৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, রবিবার মে ১৯, ২০১৩ ৮:৫৩ এএম BDST banglanew24
13 Oct 2012   05:40:32 PM   Saturday BdST
E-mail this

আহমদ জসিম-এর গল্প

ত্রি-চক্রযান


আহমদ জসিম
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ত্রি-চক্রযান আহমদ জসিম-এর গল্প

অস্থিরতার ষোলকলা পূর্ণ করে জামশেদ চৌধুরী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সেই কাকডাকা ভোরে। অথচ ঢাকাগামী আন্তঃনগরট্রেন ছাড়বে সকাল সাড়ে সাতটায়। ভোর পাঁচটা থেকেই ব্রাশ কই, পেস্ট কই, টাওয়েল কই করতে করতে পুরো ঘরটাই মাথায় তুলেছে। অথচ ঘর থেকে স্টেশন বড়জোড় আধঘণ্টার পথ। গাড়ির ত্রুটি সারাতে গ্যারেজে দেওয়া হয়েছে। পাঁচ-ছয় দিনের আগে পাওয়া যাবে না, রিকশা করেই তাকে স্টেশনে যেতে হবে- এটাই  অস্থিরতার কারণ। ব্যাপারটা মোটেও এইরকম নয়, বরং অস্থিরতা তার স্বভাবেরই অংশ।
 
জামশেদ চৌধুরী ঘর থেকে বেরুবার পর স্ত্রী-কন্যা মোটামুটি স্বস্তিতে! একই সাথে তারা নিশ্চিত, এ-অস্থিরতা চলবে অনবরত। ‘রিকশা পাচ্ছিনা কেন? (রিকশা পেলে) আস্তে চলছে কেন? (ষ্টেশন পৌঁছালে) ট্রেন আসছেনা কেন?’ ইত্যাদি-ইত্যাদি। তাদের শঙ্কার আরেকটা কারণ, সাধারণত মোড়ে এতো সাতসকালে যানবাহন পাওয়া যায় না, এর অর্থ দাঁড়ায়, জামশেদ চৌধুরী বাড়ি ফিরে আরেকটা হুলুস্থূল কাণ্ড বাধাবে!

না, তাদের এই শঙ্কা মিথ্যে হলো, মোড়ে রিকশা পাওয়া গেল। একটা মাত্র রিকশা মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। পৌষের ঘন কুয়াশাভরা সকাল। রিকশা চালক প্রায় অদৃশ্য। জামশেদ চৌধুরী রিকশাটার কাছে এসে আবিষ্কার করলো, ষাটের কাছাকাছি বয়সের রিকশা চালক, মুখে ধবধবে সাদা দাড়ি, পরনে ময়লা নীলকোট ও ছেঁড়া লুঙ্গি। জামশেদ চৌধুরী রিকশা চালককে দেখেই বুঝতে পারলো- বয়স হলেও বেটার শরীরে এখনো যথেষ্ট শক্তিসামর্থ্য! চালক পেসেঞ্জারসিটে বসে ড্রাইবারসিটে পা তুলে একেবারে নবাবি হালে আধশোয়া হয়ে আছে।
 
