 |
| ছবি:নাজমুল হাসান / বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
নুহাশ পল্লী থেকে: হুমায়ূন স্যার হ্যায় নিজে একটা ইতিহাস, হ্যার ইতিহাস লেইখ্যা শেষ করা যাইবো না। কতো সাংবাদিক লেখছেন, কিন্ত সব লিখতে পারে নাই। তার ইতিহাস অনেক ভালো। তিনি যে একজন এতো বড় কবি বা লেখক এটা আমরা বুঝতে পারিনি।প্রথমে ভাবছিলাম, ঢাকা ভার্সিটির বড়লোক টিচার। হ্যায় খুব ভালো মানুষ ছিলো। কোনো অহঙ্কার ছিলো না। বড় মানুষদের অহঙ্কার থাকে না। কথাগুলো বাংলানিউজকে বলেছেন পিরুজালি নওলাপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ আলী। তিনি নুহাশ পল্লীর শুরু থেকে কাঠমিস্ত্রী।
মোহাম্মদ আলী জানান, ‘‘১৯৯৯ সাল থেকে কাজ করছি তার সঙ্গে। প্রথমে ডা. এজাজ স্যারের সঙ্গে এ এলাকায় এসে আমাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো তারা। আমাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তিনি বলেছিলেন, ভাই আমি হুমায়ূন আহমেদ। আমার কিছু কাঠের কাজ করে দিতে হবে।’’
‘‘নুহাশ পল্লীর মধ্যে প্রথমে বাজনা কাঠগাছের পাশে বসার জায়গা ও লিচুতলায় ছনের ঘরের কাঠের কাজ করি। লিচুতলার সেই ঘরের মধ্যে বসে লিখতেন স্যার। সেখানে পড়তেন। ঘরটি ছিলো ৪০ হাতের মতো। এখন সেই জায়গায় সাড়ে তিনহাত মাটির নিচে স্যারে থাকবো’’ বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন মোহাম্মদ আলী।
‘‘প্রথম এলাকার লোকজন বলতেন, ঢাকা ভার্সিটির একজন ধনী টিচার এসেছেন। তিনি এ এলাকায় অনেক জমি কিনবেন। পরে যখন গাড়িতে করে বই আনলেন, দেখি এক গাড়ি বই। সব নাকি তার লেখা। তখন আমরা সবাই বুঝছি যে, হ্যায় অনেক বড় কবি- লেখক। এখনতো বোঝা যায়, আমরা তারে পাইছিলাম, এটা কতো বড় ভাগ্য। এ এলাকাটাকে তার কারণেই মানুষ চেনে।’’
আলী স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘‘স্যারের আচার-ব্যবহারও ছিলো সেরকম। তিনি কাউকে ঘৃণা করতেন না। বাচ্চাদের ডেকেও কথা বলতেন। এলাকার ধনী- গরিব, কামলা সবার সঙ্গেই কথা বলতেন। কারো সঙ্গে দেখা হলে কেমন আছেন বলে জিজ্ঞেস করতেন। আমাকে তিনি আদর করে তুমি বলতেন।’’
‘‘স্যার অনেকটা খেয়ালী লোক ছিলেন। বাচ্চাদের মতো নরম ছিলেন। অনেক রাত ঘরে বসে স্যারের গল্প শুনতাম, তিনি গাছ গাছালি ও কাজ নিয়ে আমাদের পরামর্শ নিতেন। আমাকে নাম না ধরে তিনি সম্মান করে মিস্ত্রী সাব বলতেন। এখন আর স্যারের সঙ্গে কথা হবে না। কিন্ত স্যারের কবরের পাশে প্রতিদিন আসবো জেয়ারত করতে। ভালো মানুষগুলা আসলে বেশিদিন থাকেন না।’’
আলী আরো বলেন, ‘‘তিনি আমার পরিবারের খোঁজ নিতেন। মেয়ে আমার স্ত্রী ও আমিসহ ৫ জন সবাইকে চিনতেন। প্রথম দিকে আমার হাজিরা ছিলো ২০০ টাকা। ৮-১০ বছরে আমাদের হাজিরা অনেক বেড়েছে, প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত। স্যার এসব কথা বলতেন।বাচ্চাদের পড়াশোনা করতে বলতেন। কাজ করলে তিনি এজাজ স্যার ও ম্যানেজার স্যারদের মাধ্যমে সবাইকে ৫০-১০০ টাকা করে বেশি দিতেন।’’
মজার স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘‘স্যার প্রায়ই কুদ্দুস বয়াতিকে ডেকে এনে আমাদের নিয়ে গান শুনতেন। সবচেয়ে বেশি শুনতেন হাছন রাজার গান। স্যার প্যান্ট বেশি পরতেন। মাঝেমধ্যে লুঙ্গি-পাঞ্জাবিও পড়তেন। তিনি সাধারণ মানুষের মতোই আমাদের সময দিতেন।
‘‘তার বিল্ডিংয়ে পানি পড়তো আমি সে কাজ করে দিয়েছি। ফার্ণিচার বানিয়েছিলাম খাট, আলমারি, রাউন্ড টেবিল। কবুতরের খোপও বানিয়েছি। তিনি বানর, কবুতর, ময়ুর, কাঠবিড়াল এসব ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমি বলি কি, স্যার মানুষ, পশু-পাখি সবাইকে ভালবোসতেন। আমরাও স্যাররে অনেক ভালোবাসি।’’
বাংলাদেশ সময়: ২০৫৩ ঘণ্টা, জুলাই ২৪, ২০১২
এমআইআর/ সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর