অর্ধযুগ আগে, দুলালের কবিতাসমগ্র প্রকাশিত হবার সময়, ২০০৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ছোট্ট একটি মূল্যায়নপত্র লিখেছিলাম দুলালের সবক`টি কবিতার বইয়ের নামোল্লেখসহ।পাঠকের জন্যে সেটা উদ্ধার করি:
‘আমাদের কবিতার অঙ্গনে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল একটি অনিবার্য নাম। নিজের স্বকীয়তা প্রমাণের জন্যে ঐক্যের বিপক্ষে একা দাঁড়াতেও দ্বিধা করেন না দুলাল। দ্বিধাহীন নিঃশঙ্কচিত্ত দুলাল অপেক্ষায় আছি প্রতীক্ষায় থেকো` বলে গতানুগতিক চিরায়ত প্রেমিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবার পরপরই সবাইকে চমকে দিয়ে ঘোষণা দিতে পারেন তবু কেউ কারো নই ! সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ব্যক্তিগত পারিবারিক সামাজিক এবং রাজনোইতিক জীবনকে প্রায়শই এলোমেলো করে দেয় তৃষ্ণার্ত জলপরী রা। শহরের শেষ বাড়ি তে বসবাস করেও প্রজন্মের কবিদের মধ্যে দুলালই সর্বপ্রথম অবলোকন করেন ঘাতকের হাতে সংবিধান । পরের জায়গা পরের জমিন-এ দাঁড়িয়ে বিপন্ন স্বদেশের ক্ষত-বিক্ষত মানচিত্র দেখে বিক্ষুব্ধ আহত বেদনার্ত দুলালের বিমূর্ত উচ্চারণ—একি কাণ্ড! পাতা নেই শুনে বাংলা কবিতার অভিভূত পাঠক তাঁর দ্রবীভূত গদ্যপদ্য পাঠ শেষে এলোমেলো মেঘের মন-এ নিজের চিন্তা চেতনা মনন ও মেধার প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হতে দেখেন। নির্জনে কেনো এতো কোলাহল এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে পাঠককে ফের ফিরে যেতে হয় কোলাহলপূর্ণ সেই জনারণ্যেই! পৃথিবীজুড়ে নর-নারীর সামাজিক-মানবিক-মানসিক-শারীরিক জটিল সম্পর্কের যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগের ম্যাথ ও মিথের মিথস্ক্রিয়ায় নিদ্রার ভেতর জেগে থাকা কীর্তিমান এই কবির অপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থর ঘৃণিত গৌরবসমূহ তাঁর কবিতাসমগ্রকে দিয়েছে অপরূপ পরিপূর্ণ এক কাব্যিক অবয়ব।’
ঢাকায় আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় আমার ছোটদের কাগজের অফিস ছিলো। একই ফ্লোরে অফিস ছিলো দুলালেরও। আমার অফিস কক্ষ থেকে দুলালের অফিস কক্ষের দূরত্ব ছিলো সাত সেকেন্ডের। অর্থাৎ কীনা একদা দুলাল আর আমার দূরত্ব ছিলো সাত সেকেন্ডের। পরবর্তীতে দুলাল নিজের স্বার্থে স্বউদ্যোগে আমাদের মধ্যকার দূরত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছেন। সাত সেকেন্ড থেকে আমাদের দূরত্ব দাঁড়িয়েছে পাঁচ ঘন্টা! হ্যাঁ, দুলাল আর আমার দূরত্ব এখন পাঁচ ঘন্টার। আমি থাকি অটোয়ায়। দুলাল টরন্টোতে। অটোয়া থেকে টরন্টোর দূরত্ব ৫০০ কিলোমিটার। ঘন্টার হিসেবে বাস-এ চেপে সেখানে যেতে পাঁচ ঘন্টা লাগে। ২০০৫ সালে কানাডা এসে দুলাল অটোয়াতে আমার নাগালেই ছিলেন কিছুদিন। সাত সেকেন্ড থেকে আমাদের দূরত্ব নেমে এসেছিলো শূন্য সেকেন্ডে। কিন্তু দুলাল বোকা নন। আমি বোকার মতো পড়ে থাকলাম অটোয়াতেই আর দুলাল আমাকে ফেলে টরন্টো চলে গেলেন বৃহত্তর অপরচুনিটির হাতছানিতে।
দুলাল। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। আমার কবিবন্ধু। আমাদের বন্ধুত্বের বয়েস কম করে হলেও তিন দশক। একসময় ঠাটারিবাজার বিসিসি রোডে থাকতেন দুলাল। আমাদের হেয়ার স্ট্রিটের বাসা থেকে হাঁটাপথের দূরত্বে। আমরা তখন তরুণ লেখক। বাংলাসাহিত্যকে একটা ঝাঁকুনি দিতে চাই কিন্তু পারি না। উলটো বাংলাসাহিত্য আমাদের ঝাঁকুনি দিয়ে ফেলে দেয়! আমি ছড়াকার হতে চাই আর দুলাল হতে চান কবি। এই হতে চাওয়াটার পেছনে আমরা ছুটেছি অবিরাম। জন্মসূত্রেই ঢাকায় ছিলাম বলে আমার স্পিডটা ছিলো খানিকটা বেশি। কবি হবার জন্যে দুলাল ঢাকায় হিজরত করেছিলেন শেরপুর থেকে। সুতরাং দুলালের দৌঁড়োনোর স্পিড আমার থেকে খানিকটা কম হলেও দৌঁড়ুচ্ছিলেন তিনি ক্লান্তিহীন। কবি হবার জন্যে কতো কষ্টকর পথ যে পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে! কতো অপমান অনাদর আর অবজ্ঞাই না সয়েছেন তিনি জীবনে!
`প্রতিরোধ` নামে আনসার ভিডিপির একটা পাক্ষিক পত্রিকা ছিলো। এই পত্রিকায় চাকরি করতেন দুলাল। খুব বড় কোনো চাকরি নয়। কিন্তু বেঁচে থাকবার অবলম্বন হিসেবে জরুরি ছিলো চাকরিটা। নব্বুইয়ের মাঝামাঝি সময়। আওয়ামী লীগ তখন বিরোধী দলে। আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালের সময় একদিন অফিসে অনুপস্থিত থাকার কারণে দুলালের তৎকালীন বস তাকে একটা রাম টাইট দিলেন কায়দা বুঝে। অন্যায়ভাবে তাকে চাকরি থেকে উৎখাত করা হলো। রাজনীতির ঘোরের মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে থাকা আমি তখন খালেদা সরকারকে উৎখাতের আন্দোলনে একজন সাহসী সৈনিক হিসেবে রাজপথে সক্রিয়। ১৯৯৬-এর মার্চ মাসে ঢাকার প্রেসক্লাবের সামনে আমরা জনতার মঞ্চ বানিয়েছি। আমার দিন-রাতের সিংহভাগ তখন ওখানেই কাটে। এক বিকেলে আমি মঞ্চে বসে আছি। সামনে বিপুল জনস্রোত। অনুষ্ঠান চলছে। মঞ্চের ডানদিকে তাকিয়ে দেখি দুলাল আমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। এগিয়ে গেলাম। একটা বিবৃতিতে আমার স্বাক্ষর চান দুলাল। অন্যায়ভাবে তার চাকরিচ্যুতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যৌথ বিবৃতি। মঞ্চ থেকে উপুড় হবার ভঙ্গিতে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দুলালের হাত থেকে বিবৃতিটা নিয়ে দ্রুত সই করলাম। বিবৃতিটা ফেরৎ নিতে নিতে ক্ষীণ কণ্ঠে দুলাল জানতে চাইলেন মঞ্চে থাকা ভিআইপি রাজনীতিবিদদের কারো কারো কাছ থেকে বিবৃতিটাতে দুএকটা সিগনেচার নেওয়া সম্ভব কীনা। সম্ভব নয় মানে? আমি টপাটপ স্বাক্ষর নিয়ে নিলাম অনেকগুলো। তোফায়েল আহমেদ, সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী থেকে ওবায়দুল কাদের পর্যন্ত একগুচ্ছ রাজনীতিবিদ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করলেন। যাদের স্বাক্ষর নিলাম তাদের মধ্যে ডজনখানেক ক`দিন বাদেই হাসিনা সরকারের মন্ত্রী হলেন। দুলালের পক্ষে বিবৃতিটা পত্র-পত্রিকায় ছাপাও হয়েছিলো। আর দুলাল বিবৃতিদাতাদের নাম ও স্বাক্ষরসহ একটা লিফলেট ছাপিয়েছিলেন। কোনো একজন ব্যক্তির পক্ষে বাংলাদেশের শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-রাজনীতিবিদদের যৌথ বিবৃতির ক্ষেত্রে সেটা একটা রেকর্ডই ছিলো। সর্বমোট পাঁচশ জনের স্বাক্ষর ছিলো তাতে। এতো অধিক সংখ্যক বিখ্যাত মানুষ আর কোনো বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন বলে আমার জানা নেই। দুলালের সেই রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারেননি!
‘শিল্প-সাহিত্যে শেখ মুজিব’(১৯৯৬) এবং ‘মুজিব হত্যা মামলা’(২০০০) নামে দুলালের দুটি বই আছে। বইদুটির নামলিপি আমার করা ছিলো, ফ্রি হ্যান্ড লেটারিঙ-এ। যদিও দুলাল সেটা উল্লেখ করেননি প্রিন্টার্স লাইনে। কিন্তু তাতে কিছু এসে যায়নি। আমাদের বন্ধুত্ব অটুট আছে। হানিফ সংকেতের ইত্যাদি অনুষ্ঠানের টাইটেল সং ‘কেউ কেউ অবিরাম চুপিচুপি’ও আমার লেখা। কিন্তু হানিফ টেলপে আমার নাম দেয় না। তাতেও কিছু এসে যায়নি। আমাদের বন্ধুত্ব অটুট আছে। আসলে বন্ধুত্বটা এমন একটা ব্যাপার যেখানে দুয়ে দুয়ে চার খুঁজতে যাওয়াটা বোকামি। দুলাল আমার ওপর রাগ করলেন না তো! প্লিজ রাগ করবেন না বন্ধু। আপনি তো আমাকে বইও উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু আমি এখনো করিনি। ২০১৩ সালে নিশ্চয়ই আমার একটি বইয়ের উৎসর্গপত্রে আপনার নামটি হাসতে হাসতে দ্যুতি ছড়াবে।
দুলালের কবিতার একজন অনুরাগী পাঠক আমি। ১৯৮৫ সালে ‘তবু কেউ কারো নই’ নামে দুলাল আর নাসিমা সুলতানার একটি যৌথ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিলো। দুই মলাটের একপিঠে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল আর অন্যপিঠে নাসিমা সুলতানা। কবি অরুণাভ সরকারের লিটলম্যাগ ঈষিকা-য় আমি ছোট্ট একটি আলোচনা লিখেছিলাম দুলাল অংশের। নাসিমা খুবই অভিমান করেছিলেন আমার ওপর। সরাসরি একদিন জিজ্ঞেসও করেছিলেন—‘শুধু বন্ধুর অংশটাই গুরুত্ব পেলো? আমাকে চোখেও পড়লো না!’ আমি খুবই লজ্জিত হয়ে বলেছিলাম, ‘বন্ধু বলে কথা। চিত্ত করে নিত্য বন্ধুকৃত্য!’ আমার বলবার ভঙিটা এমনই নৃত্যময় ছিলো যে বেশিক্ষণ সিরিয়াস চেহারাটা জোর করে ধরে রাখতে পারেননি নাসিমা। হেসে উঠেছিলেন উচ্চৈ:স্বরে। বলেছিলেন, ‘আমাকে আপনি পছন্দ না করলেও আমি আপনাকে পছন্দ করি।’ আমি বলেছিলাম, ‘পছন্দ করেন আমাকে আর বই করেন দুলালের সঙ্গে!’ এইবারও উচ্চৈ:স্বরে হেসে উঠেছিলেন নাসিমা। আহারে নাসিমা সুলতানা, তখন কি জানতাম যে এতো আগে আপনি চলে যাবেন! এই যে দেখেন দুলালের কবিতার প্রসঙ্গে বলতে গেলেই আপনাকে আমার মনে পড়ে যায়! জীবনটা সত্যি অদ্ভুত একটা মায়ার খেলা নাসিমা!
দুলাল প্রসঙ্গে ফিরি। ২০০৮-এ আমি বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেলাম। ঢাকা থেকে কানাডা ফিরে আসার পর টরন্টোতে দেলওয়ার এলাহীর নেতৃত্বে আমার বন্ধুরা একটি সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলেন। এককালের বাংলাদেশ টেলিভিশন ও এফডিসির ডিজি সালাহউদ্দীন জাকী ছিলেন সেই অনুষ্ঠানের অন্যতম বিশেষ অতিথি। আমার জীবনে দুটি বিস্ময়কর বক্তৃতা শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছিলো সেদিন। একটির বক্তা ছিলেন জাকী ভাই। অন্যটি দুলালের বক্তৃতা। আমার সংবর্ধনা অনুষ্ঠান কিন্তু সালাহউদ্দীন জাকী তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতায় আমার সম্পর্কে একটি বাক্যও খরচ না করে আমাদের শিল্প-সাহিত্যে শুধু তাঁর নিজের অবদানের ফিরিস্তি তুলে ধরেছিলেন! তিনি কবে কখন কোথায় সংকলন বের করেছিলেন সেই কাহিনিও বলেছিলেন অপূর্ব ভঙ্গিতে। এক ধরণের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস থেকেই জাকী ভাই ওরকম করেছিলেন বলে ধারণা করি। আর দুলাল আমাকে তুলে ধরেছিলেন অন্যরকম আবহে। তার কানাডা আগমন, অটোয়ায় অবস্থান এবং সেই সময়ে বন্ধু হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমার ভূমিকার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এক পর্যায়ে আবেগাপ্লুত দুলাল আমাকে তাঁর দ্বিতীয় জনক হিসেবে উল্লেখ করলেন। জবাবে আমি সেইদিনও বলেছিলাম, আজও বলি—দুলাল, আপনি আমার বন্ধু। বন্ধুর প্রতি বন্ধুর দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকে। সেটা পালন করাটা বন্ধুত্বের অন্যতম প্রধান শর্তও। জীবনে,সময়ের প্রয়োজনে একজন বন্ধুই হয়ে ওঠেন একজন মানুষের প্রধান অবলম্বন। বাংলাদেশ থেকে বারো হাজার দুইশ কিলোমিটার দূরের দেশ কানাডায় আত্মীয়-স্বজনহীন নিঃসঙ্গ প্রবাস জীবনে আপনার মতো একজন বন্ধু আমার আছে, সেটা ভাবতে পারাটাও কিন্তু বিরাট একটা শ্লাঘার ব্যাপার দুলাল! ঢাকার আজিজ মার্কেট থেকে অটোয়ার রিডো সেন্টার কিংবা কার্লিংউড মল-এ আমরা পাশাপাশি বসে আছি, ধোঁয়া ওঠা কফিতে চুমুক দিতে দিতে সুখ-দুঃখকে ভাগাভাগি করে নিচ্ছি—এইরকম সাধারণ অথচ অসাধারণ দৃশ্যের স্মৃতি কিন্তু দুলাল ভোলা যায় না। আমাদের সাত সেকেন্ডের দূরত্বকে আপনি পাঁচ ঘন্টায় উন্নীত করেছেন। আমাকে অটোয়ায় ফেলে রেখে আপনি টরন্টো চলে গেছেন। আমার হাতটি ছেড়ে দিয়ে আমার চাইতেও শক্তিশালী নতুন কোনো বন্ধুর হাত ধরেছেন। কিন্তু দুলাল, আপনি জানেন না, পাঁচ ঘন্টা কেন পাঁচ আলোকবর্ষ দূরেও যদি চলে যান আপনি, জানবেন আমি আপনার ছুঁয়ে দেয়া দূরত্বেই আছি।
৩০মে আপনার জন্মদিন। হ্যাপি বার্থ ডে দুলাল!
riton100@gmail.com;
সম্পাদনা: জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর