ঢাকা: একজন নৌ ব্যবসায়ীর স্বেচ্ছাচারিতায় হুমকির মুখে পড়েছে নৌপথে পরিবহনে নির্ভরশীল আরও বেশ কয়েকটি শিল্পখাত। একটি মাত্র কোম্পানির মালিক হয়ে এই ব্যবসায়ী তার দখলে নিয়ে নিয়েছেন নৌ-পরিবহন খাতে মালিকদের তিনটি সংগঠককেই। ফলে গোটা খাতটিই এখন গাজী বেলায়েত হোসেন মিঠু নামের এই ব্যবসায়ীর হাতের মুঠোয়। তার রাঙাচোখ উপেক্ষা করে কিছুই করা সম্ভব হয়না, বলে অভিযোগ জানিয়েছেন অন্য একাধিক নৌ-পরিবহন মালিক। তাদের আরও অভিযোগ, নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের সরাসরি ছত্রছায়ায় এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন মিঠু।
মিঠুর স্বেচ্ছাচারিতার কথা বাংলানিউজে টেলিফোনে জানিয়েছেন তারা। কেবল নৌ মালিকরাই নন, মিঠুর নেওয়া বেশ কিছু সিদ্ধান্তের কারণে এখন হুমকির মুখে পড়েছে নৌপরিবহনে নির্ভরশীল অন্য কয়েকটি শিল্পখাত। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখিন সিমেন্ট শিল্প।
এই খাতের ব্যবসায়ীরাও জানিয়েছেন তাদের অভিযোগের কথা। তাদের দাবি সিমেন্ট ব্যবসার ক্ষতি করতেই ষড়যন্ত্র করছে বহু অপকর্মের হোতা গাজী বেলায়েত হোসেন মিঠু। তাদের মতে এতে শুধূ সিমেন্ট ব্যবসাযী নয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ ক্রেতারাও। শিল্প মালিকরা জানান, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব জাহাজগুলোকেও নৌ-পরিবহন সংগঠনের আওতায় নেওয়ার পায়তারা চালাচ্ছেন মিঠু।
বাংলানিউজের অনুসন্ধানে বেলায়েত হোসেন মিঠুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা মিলেছে।
বেলায়েত নেভিগেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলায়েত হোসেন মিঠু একই সঙ্গে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের আহ্বায়ক, বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এবং কোস্টাল শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি।
তবে তার সব পরিচয় ছাপিয়ে বড় পরিচয় হচ্ছে তিনি নৌপরিবহনমন্ত্রী মো. শাজাহান খানের ঘনিষ্ঠ লোক, বাংলানিউজকে এ কথা বললেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নৌ-পরিবহন মালিক ও সিমেন্ট ব্যবসায়ী।
তারা বলেন, নিজের একটিমাত্র কোম্পানির নাম ভাঙিয়ে নৌপরিবহন সেক্টরের তিনটি সংগঠনেই পদ আঁকড়ে রেখেছেন গাজী বেলায়েত হোসেন মিঠু। উদ্দেশ্য নানারকম ফায়দা লোটা।
সূত্র জানায়, মিঠুর অন্যতম ইচ্ছা চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানা মালিকদের জাহাজগুলোকে ডব্লিউটিসি’র আওতায় আনা। সিমেন্ট কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহনকারী নিজস্ব কোস্টার ও লাইটার জাহাজ পরিচালনা জোরপূর্বক ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের আওতায় নেয়ার প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছ্নে মিঠু।
আর এ ইচ্ছা পূরণে একের পর এক জটিলতাও তৈরি করছেন তিনি। কারখানা মালিকরা তার উদ্যোগে সম্মত না হওয়ায় তিনি শ্রমিকদের দিয়ে বন্দর অস্থিতিশীল করে বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নানা অবৈধ ব্যবসায়ও জড়িত মিঠু । জাহাজ আমদানীতেও কোটি কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছেন। যা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে তার বিরুদ্ধে মামলা ঝুলছে।
সূত্র জানায়, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা `এমভি ওয়াটার কিং` নামের একটি স্ক্র্যাপ (পুরনো) জাহাজ নদীতে বাণিজ্যিকভাবে পণ্য পরিবহনে ব্যবহার করছেন মিঠু। এই চ্যাঞ্চল্যকর ঘটনার বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (সিসিসিআই)-এর পরিচালক ক্যাপ্টেন (মেরিন) সফি চৌধুরী।
চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (সিসিসিআই ) এর পক্ষে ক্যাপ্টেন সফি চৌধুরী অভিযোগে বলেন, নৌ সেক্টরে নানা অবৈধ ব্যবসায় জড়িত মিঠু। তার সর্বশেষ উদাহরণ দুর্নীতি ও নীতিবহির্ভূত কার্যকলাপের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কয়েকটি ভাঙ্গা হবে (স্ক্র্যাপ) এমন জাহাজকে বাণিজ্যিক জাহাজে রূপান্তর করা। অভিযোগে আরও বলা হয়, বেলায়েত হোসেন মিঠু অতীতে বিপুল অঙ্কের কর ফাঁকি দিয়ে পার পেয়েছেন। তাই তার দুর্নীতির হাত সুদূরপ্রসারী।
সফি চৌধুরী জানান, ট্যাঙ্কার ব্যবসায়ী কে এম মাহমুদুর রহমানের কাছ থেকে মিঠু তার ভাই এমদাদ হোসেনের নামে ওয়াটার ভয়েজ শিপিং নামের একটি জাহাজ কেনেন। সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর থেকে অনুমতি নেওয়ার পর কালীগঞ্জের ঢাকা ডকইয়ার্ডে নিয়ে জাহাজটিতে একটির পরিবর্তে বসানো হয় দুটি ইঞ্জিন। উচ্চতা ও দৈর্ঘ্যেও পরিবর্তন আনা হয়। বিষয়টি সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর অবগত।
সফি চৌধুরী আরও বলেন, ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডবি্লউটিসি) আহ্বায়ক গাজী বেলায়েত হোসেন মিঠু সরকারের সব নিয়মনীতি ভঙ্গ করে সীতাকুণ্ডের এসএ শিপ ব্রেকার্সের মালিক আবুল হাসেম আবদুল্লাহর কাছ থেকে গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি এমভি নিনা জাহাজটি (স্ক্র্যাপ হিসেবে আমদানি করা) কেনেন।পরে জাহাজটি চট্টগ্রামের বাংলাবাজারে নিয়ে দুই মাস রাখা হয়, এর প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমি নিজেই। পরবর্তীতে মেহেনুর জাহাজের সি নং ৭৮৫ ব্যবহার করে রাতের অন্ধকারে নিনা জাহাজের নাম পরিবর্তন করে `এমভি ওয়াটার কিং`-এ রূপান্তর করা হয়।
সফি চৌধুরী বলেন, “এই ব্যক্তিকে না থামাতে পারলে নৌ পরিবহন খাতে বড় ধরনের জটিলতার তৈরি হবে।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আইন অনুযায়ী ভাঙার জন্য আনা হয় স্ক্র্যাপ জাহাজ।কিন্তু নিয়মনীতি না মেনে সেই জাহাজ দিয়েই পণ্য পরিবহনের রমরমা বাণিজ্য করছেন মিঠু। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন সংস্থার নজরে আনা হলেও তারা এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।নীরব এনবিআর ও সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরও। এত অভিযোগের পরও কীভাবে স্ক্র্যাপ জাহাজটি চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পণ্য পরিবহনকারী নিজস্ব কোস্টার ও লাইটার জাহাজ পরিচালনা জোরপূর্বক ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের আওতায় নেওয়ার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
পাশাপাশি কারখানা মালিকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সিমেন্ট কারখানাগুলোসহ দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহনে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হবে। সার্বিকভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কারখানার উৎপাদনে, এ ছাড়া ডব্লিউটিসির এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পণ্য ভর্তি, খালাস ও পরিবহনে দেরি হবে। পণ্যের পরিবহন খরচ বেড়ে দামের ওপর প্রভাব পড়ে সাধারণ ভোক্তাদের মাশুল গুনতে হবে বলে তারা মনে করেন।
এ ব্যপারে বাংলানিউজের পক্ষ থেকে গাজি বেলায়েত হোসেন মিঠুর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। রাজধানীর বিজয়নগরে স্কাইলার্ক পয়েন্টে বেলায়েত নেভিগেশনের অফিসে গেলেও তার দেখা পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ সময়: ১৭১৬ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১২
এমআইআর/এজে/এমএমকে