ঢাকা: রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের নয়া ফন্দি এঁটেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের আসন্ন উপনির্বাচন তাকে নয়া ফন্দি আঁটার এ মওকা এনে দিয়েছে।
এ নির্বাচনে এককভাবে লড়াইয়ের ঘোষণা দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মাথায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে মাঠে নামার আগেই মাঠ ছেড়ে দিলেন তিনি।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে দরকষাকষির সমান সুযোগ জিইয়ে রাখতেই ‘স্বৈরাচার’ তকমা কুড়োনো সাবেক এই রাষ্ট্রপতি নতুন এ নাটকের জন্ম দিয়েছেন বলে জোর আলোচনা চলছে দলীয় পরিমণ্ডলে।
বাংলানিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাপাসিয়ায় আলাদা প্রার্থী নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে লড়াইয়ে নামার ঘোষণা দেওয়ার মাত্র এক দিনের মাথায় ব্যাকগিয়ার দেওয়ার পরিকল্পনা আগেই নিয়ে রেখেছিলেন বহু বিতর্কের নায়ক এরশাদ। সোমবার তার মঞ্চায়ন সম্পন্ন করলেন মাত্র।
এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টি (জাপা) প্রধান একদিকে যেমন আওয়ামী লীগকে ‘কাপাসিয়া তোমাদের ছেড়ে দিলাম’ বলার ক্ষেত্র তৈরি করলেন, তেমনি ‘ পাতানো নির্বাচনে ওদের সঙ্গে যাই নি’ বলে বিরোধী শিবিরে নিজের দাম বাড়ানোর সুযোগটিও চাঙ্গা করে রাখলেন।
বস্তুত উভয় কূল রক্ষা করা এমন অবস্থান এরশাদকে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগই বাড়িয়ে দিয়েছে।
কোনো দলই এরশাদের ওপর খুব বেশি ভরসা করতে পারে না এমন একটি কথা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চালু থাকলেও সাবেক এই স্বৈরশাসকের ভোটব্যাংকে কিছু স্থায়ী জমা-খরচার হিসাব থাকায় সবসময়ই সেদিকে চোখ থাকে তার এক সময়ের ঘোর বিরোধী দুই প্রধান দলের।
দলীয় সূত্রমতে, এরই মধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন দলটির বিএনপিঘেঁষা ক’জন নেতা। বিএনপিকে তারা বলছেন- দেখো, আমরা গৃহপালিত বিরোধী দল হবো না। তোমাদের মতো আমরাও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনে বিশ্বাস করি। সময় ও সুযোগ মতো আমরা তোমাদের সঙ্গেই ভিড়বো।
অপরদিকে মহাজোট নেতা আওয়ামী লীগের সঙ্গেও সমানতালে যোগাযোগ রাখছেন আওয়ামী লীগপন্থি ক’জন নেতা। মহাজোট নেতার কাছে তাদের বক্তব্য, নির্বাচনে বিএনপি না এলে না আসুক। তোমরা এগিয়ে যাও। আমরাই বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবো। তবে এখনই নয়। রাজনীতির মাঠে আরও কিছুটা জল গড়াক। এখনই মহাজোট ছেড়ে মাঠে নামলে নির্বাচন ও আমাদের ভূমিকা নিয়ে জনমনে সংশয় দানা বাঁধতে পারে।
এরশাদের এক ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, নিজের রাজনৈতিক অতীত এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে কাটানো গত ক’বছরের অপ্রাপ্তি ও অতৃপ্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে লাভ-ক্ষতির চুলচেরা হিসেব কষছেন এরশাদ। বয়সটাও নেহায়েত কম হয়নি। হাতে সময়ও কম। তাই যা করার আগামী নির্বাচনেই করে ফেলতে চান রাজনীতিতে নিজেকে ‘অস্থির মানুষ’ হিসেবে পরিচিত করে তোলা এরশাদ।
এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া তার প্রথম পছন্দ নয়। বরং বড় কোনো দলের সঙ্গে থেকে জীবনে অন্তত আর একবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে চান তিনি। আর এ বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েই আগামী নির্বাচনী রাজনীতিতে নিজের ও দলের গতিপ্রকৃতি ঠিক করবেন এরশাদ। প্রয়োজনে আওয়ামী লীগের সঙ্গ ছেড়ে বিএনপির সঙ্গে নতুন করে গাঁটছড়া বাধাও তার পক্ষে বিচিত্র নয়।
তাই জীবন সায়াহ্নে এসে এখন আর কোনো সম্ভাবনাই সহজে ছাড়তে নারাজ এরশাদ কৌশলে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই সমানতালে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাইছেন।
এ কারণেই কাপাসিয়া উপনির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েও নাটক করে তা থেকে সরে গেছেন বছর খানেক ধরে একক নির্বাচনের আওয়াজ দিতে থাকা সাবেক এই রাষ্ট্রপতি।
দলীয় সূত্রমতে, গত রোববার জাপা প্রেসিডিয়াম কাপাসিয়া উপ-নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর সেই রাতেই এরশাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। কয়েক মিনিটের আলাপে তারা ঠিক কি নিয়ে কথা বলেছেন কোনো নেতা তা জানাতে না পারলেও পরদিন সোমবার নির্বাচন থেকে এরশাদ তার দলের সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তাই প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার আলাপচারিতায় এ প্রসঙ্গটা উঠে থাকতে পারে ।
অপরদিকে একই দিন রাতে বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ক’জন নেতা বিএনপির হাইকমান্ডের সঙ্গেও গোপন আলোচনা চালিয়েছেন বলেও স্বীকার করেছে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক দলীয় সূত্র।
তবে এরশাদের এমন দু’ নৌকায় পা রাখাটা শেষ পর্যন্ত তার জন্য কাল হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারই দলের একাধিক বর্ষীয়ান নেতা।
তাদের ধারণা, এ সরকারের মেয়াদ যতো শেষ হয়ে আসছে ততোই সামনে চলে আসছে এরশাদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করার দাবি। এজন্য তার সামনে সময় খুব বেশি নেই বলেও মনে করছেন কোনো কোনো নেতা।
যদিও জাপার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে নয়, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কাপাসিয়া উপ-নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে দলীয় সূত্র বলছে, এ উপ-নির্বাচনে জয়ের ছাড়পত্র পেলে ঠিকই শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতেন এরশাদ। আর অখ্যাত কোনো প্রার্থীর কাছে বঙ্গতাজ তনয়া সিমিন হোসেন রিমির মতো হেভিওয়েট প্রার্থীকে পরাজিত করিয়ে দলীয় সমর্থন ও জনপ্রিয়তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে চাইছে না খোদ আওয়ামী লীগও।
এরশাদও চাইছেন না জাতীয় পার্টির জন্য অপেক্ষাকৃত কম জনসমর্থনপুষ্ট কাপাসিয়ায় নির্বাচনী লড়াইয়ে কম ভোট পেয়ে জাতির সামনে খেলো হতে। তাই আপাতত ব্যাকগিয়ার। শিগগিরই ‘এরশাদ নাটকের’র নতুন অঙ্ক মঞ্চায়ন হবে বলে আভাস মিলছে দলীয় সূত্রে।
বাংলাদেশ সময়: ১৭৩৪ ঘণ্টা, আগস্ট ২৮, ২০১২
জেডএম/এমএমকে/সম্পাদনা:জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com