চৌধুরী কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই চালক লাফিয়ে উঠে,  ‘আহেন স্যার, আহেন আপনারেইতো খুঁজতাছি।’ চালকের এই রহস্যময় কথায় চৌধুরী বিরক্ত হয়ে, ‘আমাকে খুঁজছো! এ- কথার অর্থ কী?’ চালক এবার একগাল হাসি দিয়ে, ‘না, মানে স্যার আপনে হইলেন গিয়া পেসেঞ্জার আর আমি হইলাম ড্রাইবার আমি আপনারে না খুঁজি খুঁজুম কারে?’ চৌধুরী বললো, ‘ও আচ্ছা’। চালক এবার দ্রুত রিকশা থেকে নেমে, ‘আহেন স্যার আপনারে স্টেশনে পৌঁছায়াদি’। আবারও সে ধাঁধা! চৌধুরী সাহেব রিকশায় উঠতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আরে আমি স্টেশনে যাবো এটা তুমি বুঝলে কী করে?’ চালক বললো, ‘আরে স্যার এত বিয়ানে ব্যাগ নিয়া কেউ অফিসে যায় না, যায় হইলো স্টেশনে।’ চালকের উত্তরটা সন্তোষজনক হলেও এমন রহস্যময় কথাবার্তা চৌধুরী সাহেবের মোটেও ভালো লাগছে না। তবু রিকশাতে উঠতে হলো, এ-ছাড়া অন্যকোনো উপায় নেই। চৌধুরী সাহেব চারদিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখল, এই একটা মাত্র রিকশা ছাড়া মোড়ে অন্য কোনো যানবাহনের অস্তিত্ব নেই।

মনে-মনে জামশেদ চৌধুরী নিজের গাড়িটার উপর রুষ্ট হলো, দু’দিন পর নষ্ট হলে এমন কী মহাভারত অশুদ্ধ হত? জামশেদ চৌধুরী আল্লাহ্র নাম নিয়ে রিকশায় উঠে বসার আগে, ‘কি মিয়া, তুমিতো বুড়া মানুষ সময় মতো পৌঁছাতে পারবাতো?’ চালক আগের মতোই সেই রহস্যময় ভাষায়, ‘যদি যাওনের আগে না মরি ঠেকায় কেডা!’ চৌধুরী এবার একেবারে গর্জন করে, ‘আরে মিয়া, রিকশা চালাও, কথা বলো বুদ্ধিজীবীর মতো, রাজনীতি-টাজনীতি করো নাকি?’ চালক হো হো করে হেসে, ‘স্যার ধরেন গিয়া হায়াত-মওত হইলো গিয়া আল্লার হাতে - আমি আপনারে কেমনে নিশ্চয়তা দিই যে স্টেশনে যাওনের আগে আমাগো মরণ হইবো না।’ কথা সত্য, তবুও জামশেদ চৌধুরীর যাত্রাপথে মৃত্যুর কথা শুনতে মোটেও ভালো লাগলো না, তাও আবার একজন রিকশা চালকের মুখে। চৌধুরী এ-কথার কোনো জবাব না দিয়ে একেবারে চুপ করে বসে আছে। চালক বেশ কিছু সময় নীরবে রিকশা চালানোর পর এবার পিছন ফিরে জামশেদ চৌধুরী দিকে তাকিয়ে, ‘স্যার, মনে করেন জোয়ান পোলার যে পথ যাইতে আধঘণ্টা লাগবো হে পথ আমার যাইতে বড়জোর একঘণ্টা লাগবো; তাও গিয়া দেখবেন আপনেই হইলেন গিয়া ট্রেনের পয়লা যাত্রী।’ জামশেদ চৌধুরী এ-কথারও কোনো জবাব দিলো না।

এখনো সকালের কুয়াশাগুলো কাঠকয়লার ধোঁয়ার মতো চারদিকে অন্ধকার করে রেখেছে। জামশেদ চৌধুরীর কাছে কেমন অস্থির- অস্থির লাগছে। বেশকিছু সময় নীরব থাকার পর চালক হঠাৎ করেই বলে উঠলো, ‘স্যার দেশের অবস্তা কেমন বুঝতাছেন? হাঁচাই কি রাজাকারগো বিচার-টিচার কিছু হইবো? নাহি আমাগো সামনে বিচারের নামে মূলা ঝুলায়া রাখবো, হুনছি গাধার সামনে নাহি মূলা ঝুলায়া রাখে আর গাধা মূলার লোভে সামনে দৌঁড়ায়, আমাগোরেও গাধার মতোন...’ এমনেতে জামশেদ চৌধুরীর মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে, তার উপর চালকের কথা শুনে ধমক দিয়ে বললো, ‘আরে রাখো মিয়া তোমার রাজাকারের বিচার -  চালাও রিকশা, কথা বলো বুদ্ধিজীবীর মতো, একেই বলে আদার ব্যাপারির জাহাজের খবর।’ চৌধুরীর কথা শুনে চালক এবার বত্রিশপাটি দাঁত বের করে কিছুক্ষণ হি হি করে হাসলো, তারপর শান্ত কণ্ঠে বললো, ‘জাহাজের খবর তো আদার ব্যাপারিরই নেওনের কথা আমি যদ্দুর জানি আদা বিদেশ থেইকা জাহাজে করি আমাগো দেশে আহে, তই জাহাজের খবর যদি লওন লাগে হেডা তো আদা ব্যাপারিরই নেওনের কাম - নাকি মিছা কইলাম স্যার?’ চালকের কথা শুনে চৌধুরী একেবারে লা-জবাব!

অনেক্ষণ নীরবে ভাবনার পর জামশেদ চৌধুরী রিকশা চালককে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘তুমি কি সত্যি রিকশা চালক নাকি চরমপন্থি? একজন রিকশা চালকের পক্ষে তো এ-ভাবে বুদ্ধিজীবীর মতো কথা বলা সম্ভব না।’ চালক এ- কথার কোনো জবাব দিচ্ছে না দেখে চৌধুরী আবারও বললো, ‘কী কোনো জবাব দিচ্ছো না যে?’ চালক এ-কথার কোনো জবাব না দিয়ে বললো, ‘স্যার আমাগো কথা তো সরকারের কানে যাওনের আগেই বাতাসে মিলায়া যায় তাই সিদান্ত নিছি যা করনের নিজেই করুম।’ চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে, ‘ঠিক বুঝতে পারলাম না, কী করতে চাচ্ছো তুমি?’ সময় হইলেই টের পাইবেন! কথাটা বলেই চালক হো হো করে রহস্যময় অট্টহাসি হাসতে লাগলো। চৌধুরী চালকের হাসি দেখে রাগে দাঁত কিলবিল করে গর্জন করে বলে উঠলো, ‘হাসি বন্ধ করো, বেটা দাঁত মাজে না কতোদিন, মুখ থেকে গন্ধ বেরুচ্ছে!’  চালক এবার বিড়-বিড় করে বলছে, ‘মুখের গন্ধ তা সারা যায়। পঁচা রক্তের গন্ধ- ও কী জঘন্য!’

আবারও দু’জন দীর্ঘক্ষণ নীরব, এ- নীরবতার মধ্যেই রিকশাটা সরু গলি পথ ফেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রাঙ্করোডে ঢুকে পড়ল। তবে ট্রাঙ্করোড তখনো পাড়ার গলি পথের মতোই নিঃস্তব্ধ। কুয়াশার চাদরে-ঢাকা সড়কের এখনো অতি নিকট বস্তুও ঝাঁপসা। মাঝে-মাঝে বিকট শব্দে দু’একটা ট্রাক-বাস দ্রুত গতিতে ছুটে যাচ্ছে। রিকশাটা চৌধুরীকে নিয়ে অতি ধীরে-ধীরে, স্টেশনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ-ভাবে কিছু সময়ের নীরবতা ভেঙে চালক বলে উঠলো, ‘স্যার আমার মনে লয় বিচার-টিচার... আসলে করবো না, হাঁচাই যদি বিচার করে তাইলেতো আগামি নির্বাচনে মানুষরে ধোঁকা দেওনের একটা ইস্যু হারাইবো; ধরেন হুজুর কিছু ভিখারি থাহে না যারা ঘা ঔষধ দিয়া ভালা করে না, মানুষরে দেহায়া ভিক্ষা করে, রাজাকারের বিচার হইলো গিয়া... এ-রহম একটা ঘা, সামনে ভোটে আবারও গলা ফাঁটায়া কইবো, ভাইজান আমরা শুরু করছি, শেষ করবার পারি নাই; এবার শেষ করনের সুযোগ দেন।’ চৌধুরী এবার শান্ত কণ্ঠেই বললে, ‘আমি বুঝে গেছি তুমি কোনো সাধারণ রিকশা চালক না, কোন আন্ডার গ্রাউন্ড পার্টি-টার্টি করো - আমি নিশ্চয় তোমার শ্রেণিশত্রুদের কেউ না, এবার নিশ্চিত মনে বাকি পথ তোমার সাথে আলাপ করেই যেতে পারি - তুমি ঠিকই বলেছ, মুজিব হত্যার বিচার করে... আগামি ইলেকশনের জন্য একটা ইস্যু হারালো, পিতার বিচারের কথা বলে তাদের আর কান্নার সুযোগ রইলো না।’ চালক বললো, ‘তয় হুজুর আপনে যাই কন, মুজিব যদি খুন না হয়ে বাত অসুখে মরতো তাইলে তাগো আজকের এ-অবস্থা থাকতো না।’ চৌধুরী এবার আলাপের প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে জিজ্ঞাস করলো, ‘আচ্ছা,  বলতো তুমি আসলে কোন দল করো?’
‘প্রতিশোধ পার্টি।’

