 |
রিয়াদ: দিনদিন সংকুচিত হচ্ছে বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমবাজার। সেই সঙ্গে কমে আসছে সরকারের রেমিটেন্স প্রবাহ। নতুন শ্রমবাজার খোলা তো দূরের কথা, যেগুলো আছে সেগুলোতেও অনে ক্ষেত্রে বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরবে এই চিত্র দারুণভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ রেখেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আগে থেকে যারা এখানে আছেন, তারাও আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের জন্য বাজার চালু থাকলেও বাংলাদেশি শ্রমিকদের বেলায় অজ্ঞাত কারণে বন্ধ হয়ে আছে কফিল (স্পন্সর) পরিবর্তনের সুযোগ। আকামা পরিবর্তন না করতে পারার কারণে প্রতিদিনই বৈধ থেকে ‘অবৈধ’ পরিচয়ে চিহ্নিত হচ্ছে শত শত বাংলাদেশি। অনেকে রুটি-রুজির তাগিদে বেপরোয়া হয়ে কফিলের কাছ থেকে পালিয়ে অবৈধভাবে কাজ করছেন এবং সেখানেও তারা সম্মুখীন হচ্ছেন নানা প্রতিবন্ধকতার, মারাত্মক বিপদের।
বাংলাদেশিদের ওপর ক্ষুব্ধ সৌদি পুলিশ
গত কিছুদিন থেকে অজানা উৎকণ্ঠায় আছেন এখানকার বৈধ শ্রমিকরাও। এর পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর সৌদি পুলিশ ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশি শ্রমিক তাড়ানো যেনো এদেশের পুলিশের প্রধান কাজ হয়ে দেখা দিয়েছে। সামান্য অজুহাতেই বৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকদের গ্রেফতার করে পাঠানো হচ্ছে সফর জেলে (এখানে সাজাপ্রাপ্তদের সৌদি থেকে একেবারে বের করে দেওয়ার জন্য রাখা হয়)। সামান্য অজুহাতে গ্রেফতার করার পর তাদের নামে দায়ের করা হচ্ছে মারাত্মক সব অপরাধের মামলা।
ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর থানার বড়ুইয়া গ্রামের বাকের আলী জমাদারের ছেলে মনির হোসেন। একেবারে অল্প বেতনে কাজ করেন একটি কোম্পানিতে। এই বেতনে কাজ করে নিজের খরচ বহন করার পর দেশে পাঠানোর মতো অবশিষ্ট কিছুই থাকে না। তাই তিনি বৈধ পথে অতিরিক্ত দু-চার টাকা রোজগারের জন্য নির্ধারিত ডিউটির ফাঁকে নামাজের পর মসজিদের গেটে বসে মেসওয়াক বিক্রি করেন। এই মেসওয়াক বিক্রিই এখন মনিরের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ৪/৫ দিন আগে মাগরিবের নামাজের পর অন্যান্য দিনের মতো মেসওয়াক নিয়ে মসজিদের গেটে বসেন মনির। সেখান থেকে সাদা পোশাকে সৌদি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। থানায় নিয়ে তার বিরুব্ধে দায়ের করা হয় ভিক্ষাবৃত্তির মামলা।
অনেক চেষ্টা-ফিকির করেও বৈধ আকামাধারী মনিরকে জেল থেকে বের করা যায়নি। মনিরের স্বজনরা অনেক জাগায় তদবির করতে গেলেও ‘বাঙালি মুসকিলা’ (বাঙালি বিপদ) বলে বিদায় করে দেওয়া হয় তাদের। অপরাধ না করেও অপরাধী সাব্যস্ত হওয়া মনিরকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মনির ছাড়াও টাঙ্গাইলের আমীর আলী, নোয়াখালীর বাচ্চু, চাঁদপুরের শহিদুলের মতো অনেকেই গত কয়েকদিনে বৈধ আকামা এবং অন্যান্য কাগজপত্র থাকা সত্বেও খালি হাতে দেশে ফিরেছেন। জানা গেছে, সৌদি বিমানের প্রতিটি ফ্লাইটে ১০/১৫ জনের একটি করে গ্রুপকে ‘সফর জেল’ থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে সচেতন প্রবাসীদের মত হচ্ছে, সৌদি কূটনৈতিক খালাফ হত্যার ঘটনার সূত্র ধরে সৌদি প্রসাশনের অলিখিত এই বৈরি আচরণ। এরই সূত্র ধরে পুলিশ বাংলাদেশি খেদাও মিশনে নেমেছে।
অনেকেই বলেছেন, দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের কূটনীতিকরা বলে আসছেন, খালাফ হত্যাকাণ্ডে দুই দেশের সম্পর্কে তেমন প্রভাব পড়বে না। কিন্তু আমরা দেখছি, যতই দিন যাচ্ছে, সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের অবস্থা ততই খারাপের দিকে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে জামায়াতের মিত্র এই দেশটি বাংলাদেশিদের মধ্যে আতংক ছড়ানোর জন্য এই কাজ করছে।
ঘটনার মূলে যাই থাকুক না কেনো, এই অবস্থা যদি আরো চলতে থাকে তাহলে অচিরেই বাংলাদেশি শূন্য হয়ে পড়বে প্রায় ২৩ লাখ বাংলাদেশি অধ্যুষিত সৌদি আরব।
সাধারণ প্রবাসীরা মনে করেন, দূতাবাস আন্তরিকভাবে ইচ্ছা করলে এই সামান্য অপরাধে অভিযুক্ত বৈধ বাংলাদেশিদের পুলিশের হাত থেকে ছাড়িয়ে এনে স্বাভাবিকভাবে কাজ করার সুযোগ করে দিতে পারে। প্রয়োজনে “এ ধরনের কাজ আর করবে না” মর্মে মুসলেকা নিয়ে দূতাবাস তাদের কাজ করার অর্থাৎ সেখানে নিরাপদে থেকে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে।
বাংলাদেশ সময়: ১৬৫৫ ঘণ্টা, মে ৩১, ২০১২
সম্পাদনা: আহমেদ জুয়েল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর; আহ্সান কবীর, আউটপুট এডিটর