 |
কাপাসিয়া(গাজীপুর) থেকে ফিরে: নির্বাচনী এলাকায় একজন প্রার্থীর চলাচল মানেই বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী পরিবেষ্টিত থাকা, বিশাল গাড়িবহরের শোডাউন ও অনবরত শ্লোগান-করতালির মতো নজরকাড়া সব তৎপরতা। প্রায় ১০ বছর ধরে সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার এমনই।
তবে গাজীপুর-৪ উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী শহীদ বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা সিমিন হোসেন রিমির মনোনয়নপ্রাপ্তির পর ২৯ আগস্ট বুধবার নির্বাচনী এলাকার তার প্রথম সফরে সঙ্গী হওয়ার অভিজ্ঞতা পুরনো ধারণাকে আমুল পাল্টে দিয়েছে।
বলা চলে, একেবারেই আড়ম্বরহীন রিমির এই সফর জনগণের সমর্থন চাইতে যাওয়া বিভিন্ন নির্বাচনের প্রার্থীদের জন্য একটি অর্থবহ বার্তাও হতে পারে। চাটুকার কিংবা বিপুল সমর্থক গোষ্ঠী পরিবেষ্টিত না হয়েও জনগণের কাছে গিয়ে যে অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালবাসা পাওয়া সম্ভব-রিমির সফরসঙ্গী হওয়ার অভিজ্ঞতা তারই প্রমাণ দিলো।
অনেকটা নাটকীয়ভাবেই দলীয় মনোনয়ন পান রিমি। সংসদ সদস্য পদ থেকে ভাই সোহেল তাজের পদত্যাগের পর গাজীপুর-৪ আসনটি শূন্য হওয়ার পরপরই বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচন করার জন্য প্রার্থী হওয়ার বাসনা নিয়ে নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে তুলতে থাকেন বেশ ক’জন প্রার্থী। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগেরই ১২ জন প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেন স্ব-স্ব রাজনৈতিক চ্যানেলে।
রিমিকে মনোনয়ন দেওয়ার পর হঠাৎ ছন্দপতন ঘটে এসব আগ্রহী প্রার্থীর তৎপরতায়। দলের কর্মী-সমর্থকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের আনাগোনা শুরু হয় রিমির ঢাকার বাসায়।
সংবাদ সংগ্রহ করতে রিমির বাসায় গিয়ে যেমন নিবেদিত প্রাণ নেতা-কর্মীদের দেখতে পাই, তেমনি চোখে পড়ে এমপি হওয়ার আগেই রিমির কাছে মতলববাজ নেতাদের স্বার্থসিদ্ধির তদবির।
২৬ আগস্ট যখন সিমিন হোসেন রিমির সঙ্গে কথা বলছিলাম তখন এক নেতাকে দেখলাম কাপাসিয়া থানার বর্তমান ওসির বদলি না করানোর তদবির করতে। তবে দৃঢ় ভাবেই রিমি সেই তদবিরবাজ নেতাকে ফিরিয়ে দেন এই বলে, “আমি কেন এবিষয়ে নাক গলাবো-এটা তো আমার কাজ নয়।”
২৯ আগস্ট বুধবার ঢাকার বাসা থেকে বেলা ১১টার দিকে রওনা হয়ে দুপুর ১টা নাগাদ কাপাসিয়ার রায়েদ ইউনিয়নের দরদরিয়ার গ্রামের বাড়িতে পৌছান রিমি। এসময় তাকে ঘিরে যেমন ছিলো না উৎসাহী নেতাকর্মীদের ভিড়, তেমনি ছিলো না মোটরসাইকেল শোভাযাত্রাও।
কাপাসিয়া উপজেলা সদর থেকে কাপাসিয়া-টোক সড়ক ধরে ভরদুপুরে শীতলক্ষ্মা নদীর উপর নির্মিত ফকির মজনু শাহ সেতু পেরিয়ে যখন এগিয়ে চলছিল রিমিকে বহন করা গাড়ি তখন আচমকা তাকে দেখতে পেয়ে আবেগ আপ্লুত হতে দেখা যায় রাস্তার দু’পাশের আবালবৃদ্ধবনিতাকে। সবাই হেসে অকৃত্রিম অভ্যর্থনা জানাতে থাকে রিমিকে।
সেতু পেরিয়ে তরগাঁও, মিয়ার বাজার, বড়হর, আমরাইদবাজার হয়ে ভুলেশ্বর অতিক্রম করে দরদরিয়া গ্রামের বাড়ি পর্যন্ত একই দৃশ্য চোখে পড়ে।
স্থানীয়দের এমন নিরাভরণ-অভ্যর্থনায় অবিভূত হতে দেখা যায় লেখিকা ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার সিমিন হোসেন রিমিকে।
আমি নিজেও অবিভূত হই দরদরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের হাসিমাখা-আবেগঘন অভ্যর্থনা দেখে।
নিজ বাড়িতে পৌছে গ্রামের সব বয়সী নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোরের ভালবাসায় সিক্ত হন রিমি। পরলোকে চলে যাওয়া স্বজনদের কবর জিয়ারত করেন।
গ্রামে এর আগে অসংখ্যবার এলেও এবার তার এই আসাটা এক ভিন্ন আবহ সৃষ্টি করে, স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি করে এক বিশেষ উদ্দীপনারও। কারণ, এতোদিন কাপাসিয়াবাসীর নিত্যশুভার্থী-আপনজন থাকলেও এবার তিনি তাদেরই অভিবাকত্বগ্রহণ করতে যাচ্ছেন।
দুপুর তিনটার দিকে দরদরিয়া থেকে ফের যখন রওয়ানা হন কাপাসিয়া উপজেলা সদরের উদ্দেশ্যে তখনও তিনি নিরাভরণ।
দলীয় নেতাকর্মীরা যে তাকে ঘিরে মিছিল-শোভাযাত্রার উন্মাদনা তৈরি করতে চাননি তা কিন্তু নয়। বরং রিমির দৃঢ় অবস্থান ও নির্দেশনাতেই সে বিষয়ে উৎসাহী হয়নি তারা।
প্রত্যাশা থাকবে আগামী দিনগুলোতেও সিমিন হোসেন রিমি প্রকৃত জনগণের হয়েই থাকবেন, কাজ করবেন তাদের জন্য নিবেদিত হয়ে- তার কাছে চাটুকারদের আসন থাকবে না।
বাংলাদেশ সময়: ১৯৩৪ ঘণ্টা, আগস্ট ৩০, ২০১২
এআই/ সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর