৫ আষাঢ় ১৪২০, বুধবার জুন ১৯, ২০১৩ ৯:১২ এএম BDST banglanew24
09 Jul 2012   06:44:36 PM   Monday BdST
E-mail this

গল্প

তোমার ভালোবাসার মতোই প্রিয় এ রাইফেল


শারমিন সুলতানা
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
তোমার ভালোবাসার মতোই প্রিয় এ রাইফেল গল্প

আমার নানী যে কিনা এক ইসরায়েলি নকশাবিদকে ভালোবাসতো এবং তাদের অনেক চিঠিই মায়ের ডায়েরির রক্তাক্ত শব্দগুলোর মধ্যে আমি আবিষ্কার করেছিলাম। সেই ছিপছিপে সুন্দর ইসরায়েলি ভালোবাসতো তার পাড়ার সবচেয়ে দুরন্ত মেয়েটাকে যে কিনা আবার পালিয়েছিল এক গেরিলার হাত ধরে স্বাধীন ফিলিস্তিনের সংকল্প ও প্রেমে। পাথর সবুজ পাহাড়ের নির্জন বাতাসে দুজন পাশাপাশি এই সব গল্পের ফাঁকে একে অপরের অপরূপ সৌন্দযের্র বিস্ময়ে অপলক তাকিয়ে রয়েছে স্বপ্নের গহীন মুক্তাঞ্চলের অলিভ গাছের খানিকটা দূরে যে ছায়াটা ছবির মতন পড়ে আছে সেখানটাতেই বসে। প্রতিটি বেদনার নির্ভুল অনুভূতির মতনই এ অনুভব কারুকাজের নিবিড় মগ্নতায় আচ্ছন্ন ও বিহ্ববল করে রেখেছে দু`জনকেই।
•    চিঠিগুলো পড়তে দিবে আমায় বা পড়ে শোনাবে কখনো?
•    অবিচার আর আর্তকথাপূর্ণ পৃষ্ঠাগুলো, যা তোমাকে গভীর এক উৎকণ্ঠায় নিমজ্জিত করবে। না, না আমার ভয় হয়। যদি তুমি ও আমি সেই সব সত্যের ভেতর নিজেদের চিনতে না পেরে আর অন্য কোন ডায়েরির পাতায় বসে গোপনে কাঁদতে থাকি। নাহ, প্রিয় আদর আমার; তা তুমি আর কখনোই জানতে চেয়ো না।
•    প্রিয় স্বাধীনতা, অ আমার মুক্তির হাসি, এভাবে ফিরিয়ে দিও না আমায়। সেই সব ঘটনাবহুল জগৎ থেকে যা কিনা আমাদেরই ভ্রুণের জগতে খাঁচাবন্দি পাখির মুমূর্ষু কাতরতায় আমাদেরই অপেক্ষায় এতো কাল ধরে অপেক্ষারত। তুমি ছাড়া আর কে আছে আমাকে ভালোবাসা আর বেদনার সেইসব গান শোনাবার, বল?
