 |
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সঙ্গে পদ্মাসেতু নির্মাণে ঋণচুক্তি বাতিল করেছে। বিষয়টি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে বড় ইস্যু। এর আগে পদ্মাসেতুতে অর্থায়নে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে যোগযোগ মন্ত্রীকে সরানোর দাবি জানায় বিশ্বব্যাংক। বিভিন্ন মহলও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে। সে সময় ওই মন্ত্রীকে নিয়ে সরকারের জন্য ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ অবস্থা সৃষ্টি হয়। ঘটনার প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে সরকার ওই মন্ত্রীকে বদলি করে। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়েছে বলে এখন আর মনে হচ্ছে না।
কিছু দিন আগে পদ্মাসেতু বিষয়ক দুর্নীতি তদন্তের জন্য কানাডিয়ান পুলিশ এসেছিল। তারা আসার পরপরই বিশ্বব্যাংক তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। সরকার বিভিন্নভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে সিদ্ধান্ত পুনরায় বিবেচনার জন্য বলেছে, কিন্তু বিশ্বব্যাংক একটুও টলেনি। এমন অবস্থায় সরকার দেশীয় খাত থেকে তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা করছে এবং মালয়েশিয়ার কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। উক্ত বিষয়ে মালয়েশিয়ার যথেষ্ট আগ্রহ আছে বলেই পত্র-পত্রিকায় খবর এসেছে। ইতিমধ্যে চীনও আগ্রহ দেখিয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো- দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশ্যে পিছপা হওয়ার কথা জেনেও অন্য দুটি দেশ অর্থ সাহায্য দিতে চাচ্ছে কেন? বিষয়টি বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
এ ব্যাপারে একটু পিছনে তাকালেই বেশ কিছু উদাহরণ পাওয়া যেতে পারে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ একবার বিশ্বব্যাংককে ঠ্যাঙানি দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বব্যাংকের মাতবরি সহ্য করেননি। ফলাফল যা হয়েছিল, তা সবারই জানা। বিশ্বব্যাংকের বিরোধিতা আর মার্কিন বিরোধিতা একই কথা। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্টমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ির সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। আর যায় কোথায়? চারিদিকে হৈহৈ পড়ে গেল। সেই অপবাদের কলঙ্ক আজও আওয়ামী লীগকে বয়ে বেড়াতে হয়।
দীর্ঘ ২১ বছর পরে ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলো, সেই সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বাংলাদেশ সফরে এলেন। সেকি সাজ সাজ রব! বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তা ব্যক্তিরা চারিদিকে সাফল্যের ঢেঁকুর তোলা শুরু করলেন। বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য। যারপরনাই ঘটনা তারা ঘটিয়ে ফেলেছেন। পৃথিবীর অধিপতি তাদের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। সোজা কথা? অতঃপর তিনি এক প্রহরের জন্য এলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আমেরিকান ডেকোরেশনে মঞ্চ তৈরি করে বক্তব্য দিলেন। তিনি বললেন, “বাংলাদেশ গ্যাসের ওপরে ভাসছে। সুতরাং বাংলাদেশের উচিৎ গ্যাস রফতানি করা।” কিন্তু শেখ হাসিনা তখনই তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বললেন, “বাংলাদেশের জন্য ৫০ বছরের গ্যাস মজুদ রেখে যদি গ্যাস থাকে তাহলে রফতানি করা হবে।” শেখের বেটির কূটনৈতিক কথার মারপ্যাচ ক্লিনটন সাহেবদের বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না। ক্লিনটন চলে গেলেন। তার পরপরই বাংলাদেশ দুর্নীতিতে এক নম্বর হিসাবে কুস্বীকৃতি পেল। বিষয়টি অনেকেরই মাথায় এসেছিল কিন্তু কিছুই করার ছিল না। তারপরের ইতিহাসও সবারই জানা। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ধস।
চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলো। হাওয়া ভবনের মতো একটি দুর্নীতি কল্যাণ অধিদপ্তর গড়ে তুলে দুর্নীতিকে একটি কাঠামোগত শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হলো। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ সবই চললো। কিন্তু কোনো আন্তর্জাতিক সংগঠন কিংবা কোনো দেশ তেমন কোনো হাঁচি-কাশিও দিল না। ভাবটা এমন ছিল যে এটাই তো হওয়ার কথা। এ ব্যাপারে তাদের কিছুই বলার নেই। বাংলাদেশে একের পর এক বোমাবাজি, রাজনৈতিক খুন হতে থাকল। এফবিআই, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সদস্যরা বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ কুকুর পর্যন্ত নিয়ে এসে বিভিন্ন রকম নাটক করল। কিন্তু ফলাফল তথৈবচ। কিন্তু এবারই প্রথম আমরা দেখতে পেলাম কানাডিয়ান পুলিশ এসেই দুর্নীতি খুঁজে পেল। আমি বলছি না যে, দুর্নীতি হয়নি। কিন্তু দুর্নীতি ধরার ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রশ্ন জাগে- এত দিন কোথায় ছিলেন? বাংলাদেশে কি এর আগে কোনো দিন বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি? সেইসব প্রকল্পে কি কোনো দুর্নীতি হয়নি? তাহলে এখনকার উদ্দেশ্যটা কি?
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ধনী রাষ্ট্রগুলো এবং তাদের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অন্যতম অন্তরায়। ধনী দেশের দূতাবাসগুলো গরিব দেশের রাজনৈতিক ইস্যুতে সব সময় নাক গলায় এবং তাদের দেশের কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকে। তারা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে নিজ নিজ দেশের সাথে একটা কেন্দ্র-প্রান্ত সম্পর্ক গড়ে তোলে। ভৌত এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়ে তুলে গরিব দেশের সম্পদ নেয়ার একটা পাইপ লাইন নির্মাণ করাই তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে- তৃতীয় বিশ্বের যে সব দেশ খনিজ সমৃদ্ধ যেমন নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশ। সেসব দেশ গত এক দশকে রাতারাতি দুর্নীতিতে এক নম্বর হয়েছিল এবং এখনও হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় এও দেখা গেছে- গরিব দেশের সম্পদ লুট করতে এসে দুর্নীতি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আবার বৈদেশিক সাহায্য দিতে এসেও একই কাজ করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সাহায্য গ্রহণকারী দেশগুলোতে রাতারাতি দুর্নীতি বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টেই তার প্রমাণ মেলে। এরশাদ সরকারের আমলে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট পলিসি’ বাস্তবায়ন করে। সেই থেকে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। অসম অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকে। সমাজে ব্যাপক অস্থিরতা, বঞ্চনা বাড়তে থাকে। একথা বাংলাদেশের সকল উন্নয়ন মৌলভীরাই (ডেভেলপমেন্ট কনসালটেন্ট) জানেন। কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলেন না। পাছে আবার ‘ট্যুইসডে ক্লাবে’র প্রবেশাধিকার হারাতে হতে পারে।
প্রিয় পাঠক, নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। কয়েকমাস আগে হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। বাংলাদেশসহ ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় তখন বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নৌঘাঁটির প্রসঙ্গটি ফলাও করে প্রচার হয়েছে। হিলারি ক্লিনটনের সাথে শেখ হাসিনা সরকারের কি আলোচনা হয়েছে? সেটা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়া বিভিন্ন রকম তথ্য প্রচার করেছে। একই সময়ে বরাবরের মত ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জীও বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। এটা মোটামুটি স্বতঃসিদ্ধ হয়ে গেছে যে, বাংলাদেশে যখনই কোনো মার্কিনী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সফর করেন। তখনই নয়া দিল্লীর কেউ না কেউ দু’দন্ডের জন্য হলেও ঢাকায় আসেন। বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলা, কোনো সন্দেহ নেই। এসব তো ঘটবেই। কিন্তু হিলারি ক্লিনটন যাওয়ার পর অপেক্ষায় ছিলাম- দেখি এবারের ঘটনা কি? ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। পদ্মাসেতু ঋণ চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। এসব ঘটনা কিভাবে, কারা ঘটালো? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়তো কানাডিয়ান পুলিশের দ্বারস্থ হতে হবে না। সহজেই অনুমেয় এবং এটাও বোঝা যাচ্ছে- হিলারি ক্লিনটনের হঠাৎ মায়ানমার এবং বাংলাদেশে দৌড়-ঝাঁপের উদ্দেশ্য এবং ফলাফলটা কি?
ভাবছি, বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নৌঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি না দেওয়ার খেসারত আর কি কি হতে পারে? আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি?
লেখক, গবেষক। ইউনিভার্সিটি অফ নিউক্যাসল, অস্ট্রেলিয়া।
nayonshakhawat@yahoo.com
সম্পাদনা: আহমেদ জুয়েল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর