 |
ঢাকা : পুঁজিবাজার সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের মন্তব্য সম্পর্কে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ’র (ডিএসই) প্রেসিডেন্ট মো. রকিবুর রহমান বলেছেন, ‘‘অর্থমন্ত্রী একটু অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। তার মতো একজন মানুষের কাছ থেকে আমরা এ ধরনের মন্তব্য আশা করি না।’’
সোমবার জাতীয় সংসদে দেশের শেয়ারবাজারকে ‘দুষ্টু বাজার’ বলে আখ্যায়িত করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। মঙ্গলবার ডিএসই’র বোর্ড রুমে সাংবাদিকদের কাছে অর্থমন্ত্রীর এ মন্তব্য সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ডিএসই’র প্রেসিডেন্ট।
রকিবুর রহমান বলেন, ‘‘অর্থমন্ত্রীর কথায় আমি ডিএসই’র প্রেসিডেন্ট হিসেবে ব্যথিত হয়েছি। এই পুঁজিবাজার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশ অবদান রেখে চলেছে। ভবিষ্যতে আরো অবদান রাখবে।’’
‘‘এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যাসেল-১, ২ বাস্তবায়ন করতে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে। প্রায় সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৭০ শতাংশ অর্থ পুঁজিবাজার থেকে সংগৃহীত করা হয়েছে। এই পুঁজিবাজার দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রেখেছে।’’
তিনি আরো বলেন, গত ৩ বছরে দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো যেমন- গ্রামীণফোন দেশের পুঁজিবাজার থেকে টাকা সংগ্রহ করেছে। এছাড়া ২০০৮ সালে সরকারি কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজার থেকে ১৯ শ’ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। টেক্সটাইল, সিমেন্ট, ওষুধ, ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজার থেকে টাকা সংগ্রহ করে তাদের কোম্পানি সম্প্রসারণ করেছে।
ডিএসই’র প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘‘সরকার ডিএসই থেকে গত ৩ বছরে মোট ১ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পেয়েছে। এই পুঁজিবাজার বিকল্প অর্থ সংগ্রহের জায়গা।’’
‘‘ভারত সরকার সে দেশের পুঁজিবাজার থেকে টাকা উত্তোলন করে পিপিপির আওতায় বড় বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করছে। আমাদের দেশেও সেটা করা সম্ভব। পুঁজিবাজার থেকে টাকা তুলে পদ্মা সেতু করা যায়। কিন্তু সরকার সেদিকে কোনো নজর দিচ্ছে না। এ দেশের পুঁজিবাজার একটি ক্রমবিকাশমান বাজার। কিন্তু বর্তমানে এ বাজার ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এখন সরকারের উচ্চ মহলের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, মামলা বা হাইকোর্টে রিট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে পারছে না।’’
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের অর্থমন্ত্রী এ পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করার জন্য বিভিন্ন সময় অনেক প্রণোদনা দিয়েছেন। কিন্তু বাজার স্থিতিশীল হচ্ছে না। তাই মনে হয়, তিনি একটু অধৈর্য হয়ে সংসদে এসব কথা বলেছেন।’’
এ সময় অধৈর্য না হয়ে অর্থমন্ত্রীকে তার ঘোষিত প্রণোদনাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি-না তা দেখারও আহ্বান জানান রকিবুর রহমান।
রকিবুর রহমান বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশ বাজারের বিনিয়োগ করার কথা। কিন্তু এখন বাজারে তাদের বিনিয়োগ মাত্র ২ শতাংশ। যার জন্য বাজার স্থিতিশীল হচ্ছে না।
তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতো আচরণ না করে ম্যাচিউরড আচরণ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আজ শেয়ার কিনে কাল বিক্রি করার কথা চিন্তা করলে বাজার কখনও স্থিতিশীল থাকে না। তাদের দীর্ঘ মেয়াদী বিনিয়োগের কথা চিন্তা করতে হবে।
তিনি অর্থমন্ত্রীর মন্তব্য সম্পর্কে আরো বলেন, ‘‘আমি দীর্ঘদিন পুঁজিবাজারের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু কখনো কোনো দেশের অর্থমন্ত্রীকে সে দেশের পুঁজিবাজারকে দুষ্টু বলতে দেখিনি। আমাদের অর্থমন্ত্রী কি অর্থে এ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, তা আমি জানি না। তবে তার মতো উচ্চ পর্যায় থেকে এ ধরনের মন্তব্য আমরা কখনো আশা করিনি।’’
তিনি আরো বলেন, অনেক দেশ তাদের সম্পদ দিয়ে চলতে পারে। কিন্তু তাদেরও পুঁজিবাজার রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও তারা বিনিয়োগের আহ্বান জানায়।
ডিএসই’র সিনিয়র সহ-সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী এ সময় বলেন, ‘‘সরকারের একটি দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এ ধরনের মন্তব্য কিভাবে আসে, আমরা বলতে পারি না। আর এ মন্তব্য তিনি এমন সময় করেছেন, যে সময় ডিএসই’র ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন করার জন্য দুটি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। মঙ্গলবারও আমরা দুটি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করেছি। কিন্তু তারা পত্রিকায় অর্থমন্ত্রীর মন্তব্য পড়ে এখান থেকে কি বার্তা নিয়ে যাচ্ছেন, সেটা দেখার বিষয়। অর্থমন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্য দেশে ও বিদেশে একটি খারাপ সংকেত বহন করবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘২০০৯-১০ সালে আমাদের পুঁজিবাজার থেকে মোট ২৮ হাজার ১১১ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তারপরও কি অর্থমন্ত্রী বলবেন, পুঁজিবাজার দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখেনি? আমরা তার এ ধরনের মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাই।’’
উল্লেখ্য সোমবার জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আরো বলেছিলেন, ‘‘শেয়ারবাজার নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না। কারণ, এই শেয়ারবাজার হচ্ছে একটা দুষ্টু শেয়ারবাজার।’’
তিনি বলেন, ‘‘শেয়ারবাজারের উন্নয়নে গত এক বছরে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এর কোনো উন্নতি হয়নি। শেয়ার বাজারের উন্নতি করতে হলে এর মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।’’
শেয়ারবাজারের উন্নয়নে ‘ডি-মিউচুয়ালাইজেশনের’ ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমি শেয়ারবাজার নিয়ে কথা বলবো, আগামী ডিসেম্বরে ডি-মিউচুয়ালাইজেশন প্রক্রিয়া চালু হওয়ার পর।’’
শেয়ারবাজার নিয়ে হই চই প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘শেয়ারবাজারের সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট তারা সবাই যুবক এবং মতিঝিলে হওয়ায় এটা হচ্ছে।’
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ১১ লাখ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘অর্থনীতিতে এর অবদান এতোটাই কম যে, এটা নিয়ে চিন্তা না করলেও দেশের অর্থনীতির কোনো ক্ষতি হবে না।’’
বাংলাদেশ সময় : ১৫২০ ঘণ্টা, জুন ১২, ২০১২
এসএনএইচ/ সম্পাদনা : আবু হাসান শাহীন, নিউজরুম এডিটর ও অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর