 |
অমর একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে সারাদেশের পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের আগ্রহ ও চাহিদার তুলনায় মেলার আয়োজনস্থল বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণটি অপ্রতুল ও অপরিসর। বেশ কয়েক বছর ধরেই এমন অভিযোগ উঠে আসছে বিভিন্ন মহল থেকে। এরই সাথে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণ থেকে মেলা সরিয়ে অন্য কোথাও মেলা আয়োজনের প্রস্তাবও উঠে এসেছে বিভিন্ন পর্যায়ে। কিন্তু যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে আমলে না নিয়ে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণেই মেলা আয়োজন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।
এ প্রসঙ্গে বরাবরই বাংলা একাডেমী একুশের চেতনা ও স্থানিক ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ তুলে থাকে। কিন্তু যে ভাষা আন্দোলন ও শহীদদের স্মরণে এ মেলার আয়োজন— সেই ভাষা আন্দোলনের সাথে বাংলা একাডেমীর সম্পৃক্ততা কতটুকু? বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম আয়োজিত মতবিনিময় সভায় শ্রাবণ প্রকাশক রবীন আহসান বলেন ‘যে চেতনা ও ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে বাংলা একাডেমী নিজেদের প্রাঙ্গণে বইমেলাকে আটকে রাখে, তা খুবই ভিত্তিহীন, কেননা— ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো এলাকাটাই জড়িত। এমন তো না যে শুধুমাত্র বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণেই ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে’।
প্রতি বছরই মেলায় আগত দর্শনার্থীদের ভিড় সামাল দিতে নাস্তানাবুদ হতে হয় আয়োজক কর্তৃপক্ষকে। দীর্ঘ লাইন পেরিয়ে মেলা প্রাঙ্গণে ঢোকার পর উপচে পড়া মানুষের যে ধ্বস্তাধ্বস্তি ভিড় দেখা যায়, বইয়ের মতো একটি নিবিড় নির্বাচনসাপেক্ষ ক্রয়-বিক্রয় প্রক্রিয়ার জন্য পরিবেশটি স্বাস্থ্যকর নয় বলে মনে করেন অনেক পাঠক ও দর্শনার্থী। মহিলা ও শিশুদের জন্য এ পরিবেশ শুধুমাত্র পদপিষ্ট না হবার কৃতিত্বমূলক অভিযান বলে মনে করেন অনেকে।
পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের সর্ববৃহৎ এই সম্মিলনের জন্য অপ্রতুল এই এলাকা থেকে মেলাকে সরিয়ে নেয়ার বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে বারবার উঠে এসেছে সোহওয়ার্দী উদ্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠের কথা। ঢাকার সাংস্কৃতিক ও বিনোদনের প্রধান পরিমণ্ডলগুলোর মধ্যেই এ আয়োজন সম্পন্ন করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আয়োজক কর্তৃপক্ষ কেন বিষয়টিকে আমলে নিচ্ছে না?
এ ব্যাপারে সূচীপত্র প্রকাশক সাঈদ বারী বলেন ‘বাংলা একাডেমী তাদের স্বার্থ হাসিল করার এ সুযোগ কখনওই ছাড়বে না, কারণ এই একটি মেলা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা একাডেমী যে পরিমাণ হাইটাইটেড হয় তা অনেক বেশি কাজ ও বাজেট থাকা সত্ত্বে শিল্পকলা একাডেমী সারা বছরেও পায় না। শিল্পকলা একাডেমীর ডিজির নাম কয়জন জানে? কিন্তু বাংলা একাডেমীর ডিজির নাম সবাই জানে’।
গল্পকার ও সাংবাদিক মাহবুব মোর্শেদ বলেন ‘সারা বছরে উল্লেখযোগ্য এই একটি কাজ করে নিজেদের উপস্থিতির জানান দেওয়া ছাড়া কার্যত বাংলা একাডেমীর আর কোনও কর্মতৎপরতা নেই। ফলে বইমেলা আয়োজন ও আয়োজনস্থলের ব্যাপারে নিজেদের কর্তৃত্ব ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না বাংলা একাডেমীর। কেননা এতে করে প্রতিষ্ঠানটির টিকে থাকার কোনও প্রয়োজনীয়তা আছে কি না সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে’।
সেক্ষেত্রে একুশে বইমেলা তথা বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণের বাইরে বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত হেমন্তের বইমেলা ও ঈদ বইমেলাসহ বছরের অন্যান্য সময়ে আয়োজিত বইমেলাগুলো কেন সফল অতটা সফল নয়? জবাবে ভাষাচিত্র প্রকাশক খন্দকার সোহেল বলেন ‘এজন্য আমাদের গণমাধ্যমগুলোই দায়ী। গণমাধ্যমগুলোও বছরের ওই একটি মাস নতুন নতুন বই ও বইমেলা নিয়ে অতি উচ্ছ্বসিত সংবাদ পরিবেশন করে। তারপর কোথায় কী হচ্ছে তার আর খোঁজ রাখে না’।
তিনি আরও বলেন ‘আমাদের গণমাধ্যমগুলো বই ও প্রকাশনা শিল্পকে প্রমোট করার নামে মেলা চলাকালীন যে প্রচারটা করেন, তাতে আসলে লেখক, পাঠক কিংবা প্রকাশকের তেমন কোনও লাভ নেই। ওটা বাংলা একাডেমীরই প্রচারণা হয়। আর এর বাইরে বছর জুড়ে প্রকাশিত অন্যান্য বই ও বইমেলা নিয়ে গণমাধ্যমের কোনও আগ্রহই লক্ষ্য করা যায় না’।
বাংলা একাডেমীর সারা বছরের অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে জানতে চাইলে কবি ও প্রাবন্ধিক সাখাওয়াত টিপু বলেন ‘ওটা একটা ডিজিটাল বন্ধ্যা একাডেমী, এতদিনে একটা স্বয়ংসম্পন্ন ওয়েবসাইট গড়ে তুলতে পারেনি ওরা। আমার দেশের ভাষার, বইয়ের কোনও একটা সন্তোষজনক তথ্য নেই ওটাতে’। তিনি মনে করেন বইমেলা আয়োজন করা একটি দেশের ভাষাভিত্তিক প্রধান প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হওয়া হাস্যকর। তিনি নিজেদের প্রাঙ্গণে বইমেলা আটকে রাখার ছেলেমানুষী প্রবণতা ত্যাগ করে একাডেমীকে তাদের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগী হতে অনুরোধ জানান।
বাংলাদেশ সময় : ১৪৪০ ঘণ্টা, ২৮ জানুয়ারি ২০১৩