•    হুবহু সব মনে নেই। বসন্তের রঙের চেয়েও উজ্জ্বল নির্মম অথচ বিপুল শব্দের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া দিনলিপিগুলো। মায়ের কাছে যেদিন ধরা পড়ি সেদিন আমরা একে অপরকে জড়িয়ে সারা রাত কেঁদেছিলাম। আমাদের উঠান আর গাছগুলোর মাঝখানে জোর করে কাঁটাতার ও প্রহরীর নিষ্ঠুর বন্দুকগুলোর নল থেকে বেরিয়ে আসা ভয়াবহ দিনরাতের বেঁচে থাকা প্রতিটি মুহূর্তের উৎকণ্ঠা ও মৃত্যুর বিভীষিকাগুলোর কথা মনে করে। যে বছর মায়ের আঠারো বছর আর নানীর একত্রিশ এবং আমার সাত সেই বছর ঐ ইসরায়েলি নকশাবিদ একবার আমাদের শহরে এসেছিল। শুধুমাত্র নানীর কথা মতোন চিঠিগুলো ফেরৎ দিতে। তার পরনের পোশাক অবিকল গেরিলাদের মতন যেন এক ফিলিস্তিনি; ভূখণ্ডের অধিকারের জন্য লড়তে গিয়ে বহুদিন পর বাড়ি ফিরেছে। গলায় ও মাথায় পেঁচানো সাদাকালো রেকাবটা খুলে যখন সে জানালার কাছে আমার মাথায় হাত রাখছিল ও আদর দিচ্ছিল গালভরে, ঠিক সেই মুহূর্তে জানালার কাচে আটকানো রং পেন্সিলে আঁকা কয়েকটা বেলুন ও কয়েকটা ঘুড়ি তছনছ করে একটা বুলেট তার কান এবং মাথা বরাবর ঢুকলে রক্তের ফিনকি গড়িয়ে আমার মুখ ও মায়ের ওড়না ভিজে গেল। আমরা দু`জনেই চিৎকার করে উঠি। আর ট্যাংকগুলো একটার পর একটা গোলা ছুঁড়তে থাকে অবিরাম। বিকট শব্দ ও ধ্বংসস্তুপের মধ্যে আমি, মা আর নানী এবং ঐ ইসরায়েলি প্রেমিকটি একাকার হয়ে নিঃশ্চুপ ধোঁয়ার অন্ধকারে পড়ে থাকি। পুরোটা শহরের শিশুরা ধ্বসে পড়া দেয়ালগুলোর নিচে চাপা পড়ে যায়। তাদের চঞ্চল ফুটফুটে নিঃশ্বাগুলো হারিয়ে যায়।
•    দোহাই তোমার এবার একটু থামো, থামো। আমার কান ঐ শব্দগুলোর আর্তনাদে বধির হয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্ণী আমার আগুনের কুঁড়ি, চুপ করো, চুপ করো...
•    শেষ যে দিন মায়ের সাথে হাঁটতে হাঁটতে পুরোটা শহরকে আমার লাশের খরস্রোত ঢেলে এগিয়ে যাওয়ার মতই কষ্টকর লাগছিল। মায়ের চোখের দিকে সেদিন আমি এক অগ্নুৎপাতের ছিটিয়ে পড়া লাভার ক্রোধ দেখতে পেয়েছিলাম। আর ভয়ের সাথে সেটাই ছিল আমার শেষ সংলাপ। মায়ের কাঁধে রাইফেল আর আমার হাতে তার আঙ্গুল। আমরা একটা পর একটা ভেঙে পড়া পোড়া দালান পেরিয়ে এগুচ্ছিলাম।
•    কোথায় যাচ্ছি মা? অবুঝ এ প্রশ্নের কোন উত্তর না দিতে পেরে চোখ থেকে এক ফোটা জল হাতে নিয়ে সূযের্র দিকে ধরে বলল, ‘দেখ কি ঝলমল করছে, নাহ? ঐ শাদা উজ্জ্বলতাকে লুট করে নিয়ে গেছে এই শহর থেকে ওরাই যারা আমাদের আত্মার পড়শি ছিলো বহুকাল। আমরা দু`জন তা ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছি।’ সামনে কাঁটাতার ও একটা ট্যাংক। সতর্ক মা আমাকে লুকিয়ে ফেললেন। ঘুম ভেঙে দেখি, আলিঙ্গনে মা নেই। রাইফেলটা আমার দুহাতে জড়ানো, অনভ্যস্ত ভার। আর পেছনের দেয়ালে নিথর পড়ে থাকা মায়ের রক্তাক্ত হাতে নিজেরই রক্তে লেখা- ‘সোনা আমার ঝলমলে রোদের কণা, ঐ হারানো উজ্জ্বলতাতে তোরই সব চেয়ে বেশি অধিকার। শুধু মাত্র তাকে ফিরিয়ে আনতে এর বেশি আদর তোর হাত ছুঁয়ে রেখে যেতে পারিনি...’
•    ছুরির আঙ্গুল অ আমার প্রিয় লালফিতার মসলিন ঝলমল, ব্যথার ডাইনির কারাগারে এভাবে বন্দী থেকেও তুমি আমাকে শুনিয়েছো জোছনায় ধুয়ে যাওয়া পাহাড়ি বাতাসের টলমলে গান আর ভালোবাসার সেই সব পঙক্তি যা রূপকথার প্রেমিকেরাও কখনো শোনায়নি তাদের রাজকন্যাদের । অ আমার বেবিলনের বিরল ক্যাকটাস, এবার থামো। সন্ধ্যার কোলে যে- ফুটফুটে রাতের টিপ ফুটল বলে। এবার যে বাড়ি ফিরতে হবে। আরেকটু পরেই তো টহল গাড়ির গড়গড় শুনে শিশুরা সারারাত জেগে থাকবে এই ভয়ে কখন দৈত্যগুলো হামলে পড়ে সশব্দ আঁধারের চিরপুরাতন মুখ ঝলসিয়ে দেয়।
•    থাকো না। আমিই পৌঁছে দিয়ে আসবো।
•    না, না গতবার কি হয়েছিল ভুলে গেছ? তুমি পারোও বটে। যদিও এতটা সাহসী বলেই ভালোবাসি। আজ যাই।
•    পাহাড়ের মুখে আকাশটা যেন লালখয়েরি একটা মখমলের চাদর জড়িয়ে নিয়েছে। বাতাসের হালকা দোলায় সতর্ক ঐ যে সে কাঁটাতার পেরুল যেন কাঠবিড়ালী।
•    ডায়েরির বাকি পৃষ্ঠাগুলোতে কিছুই লেখা ছিল না শুধু শেষ পৃষ্ঠায় একটা কবিতার মতো লেখা ছাড়া। গাজার প্রায় মৃত এক বৃদ্ধ ব্যাথায় কাতরাতে কাতরাতে হাস্যোজ্জ্বল, আমাকে এটা দিয়ে বলেছিল- ‘কখনো সময় হলে পড়ে দেখো- আমাদের ভালোবাসা ও সংকল্প কতো তীব্র।’ প্রচণ্ড ধোঁয়া আর উড়ন্ত গোলার ভেতর লোকটিকে হারিয়ে ফেললাম; পলকেই। কফির কাপভর্তি খয়েরি অন্ধকারের ধোঁয়া আর ফেনার পর্দায় পুরোটা দৃশ্যের মধ্যে এতোক্ষণ যেন আমিও ছিলাম, একজন। আরেক কাপ কফির ইশারা দিয়ে শেষ পৃষ্ঠার দিকে এগুলাম-
•    তুমি নিশ্চয়ই এতোক্ষণে খাবার খেয়ে নিয়েছো। আমাকে আরো কয়েক মাইল পথ হাঁটতে হবে যদিও পাহাড়ের কপালে চাঁদ আর ঝোপের জোনাকপাখিরা অন্তরঙ্গ সঙ্গ দিয়ে চলেছে। তবু একটা ঠাণ্ডা কাঁটা বারবার ব্যথাকে জাগিয়ে তুলছে। আবার এভাবে আমাদের দেখা হবে তো... রাইফেলটা রোজকার মতন মুছে নিলাম। কাল কোথাও যাওয়ার খবর আসবে। এখনই ঘুমিয়ে পড়বো বা ঘুমের সাথে কথা বলতে বলতে তুমি এসে হাজির হবে আর আমি আরো শক্ত করে রাইফেলটাকে জড়িয়ে ধরবো। হাত বুলাবো যেন মায়ের চুল বেঁধে দিতে দিতে শিখে নিয়েছিলাম বলেই তোমার চুলে ফুল গুঁজে দিতে জেনেছি... পার্টির আগামী সংখ্যার জন্য একটা লেখা তৈরির ইচ্ছা হচ্ছিল অনেকদিন ধরেই। আজ মনে হয় সেটা শুরু করার মতন চমৎকার একটা সম্ভাবনার ঘ্রাণ তোমার দেয়া ফুলগুলোর সাথে এ ঘর পর্যন্ত এসে গেছে। তবে আর দেরি কেন শুরু করা যাক, কি বল?...
 
তোমার হাতভর্তি ফুল ও ভালবাসার মতোনই প্রিয় আলিঙ্গন এ রাইফেল।
যেহেতু;
আত্মহত্যার বদলে আত্ম-উপলব্ধির যন্ত্রণায় বিচ্ছুরিত রাত্রিগুলোতে
আমার জানলার কাচে আঁকা ছবিটার খুন হওয়ার মতো
কখনোই ভুলিনি,
ন্যায্যতা; -যা আমাদের সব চেয়ে প্রিয় গন্তব্য।
তোমার হাতভর্তি ফুল ও ভালবাসার মতোনই প্রিয় আলিঙ্গন এ রাইফেল।
কেননা;
আমরা সেই ঝর্ণা যাকে পাহাড় অস্বীকার করেছে
আমরা সেই স্রোত যাকে উদ্বাস্তু করা হয়েছে নদীরই বুকে
আমরাই সেই গান যাদের কণ্ঠ অবরুদ্ধ করা হয় প্রতিদিন
আমরাই সেই ভূমিহীন যাদের নিজস্ব ভূমি
ধর্ম ও আধিপত্যান্ধের প্রতারণায় লুণ্ঠিত।
শুধু মনে রেখ-
তোমার হাতভর্তি ফুল ও ভালবাসার মতোনই প্রিয় আলিঙ্গন এ রাইফেল।
তোমার চোখভর্তি স্বপ্ন ও দৃঢ়তার মতোনই প্রিয় আলিঙ্গন এ রাইফেল।
তোমার বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা ও
উৎকণ্ঠাহীন নিঃশ্বাসের মতোনই প্রিয় আলিঙ্গন এ রাইফেল।
ওদের ঘৃণা ও ক্রোধের ‘বৈধতা’র! মতোনই প্রিয় আলিঙ্গন এ রাইফেল।
ওদের শিশু হত্যা ও ববর্রতার! মতোনই প্রিয় আলিঙ্গন এ রাইফেল।
তোমার হাতভর্তি ফুল ও ভালবাসার মতোনই প্রিয় মা ও মুক্তির এ রাইফেল।
এই পৃষ্ঠাটির একদম বাম কোনায় একটা কাঁটাতারের নকশার ঐপারে ঝুলন্ত একজন পুরুষ এবং এপারে একজন নারীর আঁকা আকৃতি। দু’জনেই মৃত। মাঝখানে দুইটি শিশু কাঁটাতার কামড়াচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে- ‘আমাকে আমার ভাইয়ের বাড়িতে নির্বিঘ্নে ঘুড়ি বানানোর রং করা কাগজ আনতে যেতে হবে। এই কাঁটাতার সরাও’। দূরে আর একজন যুবক যার কাঁধে একটা রাইফেল। রাইফেলের নলে গুঁজে রাখা একমুষ্টি ফুল, হাতে একটা কাগজ যাতে লেখা- ‘আমাকে আমার প্রেমিকার হাতে এই চিঠি ও ফুল পৌছেঁ দিতে হবে’।
(গল্পটি ফিলিস্তিনের সকল শিশু ও গেরিলাদের উৎসর্গিত)

বাংলাদেশ সময়: ১৭০৫ ঘণ্টা, ০৯ জুলাই, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
banglanews24 All Apps
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
IIMEJ
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান