 |
উপসংহার:
হিলি স্টেশন
সকাল ৯.৪৫
যদিও
সূর্যটা চায়ের দোকানটার ঐ পাগলটার মতোই
উত্তেজিত, প্রখর। চায়ের কাপের টুংটাং আর
নানারকম হকারের মুখরতাময় প্লাটফর্ম
সরগরম কেননা ঘণ্টা বেজেছে। যদিও
ভরাপেটের ঢোঁড়াসাপের চেয়েও অবিশ্বাসযোগ্য
কেননা তারও বুঝি গতানুগতিক নির্দিষ্ট গতি
আছে কিন্তু, এ ট্রেন অজগরের মতো হেলতে
দুলতে কিছুক্ষণ পরে অথবা অনির্দিষ্টকাল পরে
আসতে পারে, লোকাল না হলেও বলা যায়
এর সময়জ্ঞান আমার তোমার মতো সাধারণের
জ্ঞাতার্থে না থাকলেও মধ্যবিত্তের ঈশ্বর জানলেও
জানতে পারেন। শুকতলা ক্ষয়ে যাওয়া কালো
কুচকুচে পায়ের স্যান্ডেল পরিহিত যাত্রীসহ বুট
জুতা পরিহিত সবাই আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে
প্লাটফর্মে, খুঁজলে দু’একটা পেন্সিল হিলও পাওয়া
অসম্ভব না। কিছু সৌম্য শান্ত পৌঢ় মাঝবয়সী
অধ্যাপক টাইপের লোকও দেখা যায়- মোটা
ফ্রেমের চশমা ঝুঁকে পড়েছে নিয়ম অনিয়মের
হলুদ দস্তাবেজ বা সংবাদপত্র নামক প্রহসন
পত্রে! এত কিসিমের যাত্রীদের মধ্যে কিছু
বেঢপ আকৃতির, রুটি বেলা বেলনার মতো
মধ্যেখানে বেলুনের মতো চোরামাল ভরে,
মাথা ও সরু পায়ের ব্ল্যাকার মানুষগুলো
এই যুগ-সময়ের জলজ্যান্ত প্রহসন হয়ে
দাঁড়িয়ে আছে। এই জলন্ত প্রহসনগুলোই
হিলি স্টেশনকে অনন্য করেছে বাকিসব
স্টেশন থেকে। সীমান্তবর্তী স্টেশনটাতে
ভারতীয় পণ্য যেমন- জিরা, মালটা, চিনি,
পোষাক কখনো-সখনো হিরোইন; শুল্ক
ফাঁকি দিয়ে পাচার হয় আমাদের ঠ্যাং ভাঙ্গা
দেশে। উৎসবের আগে এই ব্যাবসা রমরমা।
যেহেতু ঈদ আসতে আর মাত্র একটি রোজা
তাই আজ নাই মানুষ-ভিড়ের অভাব,
না অভাব ব্ল্যাকারদের।
অবশেষে খাদ্য গ্রহণের পর হেলে দুলে ধীর গতির
সর্প- হাসফাঁস করে হাঁপাতে হাঁপাতে বহুল
প্রতীক্ষিত বরেন্দ্র এক্সপ্রেস প্লাটফর্মে এসে ফোঁস
করে ক্ষোভ ঝেড়ে দাঁড়ালো; আর সাথে সাথেই
সাধারণ জনতা খানিক হাঁপ ছেড়ে খানিক
ক্ষোভ নিয়ে, নামতে দেওয়ার আগেই ট্রেনে
ওঠার যুদ্ধে লিপ্ত হলো। এই বাস ট্রেনে
ওঠার সময় মানুষগুলো কেমনজানি স্বার্থপর!
কিছুটা হিংসুটেও বটে। আর এভাবেই যখন
স্বার্থধারণ করে লোকগুলো ভিড়
ঠেলেঠুলে ট্রেনে উঠছিলো, তখন তাদের
সাথে একটিবারের জন্য হলেও মিশে গিয়ে ভিড়
ঠেলাঠেলি করে উঠছিলো সমাজের ঐই অচ্ছুৎ
লাগেজবিহীন বেঢপ আকৃতির ব্ল্যাকি বা
না-মানুষের দল। ট্রেনে ওঠার সময়ই তারা
আর দশটা মানুষের মতো একই গেট দিয়ে
ঢোকে, যদিও তাদের জায়গা হয় ট্রেনের
মেঝেতে। চেকারের কাছে ধরা পড়লে
পালানোর সুবিধার্থে গেটের পাশেই
গাদাগাদি করে বসে-দাঁড়িয়ে যায়।
যারা গেটের আশেপাশে জায়গা পায়না তারা
সমাজের মুখোশওয়ালা ভালোমানুষদের
ঘেন্না জাগিয়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে বগিতে।
এইসব না-মানুষগুলো যখন ট্রেনে উঠছিলো
তাদের মধ্যে অনেক কিশোর ব্ল্যাকারের মতোই
ট্রেনে উঠতে যুদ্ধরত ছিলো- আরেকজন; কটা
চোখের লালচে রুক্ষ চুলের অধিকারী; আট বছর
বয়সেই তার কচি খালি-পা কাদামাখা শরীর,
নোংরা জামা-প্যান্ট। ভালো মানুষদের জন্য
শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পোশাক পাচার করতে নেমেছে;
আরো তিনটে মুখের খাবার যোগানের তাগিদে।
অবশেষে ঠেলাঠেলি করে দম বন্ধ
করা কষ্ট পেরিয়ে কিশোরটি ট্রেনে উঠে
স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে। যদিও; তখনো তার
অল্পবয়সী মুখে কিসের যেন কঠোরতার
ঘনঘটা অবশিষ্ট থেকেই যায়।
উপসংহার এর আগে:
সকাল ৮.৩০
ঘুম ভাঙার পর চঞ্চল চপলা কিশোরীর ন্যায়
সূর্যটা কেবল হাসি বিলাচ্ছে। হিলি ষ্টেশনের
রেল লাইনের উপর কিছু বেঢপ আকৃতির
মানুষেরা বসে নিজেদের দুঃস্হ সংসারের বিশাল
হা-হুতোশ নিয়েও ক্ষুদ্র সুখ-দুখের কপচাকপচি
করছে। এটাই এখানকার প্রতিনিয়ত দৃশ্য।
মাঝেমাঝেই তুমুল ঝগড়া, চুলোচুলি-মারামারি।
পরক্ষণেই সখ্যতা। ট্রেনের প্রতীক্ষা করতে
করতে রেললাইনে বসে মিতুর মা’র সাথে
জামিলের মা’র চুলোচুলি! অতঃপর
জামিলের মা মিতুর মায়ের উকুন বেছে
দিচ্ছে। আবার ধরো টুকুর বাপের সাথে মনুর
বাপের কথা কাটাকাটি, তর্ক ও প্রচণ্ড ঝগড়া।
তো ট্রেনে মাল ওঠানোর সময় টুকুর বাপকে
মনুর বাপই সাহায্য করছে। এভাবেই ড্রেনের
পানির মতো জমাট বেঁধে আটকে থাকা গণ্ডির
মধ্যে ঝগড়া বিবাদ। এর মাঝেই টুকটাক
আশা নিয়ে মৌলিক চাহিদার হাহাকারে
কাটতে থাকে তাদের জীবন। আজও
পাওনা টাকা নিয়ে একটা মেয়ে-দু’টা
লোকের তুমুল ঝগড়া; পরিবেশটাকে উষ্ণ
করে রেখেছিলো। এখনো ভদ্র মুখোশওয়ালা
যাত্রীগুলো যারা টিকিট কেটে ট্রেনে ওঠে
তারা আসেনি, যারাও বা টুকটাক
এসেছে তারাও তাদের ঝগড়ার
খিস্তি শুনে মুখে গাম্ভীর্য এনে তফাতে গেছে।
অদূরে লাইনের ধারে খেঁজুর গাছের তলায়
দাঁড়িয়ে আছে খালি পা-কাঁদামাখা শরীর
নোংরা জামা-প্যান্ট-
বেঢপভাবে ফুলে আছে; আট বছরের ছেলে।
মা শখ করে নাম রেখেছিলো সোহেল।
কালো বলে সে এখন কালুতে রূপান্তরিত।
কালুর নিঃস্পাপ মুখে কোন প্রতিবিম্ব না
থাকলেও তার বুকের মাঝের দ্রিম্ দ্রিম্
শব্দ কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে।
শীতের প্রকোপ না থাকলেও কালুর
ভয়ে গা শিউরে উঠলো একাধিকবার।
আজ তার প্রথমদিন। তার মা দিন পাঁচেক
থেকে শয্যাগত, কাজে আসতে পারেনি।
দুদিন ধরে তারা চারটে প্রাণী প্রায় উপোস।
বাড়িতে চার বছরের রুগ্ন বোন, হামাগুড়ি
দেওয়া একটা ভাই আছে। মায়ের সামান্য
সঞ্চয় ছিলো, তা দিয়ে এই
ক’টা দিন ঠেলেঠুলে চললেও আজ আর
চলবেনা। তাই আজ সে মায়ের কাজে
বেরিয়েছে। কালুর বাপের কোন
ঠিকানা নেই বাপের সংখ্যাও
তার অজানা। ছেলে বড় হচ্ছে দেখে
মা ও’পাড়ার পাট চুকিয়ে রেললাইনের
ধারে বস্তিঘরে এসে জুটেছে। শুরু করেছে
‘অবৈধ’ এ ব্যবসা। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে
পণ্য পাচার।
হিলি স্টেশনের ধার ঘেসেই লাল দেয়ালের
ওপারটা ইন্ডিয়া। দেয়ালের ওপাশ থেকে
দালালরা মালামাল এপারে ফেলে, আর
বেঢপের দল মাল শরীরে কাপড় দিয়ে
বেঁধে ট্রেনে করে অন্যান্য স্টেশনে অন্য
পার্টির কাছে পৌঁছে দেয়। একবার
আপ-ডাউনে ১৭০ টাকা তবে সবাই
দালালকে ৩০ টাকা। বি.ডি.আর
জওয়ানের বকশিশ। নইলে দু’শোই
টাকাই পেত। আর কালুর মতো
ছোটরা পায় একশ ত্রিশ। মায়ের
মুখে কালু শুনেছে এক বস্তা কাপড়ের
প্রতিটা বিক্রি হাজারের ওপর। তাদের
জোটে ১৭০ মোটে।
এইসব মাল তারা তাদের ঢোলা-জামার
পেটে শক্ত করে বেঁধে নেয়, তারপর
পরবর্তী ষ্টেশনগুলো অর্থাৎ
আক্কেলপুর, জয়পুরহাট বা শান্তাহার…
দালালদের হাতে তুলে দেয়।
একেকটা স্টেশনের জন্য আবার আলাদা চার্জ।
একটার পর একটা স্টেশনের জন্য মূল টাকার
সাথে দশ টাকা করে বেশি দেয়। তবে দূরের
স্টেশনে যাওয়ার বিপদ বেশি কেননা চেকার
ধরে ফেলতে পারে। চেকার ধরলে উত্তম-মধ্যম।
উপড়ি হিসেব মাল যাবে খোয়া। অসুস্হ
শরীরে কালুর মা এসব কথা বারবার
বলে দিয়েছে কালুকে। ব্যর্থ টোকাই
কালুর একটু ভয় ভয় করে।
ক্ষুধার তাড়না সাহস যোগায়।
হাড্ডিসার ছোটবোনটার ঈদের সেমাই-
আবদার; মায়ের ছলছল চোখ।
আজ তাকে পারতেই হবে!
কালুর বেশ দূরেই কালুর মত বেঢপ
আকৃতির ছেলেমেয়ে তাদের মায়ের
পাশে বসে আছে। তাদের দেখে সে সাহস
সঞ্চয় করে। এবড়ো থেবড়ো হলুদাভ
দাঁতের ফাঁক দিয়ে পিচিক করে থুথু
ফেলে আর ভাবে ১৩০ টাকা! চাল…
শবজি, ঈদের সেমাই! আচ্ছা
সেমাইয়ের দাম কত? নানারকম
মূল্যের কথা চিন্তা করে ভীত হয়।
প্রয়োজনীয় জিনিস ও মায়ের ওষুধ,
যদি সেমাই? না,
সেমাই সে কিনবেই। সেমাই ঈদ!
আর তারা সেমাই খাবে না?
আগে সেমাই-ই কিনবে। ইতিমধ্যেই
তার চিন্তা-বেড়াজালের মাঝেই সরগরম
হয়ে উঠেছে প্লাটফর্ম, ভিড় বেড়েছে,
ঘণ্টা পড়েছে ট্রেনের। চিন্তার জাল
ছেড়ে প্লাটফর্মের দিকে এগোতেই হঠাৎ
তার চোখ আটকে গেল প্লাটফর্মে
দাঁড়িয়ে থাকা এক সুন্দর জামা!
তার বয়সী-ই হবে, সামনের দাঁতগুলো
তারই মতন এবড়ো থেবড়ো।
বাপের হাত ধরে প্লাটফর্মে
দাড়িয়ে আছে। কালু বুভুক্ষু কুকুরের
মত চেয়ে এই দৃশ্যটি দেখতে লাগলো।
ভালো মানুষের ছেলেটি তার
দিকে তাকাতেই অবশ্য চোখ
ফিরিয়ে নিয়েছিলো। সে যদিও
কারণে অকারণে আড়চোখে প্রায়ই
দেখে নিচ্ছিলো দৃশ্যটি। প্রায়
চল্লিশ মিনিট লেট; বুড়ো
ঢোঁড়াসাপের গদাই লস্করি চালে
ভেঁপু বাজিয়ে ফোঁস করে থামে
ট্রেন।
এদিকে কালু আড়চোখ ছেড়ে
ড্যাব ড্যাব করে ফের বাপ-পোলার
দিকে চায়।
কালুর মাথায়-
চাটি মেরে ‘কিরে ব্যাটাছেলে যাবিনে?’
তখন কালু সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ট্রেনের
দরজা বরাবর দৌড়। তার বুকে
এখন দ্রিম্ দ্রিম্
হাতুরি বাজছে।
কালু কোনমতে ঠেলেঠুলে ট্রেনে উঠে এক
কোণে জায়গা নিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
যাক, তাহলে ঈদে তার সেমাই খাওয়া নিশ্চিত!
উপসংহার এর পরবর্তী দৃশ্য:
পাখিগুলো নীড়ে ফিরেছে বহু আগেই। রাঙা
বউয়ের মতো সূর্যটাও কার কোলে যে মুখ
লুকিয়েছে! এমন সময় আবছায়া রাতে দিনে
দুইবার ট্রিপ মেরে ফিরছিলো কালু।
‘শালা ডাকাইতের পোলা, ১৩০ টাকাতেও ভাগ
জুরাইছে’ কালু দালাল-রে গালি দিতে দিতে বাড়ির
পথে যাচ্ছিলো। বাড়ি বলতে বস্তির ছোট্ট খুপরি
চাটাইয়ের ঘর। দালাল তাকে নয়া বলে দশ টাকা
কম দিয়েছে। দশ টাকার জন্য তার বুকের ভেতর
কষ্ট হতে লাগলো। কাল ঈদ, সেমাই খাবে,
এটা ভেবেও একটু উত্তেজিত সে। যদি জরুরি
জিনিসের পর সেমাই কেনার টাকা না থাকে
এই নিয়ে তার ছোট্ট বুকের আনাচে কানাচে
ভয়-সংশয়ের দোলাচল নিয়ে ছোট্ট গলির মধ্য
দিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলো। তার মা অবশ্য
ওষুধ কিনতে মানা করে বলে- ‘গরীব মাইষের
আবার ওষুধ লাগেনি-রে ছাওয়াল?’ এইতো
এই স্যাঁতস্যাঁতে গলিটা পার হয়েই তাদের ঘরটা।
যেয়েই মাকে জিজ্ঞেস করবে ওষুধ কিনবে না
সেমাই? গলিটা তাড়াতাড়ি পার হয়ে ঘরের
সামনে যেয়ে দেখলো পল্টু, জনি ও মিতুর
মা এবং পাড়ার নয়াভাবী
ঘরের সামনে দাড়িয়ে আছে।
শেষ দৃশ্য:
রেললাইনের বস্তিটার শেষ মাথায় একটু
জঙ্গুলে জমি। মা কাজে যাওয়ার পর কালু
ভাইবোনসহ বুনচুন খেতে আসে। জঙ্গলটাতে
এই বুনো পাকা বুনচুনই কালুদের সুলভ ফল।
জঙ্গলটাতে অবশ্য বস্তিবাসীর কবরও
ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এখানেই কালুর মাকে
দাফন করা হয়। কাফন-দাফন খরচ ৩৪০।
কালুর উপার্জনে কুলাতে পারেনি বলেই
বাকি টাকার যোগানদার বস্তির মাতব্বর।
কালুর কেন জানি কান্না পাচ্ছেনা, তার
ছোটবোন, ভাইটাও উদাস নয়নে মায়ের
কবরের পাশে বসে আছে। আর কোন
আগাম বার্তা ছাড়াই কোন অখ্যাত
লেখকের উপন্যাসের ট্রাজিক সিনের
বৃষ্টির মতই টুপটাপ বৃষ্টি। অসময়ে
বৃষ্টি হওয়ার জন্যই দাফন করতে
আসা লোকগুলো তাড়াতাড়ি মোনাজাত
শেষে করুণা দেখানোর সময় না পেয়ে
বৃষ্টিকে গালাগাল। কালুর ইচ্ছে অবিরাম
বৃষ্টিতে কবরের পাশে বসে থাকে। যদিও
কালু ইতিমধ্যেই জানে ওদের এমন করা
শোভন নয়। ছোটভাইকে কোলে তুলে
বোনের হাত মুঠিতে ভরে নিরুদ্দেশের
বাড়ির পথে। কোথায় যেন শব্দ হলো-
কোথায় যেন শব্দ হয়।
(উৎসর্গ: আমার বন্ধুতা, আল বিরুনি প্রমিথ)
বাংলদেশ সময়: ১৬২৫ ঘণ্টা, ১ আগস্ট ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস