 |
| ছবি: নুর/ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
ঢাকা: সম্প্রতি সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে। গত এপ্রিলে ৩৯টি আবেদন থেকে বাছাই করে এসব ব্যাংকের অনুমোদন চূড়ান্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ।
নতুন ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা, অনুমোদন প্রক্রিয়া, সরকারদলীয় ব্যক্তিদের ব্যাংক করার অনুমতি এসব নিয়ে বিতর্ক শুরু থেকেই। এত বিতর্ক মাথায় নিয়ে নতুন ব্যাংকগুলো কি টিকে থাকতে পারবে? এসব বিষয় নিয়্ কথা বলতে বাংলানিউজের মুখোমুখি হন প্রস্তাবিত মেঘনা ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাংসদ এইচএন আশিকুর রহমান। সঙ্গে ছিলেন আরেক পরিচালক সেলিম আলী খান।
এইচএন আশিকুর রহমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। রংপুর-৫ আসন থেকে নির্বাচিত। গত রোববার রাজধানীর বনানীতে তার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে বাংলানিউজের সিনিয়র ইকোনমিক করেসপন্ডেন্ট সাইদ আরমানের সঙ্গে তিনি প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে বিস্তারিত কথা বলেছেন। মেঘনা ব্যাংকের বাইরে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবন নিয়েও কথা বলেছেন তিনি।
বাংলানিউজ: মেঘনা ব্যাংকের জন্য লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) পেয়েছেন গত এপ্রিলে। চূড়ান্ত লাইসেন্স পেতে অক্টোবরের মধ্যে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা জমা দিতে হবে। প্রস্তুতি কী রকম?
আশিকুর রহমান: মোটামুটি প্রস্তুত। আশা করছি, যথাসময়েই ব্যবসায়িক পরিকল্পনা জমা দিতে পারব। পরিচালনা পর্ষদে কাদের নিয়ে কাজ করব তা ঠিক করছি। ব্যবস্থাপনার শীর্ষ পদগুলোতে নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাই নির্ধারিত সময়ে প্রস্তাব জমা দিতে কোনো সমস্যা হবার কথা নয়।
বাংলানিউজ: পরিচালনা পর্ষদের কথা বললেন, এটি ব্যাংক পরিচালনায় জরুরি। কাদের সঙ্গে রাখছেন?
আশিকুর রহমান: পরিচালনা পর্ষদ এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। যোগ্য ও সৎ লোকদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চাই। তবে এক কথায় বলতে চাই, যারা থাকবে তাদের উন্নত বাংলাদেশে গড়ার স্বপ্ন দেখতে হবে। বৈধ টাকা ব্যাংকে বিনিয়োগ করতে হবে
বাংলানিউজ: রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন আছে। সাধারণ আমানতকারীরা আস্থা পাবে বলে মনে করেন কীভাবে?
আশিকুর রহমান: নতুন ব্যাংক খোলার বিষয়টি রাজনৈতিক। দেশে যেকোনো বড় উদ্যোগে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লাগে। এ ব্যাপারেও তাই। তবে যারা আবেদন করে নতুন ব্যাংকের এলওআই পেয়েছেন তাদের ব্যাপারে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো অন্যায় অথবা আইনের ব্যত্যয় হয়নি। তাই রাজনৈতিক বিবেচনাতে নতুন ব্যাংক এসেছে তা বলা যাবে না। তবে হয়তো আবেদনকারীদের মধ্যে আরো অনেকে ব্যাংক পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু সবাই তো আর পাবেন না। এতো ব্যাংক তো করতে দেবেও না সরকার। আর সেবা দিয়েই আমরা মানুষের আস্থা অজর্ন করতে চাই।
বাংলানিউজ: ব্যাংক পরিচালনা নীতি সম্পর্কে কিছু বলবেন? আজকাল ব্যাংকগুলো অনৈতিক চর্চায় জড়িয়ে পড়েছে।
আশিকুর রহমান: আমরা দেশের বঞ্চিত মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসতে চাই। তাই করপোরেট অফিস করব রংপুরে। উত্তরবঙ্গের মানুষকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে চাই। তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করতে চাই। যারা সৃষ্টিশীল কর্ম নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়, তাদের পাশে থাকব। আরেকটা বিষয়। আমরা তথ্য প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব। পশ্চিমা বিশ্বের ব্যাংকের আদলে চলতে চাই। আমরা অভ্যন্তরীণ গবেষণায় দেখেছি, তাদের সেবার মানের চেয়ে আমরা ২০ থেকে ২৫ বছর পিছিয়ে আছি।
বাংলানিউজ: করপোরেট অফিস রংপুরে করবেন কী কারণে? একটু বিস্তারিত বলবেন প্লিজ।
আশিকুর রহমান: আমরা এখানে দুটি পদ্ধতি রাখব। একটি করপোরেট অফিস, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে গুরুত্ব দেবে। রংপুরে হবে এর প্রধান অফিস। আর ঢাকায় হবে করপোরেট হেড কোয়ার্টার। কারণ নির্বাহী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাজের জন্য ঢাকায় থাকতে হবে। প্রতিযোগিতা করতে এখানে থাকতে হবে।
বাংলানিউজ: বর্তমানে ৪৭টি ব্যাংক রয়েছে। আরো নয়টি নতুন ব্যাংক আসছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কৌশল কী হবে আপনাদের?
আশিকুর রহমান: ভালো প্রশ্ন করেছেন। প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকব। টিকে থাকব নতুন নতুন পণ্য, সেবা ও মান দিয়ে। তাই তো আমাদের স্লোগান, “উই সেইল টুগেদার।” গ্রাহকের পাশে থাকব, অংশীদার হয়ে কাজ করব। প্রতিযোগিতা করেই এগিয়ে যেতে হবে। আমরা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিদের নিয়ে তাদের ব্যাংকিং সেবা দিয়ে যাব। ব্যাংক শুধু ব্যবসা করার জন্য নয়। দেশের মানুষের কল্যাণে ও উপকারে কাজ করব। প্রকৃত সহযোগী হতে হবে সাধারণের মানুষের। মহাজনী আচরণ নয়, মানুষকে উদ্দীপ্ত করতে হবে। তাদের টেনে তুলতে হবে।
বাংলানিউজ: বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি নিয়ে কিছু বলেন।
আশিকুর রহমান: বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মূল ব্যাংকিং থেকে সরে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি আরো জোরদার করতে হবে, আরো সর্তক ও কঠোর হতে হবে।
বাংলানিউজ: ব্যাংকের একটি শাখা শহরে ও আরেকটি গ্রামে থাকতে হবে এবং নিজেদের নামে সম্পদ কেনা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে কীভাবে দেখেন?
আশিকুর রহমান: অবশ্যই স্বাগত জানাই। আমরা নিজ থেকেই গ্রামের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবো। যারা ব্যাংকিং সেবার বাইরে তাদের নিয়ে কাজ কবর। আর সম্পদ কেনার যে বিষয়টি আপনি বললেন, তাতেও রাজি। সম্প্রতি ব্যাংকগুলো অন্যায়ভাবে সম্পদ করতে চাচ্ছিল। এর ফলে এই অন্যায় বন্ধ হবে।
বাংলানিউজ: প্রাইমারি ডিলার না হয়েও সরকারকে ঋণ দিতে হবে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?
আশিকুর রহমান: নতুন ব্যাংকগুলোকে এই শর্ত থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। আমরা গ্রাহকদের আমানত নেবো। শুরুতেই এটি কষ্টের হবে। সাধারণ মানুষের জন্য বিনিয়োগ করার সুযোগ দিতে হবে।
বাংলানিউজ: আপনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু বলুন?
আশিকুর রহমান: এক কথায় বলব, সাদামাটা জীবন। জন্মেছি, মরে যাবো। তবে তার আগে কিছু করে যাবো। স্ত্রী রেহানা আশিক, দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সংসার আমার। বড় ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকে। আর ছোট ছেলে দেশে ব্যবসা করছে। একমাত্র মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করছে।
আশিকুর রহমানের সংক্ষিপ্ত জীবন
জন্ম ১৯৪১ সালে রংপুরে। বেড়ে উঠেছেন যশোরে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। কারমাইকেল কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে পেশাজীবন শুরু। পরে যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে। নেদারল্যান্ডস থেকে স্যোসাল স্টাডিজে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা অর্জন করেন। এক পর্যায়ে ১৯৬৪ সালে সিএসএস পরীক্ষা দিয়ে যোগ দেন সরকারি চাকরিতে। দায়িত্ব পালন করেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হিসেবে। পরে ১৯৭৯ সালে স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন।
বাংলাদেশ সময়: ১৪৪৫ ঘণ্টা, আগস্ট ১৪, ২০১২
এসএআর/সম্পাদনা: রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com