর।
যে বৈশাখী মেলায় আপনি প্রথম জাপান আসেন, সেই মেলারই কর্মকর্তাদের কেউ কেউ কথাটি আমাকে বলেছেন কয়েকবার। তাদের ভাষ্য, আমিই আপনার হোস্ট ছিলাম, আমাকেই বলতে হবে এই মিথ্যা ইতিহাস রচয়িতাকে সত্য ইতিহাস। সুযোগ দিলে জানাতে চাইবো আপনার ইতিহাস লেখার আগে একবার অন্তত সত্য ইতিহাস জেনে নিন।
কি দরকার দুলাল ভাই,(?) একই প্রবাসী হয়ে রিটন ভাই এর মত উদার লোকের মনোকষ্টকে দীর্ঘ করা আর দূর প্রবাসে আমাদের কষ্টে রাখা। এতে আপনার কিছু ভাল গুণ চাপা পড়ে যাবে যে। আমি আপনার একজন ভক্ত-শুভাকাংখী হিসাবে বলবো, এখনও সময় অনেক আছে। এই সুদূর পথ চলতে হবে আপনাকে এই মানুষদেরই নিয়ে। মানুষদের মাঝেই বেঁচে থাকতে হবে আপনাকে আপনার কর্ম দিয়ে। সেই কাজটিই করুন, যাতে এই কাছের মানুষ গুলোই কলম ধরে আপনার গুণকীর্তন করতে।
আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। আজকের এই দিনটির মত প্রতিটি দিন হোক আপনার সুন্দর আর স্বার্থক। আপনার মঙ্গল ও সফলতা কামণা করি।
-----------
লেখক : জাপান থেকে প্রকাশিত প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা বিবেকবার্তা ডট কম এর সম্পাদক।
বাংলাদেশ সময় ১৬৫৩, মে ৩০, ২০১২
সম্পাদনা : ফেরদৌস মাহমুদ, শিল্প-সাহিত্য সম্পাদক