 |
| ছবি: নূর / বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
ঢাকা: জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শক্তিশালী ও টেকসই করতে ব্যাংকগুলোকে কৃষি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে এই সেবার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। এতে করে ব্যাংকগুলোর আমানত যেমন বাড়বে, কৃষক অর্থ জাতীয় অর্থনীতির মূল ধারায় চলে আসবে।
বাংলানিউজের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বললেন, দেশের তৃতীয় প্রজন্মের শরীয়াহ ভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংক এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (এক্সিম ব্যাংক) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এম) ও প্রধান নির্বাহী ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া। ব্যাংকটির করপোরেট কার্যালয়ে দীর্ঘক্ষণ বাংলানিউজের সঙ্গে কথা বলেন। অভিজ্ঞ ও পেশাদার এই ব্যাংকার এক্সিম ব্যাংক ও দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে তার মতামত তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বাংলানিউজের সিনিয়র ইকোনমিক করেসপন্ডেন্ট সাইদ আরমান।
বাংলানিউজ: তৃতীয় প্রজন্মের বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে এক্সিম ব্যাংক কাজ করছে। একযুগের বেশি সময় অতিক্রম করার পর জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাংকটির অবদান সম্পর্কে বলেন।
হায়দার আলী মিয়া: ১৯৯৯ সালের ৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে এক্সিম ব্যাংক। শুরুর পর থেকে ব্যাংকটি কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক হওয়ায় আমরা মুনাফার প্রতি গুরুত্ব দেই না। ব্যাংকিং করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি জাতীয় অর্থনীতিকে। এজন্য আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যকে ব্যাংকিং সহায়তা দেওয়া মতো বড় কাজটি এক্সিম ব্যাংক করে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রবাসী আয় সংগ্রহকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আর এভাবে তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংক হলেও প্রতিযোগিতায় আমরা প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছি। অবদান রাখছি জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে।
বাংলানিউজ: বিগত ১২/১৩ বছরের ব্যাংকের সার্বিক প্রবৃদ্ধি কী হয়েছে?
হায়দার আলী মিয়া: প্রবৃদ্ধি, পরিচালন মুনাফা, বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আমানত এসব সূচক যদি বিবেচনা করেন তবে এক্সিম ব্যাংকের অর্জন ঈর্ষণীয়। গত বছর আমাদের পরিচালনা মুনাফা বেড়েছে আগের বছরের তুলনায় ১৩৬ শতাংশ। একইভাবে ব্যাংকের অন্য সব আর্থিক সূচকও সন্তোষজনক। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে ব্যাংকিং করে যাচ্ছি। ফলে ব্যাংকিং খাতে একটি শক্তিশালী অবস্থান করে নিতে পেরেছি।
বাংলানিউজ: আপনি বললেন, বিগত বছরে ১৩৬ শতাংশ পরিচালন মুনাফা বেড়েছে। ব্যাংকিং খাতে এটি সবচেয়ে বেশি। ব্যাংকিং খাতে টানাটানি ছিল, মন্দার প্রভাব ছিল। এর মধ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন, এর কারণ কী? এক্সিম ব্যাংক মুনাফা নির্ভর ব্যাংকিং করছে কি?
হায়দার আলী মিয়া: না, এক্সিম ব্যাংক মোটেও মুনাফা নির্ভর নয় ব্যাংকিং করে না। মুনাফা করাটা আমাদের ব্যাংকিং লক্ষ্য কখনোই ছিল না। তবে আমি যেটি বলেছি তার ব্যাখ্যা হলো, ২০১০ সালে আমাদের মুনাফা কিছুটা কমে গিয়েছিল। আর ২০১১ সালে তা বেড়ে যায়। তবে এটি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতার কারণে হয়েছে।
বাংলানিউজ: আমদানি রফতানি বাণিজ্যের কথা বলছিলেন। এ খাতে এই ব্যাংকের অবদান সম্পর্কে কিছু বলবেন?
হায়দার আলী মিয়া: আমরা বৈদেশিক বাণিজ্যকে মূল ব্যাংকিং মনে করি। বিগত বছরের পরিসংখ্যান যদি ধরি, এক্সিম ব্যাংক প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক বাণিজ্য করেছে, যা প্রথম প্রজন্মের অনেক ব্যাংক করতে পারেনি। এর প্রায় ৭৫ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা আমরা স্থানীয় বাণিজ্যের জন্য দেশে রাখতে পেরেছি, এটা অন্য ৪৭টি ব্যাংকের কেউ করতে পারেনি। তৈরি পোশাক খাতে ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের প্রায় ৪৬ শতাংশ বিনিয়োগ এই ব্যাংকের একার। আর এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্প বিনিয়োগ যদি বিবেচনা করা হয়, তবে তা গিয়ে দাঁড়াবে ৫৮ শতাংশে। যার ওপর দেশের অর্থনীতি অনেকখানি নির্ভর করছে।
বাংলানিউজ: আপনি বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ে নানা কথা বললেন। কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে কৃষি খাতে বিনিয়োগকে কীভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়?
হায়দার আলী মিয়া: আপনি ভালো একটি বিষয় তুলেছেন। এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিনিয়োগে সব সময় উদার ছিল। এই উদার ভূমিকা পালন করে যাবে। যাত্রা শুরুর পর থেকে এই খাতের সঙ্গে আমরা নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য কৃষি খাতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আমি মনে করে, কৃষি বিনিয়োগে ব্যাংকগুলোকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। তবেই দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে। এছাড়া আমরা শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দেশের অর্থনীতির চাকাকে যেভাবে সচল রাখা যায়, সেভাবেই ব্যাংকিং করে যাচ্ছি।
প্রশ্ন: প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য কী উদ্যোগ নিচ্ছেন?
হায়দার আলী মিয়া: বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে এক্সিম ব্যাংক সর্বপ্রথম বিদেশে এক্সচেঞ্জ হাউস চালু করে লন্ডনে। সেটি ২০০৯ সালের কথা। এরপর কানাডাতে করা হয়েছে আরেকটি। এবছর আমরা আরো দুটি হাউস খোলার পরিকল্পনা নিয়েছি। এর একটি করা হবে সিডনিতে, আরেকটি নিউইয়র্কে। এর ফলে রেমিট্যান্স সংগ্রহ বাড়বে। আর তা দ্রুত দেশে তার সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছে দিতে আমাদের শাখাগুলোকে আন্তঃব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। খুব শিগগিরই এটি আমরা চালু করতে পারব।
বাংলানিউজ: আপনি কৃষি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিলেন, এর জন্য আপনাদের নিজস্ব কী কৌশল হাতে রয়েছে?
হায়দার আলী মিয়া: দেখুন, ব্যাংকগুলো এখন চাঙা এবং শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই বঞ্চিত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করতে হবে। আমরা সেভাবে কাজ করছি। তবে এর আগে তাদের ব্যাংকিং পরিধির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। এজন্য বাংলদেশ ব্যাংক নির্দেশ দিয়েছে, একটি শাখা শহরে ও একটি শাখা গ্রামে করার। আমরা এর থেকে বেশি করছি। এবছর ১০টি শাখা খোলার অনুমতি পেয়েছি। এর ৮টি করা হবে উপজেলা পর্যায়ে। এর মাধ্যমে কৃষকের আমানত আমরা সংগ্রহ করতে পারব। আবার তাদের জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে পারব।
বাংলানিউজ: বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিদেশি মালিকানাতে দেশে ৪৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে। আরো ৯টি আসছে। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
হায়দার আলী মিয়া: নতুন ব্যাংক আসলে আমি মনে করি না ব্যাংকিং খাতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পরবে। বরং প্রতিযোগিতা বাড়বে। দেখুন, স্বাধীনতার পর বেসরকারি ব্যাংক ছিল না। বেসরকারি ব্যাংক করার অনুমতি না দিলে আজ শিল্পের যে বিকাশ দেখছেন তা হতো না। আমি মনে করি, নতুন ব্যাংক আসলে ব্যবসা বাণিজ্যের পরিধি বাড়বে। আমরা যেসব খাতে বিনিয়োগ করিনি, তারা সেখানে এগিয়ে যাবে। এর ফলে দেশ এগিয়ে যাবে।
বাংলানিউজ: ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে ব্যাংকের পর্ষদ প্রভাব ফেলে, এমন কথা প্রচলতি। বিশেষ করে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের কথা শোনা যায়। আপনার ব্যাংকের কী অবস্থা?
হায়দার আলী মিয়া: আপনি যা বললেন তা মোটেও ঠিক নয়। এক্সিম ব্যাংকের বোর্ড ব্যবস্থাপনায় কখনোই প্রভাব ফেলে না। ব্যাংকের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই। আমি বলব, এই বোর্ড অত্যন্ত উদার। বোর্ড সব সময় বলে, আমরা ব্যাংক করেছি, আপনারা ব্যাংক চালাবেন। আর পর্ষদের চেয়ারম্যান পদাধিকার বলে যে সুবিধা পান সেটুকুও নেন না। তাছাড়া তিনি তো শুধু এক্সিম ব্যাংকের অভিভাবক নন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি হিসেবে ব্যাংকিং খাতের অভিভাবক তিনি।
বাংলাদেশ সময়: ১২৫১ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৬, ২০১২
এসএআর/সম্পাদনা: রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর