 |
বর্ষাকাল নিয়ে গান-কবিতা যতটা হয়েছে বাংলা সাহিত্যে অন্য কোন ঋতুর রূপবৈচিত্র নিয়ে ততটা নয়। মেঘ, বৃষ্টি আর অবিরাম বর্ষণের নৈসর্গিক বর্ণনায় বাংলা সাহিত্য ঋদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ষার গান ছাড়া গান পিপাসু বাঙালির বর্ষা যাপন হয় না।
তাই বলে বর্ষার রূপ বর্ণনাতেই আবদ্ধ নয় বাংলা গান-কবিতা। বর্ষায় শহরের নোংরা জল, কাদা, খানাখন্দ, জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত নাগরিক জীবন। আর এই সব নাগরিক যন্ত্রণা নিয়েও বাংলা ভাষায় আছে বেশ কিছু যন্ত্রণাকাতর গান-কবিতা। বর্ষায় প্লাবিত মানুষের মানবেতর জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়েও রচিত হয়েছে সাহিত্য। আর আছে বর্ষায় সিক্ত ছেলেবুড়ো, ‘আপিসের বাবু’দের নিয়ে সুকুমার রায়ের রসিকতা! বাংলা গান ও কবিতায় বর্ষার বিভিন্নতার চিত্র নিচের গান ও কবিতাগুলিতে স্পষ্টতর হবে।
বর্ষার দিনে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায় -
এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়।।
সে কথা শুনিবে না কেহ আর,
নিভৃত নির্জন চারি ধার।
দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি,
আকাশে জল ঝরে অনিবার -
জগতে কেহ যেন নাহি আর।।
সমাজ সংসার মিছে সব,
মিছে এ জীবনের কলরব।
কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে
হৃদয় দিয়ে হৃদি-অনুভব -
আঁধারে মিশে গেছে আর সব।।
বলিতে ব্যথিবে না নিজ কান,
চমকি উঠিবে না নিজ প্রাণ।
সে কথা আঁখিনীরে মিশিয়া যাবে ধীরে,
বাদলবায়ে তার অবসান -
সে কথা ছেয়ে দিবে দুটি প্রাণ।।
তাহাতে এ জগতে ক্ষতি কার
নামাতে পারি যদি মনোভার!
শ্রাবণবরিষনে একদা গৃহকোণে
দু কথা বলি যদি কাছে তার
তাহাতে আসে যাবে কিবা কার।।
আছে তো তার পরে বারো মাস -
উঠিবে কত কথা, কত হাস।
আসিবে কত লোক, কত-না দুখশোক,
সে কথা কোনখানে পাবে নাশ -
জগৎ চলে যাবে বারো মাস।।
ব্যাকুল বেগে আজি বহে বায়,
বিজুলি থেকে থেকে চমকায়।
যে কথা এ জীবনে রহিয়া গেল মনে
সে কথা আজি যেন বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়।।
বর্ষার কবিতা
সুকুমার রায়
কাগজ কলম লয়ে বসিয়াছি সদ্য,
আষাঢ়ে লিখিতে হবে বরষার পদ্য।
কি যে লিখি কি যে লিখি ভাবিয়া না পাই রে,
হতাশে বসিয়া তাই চেয়ে থাকি বাইরে।
সারাদিন ঘনঘটা কালো মেঘ আকাশে,
ভিজে ভিজে পৃথিবীর মুখখানা ফ্যাকাশে।
বিনা কাজে ঘরে বাঁধা কেটে যায় বেলাটা,
মাটি হল ছেলেদের ফুটবল খেলাটা।
আপিসের বাবুদের মুখে নাই ফুর্তি,
ছাতা কাঁধে জুতা হাতে ভ্যাবাচ্যাকা মূর্তি।
কোনখানে হাঁটুজল, কোথা ঘন কর্দম
চলিতে পিছল পথে পড়ে লোক হর্দম।
ব্যাঙেদের মহাসভা আহ্লাদে গদ্গদ্,
গান করে সারারাত অতিশয় বদ্খদ।
বসুন্ধরার বুকে বরষারি ধারা
পবন দাশ বাউল
বসুন্ধরার বুকে বরষারি ধারা
ধারা ভরা হাহাকার (২)
বসুন্ধরার বুকে।
তেরশো পঁচাশি সালে দামোদরের বান্ধ
ভেঙে পড়ে (২)
বালক ছেলে কোলে করে
বালক ছেলে কোলে করে
স্কুলে পলায়।
বসুন্ধরার বুকে বরষারি ধারা
ধারা ভরা হাহাকার
বসুন্ধরার বুকে।
স্রোতি ঘাটায় দেখলাম বিরাট এক সাকু
লুহার খুটি খাম্বা, তলে আছে ফাটুল (২)
কত গরুর গাড়ি, কত ঘুড়োঘুড়ি
কত গরুর গাড়ি, কত ঘুড়োঘুড়ি
নদ-নদী গেলো ভেসে।
বসুন্ধরার বুকে বরষারি ধারা
ধারা ভরা হাহাকার
বসুন্ধরার বুকে।
বান উঠলো ভাই ঘরে ঘরে
দেওয়াল চাপা মানুষ মরে(২)
বালক ছেলে কোলে করে
বালক ছেলে কোলে করে
স্কুলে পলায়।
বসুন্ধরার বুকে বরষারি ধারা
ধারা ভরা হাহাকার
বসুন্ধরার বুকে।
বর্ধমান পাকুরা মেদিনীপুর মানভুম
দুমকা পাটনা আর মুর্শিদাবাদ বীরভূম(২)
ষোলো ক্রোশ জুড়ে লোহার খুঁটি মেরে
ষোলো ক্রোশ জুড়ে লোহার খুটি মেরে
জলকে রেখেছে ঘেরে।
বসুন্ধরার বুকে বরষারি ধারা
ধারা ভরা হাহাকার (২)
বসুন্ধরার বুকে।
মেঘদূত
সুমন চট্টোপাধ্যায়
কখনো মেঘ ঘুঙুর পড়ে নাচবে বলে
কখনো মেঘ নাচতে নেমে ছন্দ ভোলে।
কখনো মেঘ সবুজ ডাকা অঙ্গীকার
কখনো মেঘ বন্যা ডাকা অদরকার।
কখনো মেঘ প্রাচীণ রাগে গান শোনা
কখনো মেঘ বেসুর তোলা যন্ত্রণা।
কখনো মেঘ ঘর ছাড়ার হাতছানি
ককনো মেঘ ঘরে ফেরার হয়রানি।
কখনো মেঘ ছাতায় ছাতায় মহানগর
কখনো মেঘ ভাসায় পথ ভাসায় ঘর।
ঘর বেঁধেছে পথের ধারে যাদের দল
তাদের ঘরে মেঘ মানেই নোংরা জল।।
সেই জলেতে বেদম ভিজে একটা লোক
মেঘদূতের নাম রেখেছে আহাম্মক।
বাংলাদেশ সময়: ১৮৫২ ঘণ্টা, ০২ জুলাই, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস