সাতক্ষীরা: স্বাধীনতার ৪২ বছর পেরিয়ে গেলেও সাতক্ষীরার বধ্যভুমি গণকবরগুলি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অযত্নে আর অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে বধ্যভুমি ও গণকবরের স্মৃতিচিহ্ন। এগুলো যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল শুরু হয় সাতক্ষীরায় মুক্তিযুদ্ধ। ভোমরা যুদ্ধটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সাতক্ষীরার প্রথম যুদ্ধ। এরপর একে একে জেলার বিভিন্ন স্থানে চলতে থাকে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধ।
এই যুদ্ধে শহীদ হয় ৩৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সে সময় পাক হানাদার বাহিনী সাতক্ষীরা বালক বিদ্যালয় ভবনে অবস্থান নেয়া প্রায় তিন’শ শরনার্থীদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে স্কুলের পিছনের দিনেশ কর্মকারের বাড়ির মাটির প্রাচিরের পাশে গর্ত খুড়ে তাদেরকে মাটি চাপা দেয়।
এমনকি সে সময় তাদের কেউ কেউ জীবিত ছিল। এবং শিশুদের ফেলে দেয়া হয় পাশের পুকুরে।
এছাড়া পাক হানাদার বাহীনি সে সময় মানুষকে হত্যা করে ফেলে রাখত বিভিন্ন বধ্যভুমিতে।
সাতক্ষীরার আলিপুর, মাহমুদপুর, বাঁকাল, বিনেরপোতা, ঝাউডাঙ্গা, গোপিনাথপুর, তালার পার কুমিরা, পাটকেলঘাটা, কলারোয়ার বোয়ালিয়া চন্দনপুর, বলফিল্ডের পাশে, পালপাড়া, শ্যামনগরের গোপালপুর, দেবহাটার কুলিয়াসহ অসংখ্য এলাকায় এমন বধ্যভুমি ও গণকবর রয়েছে।
সেগুলি আজও যথাযথ সংরক্ষণ করা হয়নি। এমনকি সেগুলো অনেকাংশে এখন আর চেনার উপায় নেই।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গফ্ফার জানান, সাতক্ষীরা কোর্ট প্রাঙ্গনের মধ্যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম সম্বলিত স্মৃতিস্তম্ভে একজন রাজাকার ও চার জন অমুক্তিযোদ্ধার নাম থাকায় এবং কয়েকজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম বাদ পড়ার কারণে স্মৃতিস্তম্ভটি দীর্ঘ সাত বছরেও উদ্বোধন হয়নি।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সুত্র জানায়, ২০০৫ সালের ২৬ এপ্রিল শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী আমানউল্লাহ আমান স্মৃতিস্তম্বের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। সেখানে ৩১ জন শহীদ মুক্তিযুদ্ধার নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ওই স্মৃতি ফলকে একজন রাজাকার ও ৪ জন অমুক্তিযোদ্ধার নাম স্থান পায়।
সুত্র মতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরনে নির্মিত ওই স্মৃতি ফলকে কলারোয়ার বাগডাঙ্গা গ্রামের গোলাম রহমানের নাম অন্তভুক্ত করা হয়েছে। তিনি একজন রাজাকার।
এ ছাড়া একই উপজেলার ইনতাজ উদ্দীন, ওজিয়ার রহমান এবং তালা উপজেলার সৈয়দ আবুল হোসেন ও বেদার বখতের নাম স্থান পেয়েছে। তারা সবাই অমুক্তিযোদ্ধা।
এ ছাড়া সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল গ্রামের শহীদ নাজমুল আরেফিন কাজল, কাটিয়া গ্রামের শহীদ আব্দুস সাত্তার ও সদর উপজেলার কাওনডাঙ্গা গ্রামের শহীদ মুনসুর আলী এবং দেবহাটার কুলিয়া গ্রামের শহীদ গুলজার, শহিদ সরদার মেম্বরসহ অসংখ্য শহীদ স্মৃতি ফলকে অর্ন্তভুক্ত হয়নি। অথচ তারা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা।
এদিকে সাতক্ষীরার সরকারি বালক বিদ্যালয়ের পিছনের গণববরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে বধ্যভুমিগুলি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার ইনামুল হক বিশ্বাস বলেন, একাত্তরে পাক হানাদারের নির্মম নির্যাতনের কাহিনী মনে পড়লে আমাদের শরীর আজও শিউরে ওঠে।
তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধিদের বিচার না করলে আমাদের মনের তৃপ্তি মিটবেনা। তিনি বিজয়ের মাসেই যুদ্ধাপরাধিদের বিচার শেষ করার দাবী জানান।
অবিলম্বে এসব বধ্যভুমি ও গণকবরগুলি যথাযথ সংরক্ষন করে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষন করবেন এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
একই সাথে সাতক্ষীরা আদালত চত্বরে স্থাপিত স্মৃতিস্তম্ভটি সঠিক তথ্য দিয়ে দ্রুত উদ্ধোধনের দাবি তাদের।
বাংলাদেশ সময়: ০৭৪৫ঘণ্টা, নভেম্বর ৩০, ২০১২
সম্পাদনা: সোহেলুর রহমান, নিউজরুম এডিটর