চৌধুরী ভ্রু কুচকে, ‘প্রতিশোধ পার্টি? এ- নামে কোনো দল আছে বলে তো আগে কখনো শুনি নাই - অবশ্য থকলেও থাকতে পারে। একটা খবরের কাগজে পড়েছিলাম, বাংলাদেশে নাকি তিনশোটা রাজনৈতিক দল আছে, আমি নিজেইবা কয়টা দলের নাম জানি। তো, তোমাদের নেতার নাম কি জানতে পারি?’ চালক কিছুক্ষণ মনে-মনে বিড়-বিড় করে, ‘আমাগো নেতার নাম হইলো ‘না ভুলা স্মৃতি’। চৌধুরী বললে, ‘বাহ্! বেশ ইন্টারেসটিং নাম তো, নিশ্চয় ছদ্মনাম হবে, কেনো বলছি; আমার মনে হয় না কোন মা-বাবা সন্তানের এমন উদ্ভট নাম রাখে।’ চালক এ-কথার কোনো জবাব দিচ্ছে না দেখে চৌধুরী চালককে উদ্দেশ্য বললো ‘তোমার কী মনে হয়?’
‘স্যার নেতার কথা আর কী কমু আমার দেশের হগলেরেই তো দেহি এক অবস্থা, আসলে পাজি সাজে হাজি, আছিল রাজাকার, স্বাধীনের পরে হইলো গিয়া মুক্তিযুদ্ধা!’ চালকের কথা শুনে চৌধুরী এবার গর্জন করে বলে উঠল, ‘আরে মিয়া তুমি সেই কবে থেকে মুক্তিযুদ্ধ-মুক্তিযুদ্ধ করছো, মুক্তিযুদ্ধ হইছে সেই চল্লিশ বছর আগে, এখন এসব পুরোনো কাসুন্দি ঘেটে লাভ আছে? দেশ কেমনে উন্নত হবে সে কথা ভাবো।’

‘স্যার, কেয়ামত কবে হইবো কইতে পারেন?’
‘আরে মিয়া বেকুবের মতো কথা বলো কেনো? কেয়ামত কবে হবে সেটা একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া কেউ বলতে পারে না, আমি কি করে বলবো!’
‘কতো হাজার বছর পরে কেয়ামত হইবো, কতো কোটি বছর আগে থেইকা মানুষের জন্ম হইছে- হগলের বিচার যদি এক লগে হইতে পারে তাইলে মাত্র চল্লিশ বছর আগের বিচার অহন হইতে পারব না কেন?’

চৌধুরী সাহেব এ-কথার উত্তর দেওয়ার জন্য কোনো ভাষাই খুঁজে পাচ্ছে না! তাই চুপ করে একবার আকাশের দিখে তাকালো। পথ এখনো বেশ খানিকটা বাকি, তবে আকাশ অনেকটা ফর্সা হয়ে গেছে। ভোরের কাকগুলো বিদ্যুতের তারের উপর বসে কর্কশ কণ্ঠে ডেকে যাচ্ছে। ট্রাক-বাসগুলো আগের মতোই দ্রুত বেগে ছুটে যাচ্ছে, অল্প যে ক’জন মানুষ সড়কে দেখা যাচ্ছে, তারা সকলেই আদপে প্রাত ভ্রমণে বেরিয়েছে; ঢাকায় না গেলে চৌধুরীও এদের এক জন হতো - এ নীরবতায় দীর্ঘ সময় অতিক্রম হবার পর চৌধুরী সাহেব বললো, ‘আচ্ছা তুমি যে যুদ্ধ-যুদ্ধ করছো সত্যিই যদি যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়, এতে তোমার লাভ কী?’
চালক এবার ভারীকণ্ঠে বললো, ‘ওই যে কইলাম আমরা প্রতিশোধ পার্টি।’

চৌধুরী ভ্রু কুচকে, ‘প্রতিশোধ! তোমার আবার কিসের প্রতিশোধ?’ চালক এবার থরথর করে কাঁপতে-কাঁপতে, বুড়া মায়ের প্রতিশোধ, সোজা-সরল বাপের প্রতিশোধ, পোয়াতি বোইনের প্রতিশোধ। চল্লিশ বছর ধরি বুকের মধ্যে জ্বলতাছে এই প্রতিশোধের আগুন। আমি রাজনীতি বুঝি না হুজুর, আমি বুঝি খালি প্রতিশোধ, সংগ্রামে যারা পাকিস্তান রক্ষার পক্ষে আছিল হেগো প্রতি আমার কোন ক্ষোভ নাই - আমি যেমনে স্বাধীনতা চাইছি, হেরাও পাকিস্তান চাইতে পারে; আমার প্রতিশোধ হইলো স্বাধীনের সময় যারা মাথায় জিন্না টুপি দিয়া মানুষ খুন করছে, দেশ স্বাধীন হওনের লগে-লগে জিন্নাটুপি ফেইলা গায়ে মুজিব কোট চাপাইছে। কথাগুলো বলতে-বলতে চালকের শরীরে ভয়ানক কাঁপন শুরু হয়েছে। একই সাথে বেড়ে গেছে রিকশার গতিও- টালমাটালভাবেই রিকশা দ্রুত বেগে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

চালকের হঠাৎ উদ্ভট কাণ্ড দেখে চৌধুরী কেমন বিমূঢ় হয়ে গেছে! কি করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। কিছু সময় নীরবে অতিবাহিত করার পর মায়ামাখানো কণ্ঠে চালককে জিজ্ঞেস করল, সংগ্রামের সময় তোমার বোন মারা গেছে বুঝি? চালক আবারও সেই দম ফাটানো অট্টহাসি বেশ কিছু সময় ধরে হাসার পর হাসি থামিয়ে বললে, ‘হুজুর পোলা বিয়া করাইছেন আওয়ামলীগের নেতার মাইয়্যা, আর মাইয়্যাটারে বিয়া দিছেন জামাত নেতার পোলার কাছে; আমার বিচার আমি না করলে আপনার বিচার করবো কেডা কন?’ চালকের কথা শুনে চৌধুরী সাহেবের মাথায় যেন বাজ পড়লো। কান গরম হয়ে উঠছে, কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমে গেছে; গলা কেমন শুকিয়ে গেছে। শুকনো গলায় চৌধুরী বললো, ‘আমার বিচার তুমি করবা এ-কথার মানে! আমি আবার কী অপরাধ করলাম?’
‘স্যার এতো তাড়াতাড়ি হগল কথা ভুল্যা গেছেন? আমিতো অহনো কিছুই ভুলবার পারিনাই! চোখ বুঝলেই হগল কিছুই চোখের সামনে ভাইস্যা উঠে- আমার বাপ সমির পাগলা হে তো হিন্দুস্থান-পাকিস্থান কিছুই বুঝতোনা, হে বুঝত খালি পেটভরি খাওন আর চোখভরি ঘুমান; কী অপরাধ আছিল আমার বুড়া মা’র? এমন দিনেমাইস্যা পোয়াতি বোইনটারে নষ্ট করনের আগে কী আপনার একবারও মনে হইলো না এমন এক নারীর গর্ভে আপনেও আছিলেন? তাও যদি না মারি জীবনটা রাখতেন তাইলে দুনিয়াতে আমার একটা ঠিকানা থাকতো, ভুল করছেন হুজুর ভুল করছেন- আমারে বাঁচায় রাইক্যা বড়ই ভুল করছেন।

