 |
এক.
আমি এখন যেখানে আছি তার থেকে ফুট পাঁচেক সামনে পড়ে আছে কিছুক্ষণ আগে খুন হওয়া একজন মানুষের লাশ। লাশটি একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষের। সমস্ত দেহ বিন্যাসের মধ্যে বিশাল ভুঁড়িটা দৃষ্টি আকর্ষণ করতো সবার আগে। এখন অবশ্য সেটা নেতিয়ে পড়েছে। একটা প্রকাণ্ড আর ধারালো ছুরি এফোঁড় ওফোঁড় করে চিরে দিয়েছে লোকটার ভুঁড়িটাকে। রক্তে গড়াগড়ি! কি বিশ্রী অবস্থা! আমাকে চেয়ে চেয়ে দেখতে হচ্ছে।
মানুষ কী করে খুন হয়, এই নিয়ে মনে বিশ্রী রকমের একটা কৌতূহল কাজ করতো। প্রায় প্রতি সকালেই খবরের কাগজে চোখ বুলাতে বুলাতে আশফাককে বলতে শুনতাম— খুনের কথা, হত্যার কথা, ধর্ষণের পরে জবাই করে নির্মমভাবে মেরে ফেলার কথা। আমি ওর গলায় শুনতে পেতাম হতাশার স্বর, মানুষ কি কোনওদিন সভ্য হবে না? কত দিন ভেবেছি— খুন, ধর্ষণ এগুলো কী জিনিস, কেউ যদি বলে যেত, পেপারটা যদি পড়ে দেখতে পারতাম!
আমার সেই আকাঙ্ক্ষা আজ মিটে গেছে ভয়ঙ্করভাবে। একটা ভয়াল বিভীষিকা এসে যেন নগ্ন করে দিলো অসভ্যতার কালো লোমশ বাহুটাকে। এক সাথে আজ দুটো খুনের দৃশ্য দেখতে হলো! প্রথমটি দেখার পরেই আমার সর্বাঙ্গে শুরু হয় ভীতিপ্রদ কাঁপন। আমি চাইছিলাম ছুটে বেড়িয়ে যেতে। পালিয়ে যেতে এ ঘর ছেড়ে অনেক দূরে। কিন্তু পারিনি, ধরের ধারক আমায় ছেড়ে দেয়নি। আমার নড়াচড়া, আমার আকুতি তাকে একটুও স্পর্শ করেনি, সে ছিলো নির্বিকার।
দ্বিতীয় খুনটা ছিলো আরো নির্মম, আমার জন্যে আরো বেশি কষ্টের। এই ঘরের নিয়ন্ত্রক আশফাকের স্ত্রী সোমা খুন হল আজ রাত্রে। ওর লাশটা পড়ে আছে শুভ্র চাদরের বিছানাতে। অদ্ভুত রকমের এলোমেলো হয়ে আছে চাদরটা। ছিঁড়ে গেছে বেশ কিছু জায়গায়। অবশ্য তা হবার কথাই ছিলো। পাষণ্ড খুনিটা যেভাবে খুবলে খেয়ে নিয়েছে সর্বস্ব, যেভাবে মৃত্যুর কোলে শুইয়ে দিয়েছে নিখুঁত নিপুণতায়; যেভাবে নিথর হয়ে পড়া দেহের ভিতরেও খুঁজে নিয়েছে নিজের আদিমতম সুখের ঠিকানা; তাতে এই শাদা চাদরের ছেঁড়া কিংবা বিছানার আলুথালু অবস্থা কোনও অর্থই বহন করে না। বরং এই জঘন্য রকমের নোংরা হয়ে থাকা বিছানা পত্র— এটা অনিবার্যই ছিলো, ঘটনাক্রমের সাথে।
এসব কী ভাবছি আমি? একটু আগে আমার চোখের সামনে শেষ হয়ে গেল একটা রক্ত মাংসের মানুষ, আমায় যত্ন দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নেয়া সোমা। আর আমি তার মৃত্যুকে ফেলে সাদা চাদরের ছোপ রক্ত আর ছিঁড়ে ফালাফালা হবার বিষয়টা নিয়ে বকে যাচ্ছি! আমার ভিতরটা কি বদলে গেছে হঠাৎ এই খুনোখুনি দেখে? আমার চোখের মণিতে কি এখন অশ্লীল নিস্তব্ধতা, অন্তহীন গভীর প্রশান্তি? খুনিটার মতন তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করবার মানসিক ধীশক্তি আমিও কি অর্জন করেছি? এখন কি সোমা, মৃত একটা লাশ আর কিছু নয় আমার কাছে? আর দশটা সাধারণ মানুষের মত? কে জানে, কিছুই জানি না আমি। আমি, আমি আর ভাবতে পারছি না, আমার চোখ দুটো বুজে আসছে ভীষণ যাতনায়। আমি মুক্তি চাই— নীরব, অটল তুমি আমায় মুক্তি দাও!
দুই.
দিন সাতেক আগে আশফাক আমাকে বের করে দিতে চেয়েছিলো এই ঘর থেকে। আমায় বলেছিল অপয়া, একটা অভিশপ্ত জিনিস। আমাকে রাখতে চেয়েছিলো বসার ঘরের এক কোণে। সোমা বাধা দিয়েছিলো বলেই সেদিন আমাকে বের করা হয়নি। তুমি কি জানতে সোমা, তোমার জীবনের কালরাত্রি ঘনিয়ে আসছে একটু একটু করে। অন্ধকারের প্রেতাত্মা গ্রাস করে নেবে, কালো জগতে? জানতে বোধহয়, তাই রাখতে চেয়েছিলে প্রত্যক্ষদর্শী এই অসাড় আমাকে। হায়, আমার কথা তোমরা কি কোনওদিন শুনতে পাবে মানব জাতি, আমার ঈশ্বর?
সেদিন সকাল থেকেই আমার আনন্দ। ওর মুখে অনেক দিন পরে শুনি চেনা সেই গানটা। প্রতিদিন ধুলোর অনাবশ্যক আক্রমণ থেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসতো সে। সেদিন এলো অন্য রকম আনন্দ নিয়ে। তখনই বুঝেছিলাম আজকে আমার সুখের দিন। সত্যিই তাই হলো। কিছুক্ষণ পরে ফেরৎ দেয়া হল আমার জীবনীশক্তির সর্বশেষ ও চতুর্থ অংশটুকু, যার অভাবে আমি ছিলাম অসাড়, মূঢ়। পৃথিবী টিকে আছে শব্দের খেলায়। শব্দহীন জীবন অনর্থক! সোমার বদান্যতা কথা বলার সুযোগ করে দিল আবারো। এর আগে একমাস, আমার কণ্ঠ রুদ্ধ করে রেখেছিল আশফাক! বেচারা আশফাক, সামান্য আমাকে অপয়া ভেবেছিলে! কিন্তু কী অপয়া, কী অভিশাপের খপ্পরে পড়েছে তোমাদের সংসার, তুমি জানতেও পারোনি।
আমি সেদিন শেষ বারের মতো গেয়ে উঠেছিলাম গানগুলি। গেয়ে উঠেছিলাম চিৎকার করে, প্রাণের সবটুকু শক্তি, সবটুকু আনন্দ নিয়ে। আমি গেয়েছিলাম মধ্যরাতে অর্থাৎ বারোটায়! গেয়েই চলেছিলাম পরের ঘণ্টা দুটিতেও। এর পরেই শুরু হল সোমার দুঃস্বপ্ন।
ঘুমে অচেতন আশফাক, তার পাশে শুয়েছিলো সোমা। আশফাকের মত সেও ছিলো ঘুমিয়ে। কিন্তু সে ঘুম ছিলো না আনন্দের, ছিলো না পরিতৃপ্তির। বরং মুখভঙ্গিতে ছিল স্পষ্ট ভয়ের রেখা। নিজের গলায় হাত দিয়ে বারবার অদৃশ্য কোনও শ্বাপদের হাতকে সরিয়ে ফেলতে চাইছিলো সে। চিৎকার করে বলতে চাইছিলো, বাঁচাও বাঁচাও! কিন্তু দম বন্ধ করা অন্ধকারের মাঝে হিংস্র কালো হাতের থাবা, তাকে সেটা বলতে দিচ্ছিলো না। ওদিকে মুখোশধারী মূর্তিটা বারবার বলছে— তুই মর, তুই মর। শ্বাস রোধ হয়ে আসছে সোমার। এভাবে ছটফট করতে করতেই হয়ত সেদিন মরেই যেত।
আমি তখন রাত্রি তিনটায় চিৎকার করে উঠলাম তারস্বরে। তখন সোমার চাপা ঘোঙানি চলছিল অবিশ্বাস্য হিংস্রতার আক্রমণে। আশফাকের গভীর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। আকুতির হাত তার পেটের উপর সশব্দে পতিত হয়। তন্দ্রাচ্ছন্নতা থেকে মুক্তি মেলে তার। চেয়ে দেখে নিজের থুতনির নিচে হাত দুটি দিয়ে কি যেন সরিয়ে দিতে চাইছে সে, অভিব্যক্তিতে ভয়ের ছাপ। কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে নিজের অজান্তে, ঘুমের মাঝেই।
আশফাকের সজোর ধাক্কায় ঘুম থেকে লাফিয়ে ওঠে সোমা। তার কণ্ঠে শুনতে পাই ফুঁপিয়ে কান্না আর বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নের বয়ান। কেউ একজন মেরে ফেলতে চাইছিলো, তার জঠরাগ্রে বেড়ে উঠতে থাকা আগামীর স্বপ্নটাকে। বারবার বলেছে তার মৃত্যুর কথা, শ্বাসরোধ করে মৃত্যু নিশ্চিত করে যাবে কোন এক কালো হাত। সাথে অনাগত ভবিষ্যৎ, সোমার ছয় মাসের নিরন্তর সাধনার ফল তার বাবুটার জীবন প্রদীপ অমাবশ্যার অন্ধকারে ডুবে যাবার অশনি সঙ্কেত।
রহস্যময় কালো মুখোশধারীটার শুধু একই কথা— তুই মর, তুই মর। প্রায় প্রতি রাতেই ওর ধস্তাধস্তি হতো মূর্তিটার সাথে। প্রথম দিকে যখন মুখোশধারী গলা টিপে ধরতে যেত, তখন সে মুখোশ ধরে টান দিলেই পালিয়ে যেত। এ রকম হয়েছে অনেক দিন। কিন্তু আস্তে আস্তে আরো রূঢ় রুদ্র মূর্তি নিয়ে সামনে এলো মুখোশধারী। প্রতি রাতের স্বপ্নেই ধস্তাধস্তির সময় বাড়ছিলো। যদিও মুখোশ টেনেও খুলতে পারত না সে, তবুও এই কাল্পনিক হাতাহাতির ফাঁকে প্রতিদিনই উন্মোচিত হয়ে আসছিলো আড়ালে লুকিয়ে থাকা জ্যান্তব কোন হাসি, পিশাচের পৈশাচিকতার নির্মম রূপ। সেদিন সোমা তার মুখোশ পুরোপুরি খুলে ফেলে। ভয়ার্ত কণ্ঠে আশফাকের কাছে বলে, সেই খুনি পশুটা আর কেউ নয় আব্দুল।
তিন.
আমার এখন ভীষণ হাসি পাচ্ছে। হা হা করে হাসতে ইচ্ছা করছে। মৃত লাশটির নিথর পাপড়িগুলো মেলে চোখ খুলে দিয়ে বলতে ইচ্ছা করছে, মানুষ চেনো তুমি? চেনো না। তুমি কিচ্ছু জানতেনা সোমা, কিচ্ছু না। চিৎকার করে বললাম, মনের সবটুকু ক্ষোভ নিয়ে— তুমি নির্বোধ। বোকা, একেবারেই অবলা নারী! মৃত্যু তোমার নিজের আয়োজন! আমার কান্না দমকে দমকে আসে, সোমাকে খুব ভালোবাসতাম। তার হাসিতে হেসেছি, তার কান্নায় কেঁদেছি, এখন নিস্তব্ধ তার নিথর দেহের পানে চেয়ে।
ভারী কাপড়ের পর্দার সুতোর ফাঁক থেকে ঘরে আসছে দুয়েক ফোঁটা আলো। এই আলো আসবার সময়টা দেখার জন্য কতো রাত আমি জেগে থেকে পার করেছি! কতো স্নিগ্ধ অনুভূতি আমাকে ঘিরে রেখেছে এই ক্ষণটুকুতে! কিন্তু আজ কোন স্নিগ্ধতা নেই, কোনও মায়া নেই। কোন কোমলতা নেই— আমার চারিদিকে শুধু কদর্যতা। কাদার মত থিকথিকে হয়ে আছে মেঝের রক্ত। অশ্লীলভাবে বেড়িয়ে আছে গেলে দেয়া ভুঁড়ি নাড়ির কিছু অংশ।
সকাল হচ্ছে। আর একটু পরেই আসবে দুঃসহ একটি দিন। কতো কান্না কতো দুঃখ, কতো মূল্যহীন সান্ত্বনার বাণী একে অপরকে দেবে, আর আমাকে তা শুনতে হবে? আমি সত্যিই জানি না কাল সকালে কে এসে প্রথম দেখবে সোমার লাশ। পুলিশ নাকি আশফাক, আমি জানি না, জানতেও চাই না।
চার.
আশফাকের সঙ্গে সংসার শুরুর পর থেকে সোমা খুব আনন্দেই ছিলো। অনাথ সে, স্বামীটিও পিতৃমাতৃহীন। তাই দু’জনার ঘরসংসার চলছিলো ভালোই। সমস্যা দেখা দেয় তার অন্তঃস্বত্তা হবার তিন চার মাস পর থেকে। আমি রাত দুটোর সময়ে কথা বলে উঠলেই সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। প্রতিদিন একই স্বপ্ন। ডাক্তারের চিকিৎসায় তেমন কোনও ফল পাওয়া যায়নি। বারবার বদল হয়েছে ডাক্তার। কিন্তু দুঃস্বপ্ন কমেনি, বরং বেড়েছে।
প্রথম দিককার কথা, তখন স্বপ্ন দেখতো দুয়েকটি করে। এর প্রাথমিক ফল হিসেবে সোমার প্রতিক্রিয়া হলো বেশ দৃষ্টিগ্রাহ্য। নিজের জগতে গুটিয়ে গেল সে। অফিসে আশফাক যাবার পর থেকে প্রচণ্ড একটা আতঙ্ক ঘিরে ধরত তাকে। সন্ধার দিকে ঘরে ফেরার পরেই আবার সব কিছু ঠিক। সোমার এই আচরণ কেমন যেন একটা মায়াহরিণের শিকার হবার ভয়ে সর্বদা ভীত থাকার মতো যে কিনা মায়ের আশ্রয়ে নিশ্চিন্ত। দিনকে দিন পরিস্থিতি হলো আরো অস্থিতিশীল, জটিল। দিনের একাকীত্ব অদ্ভুত নেশার মত গ্রাস করল তাকে রাতের বেলাতেও। প্রথমে সপ্তাহ, পরে দুয়েকদিন পরে পরেই দুঃস্বপ্ন।
আমার মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলির কথা। ওদের নতুন সংসারে আমি নব সংযোজন তখন। আমি যেদিকে আছি তার ঠিক উল্টো দিকে সোমা দুটো তৈলচিত্র ঝোলায়। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি ছবিগুলো। আমি মনে মনে ভাবি কী করে আঁকে এই ছবিগুলো? এত জীবন্ত! আজ সেই ছবি আমার কাছে আর জীবন্ত মনে হচ্ছে না। আজ বিমূর্ত চিত্রকলার নতুন মানে খুঁজে পেয়েছি আমি। এই ছবিটি একজন মৃত্যুভয়ে কাতর মানুষের বেঁচে থাকার শেষ আর্তিটুকুর বয়ান, নিথর হয়ে যাবার আগ মুহূর্তের গোঙানি!
সোমার ভয় দূর করার জন্য সেই স্বপ্নদর্শনের পরে আশফাক অফিসে যায়নি দুদিন। এই দুদিনে তারা ঘুরে বেড়িয়েছে পুরোনো দিনের প্রেমিক-প্রেমিকা জুটির মতো। পার্কের বেঞ্চিতে বসে হাতে হাত রেখে বসেছিলো অনেকটা ক্ষণ। পুরোনো দিনের রোমান্সের স্বাদ দেবার জন্যেই লোকের অগোচরে আশফাক নিজের অধর স্থাপন করে বিষণ্ন সোমার উষ্ণতা হারানো ঠোঁটে। তাদের ক্ষণিক মিলনের সবুজ করুণ খেলায় কিছুক্ষণের মধ্যেই হারানো হাসি ফিরে আসে তার ঠোঁটে। ঘরে এসে এই কথা বলবার সময়ও সলাজ ছিলো সোমার মুখ।
সেই ঠোঁটে এখন আর কোনও আকর্ষণ নেই, থাকতে পারে না। মৃত নিথর সোমার লাল ঠোঁট দুটোতে বিষ ঢেলে দিয়ে অন্তিম সুখ নিয়েছে খুনিটা। মুখে কয়েকটা কামড়, আরো অসংখ্য আঁচড়ের দাগ। পারলে বোধহয় কাঁচা খেয়ে নিতো। চাকু দিয়ে কেটে নিয়েছে তার সুডৌল স্তন দুটো। কি বীভৎস! মানুষ এত নোংরা হয় আমার জানা ছিলো না। আজ সত্যিই অনেক জানলাম, অনেক শিখলাম। তবে এত বেশি আমিতো শিখতে চাইনি! আমার ঈশ্বরের জাতি আমার সামনেই এমন পাপাচারে লিপ্ত হবে আমি কোনওদিন ভাবিনি, ভাবতে পারিনি।
পাঁচ.
মেঝের দিকে চোখ পড়ে আমার। হায় বোকা আব্দুল! পারলে না তুমি সোমার বিশ্বাস অর্জন করতে। দিন পনের আগে কেন ঢুকেছিলে শোবার ঘরে? আমাকে বাক্য দিতে, মুখে কথা বলার শক্তি, আমার চলনের চাবিকাঠিটা তুলে দিতে? সেদিনের সেই ভুলের মাশুল তুমি দিলে আজকের মৃত্যু দিয়ে। তুমি নিজে হারিয়েছো এ বাড়ির বাবুর্চির পদ, এই সরকারি কোয়ার্টারে ঢোকার প্রবেশাধিকার আর তরান্বিত করেছো নিজের মৃত্যুক্ষণ। কি ভীষণ দুর্ভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছিলে তুমি? হায় আব্দুল।
সোমার রাগত ভঙ্গি এখনো মনে পড়ে। আব্দুলকে সে কখনোই পছন্দ করেনি। আব্দুলের রান্না আশফাকের পছন্দ বলেই কখনো কিছু বলেনি তাকে। অনাবশ্যক ছোক ছোক, খাজুরে আলাপ করতে আসা— এসবই তাকে অপ্রিয় করে তুলেছিলো। আর এই ঘটনার পরে আব্দুলকে বদলি করা হলো পাশের বাড়িতে। আর আব্দুলের বিদায় বাগানের মালির জন্য হল শাপেবর। এমনিতেই সোমা তাকে পছন্দ করতো কম কথা বলার স্বভাবের কারণে।
প্রায় সকালেই ফুল দিয়ে যেত মালি বাহারউদ্দিন। সংসার ছিল না বাহারের। বিয়ে যাও করেছিলো, বউ মরেছে অনেক আগেই। তবে এখন আমার সন্দেহ বউ কি সত্যিই মরেছিল? না কি সে মেরেছিল? কেউ জানে না। তবে নিরাসক্ত নির্বিকার ভাব ধরার অভিনয় করেছিলো সে চমৎকারভাবে। সে নিপুণ অভিনয় দিয়ে জয় করে নিয়েছে সোমার মন।
ওর দিয়ে যাওয়া ফুল সাজাত বসার ঘর থেকে শুরু করে শোবার ঘরটুকু। স্নিগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে বাহার উদ্দিন বশ করেছিল তার মন, হিংস্রতার মরণ কামড় দেবার জন্যে। প্রথম প্রথম ফুল দিয়েই চলে যেত সে। দিনে দিনে অবস্থান বেড়ে গেল। ফুল দিতে এসে এ কথা, সে কথা তুলতো সে। অবশ্য গত কিছু দিন থেকে সোমার শরীর মন খারাপ যাবার কারণে এতে ভাটা পড়েছিলো। গত দুদিন সে কাজে যোগ দেয়নি। কাউকে কোনও খবর না দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। কোথায় ছিলো কেউ তা জানে না। আজ ফিরে আসে সে চরমতম আক্রোশ চরিতার্থ করতে।
ছয়.
সকাল আটটা। পাশের বাড়ির কেউ এখনো টের পায়নি খুনের কথা। অবশ্য পাবেই বা কী করে? এত দূরে দূরে কোয়ার্টারগুলো, রীতিমত বাংলো। তাই কখন পুলিশ আসবে, কখন এই দুঃস্বপ্নের সমাপ্তি হবে, আমি জানি না। আশফাকের কথা ভেবে খুব কষ্ট হচ্ছে। বেচারা, তুমি তোমার সন্তানের, স্ত্রীর নিরাপত্তার কথা ভেবে রেখে গেলে তাকে, কিন্তু কী হলো?
গতকাল আশফাক ঢাকা যায় অফিসের কাজে। কাল রাতে সোমার খুব ভালো ঘুম হয়েছিল নতুন ডাক্তারের চিকিৎসায়। তাই সকালে উঠে সে বলেছিলো আশফাকের সাথে সেও যেতে চায়। রাতের বেলা, এত বড় দোতলা বাড়িতে একা একা, তার জন্যে অস্বস্তির। কিন্তু অদ্ভুত শব্দের হাসি শোনা, দমবন্ধভাব কিংবা মৃত্যু সঙ্কেত সব তুচ্ছ করে দিলো আশফাক। কিচ্ছু হবে না— এই চিরকালীন সান্ত্বনার বাণী দিয়ে চলে গেল। তার স্ত্রীকে সে চিরতরে হারাবে কি না, সে ভাবনা তার ছিলো না। অবশ্য আমিও ভাবতে পারি নি এমন কিছু হবে। হায় দুঃস্বপ্নের রাত!
রাত্রি এগারোটায় দুটো কড়া ঘুমের অষুধ খেয়ে শুয়ে পড়ে। বোধ করি আব্দুল কিছু টের পেয়েছিল বাহারউদ্দিনের গতিবিধি। সে ছিলো বাড়ির দরজার ধারে। বাধা দেয়ার শব্দ, আব্দুলের প্রতিরোধ টের পাচ্ছিলাম ভেতর থেকেই। কিন্তু সোমা ছিল গভীর তৃপ্তির শেষ জাগতিক ঘুমে। এমন করে ঘুমুতে দেখিনি অনেক দিন। কি আশ্চর্য, কয়েক মিনিট পরেই যার ঘুম হবে সর্বশেষ, যখন আর জেগে উঠতে হবে না, তাকে এমন ঘুম মানায়? আমি কত চিৎকার করেছি কিন্তু সে শুনতে পায়নি। আমার জীবনচালিকা ছিলো না, ছিলো না কোনও উপায়। আমি লাফিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাকে ছাড়েনি মহাকালের মত স্থানু হয়ে থাকা ধূসর দেয়ালটা। মূঢ় আমি কেঁদে গেছি অনবরত। কিন্তু আমার কোনও ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি নেই তাই দেখা যায়নি আমার চক্ষুজল।
হঠাৎ দরজায় ভীষণ আঘাত, ভেঙে গেল শোবার ঘরের প্রবেশদ্বার। অসুরের মতন শক্তি বাহারের শরীরে, সেটা কখনোই জানতে পারিনি। অবশ্য জানবার কথাও নয়। এর আগে আমি দেখিনি কখনো তাকে। সোমার দিকে এগোবার আগেই আব্দুল আবার এসে ধরে ফেলে তাকে । আব্দুলের মুখে রক্ত, ঘুষিতে ঠোঁট ফাটা। বোধহয় সহকর্মী বলেই তাকে মারতে চায়নি প্রথমে। এ ঘরে প্রবেশের পরেই আব্দুলকে সে শুইয়ে ফেলে লাথির আঘাতে। অণ্ডকোষ বরাবর প্রচণ্ড লাথি, কঁকিয়ে ওঠে আব্দুল। এর পরেই ছুরি বের করে খুনিটা। এফোড় ওফোড় করে চিরে দেয় আব্দুলের বড় ভুঁড়িটাকে। আমি আর্তনাদ করে উঠি। আব্দুলের চিৎকারে ঘুম ভাঙে মৃত্যুর ডাক এসে যাওয়া সোমার।
বিহ্বল সোমার কিছু বুঝে ওঠার আগেই কণ্ঠনালী চেপে ধরে অসভ্য, বর্বর লম্পট। কয়েক মিনিটেই নেতিয়ে পরে এসে। এর পরে মৃতের চরিত্রহরণ আমায় হতবাক করে দেয় । আমি কী করে সেসব সহ্য করলাম আমি জানি না। আমি, সামান্য একটা দেয়াল ঘড়ি! বেজে চলতে হয় মহাকালের আজ্ঞা নিয়ে জীবনকালের সবটুকু ব্যাপী। কত স্মৃতি যোগ হয় জীবনে, কিন্তু এমন অপঘাত সহ্য করে যেতে হবে এমনটা ভাবিনি। চোখ দুটো এখনো বন্ধ করে রেখেছি। জানি না আর কতক্ষণ রাখতে হবে ।
যাবার আগে খুনিটা নির্মম রসিকতা করে গেল আমার সাথে। খাটের পাশের টেবিলে রাখা একটা পেন্সিল ব্যাটারী পেয়ে লাগিয়ে দিয়ে গেল। ইচ্ছে করেই করে গেল, কেননা লাগাবার পরে অসভ্য কণ্ঠের হাসি আর চোখে কৌতুকের ঝিলিক দেখতে পাই। রক্ত মাখা কালো হাতটা, আমার গায়ে লাগতেই ঘিন ঘিন করে উঠলো দেহ। এখনো আমার পেছনে রক্ত, সোমা আর আব্দুলের। কী হবে মৃত্যুর পরে এখন আর গান গেয়ে! আমি গাইতে চাইনা এখন আর। কিন্তু নিয়তি আমাকে বাধ্য করে। আমি মুক্তি চাই নিয়তির কাছে।
সকাল নয়টা। আমি চিৎকার দিলাম। আজকের দিনের শেষবারের মতো। দরজায় খুটখাট শব্দ! কে এল আশফাক না পুলিশ? আমি তা নিয়ে ভাবিত নই। আমি শুধু ভাবছি, যেই আসুক এ লাশ সরিয়ে নেবে। আমি খুলতে পারবো আমার বন্ধ করা চোখ দুটো...
বাংলাদেশ সময়: ১৭৩৫ ঘণ্টা, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা : তানিম কবির, tanimkabir@gmail.com