 |
রাজশাহী: শাহাদাত হোসেন, রাজশাহী জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ের জন্য কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার সার্ভিসে ৩০ কেজি আম পাঠিয়েছিলেন শনিবার।
কিন্তু রোববার সকাল ১০টায় তার মেয়ে কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার সার্ভিসের ঢাকা অফিসে গিয়ে আম পাননি।
সেখান থেকে তাকে বলা হয়েছে, গাড়ি লোড করার সময় তার আমের ঝুড়ি বাদ পড়েছে। সোমবার আবার অফিসে গিয়ে যোগযোগ করতে হবে।
এ নিয়ে শাহাদাত সাহেব তেলে বেগুনে চটেছেন। রোববার রাজশাহী পার্সেল অফিসে গিয়ে ক্ষোভের আগুনে কর্মকর্তাদের ঝলসানোর চেষ্টা করেন তিনি।
কিন্তু কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা তার কথা গায়েই মাখেননি। তাদের সাফ কথা Ôআমাদের করার কিছু নেই|Õ শেষ পর্যন্ত শাহাদাত সাহেব এ হয়রানির জন্য মামলা দায়ের করার হুমকি দিয়ে বাড়ির পথ ধরেন। এই ছিল শাহাদাত হোসেনের আম পাঠানোর দুর্ভোগের কথা।
কিন্তু তার মতো রাজশাহীর অধিকাংশ মানুষের ভাগ্যে এমন নানা ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। হৈ চৈ এমনকি হাতাহাতিও হচ্ছে, কিন্তু সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
আমের এ ভরা মৌসুমে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রিয়জনদের জন্য আম পাঠাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত আমজনতাকে পোহাতে হচ্ছে অন্তহীন দুর্ভোগ।
রাজশাহী মহানগরীর সুন্দরবন, এসএ পরিবহন, আহমেদ, কন্টিনেন্টাল এবং করতোয়াসহ বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেল অফিস থেকে পাওয়া তথ্য মতে, মহানগরী থেকে প্রতিদিন ২০ টন আম যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে। ফলে প্রচণ্ড চাপ পড়েছে কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর ওপর।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা ছেলে-মেয়ে, আত্মিয়-স্বজনের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে চড়া দামে আম কিনে ঝুড়িতে প্যাকিং করে আনা হচ্ছে রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেল অফিসে। লোকজন তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে বুকিং দিচ্ছে, কিন্তু ঠিকমতো আম পৌঁছাচ্ছে না গন্তব্যে।
প্রিয়জনকে উন্নত জাতের ভালো আম পাঠাতে রাজশাহী মহানগরী ছেড়ে শিবগঞ্জ থেকে আম কিনে করতোয়ার শিবগঞ্জ অফিসে গত বৃহস্পতিবার একমণ আম বুকিং দেন রোকন উদ্দিন। তার রশিদ নম্বর ছিল- ৩৭৮৫৬। পাঠানোর পরদিন সকালে আম ডেলিভারি দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু শুক্রবার ঢাকার উত্তরা অফিসে গিয়ে তালা ঝুলতে দেখে সেখানে আম নিতে আসা রোকন উদ্দিনের ঘনিষ্টজন খালি হাতে বাসায় ফিরে যান। সেই আম ঢাকা পৌঁছায় দুই দিন পর।
ঘটনা পর অভিযোগ পেয়ে সাফাইয়ে কেবল ÔসরিÕ বলেছে কুরিয়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ।
এমন ভুরিভুরি অভিযোগের তীর এখন প্রায় প্রতিটি কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেল অফিসগুলোর দিকে। কারো আমই সময়মতো পৌঁছাচ্ছে না গন্তব্যে, এতে কারো কারো আম ঝুড়িতেই পঁচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ আম পাঠিয়েছে দুই মণ পৌঁছাচ্ছে এক মণ, আবার কারো আমের হদিসই মিলছেনা।
ক্ষমতার জোর থাকলে ক্ষতিপূরণ আদায় হচ্ছে। আর যারা তা পারছে না, তারা মনের চাপা ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়েই বাড়ি ফিরছে।
রাজশাহী কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থাপক হাসান চৌধুরী আম পাঠানো নিয়ে এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত চাপের কারণে দুই একটি পার্সেল ÔমিসিংÕ হতে পারে। তবে সেজন্য প্রমাণ সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।
হালে আম শেষ হয়ে আসায় সবাই আম পাঠাতে কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে ভির করছে। কিন্তু বাড়তি টাকার মুনাফা লুটলেও গ্রাহকদের ভরসার মূল্য দিতে ব্যর্থ হচ্ছে সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিন দেখা যায়, অধিকাংশ আম পাঠানো হচ্ছে ঢাকায় থেকে পড়াশুনা করা ছেলে-মেয়ে ও নিকট আত্মীয়-স্বজনের কাছে। আবার ক্ষেত্র বিশেষে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খুশি করতেও আম পাঠানো হচ্ছে রাজশাহীর বাইরে।
বিশেষ করে যাদের সন্তান ও প্রিয়জন দীর্ঘদিন দূরে আছেন, তাদের কাছে মৌসুমী ফল পাঠানোর জন্য সবাই এখন ব্যস্ত।
কিন্তু এ পরিস্থিতিতে আম পাঠিয়ে স্বস্তিতে থাকতে পারছে না কেউ।
এদিকে, মৌসুম শেষের দিকে আম নিয়ে মহানগরীর কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর এখন রমরমা ব্যবসা। আর এ সুযোগে আম পাঠানোর রেটও বাড়িয়ে দিয়েছে অফিসগুলো। আগে ঢাকায় পাঠাতে যেখানে প্রতি কেজি আমের জন্য ৮-১০ টাকা নেওয়া হতো,
এখন সেখানে নেওয়া হচ্ছে ১০-১৫ টাকা। ঢাকার বাইরে আরও বেশি। তবে হোম ডেলিভারি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবন পার্সেল শাখার কর্মচারী এনামুল বাংলানিউজকে জানান, প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ ঝুড়ি আম তাদের কুরিয়ারে ঢাকা যায়।
আহমেদ পার্সেল সার্ভিসের ব্যবস্থাপক সুবাস কুমার জানান, প্রতিদিন তাদের এখান থেকে ৩০-৫০ ঝুড়ি আম যাচ্ছে। প্রতি ঝুড়িতে ২০ থেকে ৪০ কেজি আম থাকে।
এদিকে, প্রিয়জনদের জন্য আম পাঠানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান চান ভুক্তভোগীরা।
বাংলাদেশ সময়: ১২১০ ঘণ্টা, জুন ১৭, ২০১২
সম্পাদনা: শিমুল সুলতানা, নিউজরুম এডিটর