চৌধুরী বিস্ময়-মাখানো কণ্ঠে, ‘তুমি এ-সব কী বলছ?’
‘হুজুর কী হাঁচাই ভুইল্যা গেছেন, না কি ভুইল্যা যাওনের ভান করতাছেন? অবশ্যই ভুইল্যা যাওনেরেই কথা, জিন্না টুপি থুইয়া হেই যে গ্রাম থেইকা ভাইগা আইলেন আর তো কোনোদিনও গেলেন না। হুনছিলাম শহরে আইয়া শরীরে মুজিব কোট চাপাইছেন, যহনই খবর নি, হুনি একবার জয় বাংলা একবার জিন্দাবাদের দলে আছেন। সাপের মতো খালি চামড়া বদলাইতেছেন! চালকের কথা শুনে চৌধুরী চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে ভেসে উঠলো চল্লিশ বছরের ফেলে-আসা সেই পুরানো স্মৃতি, সকরুণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা তোমার গ্রামের বাড়ি কোথায়? চালক একফালি হাসি দিয়ে, ‘হুজুর হে দিন শালা কইছিলেন আইজ বাবা কইতাছেন! থাওক হে কথা, আমার গ্রাম আপনার গ্রাম এক গ্রাম, আমি মুন্সিবাড়ি আর আপনে হইলেন চৌধুরী বাড়ি, মাহামুদপুর গ্রাম, মেলানদহ থানা, মনে পড়তাছে?
‘হ, মনে পড়ছে, কিন্তু তুমি এভাবে রিকশা চালাচ্ছ কেন? সামনে যে ট্রাক আসছে। রিকশা থামাও!’
‘চল্লিশ বছর পর আপনারে পাইছি মরনের আগে জীবন থাকতে এ রিকশা থামব না!’

দু’জনের কথোপকথনের মধ্যেই একটা ট্রাক দ্রুত গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে।  ট্রাকটা যতোই সামনের দিকে ছুটে আসছে রিকশার গতিটাও সমান তালে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চৌধুরীর থামাও থামাও চিৎকারও! কিন্তু এ-চলা যে থামার নয়! এক সময় বিকট শব্দ করে ট্রাকটা দ্রুত বেগে চলে গেল, কাকগুলো বিকট শব্দ শুনে উড়াল দিয়ে কা কা শব্দ করতে-করতে আকাশে চক্কর দিতে  শুরু করলো। রাস্তায় অল্প যে ক’জন পথচারী ছিলো তারা ছুটে এসে দেখলো, থেতলানো দু’টি লাশ। লুঙ্গি ও ময়লা কোটপরা রিকশা চালকের লাশটা রাস্তায় চিৎ হয়ে শুয়ে যেন মিটমিট করে হাসছে। আত্মতৃপ্তির হাসি!

বাংলাদেশ সময়: ১৭৩৯ ঘণ্টা, ১৩ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস mjferdous0@gmail.com

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান