 |
অনুশীলন
কলমের নিব খুললেই তো আর কবিতা বের হয় না;
যেমন তোমার সঙ্গে গেলেই আমার যাওয়া হয় না।
এই ভিখিরির থালায় রাষ্ট্রের মহিমা- আধুলি-সিকি;
দৈর্ঘ্য-প্রস্থে একটা জীবন পুঁজির পোঁদে দিচ্ছে উঁকি।
বনের পাখি বলে না না, রাষ্ট্রের পাখি বলে তা-না;
সে কিন্তু বোঝে জীবন কাকে দিচ্ছে এতসব পাওনা।
প্রতিদিন ভোরে তোমাদের থাকে কত হাজার বায়না;
ভাব আমি কবিতা লিখি আমার কিন্তু কবিতা হয় না।
উপবেশন
নতুন কী লিখছেন, লিখলে দিয়েন
অনেকদিন আপনার লেখা ছাপাই না।
‘ব্রা-কেটে’ আপনাকে লিখে দিতে পারতাম
এমনিতেই তো ছাপানো আপনার মুখখানা;
কিন্তু তাতে আমার অভিন্নতা ধরা পড়ে না।
জনাব, এখন আমি আপাতত লিখি না, আঁকি
কী আঁকি?
-যা খুশি
এই ধরুন, আমার আঁকা প্রচ্ছদও হয় ট্রচ্ছদও হয়
কিন্তু আমি আসলে আঁকতে চেয়েছিলাম
গা ঘিনঘিন টাটু- পৌরপুরুষের স্তনে,
এবং সভ্যতার ঠোঁটের ওপর।
কিন্তু আপনি তো জানেন, আঁকা অত সহজ নয়,
যত সহজে আপনি ছেপে দিতে পারেন,
এক হাজার টাকার বিনিময়;
বিল করার সময় আপনি বলবেন, এক হাজার টাকা
অত কম টাকা নয়;
সম্পাদক সাহেব আমরা উভয়েই জানি
আঁকাও সহজ নয়, ছাপাও সহজ নয়
টাকাও নয় সহজ;
আমরা কিন্তু পরস্পর সহজ হয়েই বাঁচতে চেয়েছি
কোন না কোন মালিকের পক্ষে, তাই না?
মনস্কাম
এই কথাটা বলতে লাগল একমাস!
আমরা কিন্তু সকালের কথা সকালেই,
বড়জোর বিকেল অবধি-
তারপরও আমাদের দুজনের মাঝখানে
বয়ে যায় নদী;
নদীও হারিয়ে যায়, গড়ে ওঠে নগর
নগরের তলপেটে
অন্ধ ভিখিরি;
সিকি-আধুলি না পাওয়ায় করছে রগড়।
রাষ্ট্র বলছে, দায় ‘ওর’
বিত্ত বলেছে, ‘ছোটলোক তোর’
মধ্যবিত্ত বলে, (সংশোধন জরুরি-)
এ কি ভাষা!
এখন ফেব্রুয়ারি মাস
‘বাট’ আমরা ছাড়িনি কোনো আশা!
হেমন্তে রচিত পাথর
তোমারা জানো, ভোর মানে কারও হাতে
রুটি ও তরকারি,
কিন্তু আমি জানি খালি পেট সকাল সকাল
যেতে হবে ছুটে-
এই যাওয়া সরকারি।
বেসরকারি যাওয়ারাও আছে বেকার
কে জানে তাদের দরকার আছে
যারা নিজেদের দরকারি মনে করে,
তারা কে কার?
প্রত্যেকেই মনে করে, প্রত্যেকেরই মন আছে
সেদিন আমিও তবলা বাজালাম শিমুল বালিশে
বালিশ কিন্তু প্রতিদিন একা,
যে মাথা রেখে ঘুমায়
বালিশের সাথে তার রাত্রিতে দেখা;
রাত্রির ‘পরে নামে খুব চুপে ভোর,
অই বৃদ্ধের বুক চিড়ে নামছে পাথর।
বাংলা কবিতা
একটি আগন্তুক সকাল উদযাপনের চেয়ে
ভোরের চিত্রকল্প নিয়ে তারা বলছিল বেশ;
কিনারায় দাঁড়িয়ে ফসলের মাঠ দেখে দেখে
আকাঙ্ক্ষারা নেমে পড়ল মাঠ পরিদর্শনে-
কিন্তু আমরা তো জানি মাঠে নামতে হলে
কাস্তে কোদাল থাকা চাই
তারপরও যখন মাঠে নামল,
পায়ের স্যান্ডেলটি চলার অনুপযোগী কিনা
না জেনেই যখন হাঁটতে শুরু করল-
মাটির ঢেলাদের সখ্য না মেনেই
দূরের দুষ্টু এই দৃশ্যে ফিক করে হেসে
দিল এক দৌড়
মাঠ চিরে গেল ফড়িঙের দারুণ পাখনায়-
এ যেন মাঠের শোভা;
শোভা মেয়েটি ওড়নার কিনারা নিয়ে
ক্লোজআপহীন দাঁতের সরলে দিল দুষ্টুকামড়
এমন কামড়ে যে হাসি তার কোন চিত্রকল্প
লিখে নাই মাঠ পরিদর্শনে আসা গোত্রের
নাগরিক পয়েট্। এখান থেকেই আমাদের
কবিতার ভাষা বদল শুরু, এখান থেকেই
আমাদের কবিতার চিত্রকল্প নিজস্ব হয়ে উঠল।
বর্গা ইতিহাস
আমার পিতার হাতে ঠাকুরদের মাঠটি অনূদিত হয়েছে
একুশ বছর; সেই মাঠ এখন মিলুদের দখলে।
তার বয়স এখন ষাট
হাতে সাদা কাগজের পৃষ্ঠাগুলির বয়স পনের
তোমরা খুলে দেখলে বইয়ের মলাট
পিতার ভাষা ছিল লাঙলে, তোমরা তা’ পাঠ করলে
আমন ধানের বোলে
আমার ভাষা ছিল কলমের নিবে, তোমরা তা
অনুবাদ করলে কবিতায়,
সেদিন বিকেলে
পিতার কাঁধ থেকে জোয়াল পড়ে যায়
মায়ের চোখে জলের নিস্তরঙ্গ সম্বোধন;
মধ্যস্বত্তভোগীরা খুলে দেয় পাল- বিশ্ববিদ্যালয়;
সে রাতে আমার কলম আর পিতার লাঙল খোয়া যায়
আমি এখন অভিধান জুড়ে কতগুলি শব্দ খুঁজে ফিরি
পিতা এখন আকাশে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকেন;
আমার এখন অভিধান লাগে!
খোলা অভিধানে চোখ রাখতেই পিতার মুখ পাঠ করি
জানালায় বৃষ্টির ঝাপটা এসে পৃষ্ঠাগুলো ভিজিয়ে দিয়ে যায়;
মায়ের চোখ মনে পড়ে
আমার কবিতার কাঠামো পরিবর্তিত হয়
গাড়ির চাকা চলছে
মানুষ বাড়ছে, দালান উড়ছে
মানুষীরা আকাশ ছোবে, মানুষেরা ছোবে মেঘ;
পিতার জোড়াহাত জানে এসবের ইতিহাস
মায়ের চোখ জানে ইতিহাসে গড়িয়ে পড়া জল
অভিধান এর কিছুই জানে না।
ব্যক্তিগত সন্ধ্যায়
তোমাকেই কোলে বসিয়ে রেখেছি সন্ধ্যার কিনার অবধি;
একমাত্র তুমিই আমাকে চুম্বন করতে পার আকণ্ঠ
যদি সকালগুলি প্রগতিশীল- সন্ধ্যারা তবে নিরাপরাধ
কিন্তু দুপুরের প্রশ্নে একদল চুপ থাকে
এখন সন্ধ্যায় বসেছি যেখানে তার কথা লুকাবে অনেকে
অদূরে মার্কিন যুবতীর টেনিস খেলা, মৃদুমন্দ ঘাম
এই অপূর্ণ সন্ধ্যায় অবশ্যই বেরিয়ে পড়বে- যেমন তার
অন্তর্বাসের ভিতর থেকে একটা বল বেরুল টুপ্ ভঙ্গিমায়
আর ওই মার্কিন তরুণীর সাথে আমরা কী ঘামের মূল্য
প্রবন্ধের উপমাচিত্র অংকনকারীদের কথা বিবেচনা করব?
বিবেচনাধীন এই বিকেলে
বিবেচনাধীন এই সন্ধ্যায়
বিবেচনাধীন এই রাত্রিতে
পরস্পর হেঁটে গিয়েছিল পায়ের শিশির, অবলঙ ঘৃণা,
রাতভর অন্ধকার।
এইমুহূর্তে আমাদের হাতে যে বস্তু কণ্ঠ ছুঁতে চায়, তাতে
একথা নিশ্চিত বলা যায় যে, মার্কেস তার বিত্তবান গাড়িটি
অবশ্যই সি-বিচের দিকে চালিয়ে যেতে পারবে।
এখানে অনুপস্থিত সেইসব বন্ধুরা আমাদের বিক্রি করে দেবে,
একথার একটু আগেই পরস্পর টেনিস খেলা দেখছিলাম;
একথার একটু পরে আমরা বিষণ্ন কারাগার নিয়ে ভাবছিলাম
তোমাদের মনে আছে কিনা তখন আরেকটি প্রসঙ্গ
মনে পড়ে গিয়েছিল- আমাদের গ্রামে এই খেলা দেখে
আমার সহৃদয় বান্ধবীগণ হাসতে হাসতে
হাসতে হাসতে
এখানে এও বলা যায়, আমরা যেমন আমাদের ইতিহাস
শুনতে শুনতে
শুনতে শুনতে শুনতে
বিকৃত শব্দটা বসিয়ে দেই অনায়াসে;
এবং ভুলে গিয়ে কৃতীর ভঙ্গিমা দেখি!
না খেলতে পারা ওই লাজুক তরুণীর চেয়ে
ম্লান উঁচু তার অঙ্গ-আঙ্গিনা তাহাকে আরও বেশি
উচ্চকিত করে!
যদিও নৈঃশব্দের শহরজুড়ে এই ব্যক্তিগত বসন্তে
মনীষাময় মেক্সিকান যুবতীর সন্ধ্যা আমাদের চোখের ভিতর
কোলে বসে থাকে- এসবই আমাদের ব্যক্তিগত অর্জন!
আমরা দূরে বসে দেখি;
কাছে বসে যদিও দেখতে চাই
হাসতে থাকি-
হাসতে হাসতে এক একজন সরল বান্ধবী হয়ে যাই
তারপর অ্যাকুরিয়ামে মাছদের নিশ্চিত মৃত্যুর সন্ধ্যাটিকে
দুলিয়ে বাঁচাই;
বাংলাদেশ সময়: ১৯৩৮ ঘণ্টা, ১৯ জুলাই, ২০১২