 |
কেবল লাশ, লাশ আর লাশ। নিচতলা থেকে শুরু করে ষষ্ঠ তলা পর্যন্ত। কোনটাতে পুড়ে ছাই হওয়া কাপড় ও আর সুতার স্তুপ। কোনটাতে সারি সারি সেলাই আর আয়রন মেশিন, সব পুড়ে কয়লা।
এসবের ফাঁকে ফাঁকেই আগুনে ক্ষতবিক্ষত লাশ। লাশের পর লাশ। কোন কোনটা এতোটাই পুড়েছে যে চেহারা চেনারই জো নেই। হাত নেই কারো, কোনটি আবার পা বিহীন। প্রাণহীণ পোড়া শরীরে মাংসও নেই কোন কোনটির। কোনটিরবা খুলিটাই যা অবশিষ্ট আছে। এখানে ওখানে বিভৎসতা ছড়াচ্ছে নি:সঙ্গ হাত বা পা অথবা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন শরীরের অন্য কোন অঙ্গ।
গুমোট বাতাসে পোড়া লাশের গন্ধ। কোনা-কানচিতে অলস ধোঁয়া ও নিভু নিভু আগুনের কুণ্ডলি গতরাতের বিভীষিকারই সাক্ষ্য দিচ্ছে যেন।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তৃতীয় ও চতুর্থতলা। এ দুই ফ্লোরেই লাশ পাওয়া গেছে সবচে’ বেশি। লোহার মেশিনও পুড়ে যেন কাঠ কয়লা হয়ে আছে এখানে।
আগুনের আঁচ থেকে বাঁচতে পঞ্চম তলার বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন জনা চারেক শ্রমিক। রোববার সকালে লাশ পাওয়া গেছে তাদের।
তবে বিস্ময়করভাবে অক্ষত আছে সব ফ্লোরের সব ক’টি অগ্নিনির্বাপন যন্ত্র। কোনটিতেই হাত পড়েনি কারো। শ্রমিকরা যে এগুলোর ব্যবহার জানতো সে প্রমাণ নেই।
এর ভেতরেই দমকল কর্মীদের ছোটাছুটি, সেনা জওয়ানদের প্রাণান্ত উদ্ধার তৎপরতা।
ওদিকে প্রবেশ পথে ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ-র্যাব-আর্মড পুলিশ। আছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, আনসার আর রেডক্রিসেন্টের সদস্যরাও।
উৎসুক জনতার পাশাপাশি এখনো নিখোঁজ আপনজনের খোঁজ না পাওয়া শোকার্ত স্বজনদেরই বিলাপ সেখানে।
এরপর শ’ তিনেক গজ রাস্তা। তারপর নিশ্চিন্তপুর রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ।
পুড়ে যাওয়া ভবন থেকে উদ্ধার করা লাশ বিদ্যালয়ের বারান্দায় সারি দিয়ে রাখা। পুড়ে কয়লা হওয়া লাশগুলো কফিন ব্যাগে মোড়ানো। কোন ব্যাগে ক’টা লাশের দলা কে জানে! কফিন ব্যাগের মসৃণ প্লাস্টিকে যেন হেমন্তের সোনা রোদের উপহাসের হাসি।
লাশ ঘিরে স্বজনদের বিলাপ, প্রলাপ, শিশির সিক্ত মাটিতে কান্নায় গড়াপড়ি। সব মিলিয়ে এ যেন শোকেরই পৃথিবী।
আটতলা ভবনের উপরের দুই তলা এখনো নিমার্ণাধীণ হওয়ায় এই দুই তলাতেই কেবল থাবা বসাতে পারেনি আগুনের লেলিহান শিখা।
এছাড়া তাজরিন ফ্যাসন লিমিটেড এখন আগুনে পোড়া ভূতুড়ে ভবনই বটে।
শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিট থেকে শুরু করে একটানা ১২ ঘণ্টা পুড়েছে ভবন। ভবনের ভেতরে পুড়েছে কাপড়, সুতা, মেশিন। আর পুড়েছে মানুষ। ভবন থেকে লাফ দিয়ে পালাতে গিয়েও মৃত্যু হয়েছে কারো কারো।
তিন সিঁড়ির মূলটির নিচে বৈদ্যুতিক সর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হওয়ায় নামতে গিয়েই প্রথম ধাক্কাটা খায় আতঙ্কিত শ্রমিকরা।
সিঁড়ির মুখে দাউ দাউ আগুনের আঁচে টিকতে না পেরে মুহুর্তেই উপরমুখে ঘুরে যায় পলায়নপর মানুষের মিছিল। বেড়ে যায় হুড়োহুড়ি, ঠেলাধাক্কা। বাঁচার তাগিদে কে কার আগে ওপরে যাবে তার প্রতিযোগিতা নেয় নির্মম রূপ। এ সময় পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
অগ্নিকাণ্ড শুরুর পর অন্তত হাজার তিনেক শ্রমিক আটকা পড়েছিলো এখানে। তাদের অধিকাংশই বেঁচে গেছেন। তবে রোববার সকাল সাড়ে দশটা পর্যন্ত উদ্ধার করা সোয়াশ’ লাশ যেন কোন মহাপ্রলয়ের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
এখানে এখন জীবন বলতে কেবল কান্না, আহাজারি আর উদ্ধার কাজে নিয়োজিতদের ক্লান্তিহীন তৎপরতা।
বাংলাদেশ সময়: ২২৪৪ ঘণ্টা, নভেম্বর ২৫, ২০১২
সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর eic@banglanews24.com