৫ আষাঢ় ১৪২০, বুধবার জুন ১৯, ২০১৩ ৮:২৬ পিএম BDST banglanew24
12 Oct 2012   01:06:04 PM   Friday BdST
E-mail this

মরিলে কান্দিস না ও হুমায়ূন


শাকুর মজিদ
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
মরিলে কান্দিস না ও হুমায়ূন

২০০৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। ঢাকা থেকে সিলেট যাচ্ছি। সিলেটের জন্য নতুন হাইওয়ে হয়েছে। সুন্দর সুন্দর বাস যায়। বাসে নাটক দেখায়। দুইটা নাটক দেখতে দেখতে সিলেট পৌঁছানো যায়। অনেক মজা। গাড়ি ছুটছে দ্রুত বেগে। গাড়িতে নাটক দেখানো হচ্ছে, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’। এই নাটকের নাট্যকর কে, তা বলার প্রয়োজন থাকে না। এরই মধ্যে কতকগুলো মুখ হুমায়ূন আহমেদের জন্য ব্রান্ডেড হয়ে গেছে। ডা. এজাজ, ফারুক আহমেদ, মাজনুন মিজান, স্বাধীন খসরু, চ্যালেঞ্জার, মুনিরা মিঠু, কমল, এদের দেখলেই সবাই চিনে ফেলে নাটকের নাট্যকার কে। আর এ নাটকটিও তারকায় ভরপুর। জাহিদ হাসান, রিয়াজ আর মাহফুজ আছে এখানে। সবগুলো চরিত্রই খুব মজার। যাত্রীরা আগ্রহ নিয়ে দেখছে মন্ত্রী মহোদয়ের [চ্যালেঞ্জার] আগমনে তার দুই পিএস রিয়াজ আর মাহফুজ কেমন করে মন্ত্রীর তাবেদারি করছে। এই গ্রামের এক পাগল যুবক [জাহিদ হাসান] একসময় ঠাশ করে চড় বসিয়ে দেয় মন্ত্রীর পিএস রিয়াজের গালে, সাথে সাথে তার দাঁত পড়ে যায় একটা। পিএস-এর দাঁত ফেলে দেওয়ায় যাত্রীরা খুব খুশি। ঠিক তখনই আমার মোবাইলে ফোন করে রনি।

আনোয়ার হোসেন রনি সিলেটের নাট্যকর্মী। কথাকলি থিয়েটারে নাটক করে। একসময় সিলেট বেতারে আমার লেখা কিছু নাটক প্রচার হয়েছিল। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছে রনি। আমার সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। বছর কয়েক ধরে আমি সুনামগঞ্জের বাউল করিমকে নিয়ে কাজ শুরু করেছি, তাঁর বাড়িতে যাই, সিলেটের বাউল উৎসবের ভিডিও করি। সিলেটের লোকসঙ্গীতের সমজদার হিসাবে আমাকে কেউ কেউ ভাবতে শুরু করে এবং ঠিক এই কারণেই রনি আমাকে অনুরোধ জানায় যে, তার বাবা গিয়াসউদ্দিন আহমদের একটা স্মরণসভা হবে সিলেট অডিটোরিয়ামে, সেখানে ঢাকা থেকে কয়েকজন শিল্পী আসবেন এবং প্রথম অতিথি হিসেবে হুমায়ূন আহমেদও আসার কথা, আমি যেন আসি এবং তার বাবা ও তার সেই গানটি সম্পর্কে কিছু বলি।

আমি এক বাক্যে রাজি হয়ে যাই। স্মরণসভা উপলক্ষ্যে যে স্যুভেনিরাটি ছাপা হবে, তার বাধাইহীন একটি কপি এবং গিয়াসউদ্দিন সাহেবের ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’ গানেই বইটি পাঠিয়ে দেয়। আমি ভয়ে ভয়ে প্রস্তুত হই এবং ১৫ সেপ্টেম্বর ভোর ৭টার গাড়িতে রওয়ানা দেই সিলেটের পথে। বেলা সাড়ে বারোটায় আমার পৌঁছার কথা, বিকেলে অনুষ্ঠান। আমার প্রধান লক্ষ্য, ঐ একই অনুষ্ঠানে হুমায়ূন আহমেদও থাকবেন। সিলেটের এই গীতিকবিকে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ কেমন মুগ্ধতা প্রকাশ করেন তা আমার জানার খুব ইচ্ছা।

হুমায়ূন আহমেদের ছোটবেলা কেটেছে সিলেটে। তাঁর বাবা ছিলেন গানপাগল মানুষ। একবার বেতনের ৮০ টাকা থেকে ৭০ টাকা দিয়ে একটা সেতার কিনে এনেছিলেন পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝির দিকে, সেই সেতারটি তিনি কখনো বাজান নি--এসব কথা হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিকথায় পড়েছি।
Humayun
সিলেট অঞ্চলের বাউল যেমন সৈয়দ শাহনুর, রাধারমন, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম প্রমুখের লেখা গান তাঁর বহু নাটকে-সিনেমায় এসেছে। কিন্তু গিয়াউদ্দিন সাহেবের এই গানটি কী করে তাঁর মনে ধরলো আমি তখনো জানি না।

আমি ফোন ধরি এবং নাটকে দর্শক-শ্রোতা-যাত্রীদের খানিকটা বিরক্ত করেই রনিকে বলি, আমি কোথায় উঠব?

রনি বলে, সুবিদবাজারে রেইনবো নামে একটা গেস্ট হাউজে আপনাদের জন্য থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। ঢাকার গেস্টরাও এসে গেছেন। অনুষ্ঠান বিকেল চারটায়।

আমি বলি, হুমায়ূন আহমেদ এসেছেন?

রনি বলে, হ্যাঁ।
এই ‘হুমায়ূন আহমেদ’ নাম উচ্চারণ করার সাথে সাথে আমার উল্টোদিকের সিটে বসা স্থুলকায় এক প্রৌঢ়, যাকে আমি আগে ‘বিচিত্রা’ অফিসে দেখেছি, এবং যাকে আমি চিনিও, তিনি আমার সাথে কথা বলেন। নাম জিজ্ঞেস করেন। বলি, আমি শাকুর মজিদ। ভদ্রলোক মাথা নাড়েন। অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বলেন, নাম শুনেছি। আপনিও কি হুমায়ূনের অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন?

আমি বলি, গিয়াসউদ্দিন সাহেবের অনুষ্ঠানে।

তিনি বলেন, ওখানেই হুমায়ূন যাচ্ছে। ওরা কাল রাতে গাড়ি নিয়ে গেছে। আমি নাইটে জার্নি করতে পারি না। বাসে গিয়ে যোগ দেব।

আলমগীর রহমানের সাথে আর এই দিয়ে পরিচয়ের সূত্রপাত। আলমগীর রহমান ‘বিচিত্রা’র সাংবাদিক ছিলেন, এরশাদের আমলে কোন একটা রিপোর্ট তার হাত দিয়ে ছাপা হওয়ার কারণে বিচিত্রা থেকে তাঁর চাকরি চলে যায়। এরপর পৈত্রিক মুদ্রণ ব্যবসায় মনোযোগ দেন। বর্তমানে ‘অবসর’ ও ‘প্রতীক’ নামে তার দুইটা প্রকাশনী আছে। ১৯৮৫ সালে হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলী সংক্রান্ত প্রথম বই ‘দেবী’ পেপারব্যাকে প্রকাশ করার মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদের প্রকাশক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এখন তিনি তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ২০০৪ সালে হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় বিয়েতে যারা যারা উপস্থিত ছিলেন সেখানে তাঁর নামও দেখেছি।

আমাদের বাস চলছে সিলেটের পথে। দর্শক-শ্রোতা-যাত্রীদের নাটক দেখায় বিরক্তির কারণ হবে এ আশঙ্কায় আমি আলমগীর সাহেবের সাথে আর কোনো কথা বলি না। গভীর মনোযোগ দিয়ে অনেক আনন্দের সাথে নাটকটি দেখা শেষ হয়। অনেকদিন পর একটা চমৎকার স্যাটায়ার দেখলাম হুমায়ূন আহমেদের। মন্ত্রীদের নিয়ে এমন রসিকতা করতে সাহস লাগে। কিন্তু বিষয়টি যেভাবে তিনি এনেছেন এই নাটকে, সেখানে কোনো মন্ত্রীরই ক্ষমতা নেই তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়ার।

দুই ঘণ্টা পর আশুগঞ্জের এক হইওয়ে রেস্তোরাঁয় বাস থাকে কুড়ি মিনিটের জন্য। আবার শুরু হয় নাটক। এই নাটকটিও হুমায়ূন আহমেদের। এর নাম ‘এই বৈশাখে’। অনেকদিন হয়ে গেছে, টেলিভিশনে নাটক দেখা হয় না। ইচ্ছাই করে না। এরকম বাস যাত্রা নাটক দেখার জন্য খুবই আরামের।

‘এই বৈশাখে’ নাটকটি দেখতে দেখতে একটা জায়গায় হঠাৎ আমার চোখ আটকে যায়। যে বাড়িতে শুটিং হয়েছে তার দেয়ালে দু’টো সাদাকালো ছবি টাঙানো। আরে “এ তো আমার তোলা ছবি। এখানে কী করে?”

আমি ভাবনায় পড়ে যাই। এই দু’টো ছবি আমার কাছ থেকে নিয়েছিলেন মিলন ভাই।

২০০২-০৩ সালের দিকে ইমদাদুল হক মিলনের সাথে আমার আড্ডা হতো সপ্তাহে প্রায় ৩ দিন। আমাদের লালমাটিয়া অফিসে। মিলন ভাই, কায়েস ভাই, তৌকীর, আমার অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিতাম। একদিন আমার অফিসে বাধাই করা কতকগুলো ছবি দেখেন মিলন ভাই। আমার প্রথম প্রদর্শনী ‘বাংলার মুক’-এর অনেকগুলো ছবি পড়েই ছিল। তিনি হঠাৎ করে দু’টো ছবি আলাদা করে বলেন, ‘শাকুর, আমি তোমার এই দুটো ছবি কিনতে চাই, কত দিব?’ আমি লজ্জায় পড়ে যাই। আমি কি ছবি বিক্রি করি? তাঁকে অনেকভাবে বুঝালাম--ছবি দুটো আপনি নিয়ে যান। তিনি রাজি না। অবশেষে এর বাধাই খরচের দুই হাজার টাকা আমার পকেটে প্রায় জোর করে ঢুকিয়ে দিলেন মিলন ভাই। ছবি চলে গেল তার গাড়িতে।

মিলন ভাই যখন একটা শুটিং ফ্লোর দিয়েছেন ৫০ পুরানা পল্টনে। সেখানে একটা বাসা বাড়ি সাজিয়ে রাখা শুটিংয়ের জন্য। ঐ বাসায় কি তবে এ দু’টো ছবি টাঙিয়ে রেখেছিলেন মিলন ভাই?

হুমায়ূন আহমেদের অত্যন্ত প্রিয়ভাজনদের একজন হচ্ছেন ইমদাদুল হক মিলন। মিলন ভাই’র এই শুটিং ফ্লোরে নিশ্চয়ই হুমায়ূন আহমেদ শুটিং করেছেন ‘এই বৈশাখে’ নাটকটি এবং একবার ক্লোজ শটে ছবি দু’টোও তাঁর ক্যামেরাম্যান ধারণ করেছিল।

আজ হুমায়ূন আহমেদকে উপলক্ষ্য করে গিয়াসউদ্দিন সাহেবের এই অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে বাসে বসে ছবি-দুটো হুমায়ূন আহমেদের নাটকের ভেতর দেখে ফেলা নিতান্তই কাকতালীয় ব্যাপার। জগত বড় রহস্যময়। কখন যে কাকে কোথায় মিলিয়ে দেয় কেউ জানে না!

সিলেটের বাসস্ট্যান্ডে নেমে আমরা আলাদা আলাদাভাবে গেস্ট হাউজে গিয়ে পৌঁছি। আমাদের মধ্যে আর কোনো কথাবার্তা হয় না। আমার কামরায় আমি চলে যাই, ঢাকা থেকে আসা অতিথিদের আমি দেখি না। তারা সম্ভবত একসাথে লাঞ্চ করছেন। আয়োজকরা তাদের নিয়ে খুবই ব্যস্ত। আমাকে বলা হলো, আমার খাবার রুমে দেওয়া হবে। আমি মন খারাপ করে রুমে বসে বসে টিভি দেখি।

চারটায় অনুষ্ঠান, আমি সাড়ে তিনটার দিকে নিজের দায়িত্বে চলে যাই। গিয়ে দেখি গানের রিহার্সাল হচ্ছে। আমি ভয়ে ভয়ে ভেতরে ঢুকে এক কোনায় বসে পড়ি। বছর সাতেক আগে এই সিলেটের লোকজন আমাকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেছিল ‘লন্ডনী কইন্যা’ নাটক লেখার কারণে। সিলেটের বুদ্ধিজীবী মহলের এক অংশের সায় ছিল অবাঞ্ছিতকরণে। খুব ছোট ছোট কিছু সংস্কৃতিকর্মী আমার পক্ষ নিয়ে কিছু বিবৃতি দিয়েছিলেন। আজ আমার প্রথম মুখোমুখি হওয়া। আমাকে বক্তৃতাও দিতে হবে গিয়াসউদ্দিন আহমেদ সাহেবের ওপর। আজকের আয়োজনে বড় বড় বুদ্ধিজীবী সংস্কৃতিকর্মীরা থাকবেন। তাঁরা না জানি কী বলে দুয়ো দেন আমাকে সেই আশংকায় চুপচাপ বসে থাকি।

এমন সময় মন্ত্রী মহোদয় গাড়ি থেকে নামলে যে রকম পরিস্থিতি তৈরি হয় এমন একটা হুড়োহুড়ির মতো অবস্থা দেখি। বুঝতে পারি, তিনি এসে গেছেন।

হুমায়ূন আহমেদের সাথে আরও এসেছেন তাঁর বন্ধু স্থপতি আবু করিম, প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম, অভিনেতা স্বাধীন খসরু, চ্যালেঞ্জার, কমল ও তাঁর কিশোরপুত্র নুহাশ।

নুহাশকে দেখে মনে হয় বাংলাদেশের পতাকা গায়ে জড়ানো। তার সবুজ রঙের টি-শার্টের মাঝখানে লাল রঙের এক বৃত্ত।

যথারীতি শুরু হয় অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথির আসনে বসা হুমায়ূন আহমেদ, বিশেষ অতিথি একজন এমপি, সভাপতি সিলেটের মেয়র কামরান। আরও কয়েকজন আছেন মঞ্চে। বক্তৃতার পালা শুরু হয়। নিয়ম হচ্ছে, যে যত ছোট বক্তা, সে বক্তৃতা করবে সবার আগে। একই দুইজনের পরই আমার নাম ডাকা হয়।
Humayun
‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’ গানটি আমি প্রথম শুনি ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকে একটা রিহার্সাল রুমে। তখন তৌকির আহমেদ আমার ব্যবসায়িক পার্টনার। সে তার দল নাট্যকেন্দ্র থেকে একটা মঞ্চনাটক নিদের্শনা দিচ্ছে, নাম ‘হয় বদন’। এই নাটকের একটা মৃত্যুদৃশ্যে ইউসুফ হাসান অর্ক [বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্বের অধ্যাপক] এই গানটি গায়। শুধু এই গান নয়, সিলেট অঞ্চলের আরও দু’একটি গান এই নাটকে ব্যবহার করা হয়। গানগুলোর সংগ্রাহক ফজলুল কবীর তুহিন। তিনিও এই নাট্যদলে কাজ করেন। মূলত গানগুলো এই নাটকের জন্য তারই আমদানি। রিহার্সেল শেষে তুহিন এই গানটি পুরো আমাদের গেয়ে শোনান। কানে লেগে যায়।

কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের কানে এই গান লাগে আরও আগে। ১৯৯৪ সালে সুনামগঞ্জের পৌরসভা চেয়ারম্যান মইনুল মইজুদ্দিনের উদ্যোগে ৩ দিনের জন্য হাসন উৎসবের আয়োজন হলে গায়ক সেলিম চৌধুরী মূলত হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে যান। সেই দলে তুহিনও ছিলেন। এ আসরে সেলিম চৌধুরী বেশ কয়েকটি গান গেয়ে শোনান, শেষের গানটি ছিল গিয়াসউদ্দিন আহমেদের লেখা এই ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’ গানটি।

এই অনুষ্ঠানে গান শুনতে এসে হুমায়ূন আহমেদ পরিচিত হন শাহ আবদুল করিম ও গিয়াসউদ্দিন আহমেদের গানের সাথে। পরবর্তীতে এ দু’জন গীতিকারকেই তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের গীতিকার হিসেবে তালিকভুক্ত করান। এবং দু’জনের গান নিয়ে মেতে উঠেন ঢাকায় ফিরে।

হুমায়ূন আহমেদের আসরে সেলিম চৌধুরীর ডাক পড়ে ঘন ঘন। তাকে দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ হাসন রাজার গানের একটা অডিও সিডি বের করেন। তার পরবর্তী ধারাবাহিক নাটক ‘আজ রবিবার’-এ হাসন রাজার গানগুলো ব্যবহার হতে থাকে।

১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে হাসন রাজার গানের সিডি বের করা অনেক কঠিন কাজ ছিল। সিডি বের করতে হয়েছিল লন্ডন থেকে। হুমায়ূন আহমেদের এই উৎসাহকে অনুপ্রাণিত করার জন্য তাঁর দুই বন্ধু প্রকাশক আলমগীর রহমান ও স্থপতি আবু করিম পঞ্চাশ হাজার করে এক লাখ টাকা লগ্নি করেন। জানি না এ টাকা তার ফেরত পেয়েছিলেন কি না। শুনেছিলাম বেশ ক’টা অডিও প্রতিষ্ঠান এই সিডিটি জালিয়াতি করে বাজারে ছেড়ে দিয়েছিল। তাতে এর মূল উদ্যোক্তাদের পয়সা ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকে না।

হুমায়ূন আহমেদ এরপর তাঁর ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ উপন্যাসটির চিত্ররূপ দেন। সেই চিত্রনাট্যে তিনি ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’ গানটি অন্তর্ভুক্ত করেন।

‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’সহ অন্য কয়েকটি গান রেকর্ড করার জন্য স্টুডিও ভাড়া করা হয়। সেখানে বাঁশি বাজানোর জন্য ডাক পড়ে বারী সিদ্দিকীর। মগবাজারের সাসটেইন স্টুডিওতে মকসুদ জামিল মিন্টুর সঙ্গীত পরিচালনায় শুরু হয় গানের রেকর্ডিং। হুমায়ূন আহমেদ নিজেও উপস্থিত থাকেন এই রেকর্ডিং-এ। এক সময় রেকর্ডিয়ের অবসরে বংশীবাদক বারী সিদ্দিকী তাকে নেত্রকোনার ভাটি অঞ্চলের কিছু গানও শোনান। এর ফলাফল সবাই জানেন। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ এর ‘মরিলে কান্দিস না’ গানটির জায়গায় স্থান পেল ‘শুয়াচান পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি’।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় হুমায়ূন আহমেদ মূলত কী করে এ গানটি পেলেন এবং কোথায় ব্যবহার করলেন, তার বর্ণনা দিলেন। একসময় বললেন, তিনি তিনজন শিল্পীকে দিয়ে [সম্ভবত সেলিম চৌধুরী, বারী সিদ্দিকী ও সুবীর নন্দী] এ গানটি আলাদা আলাদাভাবে রেকর্ড করিয়েছিলেন, প্রতিবারই তাঁর অনেক টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু শেষমেষ তিনি বেছে নিয়েছিলেন সুবীর নন্দীর গাওয়া গানটি।

সুবীর নন্দীও ছিলেন অনুষ্ঠানে। তিনি গিয়েছিলেন এ অনুষ্ঠানে শুধু ঐ গানটি গাওয়ার জন্য। গাইলেনও খুব দরদ দিয়ে। গান গাইতে গিয়ে প্রথমেই তিনি এ গানের সুরকার এবং তাঁর ওস্তাদ বিদিতলাল দাশ [পটলবাবু] এর কথা বলছিলেন। বিদিতলাল দাশও তাঁর দলবল নিয়ে মঞ্চে উপস্থিত। আলোচনা পর্বের শেষে গানের অনুষ্ঠান শুরু হয়।

১৯৩৫ সালের ১০ আগস্ট সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার শিবনগর গ্রামে জন্ম নেওয়া গিয়াসউদ্দিন আহমদ ছিলেন সিলেটের ‘সাপ্তাহিক যুগভেরী’র ছাতক সংবাদদাতা, ছাতক প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং ফুটবলার। এসব পরিচয়ই দেওয়া হয়েছে বক্তৃতায়। দির্ঘাঙ্গী, রসিক এবং সঙ্গীতপ্রিয় এ মানুষটি অনেকগুলো জনপ্রিয় সিলেটী আঞ্চলিক গান লিখেছিলেন। তাঁর লেখা ‘সিলেট পরথম আজান ধনি বাবায় দিয়াছে’, ‘ও বাবা শাহপরাণ আউলিয়া’, ‘প্রাণ কান্দে মন কান্দে, কান্দে আমার হিয়া’ এসব গান গাওয়া হলো। জারি সারি কিছু গানও লিখেছিলেন। নৌকা বাইচের গান। মঞ্চের মধ্যে নৌকা বাইচের চমৎকার কোরিওগ্রাফি করে দেখালেন সিলেটের শিল্পীরা।

এই অনুষ্ঠান সঙ্গীত পরিচালক এবং গানগুলোর সুরকার বিদিতলাল দাশ তাঁর বক্তৃতায় জানান যে, বহু আগে [১৯৭৪ সনের ৪ নভেম্বর] গিয়াসউদ্দিন সাহেব খুব অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে ছিলেন। এ সময় বিদিতলাল দাশ তাঁকে দেখতে গেলেন। তাঁকে দেখেই একটা কাগজ তাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এই গানটা আজ লিখলাম। আপনি সুর করেন।

গানের প্রথম স্তবকটি হচ্ছে-
মরিলে কান্দিস না আমার দায়রে, যাদুধন, Humayun
মরিলে কান্দিস না আমার দায়।
সূরা ইয়াসিন পাঠ করিও বসিয়া কাছায়
আমার প্রাণ যাওয়ার বেলায়
বিদায়কালে পড়ি না যেন শয়তানের ধোঁকায়
রে যাদুধন....।

এ গানটি যখন লেখা হয় কবির বয়স মাত্র ৩৯। এরপর আরও প্রায় ৩০ বছর বেঁচেছিলেন তিনি। মারা যান ২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে। নিতান্ত নিজের মৃত্যুচিন্তা থেকে তাঁর এই মরণসঙ্গীতটি লিখে দিয়েছিলেন।

এরপর অনুষ্ঠান শেষ হয়। হুমায়ূন আহমেদ ও তাঁর বন্ধুদের আমি দেখি। একমাত্র স্থপতি আবু করিম আমার সাথে কথা বলেন। সিলেট অডিটরিয়ামের পাশের একটা চায়ের দোকানে বসে আমরা চা খাই। সিলেট শহরে আমাদের দু’জনরেই ডিজাইন করা কিছু বড় প্রজেক্ট আছে, সেগুলো নিয়ে আলাপ করি। এবং একসময় সবাই উঠে যান। আমি আমার মতো গেস্ট হাউজে গিয়ে শুয়ে থাকি।

আমার সাথে হুমায়ূন আহমেদের দেখা বা কথা হয় না। আমি তাঁদের রাতের প্রোগ্রাম জেনে গেছি। হ্যারল্ড রশীদ সাহেবের বাসায় তাঁরা রাতে যাবেন। ওখানেও গানবাজনা হবে।

আমার খাবার আসে রুমে। আমি খেয়ে দেয়ে টিভি দেখতে দেখতে ঘুমাই এবং পরদিন বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠে শুনি ঢাকার মেহমানরা সবাই সকালেই চলে গেছেন। আমার সাথে আর কারও দেখ হয় না।

পরবর্তী সময়ে জেনেছি হুমায়ূন আহমেদের গানের আসরে নানা রকমের সঙ্গীত পরিবেশন হতো। ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’ গানটি দিয়ে তাঁর সব আসরে সমাপ্তি ঘটতো। হুমায়ূন আহমেদসহ তাঁর বন্ধুরা চোখ মুছতে মুছতে আসর ছাড়তেন। একসময় হুমায়ূন আহমেদও শাওনকে বলতেন, তাঁর মৃত্যুর পর লাশের সামনে যেন শাওন এ গানটি গায়। অতি বেদনার কারণ হওয়ায় একসময় গানটি গাওয়া বাদ পড়ে যায়। তাঁর স্মৃতি থেকে প্রায় আড়াল হয়ে যায়।

হুমায়ূন আহমেদের সাথে আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা হয় ২০০৮ সালের এপ্রিল মাস থেকে। এ সময় শুনি তিনি নিজেই তাঁর মৃত্যুসঙ্গীত রচনা করলেন, ‘ও কারিগর দয়ার সাগর, ওগো দয়াময়/চান্নিপশর রাইতে যেন আমার মরণ হয়’। গানটি সুর করেছেন এস আই টুটুল, আসরে বেশ কয়েকবার গেয়েছেন তিনি। এস আই টুটুল তাঁর পাবলিক কনসার্টও শেষ করতেন এই গান দিয়ে। মনে হলো হুমায়ূন আহমেদ হয়তো তাঁর প্রিয় মৃত্যুসঙ্গীতটি ভুলে গেছেন।

কিন্তু আসলেই কি তিনি ভুলেছিলেন?

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখে আমি বিস্মিত। আমেরিকার মেরিল্যান্ডের এক বাড়িতে কয়েকজন বাংলাদেশি স্বজন এসেছেন আড্ডায়। খাওয়া দাওয়া হবে। এ অবসরে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, আমরা রবীন্দ্রনাথের গান শুনলাম, নজরুলের গান শুনলাম, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষও কিন্তু অসাধারণ কিছু গান লিখতে পারেন, এটা কিন্তু ফ্যাক্ট।... সিলেটের এক লোকের নাম গিয়াসউদ্দিন আহমদ...।

এ সময় পাশ থেকে শাওন বললেন, এটা খুব অপছন্দের গান, এটা করব না।

হুমায়ূন আহমেদ বললেন, বাট দিস ইজ ট্রু ফর ইচ এন্ড এভরি ওয়ান অব আস।

এটুকু বলে শাওনকে অনুরোধ করলেন গানটি গেয়ে শোনানোর জন্য।

শাওন গাইছেন। অবিকল সেই সুর, সেই দরদ।

সিলেটের প্রত্যন্ত গ্রামের এক গীতিকবি কী অসাধারণ কথাগুলো বলে গেছেন। সেটাই কি তবে ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় মৃত্যুসঙ্গীত? কেন জানে!

‘অন্যদিন’-এর হুমায়ূন আহমেদ স্মরণসংখ্যার সৌজন্যে।

বাংলাদেশ সময়: ১২২৭ ঘণ্টা, অক্টোবর ১২, ২০১২
সম্পাদনা: রিংকু ভৌমিক, ওয়েব এডিটর/রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
banglanews24 All Apps
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
IIMEJ
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান