৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, বৃহস্পতিবার মে ২৩, ২০১৩ ২:১৫ এএম BDST banglanew24
26 Aug 2012   06:11:29 PM   Sunday BdST
E-mail this

ছোটগল্প

ভূতসঙ্গী


মাইদুর রহমান রুবেল
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ভূতসঙ্গী ছোটগল্প

রাত ১২টা ২৫ মিনিট। বাস চলছে, বান্দরবানের উদ্দেশ্যে। রাতের মধ্য প্রহরে মহাসড়কগুলোতে জনজীবনের অস্তিত্ব খুব একটা চোখে পড়ে না। সবুজের চোখে তন্দ্রা চেপেছে। বার বার হাই উঠছে। ঘুমরাজ্য হাতছানি দিচ্ছে তাকে। তার পাশের সিটের সিট পার্টনার গাড়িতে উঠেই চোখ বন্ধ করে আছে। দেখে মনে হচ্ছে পরিতৃপ্তির সাথে ঘুমাচ্ছে সে। এদিক সেদিক তাকিয়ে সিটে হেলান দিল সবুজ। সারাদিন কাজ করার পর কিছুটা ক্লান্ত। বাসের সিটে বসে ঘুম আসছে না তবু ক্লান্ত চোখ দু’টাকে খুলতে পারছেনা। সবুজের আপ্রাণ চেষ্টা ঘুমানোর, চেষ্টায় সফলও হলো। নড়াচড়া বন্ধ হয়েছে, অবশেষে ঘুমরাজ্যে প্রবেশের অনুমতি মিলেছে তার।

নীলগিরি পাহাড়ে উঠেছে সবুজ। এটা তার কাজের অংশ নয়। তবু উঠেছে। তার ও একটা কারণ আছে। কারণটা হলো নীলগিরিতে পাহাড় এবং আকাশ একসাথে মিশে যায়। অর্থাৎ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে আকাশের ভেসে বেড়ানো মেঘগুলো মানবশরীর ছুঁয়ে যায়। আজ আকাশে রোদ তুলনামূলক কম। কারণ আকাশের মন খানিকটা খারাপ। আর তাই আজ আকাশে বেশি মেঘ উড়ছে। যে কোন সময় আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘগুলো বৃষ্টি হয়ে ঝড়তে পারে। সবুজ মেঘ ছোঁয়ার নেশায় পাহাড়ের পথে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে বড় একটা মেঘের খণ্ড ভেসে এলো সবুজের দিকে। সে হাত বাড়িয়ে দিল মেঘের স্পর্শ পাবার জন্য। বড় দাঁত সমেত একটা মুখ বেড়িয়ে এলো মেঘের সে ভেলা থেকে। সবুজ বিদ্যুৎ গতিতে হাত সরিয়ে নিল। দাঁত কেলিয়ে হাসতে শুরু করলো সেই মুখটা। সবুজ মাটিতে বসে পড়ল। কিন্তু না লাভ হবে বলে মনে হচ্ছে না। সময়ের সাথে মুখের ছবিটা ভয়ংকর হতে লাগলো। ভয়ে সবুজের কলিজা গলে যাওয়ার উপক্রম। এদিক সেদিক তাকাচ্ছে সে। কোথাও কেউ নেই। চিৎকার করার চেষ্টা করছে। কোন লাভ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। গলা থেকে কোন প্রকার আওয়াজ বের হচ্ছে না। এই অশরীরীর হাত থেকে রক্ষা পেতে পিছনে ফিরতে থাকে সবুজ। পেছনে আর জায়গা না থাকায় পাহাড় থেকে নিচে পড়ে যায়। সবুজ এখন শূন্যে ভাসছে। এর মধ্যে একটি হাত ধরে ফেলে তাকে। লম্বা একটি হাত। কার হাত তা দেখতে পারছে না সবুজ। হাতটি খানিক পিচ্ছিল। রক্ত মাখা হাতে কেউ একজন ধরে আছে তাকে। সবুজের চিৎকারে হাতটি ছেড়ে দেয় তাকে। আকাশ থেকে মাটিতে পড়তে লাগলো সবুজ। মাটিতে পড়ার আগে লাফিয়ে উঠে সে। ঘুম ভেঙে যায় তার। না, পাহাড় কোথায়। এখনো তো বাসে বসা। তার পাশের লোকটি এখনো ঘুমাচ্ছে।

রাত ৩টা বেজে ১৭ মিনিট। চোখ বন্ধ করে আছে সবুজ। বাস চলছে পাহাড়ি পথ ধরে। চলন্ত বাসে এমন একটা দুঃস্বপ্ন দেখে সে ভাবে এর অর্থ কি? কোন বিপদ আপদ সামনে অপেক্ষা করছে না তো। নানান ভাবনা তার মাথায় খেলা করছে। কিছু একটা গন্ধ ভেসে আসছে সবুজের নাকে। গন্ধটা অপরিচিত। কিসের গন্ধ ঠিক বুঝতে পারছেনা। কাউকে জিগ্যেস করে মনের কৌতূহল দূর করবে তার উপায় নেই। কারণ সবাই গভীর ঘুমে। এই মুহূর্তে পুরো বাসে পিনপতন নীরবতা। গাড়ির ইঞ্জিনের আওয়াজ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই। চালক এক মনে গাড়ি চালাচ্ছে।

ঘুমন্ত লোকটি একটু পর পর হেলে পড়ছে সবুজের কাঁধে। বেশ কয়েকবার সরিয়ে দিতে হাত বাড়াতেই আপনা আপনি সরে গেছে লোকটি। কিন্তু না এবার আর সরলো না। সবুজ ঠেলে কাঁধ থেকে সরানোর চেষ্ট করছে ঘুমন্ত লোকটির মাথাটাকে। মনে হচ্ছে সরাতে পারছে না। হয় অনেক ওজন মুণ্ডুটার অথবা সবুজের শক্তি লোপ পেয়েছে। শক্তি সঞ্চার করার চেষ্টা করছে সবুজ, ঠেলে সরানোর প্রচেষ্টা এবারও ব্যর্থ হলো তার। কিন্তু এবার নতুন একটা বিষয় আবিষ্কার করলো সবুজ। লোকটার মুণ্ডুটা প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। মনে হচ্ছে ডিপ ফ্রিজ থেকে এই মাত্র বের করা হয়েছে। চমকে উঠে সবুজ একি তার পাশে যে লোককে সে দেখেছিল এটা সেই লোক না! অন্য কেউ। নাক মুখ কেমন চ্যাপ্টা, চোখ নাই। চিৎকার করার চেষ্টা করছে সবুজ। এবারও তার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না। সিট ছেড়ে সরে যেতে চাইছে। কিন্তু না, কাজ হচ্ছে না। মনে হয় শরীরের ইন্দ্রিয়গুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। এক ফোঁটা শক্তি পাচ্ছে না সে। অথচ এই উদ্ভট মানবটা তাকে ধরে রাখেনি। সবুজ হাত বাড়িয়ে সামনের সিটের যাত্রীকে ডেকে তোলার চেষ্টা করে। এই যাত্রায় সফল হতে পারে না সে। কারণ সামনের সিটে কোন যাত্রী নেই। পাশের সিটেও কাউকে দেখা যায় না। এবার পেছনের সিটে হাত দিয়ে দেখে সে সিটেও কেউ নেই। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায় সবুজ। ব্যাপার কি আশপাশের সিটের লোকজন কই গেল, নাকি বাসে আর কোন যাত্রী উঠেনি তা মনে করতে পারছে না সে।

মৃদু হাসে উদ্ভট মানবটা। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না সে ভূত নাকি অন্য কিছু।এবার সে সবুজের হাতটা টেনে ধরে। সবুজ ভয় পাচ্ছে কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না। প্রথানুযায়ী, বাসে রাতে লাইট নেভানো থাকে। সেই নিয়মে বাসের লাইট অফ। কেউ দেখছে না কাউকে। শুধু হেড লাইটের আলোয় পথ দেখছে চালক। হাসির আওয়াজ অস্বাভাবিক। কিঁকঁ কিঁকঁ কেঁকঁ কেঁকঁ, উদ্ভট আওয়াজ করে হাসছে সে। পাশাপাশি বসে আছে তারা দু’জন।  রহস্য মানবটার শরীর এতই ঠাণ্ডা যথারীতি শীত ধরে গেছে সবুজের। মনে হচ্ছে তার গায়ে এক ফোঁটা রক্ত নেই। তার রক্তের প্রয়োজন। আসলেই রক্তের প্রয়োজন এই ভূতের। এবার সে নিজেই স্বীকার করলো। শোন্, আমার শরীরের রক্ত ফুরিয়ে গেছে। রক্ত না হলে আমি মরে যাবো। আমি মরতে চাইনা। আমার রক্ত চাই। তোকে আমার পছন্দ হয়েছে। আমি তোর রক্ত পান করবো। এমন অদ্ভূত কথা শুনে আরো ভয় পেয়ে যায় সবুজ। কাঁটাতারের বেড়া ছিঁড়ে যেতে পারেনা কেউ, সেও পারে না। ড্রাকুলার মতো মাড়ির দু’পাশে বড় বড় দাঁত এই ভূতের। হা করা মুখটা এগিয়ে আসে সবুজের ঘারের কাছে। ভয়ে চোখ বন্ধ করে চিৎকার করার চেষ্টা করে সে।

গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেছে। ভেতরের লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছে চালক। সবুজকে অক্টোপাসের মতো আটকে ধরা হাতগুলো সেকেন্ডের মধ্যে মিলিয়ে গেলো শূন্যে। কোন চিহ্ন নেই এখন। সবুজ শুকনো কাশি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। ধীরে সরে পড়লো নির্দিষ্ট আসন ছেড়ে। চালকের দিকে এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলো গাড়ির সমস্যার বিষয়ে। গাড়িতে এখনো যাত্রীরা ঘুমে। কারো কোন সাড়া নেই। চালক এবং তার সহকর্মীরা নেমে গাড়ির ত্রুটি সাড়ে।

ভোর ৫টা। অন্ধকার কেটে গেছে। গাড়ী চলছে। কিছুক্ষণের মধ্যে গন্তব্য। এর মধ্যে নিজের সিটে যায়নি সবুজ। চালকের আসনের পাশে ইঞ্জিনের ঢাকনার উপর বসে আছে সে। অজুহাত দেখিয়েছে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার জন্য সিট ছেড়ে এইখানে বসেছে।

সাড়ে ৬টা বাজে। কিছুক্ষণ আগে সূর্য উঠেছে। গ্রামে সূর্য ওঠা মানে পুরো সকাল। বান্দরবানে এখন পূর্ণ সকাল। বাস থেকে নেমেছে সবুজ। কাঁধে একটা ব্যাগ। একটা এনজিওতে কাজ করে সে। পাহাড়িদের জীবনমান নিয়ে একটি প্রতিবেদনের কাজে এসেছে সে। রাস্তার দু’পাশে পাহাড়িদের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। পাহাড়ি পোশাক নারীদের গায়ে জড়ানো। তবে এই মুহূর্তে একটু বিশ্রামের দরকার সবুজের। এমনিতেই লম্বা জার্নি তার উপর একটা দুঃস্বপ্ন তবে পরের ঘটনাটাকে সে বিশ্বাস করতে পারছেনা। এটা কি স্বপ্ন নাকি সত্যি। একটা স্বপ্ন একটা সত্য, নাকি দুটোই স্বপ্ন। তালগোল পাকিয়ে ফেলছে সে।

রাত ১০টা। সারাদিন এনজিওর কাজ করেছে। এসাইনমেন্ট কমপ্লিট। রাতের আহার শেষ করে হোটেলে ফিরেছে সবুজ। তার ইচ্ছে পরদিন নীলগিরি আর চিম্বুক বেড়াতে যাবে। কারণ স্বর্ণ মন্দির এবং মেঘলা আগের বার এসে বেড়িয়েছে। নীলগিরি যাওয়ার প্লান থাকলেও সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা যাবে কি যাবে না। কারণ রাতের কথা মনে পড়ে যায়। যদি সত্যি সত্যি কিছু হয়ে যায়। পাহাড় পর্বতের বিশ্বাস নেই। সেই ধরনের ঘটনা না ঘটে অন্য কোন দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে চোখে ঘুম চেপে যায়। মনে হচ্ছে কেউ তার চোখ জোর করে বন্ধ করে দিচ্ছে।

রাত ৩টা ২৩। আগের রাতে বাসের সেই গন্ধটা আবার ভেসে আসে সবুজের নাকে। ঘুম ভাঙ্গে তার। গন্ধটার সন্ধানে এদিক সেদিক তাকায় সে। কোথাও কেউ নেই। হোটেল কক্ষে মৃদু আলো আছে। আবারো চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছে সবুজ। আবার গন্ধটা নাকে লাগে তার। কিঁকঁ কিঁকঁ করে আবার হাসির সেই আওয়াজটা তার কানে ভাসে। চোখ খুলে উঠে বসে পড়ে সে। এবার সেই রহস্য মানব সামনে তার। তবে আজ তার প্রিপারেশন ভিন্ন। বড় কালো কোর্তা পড়া চুল বড় বড়। হাতের নখগুলো কাঁটা চামচের মতো। ভয়ংকর কিছু একটা করার প্রস্তুতি তার। মিটিমিটি হাসছে কিঁককিঁক করে। লাইট জ্বালাতে চায় সবুজ কিন্তু সুইচ বোর্ডটার সামনে বাকা হয়ে দাড়ানো এই প্রাণীটা। সবুজ জানতে চায় কি চান? প্রত্যুত্তরে সে বলে আমি রক্ত চাই। গতকাল রাতে তোর রক্ত খেতে চেয়েছিলাম, বেঁচে গেছিস। কিন্তু আজ কি করে রক্ষা পাবি বল। সবুজ দোয়া পড়ার চেষ্টা করছে কোন দোয়া মনে পড়ছে না তার। চিৎকার করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। কক্ষ জুড়ে লাফালাফি করছে, সবুজকে ধরার চেষ্টা করছে ভূতটা। আর সবুজ চেষ্টা করছে রুমটার দরজাটা কোন মতে খুলতে পারলে বাঁচা যাবে। দু’জনের ভিন্ন দু’ উদ্দেশ্যে লম্ফঝম্ফ চলছে..

বাংলাদেশ সময়: ১৮১৫ ঘণ্টা, ২৬ আগস্ট, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস, নিউজরুম এডিটর mjferdous0@gmail.com

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান