ঢাকা: সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিগত ২০ বছরে যে ভারসাম্যের পরিস্থিতি বিভিন্ন সরকারের সময় তৈরি হয়েছিলো তা আজ হুমকির সম্মুখীন। বর্তমানে অর্থনীতিতে ব্ল্যাক হোল (কৃঞ্চ গহ্বর) তৈরি হয়েছে।
একই অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক সূচকের বেশির ভাগই ঋণাত্বক। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমেছে, বৈদেশিক বিনিময় হার চাপে, কলমানির উচ্চ হার, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ হ্রাস, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট চলছে। এসব বিবেচনা করলে কোনভাবেই আগামী অর্থ বছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে সাত শতাংশে ধরে রাখা সম্বব হবে না। তবে আমার এ ধারণা যদি মিথ্যা প্রমাণ হয়, আমিই সবচেয়ে সুখী মানুষ হবো।’
শনিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট সংলাপে তারা এমন মন্তব্য করেন।
সাবেক মন্ত্রী এম সাইদুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী একে খন্দকার। সাবেক মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম, সাংসদ রাশেদ খান মেনন, ফজলুল আজিম, মাইদুল ইসলাম, হাফেজ আহমেদ মজুমদার, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ম. তামিম, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) সভাপতি মোহাম্মদ নুরুল আমিন, ব্যবসায়ী আনোয়ারুল আলম, রাজনীতিক হায়দার আকবর খান রনো, নারী নেত্রী শিরীন আখতার, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রর সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদুল ইসলাম খানসহ রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বাজেট বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন। মূল প্রবন্ধ তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
আমির খসরু বলেন, ‘বাজেটে অর্থমন্ত্রী জিডিপির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন তার জন্য দরকার সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ। আবার বিনিয়োগ বাড়াতে হলে দরকার তারল্য, মূল্যস্ফীতির হার কম থাকা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কম থাকা, জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো, আইনের শাসন থাকতে হবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের কি অবস্থা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই বিনিয়োগ কিভাবে বাড়বে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করতে যাচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন, বিটিআরসি কেউ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। এসব প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত আসে অন্য জায়গা থেকে। কিন্তু যেখানে এসব স্বাধীন ভাবে কাজ করবে না। যেখানে বিনিয়োগ আসবে না।
দুদকের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এর ওপরে মানুষের আস্থা নেই। দুদক এখন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত মন্ত্রীদের দায়মুক্তির সনদ দিচ্ছেন। এছাড়া কোন কাজ নেই। তারা এক কালো বিড়ালকে এক সপ্তাহে সাদা করে দিলো।‘
বিচার বিভাগ প্রসঙ্গে এই বিএনপি নেতা বলেন, ‘বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা নেই। মানুষ জানে কিভাবে বিচার বিভাগ চলছে। একই পরিস্থিতি আইন শৃংখলা নিয়ে।’
দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি নেই বলে ব্যবসায়ীরা আজ নানাভাবে বিদেশি টাকা নিয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মির্জা আজিজ বলেন, ‘বাজেটে অর্থমন্ত্রী যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন তা অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে রাজস্ব সংগ্রহ। অভ্যন্তরীণ অর্থ সংগ্রহের যে কথা মন্ত্রী বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব হলেও অনেকগুলোতে তা সম্ভব হবে না। ফলে চাপ বাড়বে ব্যাংক ঋণে। বাধাগ্রস্ত হবে বিনিয়োগ।
মোবাইল ফোন ও ব্যাংকে হিসাবধারীর ক্ষেত্রে যে করের বিধান করা হচ্ছে তা একটি নির্দিষ্ট সীমা থেকে করা যেতে পারে বলে বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের করের বোঝা আঘাতে করছে। তারা এক ভ্যাট কতবার দেবেন। মনে হয় দশবার দিতে হচ্ছে।’
‘বাজেট নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়’ বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এটা লজ্জার।’
ফজলুল আজিম বলেন, ‘বাজেটের কোন দর্শন নেই। কোন খাত গুরুত্ব পাচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে না। আবার ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য যে বিনিয়োগ দরকার হবে তার নির্দেশনা নেই।’
হাফেজ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘আইনে না থাকলেও প্রতিটি সরকার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে একটি ব্যর্থ চেষ্টা করে। তবে এটি শুধু বিনিয়োগে হতে পারে। কারণ বিনিয়োগে নিয়ে এলে তা করের আওতায় আসে।’
নুরুল আমিন বলেন, ‘সরকারের ঋণ বাড়লে ব্যাংকগুলোর জন্য আতংক বাড়ে। বিশেষ করে ডিলার ব্যাংকগুলোর জন্য। তাই সরকারকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে।’
আনোয়ারুল আলম বলেন, ‘সাবির্ক পরিস্থিতি দেখে বলা যাবে না মূল্যস্ফীতি কমবে। এর মধ্যে সরকারের ঋণ যদি বাড়ে তাহলে সুদের হার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বলতে পারছি না।’
হায়দার আকবর খান রনো বলেন, ‘নিম্বর আয়ের শ্রমজীবী মানুষ বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। বাজেটে এটি থাকা উচিত। শিরীন আখতার ও ওয়াজেদুল ইসলাম খানও একই দাবি করেন।’
বাংলাদেশ সময়: ১৬৪৯ ঘণ্টা, জুন ১৬, ২০১২
এসএআর/ সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর