১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শনিবার মে ২৫, ২০১৩ ৫:২৯ পিএম BDST banglanew24
22 Nov 2012   05:08:56 PM   Thursday BdST
E-mail this

আসিফ আজিজ-এর রচনা

উৎপল দত্তের নাটকে রাজনৈতিক চেতনা


আসিফ আজিজ
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
উৎপল দত্তের নাটকে রাজনৈতিক চেতনা আসিফ আজিজ-এর রচনা

উৎপল দত্ত (১৯২৯-১৯৯৩) জন্মেছিলেন এক সংক্ষুব্ধ সময়ের বুকে। সমগ্র বিশ্ব এবং বিশেষ করে পাক-ভারতীয় উপমহাদেশে তখন কালকের সকালটি কেমন হবে একথা বলা ছিল দুষ্কর। বিশ শতকের প্রথম দশক থেকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকলো অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধের প্যাটার্ন, মানুষের আর্ন্তজাগতিক ভূগোল এবং তৎসম্পর্কিত বাহ্যিক আচার-আচরণ, যা চল্লিশের দশকে গিয়ে আরও পরিণত হলো। উৎপল দত্তের বেড়ে ওঠা এই কালখণ্ডে। এই সময়ের কল্যাণে যিনি বিশ্বের পাশে পেয়েছিলেন জীবনের অসংখ্য শাখা-প্রশাখাময় বৈচিত্র্যের সন্ধান। সেই কালোত্থিত জীবনের বৈচিত্র্যসংযাত রাজনৈতিক রসায়ন উৎপল দত্তের নাটকের প্রধান মনোযোগ।

রাজনৈতিক নাট্যশালা এক অনন্য রণক্ষেত্র। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ রাজনৈতিক সংগ্রামের এই রণাঙ্গনে নানা ভূমিকায় নানা রূপে উৎপল দত্তের প্রবেশ ও সংগ্রাম। অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক, নাট্যকার, নাট্যান্দোলন কর্মী- যখন যে রূপে প্রয়োজন তখন সে রূপে আবির্ভূত উৎপল দত্ত। অন্যদের থেকে তিনি স্বতন্ত্র কারণ এই সবগুলো ক্ষেত্রে তাঁর সফলতা ছিল তুঙ্গে। তবে নাট্যকার হিশেবে সকল প্রতিভাকে অতিক্রম করেছেন তিনি। এই শিল্পী-যোদ্ধার অক্ষয় তূণীরের শ্রেষ্ঠ আয়ূধ তাঁর নাটক। রাজনীতি যেমন মানুষকে মানুষের খুব কাছে নিয়ে যায়, চিনতে শেখায়, অধিকার সচেতন করে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথের দিশা দেখায়, ভুল-শুদ্ধ-প্রয়োজন-অপ্রোয়জনীয়তাকে বোঝার মঞ্চ তৈরি করে দেয়, তেমনি নাটক মানুষের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক, আত্মিক, সামাজিক, সাংস্কতিক, ঐতিহ্যিক সংগ্রামের যোগাযোগ স্থাপন করে।

নাটক এবং রাজনীতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অধিকার আদায়ের ভিন্ন দুটি মাধ্যম। দুটিরই আছে অনেকগুলি শাখা। নাটক কখনো কখনো প্রচার করতে চায় রাজনৈতিক আদর্শ। তবে কি রাজনীতি আর নাটক এক অন্যের পরিপূরক? সেটা জানার জন্য প্রয়োজন রাজনীতি কী তা একবার স্বল্প পরিসরে জানা। চেম্বারস অভিধানে রাজনীতি বলতে সরকার, রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ অথবা মতামত পরিচালনার কলাকৌশলকে রাজনীতি বলা হয়েছে। ভিন্ন কিছু অভিধানে রাজনীতি বলতে বোঝানো হয়েছে সরকার বা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পদ্ধতি বা আন্দোলনকে। রাজনীতি প্রায় সময় দেশে সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত করতে চায়, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের চেষ্টা চালায়, নিজ দল বা মতাদর্শের পক্ষে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করে। বলা যায়-

‘রাজনীতি হলো একটা লড়াই, প্রতিকূল একটা শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাকে পরাভূত করাই হলো লক্ষ্য। রাজনীতি হলো ক্রমান্বয়িক গতিশীলতা, প্রতিকূলতাকে পরাজিত করেও তাকে এগিয়ে যেতে হয়। রাজনীতি হলো একটি বিজ্ঞান, যার একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে, পদ্ধতি আছে।’

মার্কসবাদী দৃষ্টির আলোকে রাজনীতি বলতে মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, শ্রেণীগত ব্যক্তিগত সব কর্মকাণ্ডকে বোঝায়। রাজনীতির প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হলো কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা। রাজনৈতিক দল হলো সেই লক্ষ্যের বা অভিযানের সামগ্রিক বাহিনী। সেই লক্ষ্য অর্জনে সবথেকে বেশি প্রয়োজন হলো নিজ মতাদর্শের প্রতি মানুষের দৃষ্টিকে আকৃষ্ট করা। রাজনীতির এই ব্যাপকতার আলোকে কোন নাটককে তখনই রাজনৈতিক নাটক বলা যায় যখন সেটি সরকার, রাষ্ট্র এবং রাজনীতি নিয়ে কথা বলে। কোন একটি ভাবনা বা মতাদর্শকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থান থেকে হয় সমর্থন নয় আক্রমণ করে। কথনো প্রকাশ্যে, কখনো পরোক্ষভাবে, কখনো রূপকের সাহায্যে রাজনৈতিক নাটক তার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চায়। সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ভুল-ত্রুটি নির্ণয় করে দর্শককে পরিবর্তন করতে চায়। সব মিলিয়ে বলা যায়, যদি কোন নাটক নির্দিষ্ট এক জনমণ্ডলীর কাছে কোন রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক কোন নির্দেশ বা ধারণা বহন করে নিয়ে যায়, রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে সেই নাটককে বলা যায় রাজনৈতিক নাটক।

অপরিহার্যভাবে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় আলোচনার শুরুতে আমরা স্মরণ করবো শিল্প-সাহিত্য সমালোচনা প্রসঙ্গে মার্কসবাদের অন্যতম পুরোধা তাত্ত্বিক ও প্রবক্তা, মহান বিপ্লবী মাও সে তুং-এর ইয়েনান ভাষণের সেই অভ্রান্ত সিদ্ধান্ত :

‘শিল্প ও সাহিত্য সমালোচনার দুটি মানদণ্ড আছে : একটি রাজনৈতিক অপরটি শৈল্পিক। ...শ্রেণীবিভক্ত সমাজে প্রত্যেক শ্রেণীর নিজস্ব রাজনৈতিক ও শৈল্পিক মানদণ্ড আছে। কিন্তু সমস্ত শ্রেণীবিভক্ত সমাজে সমস্ত শ্রেণীই সর্বদা শৈল্পিক মানদণ্ডের চেয়ে রাজনৈতিক মানদণ্ডকে স্থান দিয়ে থাকে।’ তাঁর মহামূল্যবান সুস্পষ্ট নির্দেশ : ‘আমরা দাবি করব রাজনীতি ও শিল্পকলার ঐক্য, বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের ঐক্য, বিপ্লবী রাজনৈতিক বিষয়বস্তু এবং যত উচ্চমানের সম্ভব উৎকৃষ্ট শিল্পগুণান্বিত আঙ্গিকের ঐক্য।’

উৎপল দত্তের নাটক বিশ্লেষণকালে আমরা এই মহান নেতার শিল্প ও রাজনৈতিক আদর্শের প্রভাব এবং নাট্যকারের সফলতা-বিফলতা পর্যলোচনা করবো।

বাংলা রাজনৈতিক নাটকের ইতিহাস শুরু বলা যায় দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটকের মাধ্যমে। উনিশ শতকের মধ্যভাগে বাংলা নাটকের মূল চালিকাশক্তি ছিল সমাজ সংস্কারের মানসিকতা। রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’রা সেকালে সমাজে যে প্রবল প্রগতিশীল আন্দোলন উপস্থিত করেছিলেন, সেকালের নাটক মূলত তারই প্রতিফলন। খুব সূক্ষ্ণ বিচারে অবশ্য দেখা যাবে আমরা ‘সমাজ সংস্কার-চেতনার নাটক’ বলেছি, তাও প্রকৃতপক্ষে রাজনীতি-বিবর্জিত কিছু নয়। তাঁদের নাটকে Negation-র লক্ষ্য ছিল আপন সমাজের মধ্যযুগীয় কুসংস্কার, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নয় এখানেই দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ স্বতন্ত্র। ‘নীলদর্পণ’-এ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণের নির্মম চিত্র উদঘাটনই ছিল মূল লক্ষ্য। এরপর জাতীয়তাবাদের উন্মেষ পর্বে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, কিরণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, হরলাল রায়, উপেন্দ্রনাথ দাস, উমেশচন্দ্র গুপ্ত, প্রমুখ মূলত ইতিহাসের প্রচ্ছদে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাজনৈতিক নাটক রচনা করেছিলেন। পরবর্তীকালে এই ধারা গিরীশচন্দ্র-দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে। আর বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্বে বাংলা নাটককে প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক নাটকের ধারা হিশেবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন উৎপল দত্ত।
 
এই ধারায় উৎপল দত্তের অনন্যতা, সফলতা, বিশিষ্টতা বা স্বতন্ত্রতা কোথায়? পূর্বসূরিরা যে রাজনৈতিক নাটকের ধারা সৃষ্টি করেছিলেন সেখানে সরাসরি রাজনীতিকে উপস্থাপন করা কঠিন ছিল ব্রিটিশদের পদাবনত থাকার কারণে। তাঁরা ইতিহাসের উপর রাজনীতি আরোপ করে নাটক লেখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু উৎপল দত্ত অন্য নাটকের পাশাপাশি রাজনৈতিক নাটকে শাসক, শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন সরাসরি। শুধু তাই নয়, নাটক নিয়ে তিনি চারদেয়ালে ঘেরা থিয়েটারে আবদ্ধ থাকেননি, পৌঁছেছেন গণমানুষের কাছে; নাটকে সম্পৃক্ত করেছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে।
 
উৎপল দত্তের রাজনৈতিক নাটকগুলোর মধ্যে আবার পাওয়া যায় শ্রেণীচেতনা, ইতিহাস চেতনা ও মধ্যবিত্ত চেতনা। ‘টিনের তলোয়ার’, ‘রাতের অতিথি’, ‘ছায়ানট’, ‘সূর্যশিকার’, ‘মানুষের অধিকার’ প্রভৃতি নাটকে যেমন পাওয়া যায় শ্রেণীচেতনা সচেতনতা, তেমনি ‘টোটা, ‘লাল দুর্গ’, ‘তিতুমীর’, ‘কল্লোল’,‘দিল্লী চলো’, ‘ক্রুশবিদ্ধ কুবা’ প্রভৃতি নাটকের ইতিহাস চেতনা, ‘অঙ্গার’, ‘ফেরারী ফৌজ’ প্রভৃতি নাটকের মধ্যবিত্ত চেতনা তাঁর নাটককে দেয় ভিন্নমাত্রা।

উৎপল দত্তের নাটকে ভারতবর্ষের সমাজ, রাজনীতির পাশাপাশি উঠে এসেছে বিশ্বরাজনীতি, অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াস, মানবতার জয়তু জীবনজিজ্ঞাসা প্রভৃতি বিষয়। ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ আজীবন সংগ্রামী। এখানে যেমন অন্যায়, অত্যাচার, দখল, শাসন-শোষণ নিত্য চলেছে, তেমন নিপীড়িত, শোষিত, সর্বহারা মানুষ তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে বারবার; আদায় করেছে তাদের কাঙ্ক্ষিত অধিকার। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গণ-বিপ্লবের কাহিনী তাঁর নাটকের অন্যতম বিষয়বস্তু। গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়কালে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ১৮৫৭ সালের ভারতীয় মহাবিদ্রোহ, নীলবিদ্রোহ, সন্ন্যাসীবিদ্রোহ, ওয়াহাবি আন্দোলন, জালিয়ানওয়ালাবাগের রক্তাক্ত অধ্যায়, আজাদ হিন্দ ফৌজের দুঃসাহসিক অধ্যায়, ভারতের নৌবিদ্রোহ, দেশবিভাগের মর্মদন্তু ঘটনা ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, বিশ্বের সংগ্রামী মানুষের মরণপণ সংগ্রামী ঘটনাগুলিও তাঁর নাটকে ধরা পড়েছে গভীর ইতিহাসবীক্ষার আলোকে। পৃথিবীর প্রথম শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্রগঠনের যে ঘটনা আজও সর্বহারা শ্রেণীর চোখের মণি সেই প্যারি কমিউন, অক্টোবর বিপ্লবের পূর্ব ও উত্তরকাল, ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রাম, চীনের বিপ্লব, ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধ, কিউবা, ইন্দোনেশিয়া, একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ও প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের কলঙ্কজনক ভূমিকা- সবই তিনি লিপিবদ্ধ করে গেছেন তাঁর নাটকের বিষয়বস্তুতে।
 
নিজেকে তিনি বলতেন ‘প্রোপাগান্ডিস্ট’। প্রচলিত সমাজব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর প্রোপাগান্ডার বিষয়। প্রোপাগান্ডা করতে গেলে দরকার মানুষকে ক্রুদ্ধ করে তোলা। গণ-আন্দোলনের পথে নামলে প্রকাশ পাবে সেই ক্রোধ ও সংগ্রামের মুষ্টিবদ্ধ প্রয়াস। উৎপল দত্ত তাঁর সমগ্র নাট্যজীবনে এই ব্রতকেই শিরোধার্য করেছিলেন।

ইতিহাস আশ্রিত নাটকগুলোর মধ্যে ‘কল্লোল’, ‘ব্যারিকেড’, ‘একলা চলো রে’, ‘জনতার আফিম’, ‘তিতুমীর’, ‘সন্ন্যাসীর তরবারি’, ‘ক্রুশবিদ্ধ কুবা’, ‘টোটা’, ‘অজেয় ভিয়েতনাম’ উল্লেখযোগ্য।
 
ভারতের ঐতিহাসিক নৌ-বিদ্রোহ নিয়ে লেখা ‘কল্লোল’ উৎপল দত্তের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নাটক। এই নাটকের মধ্য দিয়ে তিনি ইতিহাসের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিদ্রোহ নতিস্বীকার করেছিল। কিন্তু না, ‘কল্লোল’ নাটকে করেনি। উৎপল দত্তের নিজস্ব ভাষ্যে পাওয়া যায় :

‘৪৬-এর নৌ-বিদ্রোহ এক বৈপ্লবিক প্রক্রিয়ার সূচনা। এই সেই প্রক্রিয়া যা ব্রিটিশ কংগ্রেস-মুসলিম লিগ চক্রের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত করতে বাধ্য করলো স্বতঃসিদ্ধভাবে। ইতিহাসের প্রক্রিয়াই তাই। এই সেই প্রক্রিয়া এবং ষড়যন্ত্র যাতে সমগ্র ভারতবর্ষটাই প্রজ্জ্বলিত হলো বিদ্রোহে। এই সেই প্রক্রিয়া যার অমোঘ নিয়মে ভারতী বুর্জোয়া সশস্ত্র সংগ্রামের দুঃস্বপ্নে আজও ভীত। এই প্রক্রিয়া বৈপ্লবিক স্বপ্নের। বিপ্লবের। তাই থিয়েটারের বর্ণমালায় ‘খাইবার’ আত্মসমর্পণ করেনি যেমন আইজেনস্টাইনের ‘ব্যাটেনশিপ পোটেমকিন’-এ করেনি, যদিও ইতিহাস বলে করেছিল। পোটেমকিনের বিদ্রোহীরা মহান অক্টোবর বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে এসে নিজেদের উপনীত করেছিল। ইতিহাসের মানদণ্ডে পোটেমকিন নাবিকদের আত্মসমর্পণ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বৈপ্লবিক প্রক্রিয়ার তার পুনঃসূচনা। সেই বৈপ্লবিক প্রক্রিয়ার এক অন্যতম উপাচার কল্লোল।’

এই নাটকের সব ঘটনাই ঐতিহাসিক এই অর্থে যে, ১৯৪৬ সালের নৌ-বিদ্রোহে যা ঘটেছিল তা থেকেই এর আদ্যোপান্ত গঠিত। তার মানে এই নয় যে খাইবার নামক জাহাজে এই ঘটনা ঘটেছিল নাট্যকার একাধিক জাহাজের অভিজ্ঞতাকে একত্রিত করে একটিমাত্র জাহাজে সন্নিবেশ করেছেন, সংক্ষেপন করেছেন। ‘খাইবার’কে এখানে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সব বিদ্রোহী জাহাজের প্রতিনিধি হিসেবে। প্রকৃত ইতিহাস যদি উন্মোচিত হয় তবে আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে পারি কিভাবে সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ নাবিকদের বিনা শর্তে আত্মসমর্পণের উপদেশ দিয়ে শেষ পর্যন্ত নাবিকদের বন্দী করালেন এবং ব্রিটিশ লৌহ শক্তির যবনিকায় প্রেরণ করে সকল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অন্যতম শরিক হয়ে ইতিহাসের বিড়ম্বনায় রূপান্তরিত হলেন। এ কথা এখন স্পষ্ট যে দুই নেতার সরাসরি বিদ্রোহ-বিরোধীতা মোলায়েম ভাষায় আত্মসমর্পণের জাল তৈরি করেছিল। কারণ তারা তখন নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে স্বাধীনতার দর-দস্তুর করতে অনেক ব্যস্ত ছিলেন। কংগ্রেসের এই দেউলিয়া রাজনীতি নাটকে স্পষ্ট। ‘কল্লোল’ নাটক একটি বিশেষ যুগকে ধরে রেখে সেই যুগের সেই যুগের বৈশিষ্ট ফুটিয়ে তুলেছে। এ নাটক একটি যুগসৃষ্টির অধিকারী, এই কারণেই যে ঐ বিশেষ যুগের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক চেহারার যথাযথ প্রতিফলন ঘটে এ নাটকের সর্বত্রে।

‘একলা চলরে’ নাটকে দেখি ‘দেশের বিনা রক্তপাতে’ স্বাধীনতার সঙ্গে প্রকৃত গান্ধীবাদীদের নিগ্রহ। যারা নিগ্রহ করেছেন তারাও কংগ্রেসি, তবে তারা ভূস্বামী, জমিদার। স্বাধীনতার মুনাফা তারাই লুটেছেন বেশি। মুনাফার তাগিদে সাম্প্রদায়িকতার ইন্ধন তারাই জুটিয়েছেন নির্লজ্জভাবে। চাষীর অন্ন খেয়ে ভুঁড়ি বাড়িয়ে কৃষক সমাজকে ভাগ করেছেন মুসলমান চাষী এবং হিন্দু চাষী আক্ষ্যা দিয়ে। নাট্যকার দেখিয়েছেন স্পষ্টভাবে শান্তি এবং ক্ষমার প্রতীক সত্যাগ্রহী কংগেসি পিতাও রেহাই পায়নি ব্রিঠিশ রাজশক্তির পুলিশবাহিনীর হাত থেকে যখন তারা জানতে পেরেছে তার পুত্র ব্রিটিশের মূলোচ্ছেদে সশস্ত্র বিপ্লবীদের সঙ্গে যুক্ত। পুত্র সহিংস বলে অহিংস পিতাকে ক্ষমা করেনি।

‘রাইফেল’ নাটকের বিষয়বস্তু ত্রিশ থেকে চল্লিশের দশক পর্যন্ত। ১৯৩৪ সালে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে বিপ্লবী দলের যে অভ্যুত্থান ঘটেছিল সেটাকে নাট্যকার তুলে ধরেছেন এখানে। আন্দোলন নিয়ে বিপ্লববাদী ও গান্ধীবাদীদের মধ্যে যে মতদ্বৈততা ছিল তাকে নাট্যকার রূপায়িত করেছেন অসাধারণ নাট্যোৎকণ্ঠায়। অবশ্য এই মতদ্বৈততায় উৎপল দত্ত বিপ্লববাদেই বিশ্বাসী। নাটকের শুরুতেই নাট্যকার সূত্রধর চরিত্রের মাধ্যমে সেই প্রশ্নই তুলে ধরেছেন-

‘‘কান পেতে শুনুন, চারিদিকে ঢক্কা নিনাদ, দেশ স্বাধীন হয়েছে বিনা রক্তপাতে, অহিংস সংগ্রামের দৌলতে! দেশ নাকি স্বধীন হয়েছে খদ্দর পরার ফলে, আমরা একমনে চরকা কেটেছি বলে!

অহিংস সংগ্রামের ফলে দেশ স্বাধীন? তবে কি ক্ষুদিরামের নাম মুছে ফেলা হবে ইতিহাস থেকে? বিনা রক্তপাতে দেশ স্বাধীন? তবে কি সূর্যসেনের রক্ত রক্ত নয়? তবে কি সে যুগে ঝাঁসির রানী লক্ষ্ণীবাই আর তিতুমীর, আর এযুগে নৌ-বিদ্রোহী আর সুভাষচন্দ্রের সশস্ত্র আই. এন. এ. বাহিনী আমাদের কেউ নয়?’

এই সংলাপের মদ্য দিয়ে স্পষ্ট হয় নাট্যকারের আদর্শ। পরাধীন ভারতে যারা দোসর ছিল তারাই ’৪৭ পরবর্তী ভারতে ক্ষমতায় বসে। তাই গণমানুষের স্বাধীনতার স্বপ্ন থেকেই যায়। উৎপল দত্ত বোধহয় এটাই দেখাতে চান যে, পরাধীন ভারতে ব্রিটিশরা যেমন সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালাত, শাসন-শোষণ করত, ঠিক তেমনিভাবে শোষণ নির্যাতন করে স্বাধীন দেশের কংগ্রেসীরা। কংগ্রেসী স্বাধীনতাকে নাট্যকার স্বাধীনতা বলতে নারাজ। সেটা শুধু ক্ষমতার পালাবদল, কাঠামো বদল নয়। নাটকের শেষে তাই বিপ্লবীরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করে। লুকিয়ে রাইফেল নিয়ে তারা আবার ঘুরে দাঁড়াতে চায়। নাট্যকার স্পষ্টভাবে বোঝাতে চেয়েছেন অস্ত্র ছাড়া বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে জেতা সম্ভব নয়। তাই রাইফেল হয়ে ওঠে গণমানুষের হাতিয়ার।

‘ফেরারী ফৌজ’ নাটকে নাট্যকার ১৯৪৭ পূর্ব ভারতবর্ষের রাজনীতি ও আন্দোলনকে তুলে ধরেছেন। বাংলার আন্দোলনের ইতিহাসে যা অগ্নিযুগ নামে পরিচিত সেই যুগটি যেন ভেসে ওঠে চোখের সামনে। ইতিহাসকে এখানে নতুন মাত্রায় উপস্থাপন করেছেন। ’৬০ এর দশকে লেখা এই নাটকের বিষয়বস্তু হিসেবে উঠে এসেছে স্বাধীনতা আন্দোলনে বিপ্লববাদীদের সাহসী ভূমিকা ও কার্যকলাপ। তিনি ষাটের দশকে বিপ্লবীদের উত্থান-পতন, সংগ্রাম-বিচ্যুতিকে দেখিয়েছেন। এই বিপ্লবী আসলে কমিউনিস্টরা আর কংগ্রেস হলো রূপান্তরিত ব্রিটিশ শক্তি। অশোক এই নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র। শচী, বঙ্গবাসী, রাধারানী সবাই যেন বিপ্লবী। কেই প্রত্যক্ষ কেই পরোক্ষভাবে। এসব চরিত্রের মধ্য দিয়ে নাট্যকার আমাদের ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীদের সাহসিকতাকে তুলে ধরেছেন।

কৃষকবিদ্রোহের নেতা তিতুমীরকে চব্বিশ পরগণার তৎকালীন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট এজেন্ট, ক্রফোর্ড পাইরন, একজন গবেষক হিসেবে হাজির করেছেন ‘তিতুমীর’ নাটকে । তিতুমীরের ঐতিহাসিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি বাংলার প্রাচীন পুঁথি গবেষণায় মত্ত। নাট্যকার এখানে একদিকে ক্রফোর্ড পাইরনের  গবেষকের আপাত বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে সঙ্গে তার ঔপনিবেশিক স্বার্থরক্ষার বিষয়টিকে সুনিপুণ নাট্যকারের মতো আমাদের তিতুমীরের সাম্প্রদায়িকতা বিরোধীতা, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতার লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। এ নাটকে তিতুমীর নাট্যকারের চোখে একজন অতিকথার নায়ক। ‘অতিকথা’ সমাজবিজ্ঞানীদের মতে মানুষকে এক বিশ্বাস প্রদান করে, যার ফলে সে নৈতিক বা ধর্মীয় কাঠামোর মাধ্যমে ঐ বিশ্বাসের দ্বারা বর্তমান জীবনকে ব্যখ্যা করতে চায়। তিতুমীরের চোখে দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামই ধর্মরক্ষা করার সংগ্রাম :

          ‘যার যা আছে সব কিছু দিয়ে দিতে হবে, তবেই সে এই সংগ্রামের প্রকৃত যোদ্ধার দায়িত্ব বহন করার উপযুক্ত হবে।’

নাটক উৎপল দত্তের কাছে নিছক অবসর-বিনোদনের আশ্রয় নয়, তা অস্ত্র ; এবং এই নাট্যকারের হাতে তা ‘টিনের তলোয়ার’ও নয়, তা ‘রাইফেল’। ‘তীর’, ‘টোটা’, ‘কৃপাণ’, ‘রাইফেল’, ‘সন্ন্যাসীর তরবারি’, ‘টিনের তলোয়ার’- নানাধরনের অস্ত্রের নাম ব্যবহার করে এত বেশি নাটকের নামকরণ আর কোনো নাট্যকারই কি করেছেন? আর কোন নাট্যকারের নাটকে নানাধরনের যুদ্ধবিদ্যার অনুষঙ্গ- ‘ফৌজ’, ‘ব্যারিকেড’, ‘দুর্গ’- এত বেশি আছে? তাঁর নিজের কথাগুলোই এক্ষেত্রে আমাদের বেশি সাহায্য করে :

  From the very beginning of my theater-work, we have tried to put revolution in a historical perspective. Studying social phenomena in isolation, assuming each phase of development as a hole, that is, substituting the General with the Perticular, is a universal bourgeois vice; (Twoards Revolutionary theatere, p28)

প্রাচীন ভারতে সমুদ্রগুপ্তের শাসনকালে শ্রেণীস্বার্থ এবং বিজ্ঞান সাধক কলহনের যুক্তিবাদী বিজ্ঞানভিত্তিক লড়াই নিয়ে লেখা ‘সূর্য শিকার’, ফকির সন্ন্যাসীর লড়াই নিয়ে ‘সন্ন্যাসীর তরবারি’, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তির লড়াই নিয়ে ‘টোটা’, উনিশ শতকে বাঙালি নাট্যকর্মীদের মুক্তির শপথ নিয়ে ‘টিনের তলোয়ার’, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ’, চিনাগুড়ি কয়লাখনি শ্রমিকের ওপর মালিক পক্ষের নির্মম অত্যাচার নিয়ে লেখা ‘অঙ্গার’ দেশীয় ইতিহাস নিয়ে লেখা উলেখযোগ্য রাজনৈতিক নাটক।

মানবজাতির মুক্তির জন্য ধাবিত যে কোনও সংগ্রামের প্রতি উৎপল দত্ত শ্রদ্ধাশীল। মার্কসবাদী উৎপল দত্তের কাছে প্যারি কমিউন, সোভিয়েত, চীন, ভিয়েতনাম, কিউবার কমিউনিস্ট যোদ্ধারা তিতুমীর পরিচালিত ওয়াহাবী আন্দোলনের বীর সেনানীদের উত্তরসূরি। মার্কসবাদ ও লেলিনবাদের অবিচল আস্থায় বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে সত্য অন্বেষণ করেছেন। সেই সত্যই তার কাছে জীবনসত্য যা শ্রেণীসংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার্য। এটি তিনি তত্ত্বগতভাবে বিশ্বাস করতেন না, নাটকে প্রয়োগও করেছেন। হিটলালের নাৎসীবাহিনীর বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের ব্যারিকেড গড়ার ইতিহাস উঠে এসেছে উৎপল দত্তের ‘ব্যারিকেড’ নাটকে। এই নাটকে আমরা ভীত, মতামত প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত ডাক্তার, হেরমান স্ট্রবেলদের পরিচয় পাই, ফ্রায়েৎসাইটুং পত্রিকার সম্পাদক ও মালিক হাইনরিশ লাস্টদের পরিচয় পাই, যারা ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় ফ্যাসিবাদের স্বপক্ষে প্রচার করেন, কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কুৎসার বান ডাকান, আবার অটো বিরখোলৎসের মতো দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দীর্ণ, সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকদের পরিচয়ও পাই। কমিউনিস্ট ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তির নির্বাচনী জয়কে বার বার বাতিল করে এবং শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে কিভাবে হিটলারের নাৎসী পার্টি ক্ষমতা দখল করল, তারও পরিচয় এই নাটকে রয়েছে। এই বাংলার সাতের দশকের সন্ত্রাস, অসহিষ্ণু শাসকদের গণতন্ত্র নিধনের চেষ্টার সঙ্গে চমৎকার মিল খুঁজে পাওয়া যায় এখানে, অথচ কোথাও একটুও ইতিহাস বিকৃতি চোখে পড়ে না।

সমাজতন্ত্রের জন্য কিউবান জাতির লড়াই ইতিহাসে গাথা হয়ে আছে। ‘ক্রুশবিদ্ধ কুবা’ নাটকে উৎপল দত্ত’র ইতিহাসবীক্ষা কিউবার বর্ণময়, আলো-উজ্জ্বল ভূমিকাই শুধু তুলে ধরেননি, সমকালীন বিশ্ব সংকটের পরিসরকেও ছুঁয়ে গেছে। ঐতিহ্য বিস্মৃত সোভিয়েত, পূর্ব ইউরোপ সমাজতন্ত্রকে ত্যাগ করেছে, চীন গা বাঁচিয়ে চলার নীতি নিয়ে বিশ্ব পরিস্থিতি থেকে নিজেকে অনেকখানি গুটিয়ে রেখেছে। কিউবা পথ প্রদর্শক। ‘ক্রুশবিদ্ধ কুবা’ ইতিহাসের এই সংকটে হতমান সমাজতন্ত্র ও বিশ্বমানবতাকে নিয়ে গেছে অনিঃশেষিত এক সত্যে- সমাজতন্ত্র অজেয়, সমাজতন্ত্র মৃত্যুহীন।

সোভিয়েত রাশিয়া ও রুমানিয়ার পতনে উৎপল দত্ত প্রতিবিপ্লবের গন্ধ পান। লেখেন ‘প্রতিবিপ্লব’ গ্রন্থ। লালদুর্গের পতনে সমাজ বদলের ডাক বিঘ্নিত হবে। এই আশংকার প্রেক্ষিতে তিনি লিখলেন ‘লালদুর্গ’ নাটক। ফরাসি বিপ্লবের ঐতিহ্যকে নাট্যকার বিশ শতকের সমাজ বদলের লড়াইয়ের প্রেরণা সৃষ্টিতে স্মরণ করেছেন।

এছাড়া রুশবিপ্লব ও বিপ্লবী লেনিনকে নিয়ে ‘লেনিনের ডাক’, সোভিয়েত মুক্তির সংগ্রাম নিয়ে ‘লেনিন কোথায়’, রুশ বিপ্লবে লেনিন ও স্তালিন বিষয়ে ‘স্তালিন ১৯৩৪’, জার্মানির ফ্যাসিস্ট অত্যাচার, ইহুদি নিধন নিয়ে ‘প্রফেসর ম্যামলক’, আমেরিকার বর্ণবিদ্বেষ নিয়ে ‘মানুষের অধিকার’, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামি সৈন্য ও জনগণের লড়াই নিয়ে ‘অজেয় ভিয়েতনাম’, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে জয়বাংলা ও ঠিকানা উৎপল দত্তের অন্যতম রাজনৈতিক নাটক।

নাট্য আঙ্গিকের গুরুত্বকে উৎপল দত্ত কখনও অবহেলা করেননি। সেটাও তাঁর রাজনীতিরই অঙ্গ ছিল; কেন না তিনি বুঝেছিলেন যে, নাটকের মর্মবস্তুকে দর্শকের কাছে ব্যাখ্যা করার ভাষা হচ্ছে নাট্য আঙ্গিক। তাঁর হাতে আর অন্য কোনো উপাদান নেই। বিষয়বস্তু থেকে আঙ্গিক পর্যন্ত সমস্ত খুঁটিনাটি উপাদানকেও মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা, এই ক্ষেত্রেই উৎপল দত্ত তাঁর ইতিহাসগত পূর্বসূরিদের থেকে স্বতন্ত্র এবং অনন্য।

উৎপল দত্ত স্টেজের কথা বা যাত্রার বৃহত্তর পরিসরের কথা ভেবে নাটক লিখেছেন। প্রতিমুহূর্তে মঞ্চসংস্থান, অভিনেতা-অভিনেত্রীর ক্ষমতা ও যোগ্যতার সীমা, দর্শকের প্রতিক্রিয়া অন্যান্য মঞ্চোপকরণের লভ্যতা- ইত্যাদি বিবেচনা করে নাটক লিখতে হয়েছে বলে তাঁর সংলাপ কদাচিৎ অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। তাঁর সিচুয়েশন, তাঁর নর-নারীদের আচরণ কদাচিৎ নাটকীয়তা-বর্জিত। এই নাটকীয়তা উৎপলদত্তের একটি ইতিবাচক গুণ। এই নাটকীয়তাকে বাস্তবের সঙ্গে সমীকরণ করে দেখা উচিত নয়, এ নাটকীয়তা নাট্যশিল্পের নিজস্ব দাবিতে গড়ে ওঠে। নাটকের সংলাপগুলি দর্শকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। কল্লোল’, ‘অঙ্গার’, তিতুমীর’ প্রভৃতি নাটকের যে সেট এবং মঞ্চ পরিকল্পনা দেখা যায় তা আমাদের সত্যিই অভিভূত করে।

নাট্যকার, অভিনেতা, পরিচালক উৎপল দত্ত আধুনিক এই কারণে যে তিনি বিশ্বের বিপ্লবী রাজনৈতিক থিয়ৈটারের স্মরণীয় প্রতিভাদের অনুসরণে বাংলা থিয়েটারে কি জীবনদর্শনে, কি নাট্যতত্ত্বে, মঞ্চায়নে, আঙ্গিক সৌকর্যে বুর্জোয়া ধ্যানধারণা অতিক্রম করতে চেয়েছেন। তিনি একদিকে বাংলা থিয়েটারের প্রতিটি ঐতিহ্য ভেঙেছেন, অন্যদিকে প্রতিটি ঐতিহ্য বিশ্বের বিপ্লবী রাজনৈতিক থিয়েটরি তত্ত্বের নিরীখে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়াসী হয়েছেন। তাঁকে বলা যায় বিশ শতকের শেষ পঞ্চাশ দশকের সবচেয়ে সফল, বৈচিত্র্যসন্ধানী নাট্যকার।

বাংলাদেশ সময়: ১৬৫২ ঘণ্টা, ২২ নভেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস, eic@banglanews24.com

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান