রেজাউল করিম বিপুল, জেলা প্রতিনিধি বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ফরিদপুর: দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর পল্লীকবি জসীমউদদীনের ‘আসমানী’ কবিতার আসমানী মারা গেছেন (ইন্নালিল্লা... রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৯ বছর।
শনিবার ভোর তিনটার দিকে ফরিদপুরের নিজ বাড়িতে তিনি মারা যান। আসমানীর পরিবার সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
‘আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও, রহিমুদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও’ পল্লীকবি জসীমউদদীনের ‘সুচয়নী’ কাব্যগ্রন্থের ‘আসমানী’ কবিতাটিতে এভাবেই আসমানীর বর্ণনা দিয়েছিলেন কবি।
দাফন: দুপুরের নামাজের পর জানাজা শেষে বাড়ির উঠানে আসমানীকে দাফন করা হবে। নিজ বাড়ির উঠোনেই তাকে দাফন করা হবে। এতথ্য জানিয়েছেন তার নাতি সবুজ।
এদিকে, জেলা প্রশাসক হেলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, দাফনের সব খরচ দেবে জেলা প্রশাসন। এতদিন আসমানীর চিকিৎসার সব খরচ শ্রমমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও জেলা প্রশাসন বহন করেছে।
পেছনের কথা: আসমানী কবিতাটি রচনার কারণ সম্পর্কে জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, ১৯১৩ সালে ফরিদপুর সদর উপজেলার ঈষাণ গোপালপুর ইউনিয়নের ভানুরজঙ্গা গ্রামে আসমানীর জন্ম। আরমান মল্লিকের মেয়ে আসমানীর মাত্র ৯ বছর বয়সে বিয়ে হয় পাশের রসুলপুর গ্রামের মমিন মণ্ডলের ছেলে হাসাম মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি দুই ছেলে ও ছয় মেয়ের জননী।
আসমানীর শ্বশুর মানিকগঞ্জের পীর রহিম উদ্দিনের ভক্ত ছিলেন। রহিম উদ্দিন বেশির ভাগ সময় আসমানীর শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করতেন। সেখানে জীর্ণ কুটিরে তিনি প্রায়ই মুর্শিদী গানের আসর বসাতেন। আর এই গানের টানে কবি জসীমউদ্দিন আসমানীদের বাড়িতে ছুটে যেতেন। সেখানেই আসমানীর সঙ্গে কবির পরিচয় হয়। সে সময় ওই বাড়ির পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখে তিনি কবিতাটি রচনা করেন। কবির রচিত কবিতার পংক্তিগুলো আসমানীকে বাংলাসাহিত্যে অমর করে রেখেছে।
৯৯ বছরের বয়সের বার্ধক্যজনিত কষ্ট, অনেকদিন ধরে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত আসমানী অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন। রেখে গেলেন ছয় ছেলেমেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী।
আসমানী ২০১১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রথম অসুস্থ হয়ে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে হন। এ সময় তার আমৃত্যু চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় ফরিদপুর জেলা প্রশাসন।
হাসপাতালের চিকিৎসা শেষে শহরের টেপাখোলা এলাকায় সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত শান্তিনিবাসে আসমানীর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
আসমানীর চিকিৎসা সহায়তার জন্য ‘আসমানী সহায়তা তহবিল’ গঠন করা হয়। এতে শ্রমমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, এফবিসিসিআই সভাপতি একে আজাদ হাত বাড়িয়ে দেন। তারা প্রত্যেকেই ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান দেন।
২০১২ সালের ২৩ জুন আসমানী আবার অসুস্থ হলে তাকে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।সেখানে থেকে ১ জুলাই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।এখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়।
ঢাকায় এক মাস চিকিৎসা শেষে ২ আগস্ট ফরিদপুরের রসুলপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে তাকে নেওয়া হয়। এতোদিন বাড়িতেই তিনি ছিলেন।
কবিতাটি পাঠকদের জন্য হুবুহু তুলে ধরা হলো
আসমানী জসীমউদদীন
আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও, রহিমুদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি, একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে, তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।
পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক-খান হাড়, সাক্ষী দিছে অনাহারে কদিন গেছে তার।
মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি থাপড়েতে নিবিয়ে দেছে দারুণ অভাব আসি।
পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস, সোনালি তার গা বরণের করছে উপহাস।
ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি, সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি।
বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হল তাই কেঁদে, হয় নি সুযোগ লয় যে সে-সুর গানের সুরে বেঁধে।
আসমানীদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল্-বিল্-বিল করে।
পেটটি তাহার দুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার, বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর।
বাংলাদেশ সময়: ০৯২৯ ঘণ্টা, আগস্ট ১৮, ২০১২ সম্পাদনা: প্রভাষ চৌধুরী, নিউজরুম এডিটর/রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।