 |
০১
সোয়াতের বাজারে রুটির দাম বেড়ে যায় এমনকি পছন্দ মতোন রুটি অথবা বিস্কুট কিনতে পারার স্বাধীনতা বন্দী হয়। আর রাতারাতি রকমারি বোরখা ও রেকাবে দর্জিঘর ও কাপড়ের দোকানগুলো ঢেকে যায়। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে সমবয়সীদের হিজাবের ব্যবহার ও একটু অগোছালো হয়ে যাবার ভয়ে কাঁপতে থাকা মুখগুলোর দিকে তাকানো শৈশব ও আগামীর খুন হয়ে যাওয়া কবরখানার গেটে বেদনার নির্ভুল আকৃতির সাথে পরিণত অবিচার গুলোকে গলা মিলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখার পরও অস্বাভাবিক ঘোমটা টেনে যে মেয়েরা বাড়ি ফিরে আসে নিজস্ব ঘরের নিজস্ব ঘুণেধরা চৌকাঠে পা রাখে তাদের আর্তনাদের নিঃশব্দ আহাগুলো জমে জমে গোলা হয়ে ধ্বংস হচ্ছে আমাদের মাটি ও আমাদের মানুষের ভেতরে থাকা মানুষ তার খোঁজে যাবার মতোও জ্ঞানশূণ্য আমরা পরে আছি আলোহীন আরাধণার আয়াতেঅন্ধ ফলবান বন্ধ্যাত্ব। এই রকম আগলে রাখার শিক্ষাই আমার নানির বাবা তার মেয়ের মেয়েকে ব্যক্তিত্ববোধ সম্পন্ন এক পৌরাণিক ভঙ্গিতে রোজ দিতেন। যার ভার সহ্য না করতে পেরে জেগে ওঠা আমি খুন।
০২
দিনগুলো যখন খালি পায়ে দৌড়ে স্কুলঘরের জানালার পাশে এসে দাঁড়াতো কিংবা তাকিয়ে থাকতো ধ্বসে পরা দেয়ালের গায়ে আঁকা অস্পষ্ট ঘোড়ার ঘাড়ের উড়ন্ত চুলের বাতাসের দিকে তখন কারোর গোপন চোখ আমাদের আঁচল ও হিজাবের ফাঁকগুলোতে ঢুকে পরতো বাইরের রোদের সাথেই এবং আমাদের চোখ সেই সব দৃষ্টির অর্থ না বুঝতে পারার সরলতায় হাসতো। মায়ের তেড়ে আসা বাক্যগুলোও সোয়াত অথবা হেরাতে হাজার বছরের একই চুল বাঁধার ভঙ্গির মতোই অবিকল। ঐ সব শব্দরা সমাজের সুড়ঙ্গ পথ বেয়ে বেরিয়ে আসা বিষধর সাপের মতোই পেঁচিয়ে ছোবল ছুড়ে মারছে আর বিষাক্রান্ত শৈশব ছটফট করে মরে যাচ্ছি শব্দহীন দীর্ঘঘোমটার বিষণ্ন মুখেরা। ঐ যে পাতাগুলো দেখছেন আপনার জানালার বাইরে ওদের গায়ে লেগে থাকা রঙের সাথে কখনোই আমাদের আত্মীয়তা হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও জন্মে না। ওই পাষণ্ড ও অমানবিক চিন্তার লোকগুলোর ক্ষমতা যতো বাড়ল আমাদের রক্তপাত ও মর্ম যন্ত্রণার গানগুলো বাবলার শুকনো কাঁটার মতোই ততো ধারালো ও নিষ্ঠুর বিঁধে যেতে থাকলো। তাদের অন্ধত্বের লাগাম খুলে বেরুতে থাকল অজস্র হিংস্র হানার বিভীষিকা। যদিও নিজের ঘরের মধ্যেও এ অগ্নিজলে পোড়া হৃদয় দেখার একজনও কোথাও নেই দূর দূর সূর্যাস্ত ও উদয়ের বেলাভূমি পর্যন্ত আমাদের। ঠিক মনে পড়ছে ঘোমটা না দেওয়া মোহাইনূরী রাখতাইনের কথা আমার খেলার সাথী যার বয়েস আমার বয়েসের দুই বছরের কম হয়েও এগারো তাকে যখন বেপর্দা আখ্যায়িত করে ঐ যে ঐখানে সকলের সামনে রক্তাক্ত ফেলে গিয়েছিল লাশ। সে দিনও কারো মুখে একটা উচ্চ আহা স্বর কেঁপে উঠে নাই! একমাত্র মোহাইনূরীর বাবা তার মাকে এই বলে ভর্ৎসনা করে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তাকেও গুনাগার ও বেপর্দার ভাগিদার হতে হলো। আমি দেখতে পেলাম আমরা সবাই দাঁড়িয়ে আছি সেই সমুদ্রের কিনারে যেখানে সাইক্লোন আর নির্মম অগ্নিজলের তাণ্ডব ছাড়া আর কোনো আরাধ্য সৌন্দর্য দেখার অধিকার কারোর স্বপ্নে নেই। মর্মের অনিবার্য এইসব হত্যাকাণ্ডই আমাদের সবচেয়ে প্রিয় গৌরবগাঁথা!
বাংলাদেশ সময়: ১৩১৬ ঘণ্টা, ১৩ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস mjferdous0@gmail.com