 |
এই প্রথম জানলাম আমি হোসে সারামাগোর জগৎ, তাঁর প্রিয়তম স্ত্রী পিলার ও কন্যা বিওলেণ্ডার খবর। যাদের আগ্রহের কাছে, নিজের গল্পে যে সব কাহিনী নির্মাণ করেছেন তিনি— তা তাঁর আত্মউন্মোচন। দীর্ঘ লেখক জীবনে ‘এই আছি পরমুহূর্তে নেই’ এই কথার মধ্যে মৃদু বিদ্রূপ আর সযত্নে লুকানো দুর্বোধ্য কথোপকথনে ভাস্য দিয়ে গেছেন তিনি। আমার স্ত্রী প্রথম পাঠেই আমার সাথে তাঁর অনেক মিল খুঁজে পেলেন।
অতিনাটকীয় সুরারোপ করে তিনি বললেন—
হোসে সারামাগো নামের মানুষগল্পটিকে জানো তুমি?
না।
পড়ো, পড়ে আমাকে বলো!
হ্যাঁ। একথা বললাম।
হোসে সারামাগো নামটির সাথে ভারতবর্ষের পাঁচশত বছরের আগের পটভূমি আমার মাথায় এলো। ভাস্কো দা গামা আর হোসে সারামাগো এই দুটি মানবগল্প— মাথায় না ঢুকলে আমার চিন্তার সারবস্তুর কোনো পরিবর্তন আপতত ঘটতো না? কিন্তু নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার মুখোশীয় সমস্ত ব্যাপারটি এখন মনের সংক্ষিপ্ত বিবরণে রেখে আপাতত— এই দুই ব্যক্তির গল্পে একটা অক্ষম ও অগভীর প্রচেষ্টা আমার নিতে হবে। কেননা, এই গল্প ও চরিত্রগুলি আমার পারস্পরিক সম্পর্ক আর ঘটনাগুলির তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ হলেও আপতত তার ব্যতিক্রম ঘটলে আমার স্ত্রীর প্রশ্নবাণ আমাকে বিব্রত করবে। ফলে সংসারে আমার অংশগ্রহণ না থাকলেও মন ভাঙানিতে যাতে না পড়ি— সেই জন্য এই চেষ্টা।
এখন গল্পটা শুরু করা যাক। আমার স্ত্রী দীর্ঘাঙ্গিণী নন। তার চুল কোঁকড়ানো, আগুন লাল ও কালো রঙের মিশ্রণ। তার বক্ষ দুটি বড়, আকর্ষণীয়। সেই বক্ষে, যতো আবেগ ও বোধ দ্বারা তিনি আক্রান্ত— ততটা বুদ্ধির চাতুর্যকে তিনি অবহেলা করেন। তবে লেখক-কবি বুদ্ধিদীপ্ত মানুষকে সমাদর করেন তিনি। এমন কি আমার শত্রুর ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটে না। তার বক্ষটা আতিথেয়তা ও সমবেদনা দ্বারা পূর্ণ, ফলত তিনি শিল্পবৈচিত্র্যে আর কাব্যপাঠে আহত ও মর্মাহত হন প্রায়শ। তারপরও প্রেম প্রকাশের আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে তিনি মাথা ঘামাতেন, এবং এখন ঘামান। ফলে ১৯৮৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৫ বৎসর লাগলো আমাকে স্বামী ও প্রেমিক হিশাবে গ্রহণ করতে। ওর পূর্বপুরুষ ছিল ইরাকি। আর আমার নানা সৈয়দ আব্দুর রহমান ছিলেন নবাব কন্যা উম্মে জোহরার বংশধর। ফলে আর্য রক্ত আমাদের মধ্যে ছিলো বলে এক ধরণের অহম আমাদের পেয়ে বসে।
ও— যে প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম।
স্ত্রী বললেন— তুমি আর হোসে সারামাগো একই চিন্তা করো। হোসে কমরেড, তুমিও। তোমরা দু’জনই বিশ্বাস করো চিন পরবর্তী বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে। আর হোসেকে দেখে বোঝা যায়, অতন্দ্র ইন্দ্রিয়পরায়ণ কামুক, তোমার মধ্যে তাও আছে। পিলারও সেই কথা বলেছিলো, বোধ হয়?
আমি বললাম— হোসে তো ভাবে ‘জীবনটাই গল্পের অংশ’। আমি আরো বললাম— ধরো, আমি গল্প লেখা শুরু করলে তোমার প্রসঙ্গ এসে যাবে। ধরো, আমি তো রবি বাবুর মতো নয় যে, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে খুলে ধরতে পারবো না। বললাম, ধরো— শুদ্ধচারিরা কী লিখবে? ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’ —আমি বাপু চাকরি ইস্তফা দিয়ে ঢাকার জলবায়ু আর তোমাকে নিয়ে লিখবো। এসব শুনে আমার স্ত্রী আপত্তি করার কথা স্বপ্নেও ভাবেন না কিন্তু এই যে আমি অলস লিখছি না বলে, তার অস্থিরতা ও কারণ অনুসন্ধানে সর্বদা তৎপর থাকেন তিনি।
আমার স্ত্রীর একটা বৈশিষ্ট্য ছিলো। লোকে তাঁর সাথে ভাব জমাতো আর আমার ঈর্ষার আগুন এভাবে তিনি জ্বেলে রাখতেন, এখনও রাখেন। মাঝে মাঝে ভাবি আমি কি সিক? এ প্রসঙ্গ এড়াতে আমি তাকে বলি— গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজকে তো জানো। তাঁর স্ত্রী মার্কেজকে প্রেমের ব্যাপারে সাহায্য করতো। আর আমাদের অধ্যাপক বন্ধু মুহম্মদ মহসীনের ভাষ্যমতে, ওয়েলসের স্ত্রী অ্যানি ক্যাথারিন জানতো যে ইসাবেল ম্যারি, মার্গরেট স্যাঙ্গার, অ্যাম্বার রিভস, রেবেকো ওয়েস্ট, ওদেতে কেউন ও মৌরা বুদবের্গ এ ছয় জন তাঁর আনঅফিসিয়াল স্ত্রী।
আমি তাকে বলি, সে আনন্দ পায় কিন্তু অ্যানি ক্যাতারিনের সৎ বোন হতেও রাজি হয় না।
যে গল্পটি শুরু করেছিলাম তার আরো অনেকগুলি ফেজ আছে। যখন সে আমার প্রেমিকা ছিলো হোসে সারামাগোকে পড়েনি তখনকার কথা বলি। তখন নিজেকে তার পরিত্যক্ত মনে হতো। এই বিশ্ব সংসারে মানুষের দেওয়া প্রবঞ্চনায় সে নিজেকে জগতের অপাংক্তেয় ভাবতো। তারপরও, কোনো কিছুর অভাব ছিলো না তার, অথচ তার রূপের আগুনে আমি পুড়ে যেতাম। তার বাবাকে সে দেখেছে সচ্ছল, কিন্তু সমাজের ধনুকবাঁকা মানুষের নিরন্ন মুখ তার বুকে তড়িৎ ব্যথা সঞ্চালন ঘটাতো। ফলে, নিরর্থক এ বৈষম্যনীতি তার চিন্তাশক্তিকে মৃতজনের আত্মার মতো অসারতা এনে দিতো। সে ছিলো জন্মগতভাবে কমরেড আর দ্রোহী এক নারী।
হোসে সারামাগোর কথায় ফিরে আসি। হয়তো জলদস্যু ভাস্কো দা গামার রক্ত তার শিরায় প্রবাহিত। তা না হলে ভাস্কো দা গামা— সাগরের নুন, প্রাচীন গন্ধম ফল, জাদুর তেল ও হাড়, মশলা ও সোমরস আর নারীর জরায়ু কেটে নিয়ে গিয়েছিলো কী করে পর্তুগালে। ফলে, হোসে সারামাগোর রক্তে আমাদের উত্তরাধিকার আছে। আমি স্ত্রীকে বললাম— গোয়ার কালিকটে আমাদের পূর্বপুরুষ ছিলো। আমি স্ত্রীকে আরো বললাম— হোসে সারামাগো বলে— ‘অক্ষরের পর অক্ষর, শব্দের পর শব্দ, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা এবং বইয়ের পর বই লিখে আমি যাদের সৃষ্টি করেছি, তারা আমার অস্তিত্বের গভীরে রোপিত হয়ে গেছে। আমার ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছে তাদের প্রভাবে।’
আমার স্ত্রীকে আরো বললাম— জানপহেচান! এখন বলো, হোসে নতুন কি করেছে যা আমি করিনি? তোমার বুক কেটে কি আমি অক্ষর বানাইনি? যাদের সৃষ্টি করেছি আমি। তারা কি তোমার আমার ভেতরে রোপিত বোধিবৃক্ষ নয়? এসব কিছু শুনে আমার স্ত্রী আবেগে মূক হয়ে যান। শাদা শাদা মেঘ উড়ে যায় তার ঠোঁটে, বুকের পেণ্ডুলামে। তখন সে বলে— চলো স্তূপিকৃত জ্ঞানের ভিতর যে বোধিদ্রুম থাকে তার অতলে নামি। আমি সাহসী হই। এরপর আমার স্ত্রী মুগ্ধ চোখে তাকায়।
আমি বলি— কী হলো?
কী?
দেখবো।
হ্যাঁ, হোসে সারামাগোর ‘অন্ধত্ব-বিষয়ক প্রবন্ধে’ কী আছে দেখবো?
চলো।
তারপর মাছের মতো ‘অন্ধত্ব বিষয়ক প্রবন্ধে’ হেঁটে হেঁটে আর কনুই বাঁধিয়ে আমরা দুজনা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি ‘অন্ধ প্রেমিকের মতো’ একে অপরের দিকে।
পাঁচশত বৎসর আগে হোসে সারামাগো চুরি করেছিলো এইসব।
স্ত্রীকে বলি— সাব অল্টার্ন বোধই আসল। পিকাসোও তো আফ্রিকা থেকে চুরি করেছিলো চিত্রকলার ফর্ম। মাইকেল জ্যাকসান আরব থেকে নাচের মুদ্রা। এখন সারামাগোর লেখায় যে কান্না মাখানো আর্তনাদগুলি আছে— তা আমাদের। হোসের শব্দরাজ্যে গিয়ে তা পরবাসে, নিঃশব্দের রাজ্যে শুয়ে আছে?
আমার স্ত্রী বলেন— তোমার ও হোসের দেহের অংশটা অর্থাৎ বোধগুলি একই রকম। আমি ভাবি ইন্টারনেটে ব্লক শিখে হয়তো হোসের সাথে মিলিয়ে নেবো কিন্তু হয়না, ভাষা আমার চিন্তাকে মৃত্যু ঘটায়।
এসব কথা কিভাবে ব্যাখ্যা করবো আমার জানা নেই। তবে চিন্তা, যা শূন্য আর সামান্য যা-ই হোক না কেন— তা চিন্তা করে একরকম স্বস্তি পাই।
আমার স্ত্রীর কথা বলি, সে পাতালপুরির ভ্রমরার পেটে বসবাস করে। ঐ ভ্রমরার মৃত্যু হলে তারও প্রাণভ্রমরা নিভে যাবে। তবে ভ্রমরার পেটে তার প্রাণ থাকলেও মানুষের প্রতি তার প্রেম সবচাইতে অকৃত্রিম ও নিঃস্বার্থ।
লোকে বলে, আমি যে গল্প লিখছি তা আমারি আত্মজীবনী। অবশ্য আমিও এর আগে তা বুঝতে পারিনি। এখন বুঝি আত্মজীবনী ছাড়া গল্প হয় কিভাবে? কিন্তু আমার স্ত্রী যে হোসে সারামাগোর গন্ধ পান আমার বুকের মধ্যে। তিনি চিৎকার করে বলেন— পাবলো, তোমার মধ্যে হোসে সারামাগো বাসা বেঁধেছে। কথাটা আমারও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। আমি ভাবি আর স্মৃতিতে অস্পষ্ট সেই পাঁচশত বছর আগের দীর্ঘরাতের কাপে চুমুক দিয়ে জলদস্যুতার মধ্যে সেই গন্ধ ভরা অনার্য রমণীর কামার্দ্র নাভির ঘ্রাণ খুঁজে পাই।
হোসে সারামাগো নিয়ে প্রতিদিন রাতে আমার স্ত্রীর সাথে দ্বিতীয়বার, দ্বিতীয়বার, দ্বিতীয়বার এবং দ্বিতীয়বার এই বিশদ গল্পটা ফাঁদতে থাকি। আমরা বুঝতে চেষ্টা করি ‘গল্পটা’। এবং অবান্তর কিছুর অবতারণা না করেই গল্পটা বর্ণনা করা আমার ইচ্ছে। আমাদের নানা বাড়িতে কালো মলাটে ঢাকা একটা কোরান শরীফ ছিলো। পবিত্র এই গ্রন্থটি আমার নজরে ছিলো কিন্তু ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এখন আমার শৈশবের স্মৃতিগুলিও এই কালো মলাটে ঢাকা পবিত্র গ্রন্থের মতো অস্পষ্ট ও অস্পর্শ মনে হয়, তাকে দেখতে পাই, তবু ধরতে পারি না।
আমার স্ত্রী বললো, চলো আমরা হোসে সারামাগো ভালো করে পড়ি।
আমি বললাম— তাই। তারপর থেকে আমরা প্রতিদিন হোসে সারামাগো পাঠ করি আর জানতে পারি আমরা একে অপরকে এতদিন যা জানতাম তা কালো মলাটের কোরানের মতো।
আমি বললাম, সারামাগোকে ‘রাজনৈতিক নীতিবাদী’ বলে লোকে।
আমার স্ত্রী বললেন— মানুষ তো রাজনৈতিক প্রাণী, তা না হলে তার আর পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকতো না।
আমি বললাম, হোসে মার্ক্স এঙ্গেল্স থেকে শিখেছে যে ‘মানুষকে যদি তার পরিপার্শ্বের দ্বারা গঠন করা হয় তাহলে প্রথমে ওই পরিপার্শ্ব মানবিক করা প্রয়োজন।’
আমার স্ত্রী বললেন— সারামাগো হয়তো আমাদের চোখ উপড়ে নিয়ে মার্ক্স এঙ্গেল্সকে দেখেছেন? আমি মনে মনে বিড় বিড় করে বলি— হয়তো সে কথা-ই ঠিক, সে কথা-ই ঠিক...
বাংলাদেশ সময় : ১৭২৭ ঘণ্টা, ২৪ জানুয়ারি ২০১৩
দ্য-টিকে, এনআরএ