 |
| সংগৃহীত |
চট্টগ্রাম: `আমরা দল বেঁধে আদালত ভবন থেকে রেজিস্ট্রি ভবনের সামনে পৌঁছার পর দেখি হিংস্র পুলিশের আক্রমণে অসংখ্য মানুষ হতাহত হয়ে পড়ে আছে। সাধারণ মানুষ প্রাণরক্ষা ও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পাগলের মত ছোটাছুটি করছে। চারপাশ খোলা, সামিয়ানা খাটানো একটা ট্রাকে দলীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে শেখ হাসিনা দাঁড়িয়ে আছেন এবং হ্যান্ডমাইকে পুলিশ বাহিনীকে লক্ষ্য করে বারবার বলে চলেছেন-আমি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বলছি, আপনারা জনতার উপর গুলি চালাবেন না।`
স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী তুমুল আন্দোলনের মধ্যে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে ইতিহাসের যে নৃশংসতম গণহত্যা সংঘটিত হয়, আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে আইনজীবী ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল সেদিনের পরিস্থিতি এভাবেই বর্ণনা করেছেন।
২০০০ সালের ৮ আগস্ট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল গণহত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্যে তিনি জানান, সেদিন ঘটনার সময় শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রাকটিকে ঘিরে ছিল সশস্ত্র পুলিশের নিশ্চিদ্র বেস্টনী। পুলিশ বাহিনী সরাসরি গুলিভর্তি রাইফেল তাক করে ছিল শেখ হাসিনার দিকে।
সাংবাদিক নিরুপম দাশগুপ্ত সম্পাদিত `চট্টগ্রাম গণহত্যা: প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি` শীর্ষক বইয়ে প্রত্যক্ষদর্শী বিভিন্নজনের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে সেদিনের ভয়াবহ পরিস্থিতি, যে বইটি ইতোমধ্যে সেই নিষ্ঠুর ওই গণহত্যার প্রামাণ্য দলিল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
২০০০ সালের ২১ মে অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত`র (বর্তমানে মানবতা বিরোধী আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর) কাছ থেকে নেয়া একটি সাক্ষাৎকার ছাপানো হয় বইটির ২৮ থেকে ৩২ পৃষ্ঠায়।
রোমহর্ষক এ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রানা দাশগুপ্ত জানান, পুলিশের অন্যায় গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে কয়েকজন আইনজীবী শ্লোগান দিতে দিতে আদালত ভবন থেকে নেমে যান। আইনজীবীদের মধ্যে ছিলেন, অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল, মাজেদুল হক, শামসুল ইসলাম, সব্যসাচী দত্ত, স্বপন চক্রবর্তী ও অ্যাডভোকেট শহীদুল হুদা (পরবর্তীতে মামলার বাদি)।
তিনি বলেন, `চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে টেলিফোন করে জানা গেল, গুলিবিদ্ধ বহু লাশ ও আহত ব্যক্তিকে এ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে এবং আরও অনেক মৃতদেহ ও আহত মানুষ শহরের বিভিন্ন স্থানে তখনও পড়ে আছে। এ নিদারুণ মর্মান্তিক সংবাদটি এরশাদবিরোধী আন্দোলনের আরেক অগ্রনেত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে জানিয়ে দেয়ার জন্য শেখ হাসিনা সাথে থাকা একজনকে নির্দেশ দেন।`
বইটির ৪০ পাতায় গণহত্যা পরবর্তী পরিস্থিতির আরও ভয়াল বর্ণনা আছে তৎকালীন চট্টগ্রাম নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইনের কনস্টেবল মোহাম্মদ আলীর বর্ণনায়। ২০০০ সালের ২৪ জানুয়ারি বিচারিক আদালতে তিনি এ মামলার সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ঘটনার দিন রাতে এর চেয়েও যে ভয়াল, পৈশাচিক ও মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে হবে তখনও বুঝিনি। রাত তখন গভীর। চারপাশ নীরব, নিস্তব্ধ। জে.সি মন্ডল সদলবলে একটি খোলা ট্রাকে করে পুলিশ লাইনে এসে পৌঁছলেন। তার সাথে থাকা ফোর্স তখনও সশস্ত্র অবস্থায়। তবে উর্দিপরা নয়, সাদা পোশাকে। জেসি মন্ডলের নির্দেশমত সাদা পোশাকের ফোর্স পুলিশ লাইনের একটি অব্যবহৃত একটা ঘরের মধ্য থেকে আট-দশটা লাশ ট্রাকে তুলে নিয়ে কোথায় চলে গেল। প্রতিটি লাশ ছিল রক্তাক্ত, বিকৃত, বীভৎস এবং সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায়। সহকর্মীদের কাছ থেকে জানলাম, মন্ডল ও তার লোকেরা সেদিন সন্ধ্যায় লাশগুলো পুলিশ লাইনের ঘরটিতে রেখে গিয়েছিল।
উল্লেখ্য জেসি মন্ডল কোতয়ালী থানার তৎকালীন টহল পরিদর্শক (পিআই) ছিলেন। বর্তমানে পলাতক থাকা মন্ডল ওই মামলার অন্যতম আসামী।
২৪ জানুয়ারির গণহত্যা নিয়ে সিএমপি`র ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক অভিজিৎ চাকমা ২০০০ সালের ৫ জুলাই বিচারিক আদালতে জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, `শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রাক আদালত ভবনে উঠার রাস্তার দিকে এগিয়ে এলে জটলা সৃষ্টি হয়। ঠিক তখনই জেসি মন্ডল অয়্যারলেসে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদাকে বলেন, `ওরা এসে গেছে স্যার।` উত্তরে কমিশনার হুদা উচ্চস্বরে চীৎকার করে বলেন, `হামাইয়া ফেল! শোয়াইয়া ফেল! গুলি কইরা হাসপাতাল ভরাইয়া ফেল! এরপর শুরু হয় নিরস্ত্র জনতার উপর গুলিবর্ষণ।`
২০০০ সালের ৭ আগস্ট বিচারিক আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে আহত তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা অমল কান্তি দাশ বলেন, সেদিনের ঘটনায় আমার মুখের ডানদিকের চোয়ালের একাংশ সম্পূর্ণ উড়ে যায়। সুদক্ষ ভারতীয় প্লাস্টিক সার্জনরা আমার মুখের ডানপাশের ও বাঁ পায়ের ত্বক ও মাংসপেশীর কিছু অংশ কেটে নিয়ে ডান চোয়ালে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালান। কিন্তু তারপরও তারা পুরোপুরি সফল হতে পারেননি। তাছাড়া পুরোপুরি সফল হওয়াও সম্ভব ছিলনা। আর তা ছিলনা বলেই আমি আজও এক বিকৃত-বীভৎস চেহারার অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছি।
১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে মারা যান ২৪ জন। বহু লোক আহত হন। যারা মারা যান তাদের সবাইকে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে অভয়মিত্র মহাশ্মশানে পুড়ে ফেলা হয়।
গনহত্যা নিয়ে ২০০০ সালের ৯ আগস্ট বিচারিক আদালতে জবানবন্দি দেন নগরীর বলুয়ার দিঘীর পাড়ে হিন্দু ধর্মীয় অভয়মিত্র মহাশ্মশানের পুরোহিত মন্টু কুমার চক্রবর্তী।
জবানবন্দিতে মন্টু বলেন, যেসব পুলিশ লাশগুলো শ্মশানে নিয়ে এসেছিল তাদের শার্টে নেমপ্লেট ছিলনা। জীপ ও ট্রাক থেকে পুলিশ নেমে লাশগুলো পুড়ে ফেলার নির্দেশ দেয়। তবে এসব লাশের মধ্যে ৪টি মুসলিম সম্প্রদায়ের হওয়ায় আমরা দাহ করতে অপারগতা প্রকাশ করি। এতে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। গালিগালাজ করে এক পর্যায়ে গলাধাক্কা দিয়ে কালু ডোম ও আমাকে জীপের মধ্যে উঠিয়ে পুলিশ কমিশনার রকিবুল হুদার কার্যালয়ে নিয়ে যায়।
আমাদের সাথে থাকা এক পুলিশ রকিবুল হুদাকে বলেন, স্যার, এরা ডকুমেন্ট ছাড়া মৃতদেহ পোড়াবেনা বলছে। একথা শুনে হুদা ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন, `মন্ডল (জেসি মন্ডল), দিনের বেলা বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে যেভাবে হয়েছে, সেইভাবে এদেরকে শেষ করে দেন।` কালু ডোম একথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে কমিশনারের পা জড়িয়ে দেন এবং কান্না করতে করতে বলেন-স্যার, কাজ করে দেব। আমাদের ক্ষমা করে দেন। কমিশনার একথা শুনে চীৎকার করে বলে উঠেন, `যা যা তোর শরীর থেকে মরা মানুষের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।`
ইতিহাসের ভয়ংকরতম এ নৃশংসতার বিচার গত ২৫ বছরেও হয়নি। সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী, ঘটনার শিকার আহতরা, নিহতের স্বজনরা সবাই চান, এ ঘটনার বিচার হোক, দোষীরা শাস্তি পাক।
সাংবাদিক নিরুপম দাশগুপ্ত বাংলানিউজকে বলেন, `বিবেকের তাগিদে ইতিহাসের এ বর্বরতা নিয়ে আমি কিছু তথ্য প্রকাশ করেছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এ বই পড়ে স্বৈরাচার, সামরিক শাসকদের নির্মমতার তথ্য জানতে পারবে। আমি চাই, এ ঘটনার বিচার হোক। যত দ্রুত সম্ভব আদালত বিচার শেষ করে রায় ঘোষণা করুক।`
একই প্রসঙ্গে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবী ও রাজনীতিক ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল বাংলানিউজকে বলেন, `আমার দু`টি দাবি আছে। যাদের আমরা হারিয়েছি তাদের তো আমরা আর ফিরে পাবনা। হতাহতদের পরিবারকে যেন সরকার খুঁজে বের করে তাদের পাশে দাঁড়ায়, তাদের পুর্নবাসন করে। আর দ্রুততার সঙ্গে যেন এ ঘটনার বিচার শেষ হয়।`
বর্তমানে মামলাটি যে আদালতে বিচারাধীন সে আদালতের অতিরিক্ত পিপি অশোক কুমার দাশ বাংলানিউজকে বলেন, `আমরা ইতোমধ্যে ২৫ জনের সাক্ষ্য নিয়েছি। আমাদের পক্ষ থেকে আর সাক্ষ্য নেয়ার প্রয়োজন নেই। আগামী ধার্য তারিখে যুক্তিতর্কের সময় নির্ধারণ করবেন আদালত। আশা করছি, দু`মাসের মধ্যে বিচার শেষ হবে।`
বাংলাদেশ সময়: ২০০০ ঘণ্টা, জানুয়ারি ২৩,২০১৩
আরডিজি, সম্পাদনা: তপন চক্রবর্তী, ব্যুরো এডিটর।