 |
সৌদি আরব থেকে: ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। একথা সবাই মানলেও প্রবাসীদের জীবনে এই কথার বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। প্রবাসীদের ঈদটা একটু অন্যরকম। প্রবাসে অনেকেই আছেন যাদের জন্য ঈদের দিন অত্যন্ত কষ্টের। মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ। এই ঈদকে নিয়ে মানুষের শখ আহ্লাদ আর প্রস্তুতির কমতি থাকে না। কিন্তু ঈদ আনন্দের লেশমাত্র লাগে না প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনে। ঈদ আসে ঈদ যায় প্রবাসে তাদের কষ্ট এতটুকু কমে না।
ফজরের আজানের পর মসজিদে ছুটে যাওয়া, পুকুরে গোসল সেরে সামান্য মিষ্টি মুখ করে মাড় দেওয়া কড়কড়ে নতুন জামা পরে ঈদগাহ মাঠে যাওয়া- গ্রামের এই দৃশ্য, সেই অনুভূতি এখন শুধুই স্মৃতি।
এখন ঈদগাহে যাওয়ার সময় কেউ আর প্রতিবেশীদের ডেকে নেয় না। জোর করে এক প্লেট সেমাই-ফিরনি খাইয়ে দেয় না। নতুন জামা পরে সালাম করলে কেউ নতুন কড়কড়ে টাকার নোটগুলো হাতে উঠিয়ে দেয় না। এসব খুব মিস করি। এখন আমি প্রিয় দেশ, মায়াবি সবুজ গ্রাম থেকে বহু দূরে, সৌদি আরবের মরু প্রান্তরে।
এখানে ঈদ মানে শূন্যতা, ঈদ মানে না পাওয়ার কষ্ট। পরিবার পরিজন ছাড়া ঈদ যে কত কষ্টের তা একমাত্র প্রবাসীরাই বোঝে। সকাল হলেই ঈদ অথচ অনেক রাত পর্যন্ত ডিউটিতে আছি। শেষ রাতে গোসল সেরে রাতের বাসি ভাত-তরকারি খেয়ে ঈদের নামাজে যাওয়ার প্রস্তুতি। পুর্বাকাশে সূর্য দেখা পাওয়ার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায় ঈদের নামাজ। এর মধ্যে আসতে শুরু করে দেশ থেকে আপনজনদের মিসকল আর খুদে বার্তা। সবাই কুশল জিজ্ঞাসা করে, কী খেয়েছি জানতে চায়। এখানে সেমাই ফিরনি যে জোটে না তা কাউকে বলতে পারি না।
ঈদের প্রস্তুতি জানার জন্য ফোন করেছিলাম শারমিনকে। ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করতেই পাশ থেকে আমার দুই বছরের মেয়েটি কি যেন বলতে চাইছে। তার মাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম সে বুঝাতে চেয়েছে, কয়েকদিন আগে বাজার থেকে আমার জন্য লাল টুকটুকে জামা আর বাঁশিওয়ালা জুতা এনে দিয়েছে। সেটা ওর খুব পছন্দ হয়েছে। ছোট্ট মেয়েটার অস্পষ্ট কথাগুলো শুনে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো। মা-মেয়ে দু’জনের কথা শুনছিলাম আর চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল।
সবকিছু খোলামেলা না বললেও এতকুটু বুঝতে পেরেছি, ঈদে খরচ করার জন্য যে টাকা পাঠিয়েছি তা বর্তমান বাজারে যথেষ্ট নয়। বললাম, আজকালের মধ্যেই আরো কিছু টাকা পাঠিয়ে দেবো টেনশন করো না। জানলাম, সবার জন্য কেনাকাটা শেষ। এখন শুধু অপেক্ষা ঈদের দিনটির জন্য। এটুকু জেনে ভালো লাগলো আমাদের কষ্টের উপার্জিত টাকা দিয়ে আমাদের পরিবার আনন্দের সঙ্গে ঈদ করতে পারছে। এটুকুই প্রবাসীদের স্বার্থকতা।
ঈদের নামাজ আর দেশে ফোন করার পর কষ্টের বোঝা আরো ভারি করে ঘুমানোর প্রস্তুতি। বুকফাটা কান্না চেপে আর যন্ত্রণা বুকে নিয়ে বিছানায় যাই। চোখের পানিতে বালিশ ভিজিয়ে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করি যাতে কষ্টের ভারটা একটু কমে। আর তাতেই দুপুর ঘনিয়ে পুর্বের সুর্যটা পশ্চিমে হেলতে শুরু করে। বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে দুয়েক জন বন্ধুকে সাথে নিয়ে সামান্য আনন্দের প্রত্যাশায় উদ্দেশ্যহীন ছুটে চলা। এভাবেই কেটে যায় প্রবাসীদের ‘ঈদ’ নামের কষ্টের দিনটি।
লেখক: সৌদি আরব করেসপন্ডেন্ট
E-mail: alaminbd_85@yahoo.com
সম্পাদনা: জাহাঙ্গীর আলম, নিউজরুম এডিটর