৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, বুধবার মে ২২, ২০১৩ ৩:২২ পিএম BDST banglanew24
29 Sep 2012   04:03:04 PM   Saturday BdST
E-mail this

হাসান মাহবুব-এর গল্প

বৃষ্টি এবং বাতাসের রূপকথা


হাসান মাহবুব
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
বৃষ্টি এবং বাতাসের রূপকথা হাসান মাহবুব-এর গল্প

যে মেয়েটি বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ছাঁটে নিজেকে সমুদ্রকন্যার মতো করে গড়ে নেয়, বাতাস তার জন্যে বয়ে নিয়ে আসে রূপকথার অজস্র উপঢৌকন। দখিনা বাতাস তাকে পরিয়ে দেয় কনকমুকুট, তার করপল্লবে গুঁজে দেয় করবী ফুল। বিজলীর করাল চোখরাঙানীতে সবাই দরজা জানলা বন্ধ করে কুবাতাসের দাসত্ব মেনে নিয়ে প্রার্থনায় নিমগ্ন হলে হাওয়ারথে করে মেয়েটি চলে যায় বৃষ্টি আর বাতাসের রাজ্যে রাজকন্যার বেশে।

উদ্ধত আর অহঙ্কারী বাতাস সবাইকে নেয় না নিজগৃহে, সবাইকে দেয় না ভালোবাসার সুশীতল পরশ। তাই এই কথিকায় কেউ রাজকন্যা আর কেউ প্রজা।

-বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভিজছিস কেন খামোখা? দেখছিস না কি ভীষণ বাতাস আর বজ্রপাত। উড়ে যাবি তো! শিগগীর ভেতরে আয়! ডেঁপো মেয়ে পাকামি শিখেছে খুব!

রাজকন্যার সাথে প্রজার এহেন আচরণ মেনে নিতে পারে না বায়ু এবং জলের অধিপতি। বাতাসের গর্জন বেড়ে চলে। সক্রোধে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় মাতবরি ফলানো অভিভাবককে। অথচ একদিন সেও ছিলো রূপকথার একটি চরিত্র। কান্তিমান এক যুবরাজ। আজ তার ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা, সে এখন সামান্য একজন প্রজা। ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে সবসময়। সিক্ততা তার কাছে তিক্ততা। বাতাস তার কাছে সর্বনাশ!

যে বাতাসে আমরা নিঃশ্বাস নিই, যে বাতাসে উড়োই আবেগের রঙিন বেলুন কখনও কখনও সে বাতাসই ভীষণ প্রবঞ্চক হয়ে ওঠে। উড়িয়ে নিতে চায় সবকিছু। ভেঙে ফেলে ঘর, আবার কারো কারো কাছে গচ্ছিত রেখে যায় ঘোরের নয়নরঞ্জন।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে এখনও ভিজছে মেয়েটি, বাতাসের প্রহেলিকার জবাব খুঁজছে। বায়ুরথে চড়ে বাতাসের রাজ্যে যাবার পথে রূপকথার বরুণকুমারের সাথে খুনসুটির সময় কোত্থেকে বাবা এসে গাল পাড়া শুরু করলো! সেই সাথে সবকিছু উবে গেল। বৃষ্টি আর বাতাসের বেগও কমতে শুরু করেছে। টবের লতাবাহারটার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে শোবার ঘরে ফিরলো সে।

‘ইশ! ভিজে একেবারে একশা হয়ে গেছিস। নে তোয়ালেটা নিয়ে ভালোমতো মোছ মাথা। ঠাণ্ঠা বাঁধিয়ে বসবিতো!’

‘বাবা তখন যে তুমি পড়ে গেলে বাতাসের প্রচণ্ড ঝাপটায়, ব্যথা পাওনিতো?’

‘কখন আবার পড়ে গেলাম। পাগলী মেয়েটা বলে কী!’

বাবা আর মেয়ে খুব হাসে একসাথে। খোলা জানালা দিয়ে মৃদু হিমেল বাতাস তাদেরকে আলতো ছুঁয়ে যায়।

সেদিন রাতে মেয়েটি তার জ্ঞানী এবং গম্ভীর স্বামীর সাথে ঘুমোবার আগে উচ্ছাসের সাথে বৃষ্টির অনাসৃষ্টি কাণ্ড আর বাতাসের সাথে তাসখেলার কথা বলতে গেলে জানতে পারে যে বায়ুমণ্ডলে কি সব গোলযোগ চলছে যার ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পাবে, খরা কবলিত হবে অনেক এলাকা, বৃষ্টি হবে কালেভদ্রে আর বাতাস নাচবে তাণ্ডবনৃত্য। এর প্রতিরোধে মনুষ্যপ্রজাতির কী কী করা উচিত তার ফিরিস্তি দিতে শুরু করলো, বৃষ্টিপ্রবণা মেয়েটি বিরক্ত হয়ে তাকে বিজ্ঞান কপচাতে মানা করে এবং আলিঙ্গনের আহবান ফিরিয়ে দেয়। মেয়েটি বিজ্ঞানের চেয়ে রূপকথা নিয়ে ভাবতেই বেশি ভালোবাসে। গভীর ঘুমের মধ্যে যখন সে সমুদ্র এবং জলের অধিপতি বরুণকুমারকে স্বপ্নে, অথবা তন্দ্রায় অথবা জাগরণে দেখে. তখন তার মধ্যে একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক দ্যোতনার সৃষ্টি হয়। বরুণকুমারের সাথে যখন আদুরে গলায় কথা বলতে থাকে তার মনে হয়, সে কি দ্বিচারিণী? এক মুহূর্তের দ্বিধা ছুড়ে ফেলে সে নিমিষেই। এই রূপকথার রাজকন্যা যে হতে পারে না তার চেয়ে দুর্ভাগা আর কে আছে!

‘তুমি আজকে আমাকে নিয়ে গেলে না কেন তোমাদের রাজ্যে?’

‘বাবাকে ছেড়ে থাকতে পারতে? তার বুকের গভীরে তোমার জন্যে ভালোবাসার জলোচ্ছ্বাস টের পাও?’

‘আহা! খুব দরদ দেখছি আমার বাবার প্রতি! মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশি যাকে বলে!’

মেয়েটি ঠোঁট উল্টিয়ে অভিমানের ভঙ্গি করে। কিন্তু একটু পরেই তার চোখ থেকে অভিমানের মায়াঞ্জন মুছে যায়। আগুনচোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে,

‘আমার মাকে কেন কেড়ে নিয়েছিলে তাহলে? তখন এত দরদ কোথায় ছিলো তোমার?’

‘রূপকথার রাজ্যে কি কেবল রাজপুত্রই থাকে মেয়ে? কতো দৈত্য-দানো, অসুরের বসবাস, ওদের সাথে কতো বুঝতে হয়...’

মেয়েটি উন্মনা হয়ে যায়। এক ভীষণ বাতাসের দিন জলযানে করে পাড়ি দেবার সময় বোশেখ হাওয়ার নিষ্ঠুর ছোবলে তার মা তলিয়ে গিয়েছিলো জলে, অতলে।

মেয়েটির ঘুম ভেঙে যায় জানলা দিয়ে আসা প্রখর রোদে। রোদ ভালো লাগে না তার। এ শহরের কারোই হয়তোবা না। সবারই প্রার্থিত বৃষ্টি। তবে সেটা যতটা না বৃষ্টি এবং বাতাসের রূপকথার চরিত্র হবার ইচ্ছায়, তার চেয়ে বেশি গরমে ওষ্ঠাগত প্রাণটাকে একটু সতেজ করার প্রত্যাশায়। ক’জন হতে পারে ঐ মেয়েটির মত বৃষ্টিবিলাসিনী! ক’জনের বারান্দায় নেমে আসে দেবদূত হাওয়ার খামে সমুদ্রজল ভরে? একদিন এমন বৃষ্টি নামবে যেদিন আর কাউকে সাধনা করে রূপকথার রাজ্যে যেতে হবে না। অফিসফেরত লোকটি ছাতা ছুড়ে ফেলে গান গাইবে, জমির দলিললেখক বাতাসে উড়িয়ে দেবে যাবতীয় নথিপত্র, বুড়িয়ে যাওয়া নিমগাছ বা জীর্ণ যাত্রীছাউনির নিচে অভিনেত্রী আর অভিভাবকেরা আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়ুবে না।

মেয়েটি জানে একদিন নেমে আসবে এরকম বৃষ্টি, বইবে এরকম বাতাস।

রূপকথা নেমে আসবে শহরে। সেই রূপকথায় কোন দৈত্য-দানো থাকবে না। সেই রাজ্যে কোনো প্রজা থাকবে না। কাউকে খাজনা দিতে হবে না। উচ্ছেদ হতে হবে না। জলে তলিয়ে যাবেনা আর কেউ।

‘আজ বিকেলে যেতে হবে কিন্তু, রেডি থাকিস’

‘কোথায় বাবা?’

‘ভুলে গেলি? সাইক্রিয়াট্রিস্টের কাছে যাবার তারিখ না আজকে?’

‘ওহ বাবা, বাদ দাওতো ওসব! ছেলেবেলায় ভীষণ ঝড়-জলের প্রকোপে মাকে হারাবার পর মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে বৃষ্টি দেখলেই এলোমেলো হয়ে যাওয়া- এসব ক্লিশে কাহিনী দিয়ে বড়জোর বাজারি ছবি হতে পারে। রূপকথার জগতে এসবের কোনই মূল্য নেই।‘

‘তাহলে এটা কেমন হয় বলতো, তোর মাকে আমি পানিতে ডুবিয়ে মেরেছি, এটা তুই দেখেছিস তারপর থেকেই তুই মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন...’

‘নাহ এটাও ভালোনা। বরং আমি একটা কাহিনী বলি, এটা কেমন লাগে দেখো, আমি তুমি আর মা পিকনিকে যাচ্ছিলাম পাহাড়ে। আমরা অনেক উঁচুতে উঠেছিলাম। আমরা মেঘের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম, হঠাৎ করেই মা মেঘের দেশে চলে গেলো আর ফিরে এলোনা, অথবা এভাবেও ভাবতে পারো মা পা পিছলে নিচে পড়ে গেল, অনেক নিচে আমরা আর খুঁজে পেলামনা...’

বাবা আর মেয়ে খুব কাঁদে। বুকের জমে থাকা মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে।

‘তবুও বাবা বৃষ্টি আর বাতাসকে দোষ দিও না! এটুকু ফ্যান্টাসি না থাকলে, এটুকু রূপকথা না থাকলে বাঁচবো কীভাবে বলো!’

চলে যাওয়া একজনের মৃত্যুদিবসে চশমার কাচ মুছতে মুছতে প্রৌঢ় লোকটি তার বৃষ্টিবিলাসিনী মেয়েটির এটুকু আব্দার মেনে নেয়। মেনে না নিয়ে হয়তোবা তার উপায়ও ছিলো না।

জানলার ফাঁক দিয়ে খানিকটা বাতাস অধোবদনে এসে তাদের ছুঁয়ে দিয়ে যায়। রূপকথার রাজ্য থেকে ভালো বাতাস, দৈত্য বাতাস না। একটু পরেই হয়তোবা বৃষ্টি নামবে। সমুদ্র আর জলের অধিপতি মিশে যাবে মানুষের বুকের সমুদ্রে...

 বাংলাদেশ সময়: ১৫৫০ ঘণ্টা, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা : তানিম কবির, tanimkabir@gmail.com

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান