 |
ময়মনসিংহ: আধিপত্য বিস্তারের নামে নৃশংসতা, রগকাটা কিংবা পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দেশব্যাপী দারুণভাবে বিতর্কিত হয়ে পড়েছে ইসলামকে পুঁজি করে রাজনীতি করা জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির।
ময়মনসিংহে জামায়াত-শিবিরের ঝটিকা মিছিল ছাড়া প্রকাশ্যে দলটির কার্যক্রম নেই। নেই শক্তির কোনো মহড়া। ৯ ডিসেম্বের অবরোধেও ২/১টি স্থানে বিএনপির সঙ্গে এক হয়ে মিছিল করেছে সংগঠন দুটির নেতাকর্মীরা। লিফলেটও বিতরণ করেছেন তারা।
এদিকে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের বিতর্কিত ভূমিকা প্রসঙ্গে জেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি আনোয়ার হাসান সুজন বাংলানিউজকে বলেছেন, “আগের ইতিহাস টেনে লাভ নেই। সত্যিকার দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল জামায়াত এবং শিবির।”
১৯৭১ সালে তাদের বিতর্কিত ভূমিকাকে অস্বীকার করে বলেছেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় দোষ, আমরা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অবিচল। আমরা বাংলাদেশকে কোনো দেশের চর হতে দেবো না।”
এদিকে, অনেকটাই আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে ময়মনসিংহে জামায়াত-শিবির রাজনীতি করে যাচ্ছে। কয়েকবার জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান ছাত্রলীগের প্রতিরোধের মুখে পড়েছে।
এদিকে, গত এক মাসে সারা দেশে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ। বেশিরভাগ মানুষ ধর্মের লেবাসে রাজনীতির নামে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করার বিষয়টিকেও ভালোভাবে দেখছেন না। তাদের মতে, “ইসলাম ভালো। তবে জামায়াতে ইসলামী ভালো নয়।”
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেও ময়মনসিংহে জামায়াত-শিবির অনেকটাই কোণঠাসা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তারা নিজেদের প্রকাশের জন্য বিভিন্ন যানবাহনে ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াওসহ পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতাসহ অন্যদের বিচার কাজ সম্পন্ন হতে চলেছে। সরকারের এ তৎপরতা ঠেকাতে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা তাই মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
এবিষয়ে জানতে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তাজউদ্দিন আহমেদ রানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “জামায়াত-শিবির ড্রাকুলার। এরা ইসলামকে পুঁজি করে রাজনীতি করে যাচ্ছে। ছাত্রলীগ ময়মনসিংহে জামায়াত-শিবিরকে প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছে।”
তিনি বলেন, “জামায়াত-শিবির যাতে ময়মনসিংহে সন্ত্রাস বা নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া এ সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা তৎপর রয়েছেন।”
এদিকে, ময়মনসিংহে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষ মনে করেন, ছাত্রলীগ নেতা তাকিমের রগ কাটার মধ্য দিয়ে পুরনো রগকাটার রাজনীতি শুরু করেছে জামায়াত-শিবির। পৈশাচিক এ ঘটনাটি দেশের অন্যান্য স্থানের মতো ময়মনসিংহের মানুষের হৃদয়কেও দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে।
এছাড়া প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় জামায়াত-শিবিরের নৃশংস ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশের পর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে ময়মনসিংহের সাধারণ মানুষের মধ্যে।
ময়মনসিংহ শহরের সানকিপাড়া রেলক্রসিং সংলগ্ন কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল হক (৫০), শহরের মিন্টু কলেজ বাজার এলাকার মাছ ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমের (৩৫) সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সাম্প্রতিক কার্যাকলাপ নিয়ে কথা হলে তারা এর তীব্র নিন্দা জানান এবং এ সংগঠন দুটির প্রতি ঘৃণা উচ্চারণ করেন।
একই ধরনের মন্তব্য করে এ দু’ক্ষুদে ব্যবসায়ীই বলেন, “জামায়াত-শিবির পুলিশকেও মানছে না। ওরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। দেশের শান্তি বিনষ্ট করছে। ইসলামের নাম ব্যবহার করা এ সংগঠন দুটির বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তে আসা উচিত।”
চরমোনাই পীর সাহেবের নেতৃত্বাধীন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন জেহাদী বলেন, “একটি রাজনৈতিক দল ধর্মের নাম ভাঙিয়ে রাজনীতি করছে। দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে।”
ময়মনসিংহ জেলা জাকের পার্টির যুব ফ্রন্টের সভাপতি শহীদুল্লাহ খান বলেন, “জঙ্গি মদদদাতা সংগঠন জামায়াত-শিবির। সংসদে আইন করে এ সংগঠনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত।”
শহরের খাগডহর এলাকার ডলি বেগম নামে মধ্যবয়সী এক গৃহিণী বাংলানিউজকে বলেন, “টিভিতে জামায়াত-শিবিরের বর্বরতার দৃশ্য দেখেছি। ওরা মানুষ হয়ে কীভাবে মানুষের সঙ্গে নির্দয় আচরণ করছে? এমন বর্বরতা কারোরই কাম্য নয়।”
ময়মনসিংহ জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাদিক হোসেন বলেন, “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এখন গণদাবি। এ গণদাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত দেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সব মানুষের এক কাতারে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। খুব দ্রুত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শেষ করতে হবে।”
ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান সভাপতি ও ময়মনসিংহ-৪-সদর আসনের সংসদ সদস্য প্রিন্সিপ্যাল মতিউর রহমান বলেন, “ইসলাম নিশ্চয়ই ভালো। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ভালো নয়। এদেশে ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী থাকবে না। দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে আন্তজার্তিক মানদণ্ডে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই এ বিচার কাজ সম্পন্ন হবে।”
সাধারণ মানুষ বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা জামায়াত বা শিবিরের কোনো নেতাকর্মী সরাসরি কথা বলতে চাননি।
মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের বিতর্কিত ভূমিকা প্রসঙ্গে জেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি আনোয়ার হাসান সুজন বাংলানিউজকে বলেন, “আগের ইতিহাস টেনে লাভ নেই। সত্যিকার দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল জামায়াত এবং শিবির।”
তিনি বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় দোষ আমরা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অবিচল। আমরা বাংলাদেশকে কোনো দেশের চর হতে দেবো না।”
ময়মনসিংহ শহর জামায়াতের আমির মোজাম্মেল হক বলেন, ‘জামায়াত-শিবির দেশের মানুষকে ভালোবাসে। আমরা শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। দেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়া হয় না। এটা প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু জামায়াত-শিবিরের বেলায় এ অধিকার হরণ করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “সবার মনে রাখা উচিত, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দল নয়। অন্য দলগুলোর মতোই আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাস করি।”
৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামে জামায়াত-শিবিরের ভূমিকা প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, “ওই সময়ের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন।”
ময়মনসিংহে জামায়াত-শিবিরের কার্যক্রম সম্পর্কে গোয়েন্দা পুলিশ সতর্ক রয়েছে দাবি করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফখরুদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, “পুলিশের তীক্ষ্ম নজরদারি রয়েছে।”
বাংলাদেশ সময়: ২০২১ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২১, ২০১২
সম্পাদনা: আশিস বিশ্বাস, অ্যাসিস্ট্যান্ট আউটপুট এডিটর