 |
| ছবিঃ কাশেম হারুন/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
মাহমুদুর রহমান মান্না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি ও আওয়ামী লীগ নেতা। রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে কথা বলে আমজনতার কাছে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। তবেনিজ দলের সমালোচক হওয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে নিগৃহীত হয়েছেন দলীয় পরিমণ্ডলে; বলা যায়, তাকে করে রাখা হয়েছে একঘরে। তাই কয়েক দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও অর্জিত সুনামকে সঙ্গী করে সম্প্রতি `নাগরিক ঐক্য’ নামে বিকল্প এক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। এ ফোরামের প্রার্থী হয়েই ঢাকা সিটি করপোরেশন (উত্তরের) মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা তার। সম্প্রতি তার নিজস্ব রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলানিউজের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন স্বকালে কিংবদন্তি হয়ে ওঠা সাবেক এই ছাত্রনেতা। বাংলানিউজের পক্ষে তার একান্ত সাক্ষাৎকারিটি নিয়েছেন স্টাফ করেসপন্ডেন্ট আশরাফুল ইসলাম।
বাংলানিউজ: কি ভাবে দেখছেন দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে?
মাহমুদুর রহমান মান্না: দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। দেশ একটি অমীমাংসিত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পড়ে গেছে। থিওরিটিক্যালি (তাত্ত্বিকভাবে) এটি কঠিন কিছু নয়, এর সমাধান করা যায়। কিন্তু দেশ ক্রমাগত সাংঘর্ষিক অবস্থার দিকে যাচ্ছে। এই সংকট পেরোনোর কোনো সদিচ্ছাও নেই রাজনৈতিক দলগুলোর।
অর্থনৈতিক অবস্থাও ভাল নয়। গার্মেন্ট শিল্পপ্রধান একটি বড় অঞ্চল সংঘাত-সহিংসতার মুখে বন্ধ রয়েছে। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট (নগদ মুদ্রার সংকট) , দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট। এসবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতিকে আমি খুবই নাজুক এবং ভঙ্গুর মনে করছি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই, তারপরও রাজনৈতিক পন্থাই এসব কিছুর সমাধানের সর্বোত্তম উপায়।
বাংলানিউজ: তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের ইস্যুতে বিএনপির চলমান আন্দোলন কর্মসূচিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: আমি মনে করছি, বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে এখন আর আন্দোলন করছে না, তারা চাচ্ছে দলনিরপেক্ষ কোনো সরকার পদ্ধতি। এ দাবির পক্ষে যুক্তি আছে বলেই আমি মনে করি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের পরস্পরের প্রতি কোনো আস্থা-বিশ্বাস নেই। তাই আমাদের একটি `পক্ষপাতহীন অবস্থান` (‘নিউট্রাল পজিশন’) খুঁজতে হবে।
বাংলানিউজ: যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পৃক্ততা কতটুকু বলে মনে করেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: এ সরকারের মেয়াদের গত সাড়ে তিন বছরে অবস্থাদৃষ্টে তেমনটাই (সম্পৃক্ততা আছে) মনে হচ্ছে। কেবল একবার মওদুদ সাহেব (বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ) কিছু কথা বলেছিলেন, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিএনপি বা বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তুললেই ``তারা যুদ্ধাপরাধের বিচার চায় না`` মনে করা উচিৎ নয়। উল্টো সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পুলিশ দিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালাচ্ছে বলে দলগুলো অভিযোগ করছে ।
বাংলানিউজ: ``দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের কাছে সাধারণ মানুষ জিম্মি এবং তারা এদের থেকে মুক্তি চায়`` --এ অভিমত অনেক বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষের। এ অভিমতের সঙ্গে কতটা একমত আপনি?
মাহমুদুর রহমান মান্না: নিশ্চয়ই আমিও অনেকাংশে তা-ই মনে করি। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচির কারণে আমার ছেলের ‘এ’ লেভেল পরীক্ষা দিতে হয়েছে রাত ১২টায়, কিন্তু কেন? বিরোধী দলের কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করতে রাজধানীর উত্তরায় যানবাহন আটকে দেওয়া হয়, শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরতে পারেনি, সীমাহীন বিড়ম্বনা ভোগ করেছে। এসব দিক বিবেচনায় নিলে এক অর্থে আমরা এদের হাতে জিম্মিই হয়ে আছি বলা যায়। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমরা কি প্রত্যাশা করি? তাদের কাছে আমারা প্রত্যাশা করি প্রগতি, সুখে-শান্তিতে থাকার নিরাপত্তা। কিন্তু তারা তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।’
বাংলানিউজ: দেশের `গণতান্ত্রিক দল` বলে দাবিদার দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা কতটুকু হচ্ছে? আর না হলে এর জন্য কাকে দায়ী করবেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: চর্চা নেই। এজন্য ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতাকেই দায়ী করবো। দলের মধ্যে যিনি গণতন্ত্রের কথা বলছেন তিনি নিজেই যথাযথভাবে তা পালন করছেন না। ওনারা যদি চর্চাটা করেন তাহলেই সহজ হয়ে যায়, না করলে কঠিন। তবে এর জন্য দায় তাদেরই।
বাংলানিউজ: রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পর আপনার কেমনতরো অভিজ্ঞতা হলো সে প্রসঙ্গে বলুন।
মাহমুদুর রহমান মান্না: সংস্কারের কথা আমি আজ নতুন বলছি না। জাসদ ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর থেকেই বলে আসছি। আমার কথা প্রথম দিকে সবাই পছন্দ করলেও পরবর্তী সময়ে এসে আর সেভাবে নেয়নি। তবে আমি নিশ্চিতভাবেই সংস্কারপন্থি। যারা সংস্কার নিয়ে এক সময় অনেক কথা বলেছেন, তাদের অনেকেই আজ ভাল আছেন, কেবল আমি ভাল নেই।
বাংলানিউজ: আপনার নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ ‘নাগরিক ঐক্যে’র সাফল্য নিয়ে আপনি কতোখানি আশাবাদী?
মাহমুদুর রহমান মান্না: সিটি করপোরেশন নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, মানুষ দলবাজি চায় না । তার প্রমাণ নারায়নগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জনগণ দু’দলের (আওয়ামী লীগ-বিএনপি) বাইরের প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছে। জাতীয় নির্বাচনেও যদি মানুষ যোগ্য বিকল্প দেখে, তাহলে পরিবর্তন আসতেও পারে।
আমার অবস্থান দু’দলের বিরুদ্ধে নয়, তবে রাজনৈতিক দলের নেতাদের যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। তাদের সচেতন করতে চাই। কোনো রাজনৈতিক দল গঠনের স্বপ্ন এখনো আমার নেই। তবে আমার মৃত্যুর পর হলেও সেটা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি মার্টিন লুথার কিং কে স্মরণ করতে চাই। তার ভূমিকা কিভাবে আমেরিকাতে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল।
বাংলানিউজ: কোন রাজনৈতিক দর্শন কাজে লাগাতে চান?
মাহমুদুর রহমান মান্না: মহাত্মা গান্ধী ও নেলসন ম্যান্ডেলা আমার প্রিয় ও অনুকরণীয় নেতা। তাদের রাজনৈতিক দর্শন কাজে লাগাতে চাই।
বাংলাদেশ সময়: ১৪৪৮ ঘণ্টা, জুন ২০, ২০১২
সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর/ আহমেদ রাজু, চিফ অব করেসপন্ডেন্টস; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
jewel_mazhar@yahoo.com