 |
আরেক টু হলেই শহরের প্রাণটা যায় যায়। এমনিতেই লোড, তার ওপর এখন ওভার লোড। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৩৩ দেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী একত্রিত হয়েছেন ঢাকায়। যানজটে আচল ঢাকায় কালচার কাকে বলে! এবার দেখিয়ে দিল সরকার। ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত রাস্তা বন্ধ। ভিআইপি যাচ্ছে। বিশেষ নিরাপত্তায় নিয়োজিত রাষ্ট্র পক্ষের বাহিনী রাজপথের নির্দিষ্ট পয়েন্টে পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে। গাড়ি তো বন্ধ রয়েছেই, মানুষ তো দূরে থাক, একটা রাস্তার কুকুরকেও এখন এপাশ থেকে ওপাশে যেতে দেওয়ার পারমিশন নাই। ফলে ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত রাস্তাটা একদম খা খা করছে। আসা এবং যাওয়া- দুইপাশই। কিছুক্ষণের মধ্যেই পান্থপথের চৌরাস্তার কাছাকাছি চলে আসল গাড়ি বহর। মনে হচ্ছে হোটেল রূপসী বাংলায় আপাতত গন্তব্য। গাড়িগুলো আসার আগ মুহূর্তে মানুষজন যে যেখানে ছিল সেখানেই আছে। সামান্য নড়াচড়ার সুযোগ নাই। ভিআইপি কি আর এই রাস্তায় নতুন যায়? দেখতে দেখতে নিয়মটায় সবাই অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কথা। তাই সবার জানা ভিআইপি যাওয়ার আগে কোথাও যাওয়া যাবে না। ডানেও না, বামেও না। নড়লেই পুলিশের বাড়ি পরতে পারে হাঁটুর গিরায়। তখন সকাল এগারোটায়ই শরীরের বারোটা বেজে যাবে। তাই নো রিস্ক। জনগণ এখন বেশ সচেতন মনে করে নিজেকে। তার চেয়ে তারা বরং যে যেখানে আছে দাঁড়িয়ে থেকে ভিআইপিকে দেখে নিজের সঙ্গে মেলাতে পারে। এক মুহূর্তের জন্য স্বপ্নে চলে যেতে পারে কেউ কেউ। যে একদিন, শুধু এমন এক মুহূর্তে নগরের মানুষ নিজে কখনো যাচ্ছে এমন কালো গ্লাসের গাড়ি চড়ে। চলে যাচ্ছে প্রটোকল সুবিধা নিয়ে ফাঁকা রাস্তা ধরে সাইরেন বাজিয়ে বাজিয়ে। পাশ থেকে কে ডাকলো, কে হাত বাড়ালো তাকাবার জন্য তাদের বয়ে যাচ্ছে, ড্রাইভারের চোখ শকুনের মতো যেন পড়ে আছে গন্তব্যের দিকে। কখন কোনো ঝুঁকি ছাড়াই একটানে পৌঁছে যেতে পারবে নিরাপদে। পরক্ষণেই তাদের কারো কারো স্বপ্ন ভাঙে, এ কেমন তাদের ভাবনা কাপুরুষের মতো, বাধা বিপত্তিহীন পৌঁছে যাবে, বললেই হলো! প্রতিদিন জ্যামে পরতে পরতে যে অভ্যাসটা করেছে, এখন ভালো লাগবে তা ছাড়া। ধুর! ভিআইপিদের গাড়ির সবার আগে বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রীর গাড়ি। গাড়িগুলো পেছনে ফেলে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সেখান থেকে রওয়ানা হলো বুঝি। ধুর! এদের এসব ক্যাচাল নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে না বেশিক্ষণ। পারলে জাহান্নাম থেকে জান্নাতে যাক গে। তাদের কি। এখন বরং ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি কখন ছাড়বে রাস্তাটা, আর যে যার কাজে-কামে ছুটবে। প্রথম গাড়িটার কালো গ্লাস খুলে সংস্কৃতিমন্ত্রী হাত নাচায়নি যে- জনগণ দেখে একবারেই চিনে ফেলেছে, এইটা আমাগো দেশের মেয়ে। গাড়িগুলির সামনে সব দেশের পতাকা উড়ছে, আর সবার আগেরটায় দেশেরটা উড়ছে, তাই ধরতে পেরেছে।
গাড়িবহর শাই শাই করে চলে যাবে, ঠিক তখনই তো কাণ্ডটা। এক মহিলা, মধ্য বয়সী। দেখে মনে হলো গোসলখানা এর জন্য না। চুলে জট পড়ে গেছে। চেহারায় মরিচা। পুলিশ বাহিনীর নিরাপত্তাকে বুইড়া আঙ্গুল দেখিয়ে, ডর ভয় বাদ দিয়ে সে একেবারে রাস্তায় নেমে গেছে। ভাগ্যিস যে, ডান সাইডের রাস্তায়। হঠাৎ নাচের মুদ্রা তুলতে তুলতে ফুটপাত থেকে রাস্তায় নেমে এসেছে। গান গাইছে জোরে, ‘মুন্নি বদনাম হুইয়ি, ডারলিং তেরে লিয়ে.. মুন্নি কে গাল-গোলাবি... সারাবি রে, লে ঝান্ডু বাম হুয়ে... ডারলিং তেরে লিয়ে...।’ একবার গুনগুনিয়ে আবার জোরে জোরে সুরে সুরে গাইতে গাইতে সে এগিয়ে যাচ্ছে মাঝ রাস্তার দিকে। পুলিশ লাঠি নিয়ে তেড়ে আসছে, লজ্জায় তাদের মাথা হেট, সব মাটি করে দিল এ। দশ মিনিট ধরে রাস্তাটা ফাঁকা করে রেখেছে কি এর বিশেষ নৃত্য প্রদর্শনের জন্য!
‘হেই, সরা এই টারে, মঞ্চ পেয়েছে’ একজন তেড়ে আসলো। পরিস্থিতি এমন যে বাম সাইডের রাস্তা দিয়ে ভিআইপির গাড়ি যাচ্ছে, আর ডান সাইডে নৃত্য। গাড়িগুলোতে তখন মন্ত্রী না টন্ত্রি তার খবর কে রাখে, জনগণের নজর এইদিকে। কে যেন মুহূর্তেই রিমোটের বাটন চাইপা চ্যানেল ঘুরাইয়া দিছে যেন। মহিলা একবার দেহের সামনের অংশ দেখাচ্ছে, আবার পেছনের অংশ, তারপর কোমর দোলাচ্ছে, খানিক বাদে এক দিকে হেলে পাছায় হাত ঘষছে আর বলছে, ‘মুন্নি বদনাম হুয়ে, ডারলিং তেরে লিয়ে।’ রাস্তার মানুষগুলো জানে, এই অবস্থায় যে যেখানে আছে দাঁড়ির মতো দাঁড়িয়ে থাকবার নিয়ম। কিন্তু কে মানে তখন নিয়ম। মহিলার অঙ্গভঙ্গি যেখান থেকে ভালো মতো দেখা যাবে, সবাই সেদিকে সরে আসছে। ইতোমধ্যে আবার স্লোগানও বানিয়ে ফেলেছে কেউ কেউ। বলল, ‘দেখেন পাগলির কাণ্ড! দেখছেন? আর সময় পায় নাই। যা ভিআইপি তো নাচ দেখতে দেখতে গেল রে।’
মহিলার দেহের নিচের অংশে লাল রঙের পেটিকোট আর ওপরের অংশে গোলাপি রঙের ব্লাউজ, দুটোই বেশ পুরনো, কোথাও কোথাও এমনি পুরাতন যে, ছেঁড়া ফাড়া বেশ স্বাভাবিক লাগছে। কিন্তু তার হাত নাচানো, পা নাড়ানো দেখে কেউ কেউ ধরেই নিয়েছে আরে ওটা কখনোই পেটিকোট হতে পারে না, নির্ঘাত স্কার্ট, আর ওপরের পার্টটা দেখছো না ওটা কেমন টপ, হ্যাঁ টপই তো, হুম।
গাড়ি বহর চলে গেলো। গ্লাসের ওপাশ থেকে কোনো দেশের কালচারাল মিনিস্টার ভুলেও এই কালচারটা দেখলো কিনা বোঝা গেল না। শুধু দেখা গেল, গাড়িগুলো কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা চলে গেছে খালি রাস্তা খালি করে। তখনও চলছে নাচ। এবার আরেকটা লিরিক। চিকনি চামেলি না কি একটা গাইছে... খুব পরিষ্কার না। তবে দুই হাত মাথার পেছনে নিয়ে হাঁটুর জয়েন্ট ভেঙে নাচার ভঙ্গি দেখে মনে হতেই পারে চিকনি চামেলি গানটাই গাচ্ছে। আর ঝাঁকি মারছে পুরো শরীর। বেশ দুলছে স্থূল অংশগুলো।
একটু পরে, মনে হল বেশ জেদি পুলিশ অফিসার মহিলাকে পুলিশের গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে গেল। অনেকটা জোর করে টেনে হেঁচড়ে। এরপর গাড়িটা শাহবাগের দিকে টার্ন নিল। কে জানে হয়তো সবাই ভেবে নিয়েছে, এবার সোজা শাহবাগ থানায় তারপর সাজা। শালার পুলিশ পারেও, পাগলের সঙ্গে মাতবরি। না হয়, ভিআইপিকে একটু নাচই দেখিয়েছে, তাতে আবার এত রাগ। পাগল এতকিছু বুঝলেতো কথাই ছিল না, পাবলিকের মতো ভদ্রস্থ হয়ে ফুটপাতেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিআইপির গাড়ি চড়া দেখতো। কি আছে পাগলির কপালে এক আল্লাহ জানে।
ভিআইপি চলে যাওয়ার পরপরই রাস্তা স্বাভাবিক। অর্থাৎ এক দঙ্গল গাড়ি এসে পান্থপথ থেকে বাংলা মোটর পর্যন্ত জ্যাম।
স্মৃতিতে যদি জ্যাম না লাগে, তবে একটু আগে ফাঁকা রাস্তাটাকে মঞ্চ বানিয়ে নাচলো যে মহিলা, তার নাম ফাতেমা ওরফে প্রথমা।
ফাতেমা নামটা মা-বাবার দেওয়া, আর প্রথমা নিজেই রেখে দিয়েছে। শুধু সে নয়, বান্ধবী মমতাজও নিজের নামটাকে নিজেই চেঞ্জ করে রেখেছে মমতা। বলে কি-না, ওসব নামে আর চলবে না, তাই চাল-চলন পরিবর্তনের আগে নিজের নাম থেকেই তা শুরু। ম্যাট্রিক পাশের পর কলেজে উঠেই দুই বান্ধবী নতুন নামে পরিচিত হতে শুরু করেছিল। আজ থেকে প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর আগের কথা। ব্যাস, বন্ধু-বান্ধব মহলে নামগুলো প্রচার হয়ে গেল। পুরো ভাব-সাবই আলাদা। একটা বর্গীয় জ আর আদি দুই-একটা অক্ষর বদলালে যদি সেকেলে গন্ধটা মুছে চায়, তাতেই তারা রাজি।
ফাতেমা ওরফে প্রথমা থিয়েটার করতো। ক্লাস নাইন থেকেই। বাবা-মা কিংবা পাড়া-পড়শি কেউ না বলে দিলেও থিয়েটার থেকেই একদিন সিনেমায় গিয়ে নাম করা অভিনেত্রী হবে সে এমন অনুমান থেকে ওখানে নাম লিখিয়েছিল। মিরপুরের শ্যাওড়া পাড়ায় ওদের বাসা ছিল। দুই ভাই আর এক বোন, সঙ্গে বাবা-মা। বাবা ছিল মিরপুর ন্যাশনাল উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক। আর মা গৃহিনী। এলাকার বড় ভাই কাওছার ওরফে কায়সার ভাই ভরসা দিয়েছিল, ‘হ্যাঁ, আগে চল আমাগো থিয়েটারে। কাজলদার হাতে পড়লে একেবারে মাল হয়ে বেরুবি। অভিনয় একেবারে রক্তে মিশিয়ে দেবে। তখন দেখবি কে ঠেকায়, ডিরেক্টররা বাসার সামনে হামলে পড়ছে শিডিউল নেওয়ার জন্য।’
স্বপ্নটা এভাবেই ছোট থেকে বড় হতে থাকে প্রথমার। ঠিক সেই রকম, যেমন করে বলা নাই কওয়া নাই তাদের শেওড়া পাড়ার বাসার সামনের গলিটা দিনে দিনে আশ্চর্য রকমের বড় হয়ে গিয়েছে।
ওইদিকে মমতাজ ওরফে মমতা ছিল বাউলের মেয়ে। বাবাকে এলাকা থেকে বের করে দিয়েছিল হুজুরেরা। তারপর একমেয়ে ও বউকে নিয়ে ঢাকার শেওড়া পাড়ার একটা বস্তিতে উঠেছিল বাউল। মেয়ের কোকিলা কণ্ঠ। কণ্ঠে গান ওঠে ভালো। আগ্রহ দেখে বাবাই শিখিয়েছিলেন টুকটাক। এরপর ধারাবাহিক ভাবে যেকোনো আসর-অনুষ্ঠানে গাইতে গাইতে গানটাই নেশা হয়ে গেছে। একদিন শেওড়া পাড়ার ফাতেমার সঙ্গে কিভাবে যেন পরিচয় হয় মমতাজের। তারপর তার পাল্লায় পড়ে সেও থিয়েটারগামী। প্রথমা নামি নায়িকা আর মমতা বড় গায়িকা হতে গিয়েছিল থিয়েটারে। ক্লাশ শেষে নিয়মিত বিকেলে থিয়েটারে যেতো দুজনে। ফিরতো সন্ধার পর। বাবা-মা ধরেই নিয়েছেন মমতা সঙ্গীত শিখতে থিয়েটারে যায়। আর প্রথমার বাবা-মা জানতেন, মেয়ে কেলাশের পর অভিনয় শেষ কইরা বাসায় ফিরবো।
সেইবারের দুইবছর পর প্রথম প্রথমার বাবা-মা জানতে পারল, প্রথমা আর থিয়েটারের কায়সার ভাইয়া ভাইগা গেছে। স্কুল শিক্ষক বাপের মাথায় হাত, মাইয়্যাটার অভিনয় শিক্ষা আর হইল না।
এরপরে বছরও গড়ায় নাই, মমতা ভাইগা গেল কাজলদার লগে। তার গান শিক্ষার সমাপ্তি হয়েছিল। কিন্তু তার বাপের মনোবল ছিল আলাদা। সব শুনে সে বলল, ‘আমার মাইয়্যা একটা, বাপ-মা ছাড়ছে তো কি হইছে, গান ছাড়বো না। ওইটা ওর নেশা। লাগলে কাজলদা না কি হেরে ছাড়বো তবু সে গান ছাড়বো না।’ বাপের কথা শুনে, বস্তির অনেকের মাথা খারাপ, ‘মাইয়্যা ভাইগা গেছে হেই টেনশন নাই, বুইড়া আছে গাহান লইয়া।’
এই ঘটনার দশ-বারো বছর পর একটা ফ্যাশন হাউসে পোশাক কেনাকাটা করতে এসে হঠাৎ দেখা মমতা আর প্রথমার। বাছা পোশাক হাত থেকে ফেলে দিয়ে প্রথমাকে জড়িয়ে ধরলো মমতা।
মমতা বললো-বাব্বা, তোর সঙ্গে মেলা বছর পরে দেখা।
প্রথমা একই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলল, তুইও তো, একেবারে নিঁখোজ। তা গানের কি খবর বল?
মমতা বলল, ‘একটা অ্যালবাম করার চিন্তা করছি। আর কনসার্টেতো যাচ্ছিই প্রায় প্রায়।’
প্রথমা আগ্রহ বাড়িয়ে জানতে চাইলো,‘তা, কাজল দা হেল্প টেল্প করে তো নাকি? বেচারা। হা হা। তোদেরও আর তর সইলো না। পরে এসেই শুনলাম তোরা গায়েব।’
মমতা বলল, ‘দুই বছর হলো আমাদের ডিবোর্স হয়ে গেছে। কাজল এখন কোথায় আছে জানি না। আসলে, সংসারটা শেষ পর্যন্ত চেয়েছিলাম টেকাতে। কিন্তু পারলাম কই? অযথা সন্দেহ। কনসার্টে যাওয়া নিয়ে কাসুন্দি। রবির সঙ্গে একটু বেশি ওঠ-বস হয়ে গিয়েছিল। মেনে নেয়নি। শুনেছি আবার বিয়ে করেছে।’
প্রথমা লম্বা শ্বাস টেনে বলল, ‘ভেবেছিলাম তোরা একসঙ্গেই আছিস। আমারো ওই একই হাল। এক বছরও টানতে পারলাম না। মোহাম্মদপুরের একটা বাসায় উঠলাম। মডেলিং করার ইচ্ছা হল। ভাবলাম, থিয়েটার দিয়ে তো আর হলো না। যদি সহজ রাস্তায় কিছু হয়। মডেলিংয়ের ওপর দুইমাসের কোর্সও করলাম। এরপর ব্যস্ত হয়ে পড়লাম হঠাৎ। র্যাম্প মডেল পুরোদমে। একবার হঠাৎ শো ক্যান্সেল হয়ে গিয়েছিল বলে বাসায় চলে আসি তাড়াতাড়ি। এসে দেখি... কায়সার বাড়িওলার মেয়ের সঙ্গে...। আমি চলে এলাম শেওড়া পাড়ায় সেই রাতেই। পরে আর ও আমাকে নিতে আসেনি। এখন হয়তো বাড়িওলার সেই মেয়েকে বিয়ে করে বাড়ির মালিক হয়ে বসে আছে। একমাত্র মেয়ে। ও হ্যা, এসে এও শুনলাম, তোরাও...’
মমতা জানতে চাইল, ‘তা এখন কি করছিস বল, সিনেমায় যাবি না?’
প্রথমা বলল, ‘আপাতত র্যাম্পই ভালো ঠেকছে। ফ্যাশনটাই প্যাশন। তাছাড়া ভালোই কেটে যাচ্ছে সময়। দাঁড়া তোকে একটা ছবি দেখাই।’
প্রথমা মোবাইলের ইমেজে গিয়ে একটা ছবি বের করে দেখিয়ে বলল,‘কেমন দেখছিস একে। মন্দ নয়। হা হা হা হা, ফ্যাশন ডিজাইনার। জনসন। ওর সঙ্গেই আছি এখন। ভালোই কেয়ার নেয় আমার। আর হ্যাঁ... আরেক টা সুখবর আছে! ডাক্তার বলেছে আমি কখনোই কনসিভ করতে পারবো না, তাই আর বিয়েটা করিনি। শুধু শুধু ঝামেলা বাড়িয়ে কি লাভ? আবার কবে কে চলে যায়! তোর আর কি খবর বল?’
মমতা বলল, ‘গান নিয়েই আছি। অ্যালবাম করছি সামনে। তুই তো, জিসান কে চিনতি? ওই যে, কলেজে ভালো গান করতো। ক’মাস আগে হঠাৎ দেখা একটা কনসার্টে। তারপর আর কি, ফোনে কথাবার্তা, বাসায় যাতায়াত। ওকেই আবার বিয়ে করার কথা ভাবছি।’
এরমধ্যে বাবা একদিন গেল মেয়ের বাসায়। বাবা এসেছে তাই জনসন কে আজ আসতে না করে দিয়েছে প্রথমা। প্রথমা ফ্রিজ থেকে হুইস্কির বোতল আর একটা কাঁচের গ্লাস নিয়ে ডাইনিংএ বসে বাবাকে ডাকে। বলে, ‘আব্বা তুমি খাবে?’
বাবা মাথা নেড়ে না করে দেয়। এবার ঢেলে খেতে খেতে প্রথমা বাবাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা, ছোটবেলায় দেখেছি আম্মার সঙ্গে সারাক্ষণ তোমার ঝগড়া লেগেই থাকতো। এখনো কি চালিয়ে যাচ্ছ? আচ্ছা, কখনো কি বিরক্তি আসেনি। ঘেন্না আসে নি তোমার আম্মার প্রতি? কিম্বা আম্মার তোমারে নিয়া। তোমরা তো চাইলে ছাড়াছাড়ি করে ফেলতে পারতে?’
বাবা বলল, ‘আসলে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।’
প্রথমা সাফ জানিয়ে দেয় এবার, ‘অভ্যাস না ছাই! বলো, এক ছাদের নিচে অভিনয় করে গেছ। রোজ রোজ এত কেলেঙ্কারীর চেয়ে যে যার রাস্তায় চলে গেলেই তো পারতে।’
বাবা জানাল, ‘তাহলে তোর কি হতো?’
প্রথমা ততক্ষণে ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। বলল, ‘কি আর হতো, আম্মা সঙ্গে নিয়ে অন্যের বাড়িতে ওঠতো, নইলে একা থাকতো। অবশ্য আম্মা তো আর যায় নি... আর তুমিও সুযোগ পেয়ে রোজ রোজ পেদানি দিতে। আর তার শুধু স্যাকরিফাইস। গিরগিটি কোথাকার!’
তারপর আরো, ‘তা কেমন দেখলে বাসায়? পুরুষ মানুষের ড্রেস দেখে ভাবছো, স্বামী নেই, অথচ।’
বাবা যেন উত্তর আগেই রেডি করে রেখেছিল, ‘সে কি! না, না, তা ভাবিনি। সত্যি বললাম। তুই যেভাবে ভালো থাকিস চল। আমি শুধু তোকে দেখতে এলাম আর কি। কিচ্ছু বলার নেই। বলি কি! তোর মা তো আমার জন্য নিজের মতো কখনোই থাকতে পারেনি, তাই তোকে নিজের মতো করে চলতে দেখে শান্তি লাগছে।’
‘এই দরজা খোল, খোল বলছি। বলি, রিহার্সেল রুমটা কি শুধু তোমাদের দুইজনের জন্য? এক্ষুণি খোল। খোল বলছি।’ কনসার্ট শুরু হওয়ার আগে আগে মমতাকে তার এক সহ শিল্পীকে নিয়ে রিহার্সেল রুমের দরজা আটকে ভেতরে আছে দেখে সিনিয়র শিল্পী বিপ্লব দাস আওয়াজ তুলল। অবশেষে মমতা দরজা খুলে তাকে দিল মধুর ঝাড়ি, ‘ধ্যাৎ, তুমি না..’
বিপ্লবও বলল, ‘হ্যাঁ, সব তো তোরা, আজ জিসান, তো কাল জিচন্দ্র।’
মমতা বলল, ‘আজকাল তুমি কি যে বল না দাদা। আসার সময় দেখো নি বুঝি, জিসান রুবি কে নিয়ে বাথরুমে ঢুকছে?’
বিপ্লব কেয়ার না করেই বলল, ‘না দেখিনি।’
‘ধ্যাৎ, মিত্থুক।’ বলে মমতা। ‘রিহার্সেল না ছাই। দরজা ধাক্কাচ্ছিলে কেন, বলো? ওল্ড ম্যান। হয়ার আর ইওর পার্টনার?’
গান আর সেই সূত্রে নতুন কারো সঙ্গে সম্পর্ক-এই হলো মমতার পথচলা। জিসানকে সে বিয়ে করতে পারে নি আর। অবশ্য মমতাই আর আগ্রহী ছিল না। গান নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ল যে, আজ ঢাকা, তো কাল চিটাগাং, পরশু আবার খুলনা। এভাবেই মহাব্যস্ত জীবনে ঢুকে পড়ে সে। সংসার, সন্তান এইসবের জায়গা দখল করল একমাত্র গান। টানা চতুর্থ অ্যালবাম বেরিয়ে গেছে। কনসার্টে দর্শক মাতিয়ে তোলায় একাই যথেষ্ট সে। পরিচিতি চারদিকে। অনেক বলে কয়ে এক ব্যবসায়ী বিয়েতে রাজি করিয়েছে তাকে। মন্দ নয়। বিজি পারসন। মাসের অধিকাংশ সময় বাইরে থাকেন ভদ্রলোক। তার কথা হলো-‘জাস্ট ওয়ান্ট... অ্যা... চাইল্ড, বেবি।’ ‘ওকে’ বলে দেয় মমতা। তারও মনে হয় বয়েস হয়েছে, একটা আশা সে করতেই পারে। আর এখন তো সবই গোছানো। অনেক বছর বাদে এই ক্ষণে তার মনে পড়ে প্রথমাকে। ইস্। ও থাকলে কত ভালো হতো। তার মনে হয় বিয়ের সময়টায় অন্তত প্রিয় মানুষরা কাছে থাকা উচিত। বিয়ে তো বিয়ে, হোক দুই দিনের জন্য, আর তিন দিনের জন্য। সময় ভালো থাকলে, একটা বাচ্চা নিয়ে... ব্যস, তার বাবার ঠিকানা তো হলো। বিয়েটা করেই ফেলে মমতা, কিন্তু কোথায় খুঁজবে প্রথমাকে। তার সূত্রতো আর মমতার সঙ্গে গেঁথে নাই। প্রথমা আর কখনো বাচ্চাই নিতে পারবে না।
রাত বাড়লে, নাইট ক্লাবের রাত আরো বেড়ে যায়। কত রকমের মানুষ ভিড় করে সেখানে। দিনের মানুষদের সঙ্গে রাতের কাউকেই মেলানো যাবে না। গুলশানের একটা নাইট ক্লাবে প্রথমার পরিচয় হয় এক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে। সে মাঝে মাঝেই শো করতে যায় ওখানে। একরাতে আফসার নামের ওই অফিসার তাকে নিজের বাসায় নিয়ে যায়। বলল, ‘কনফিডেন্সিয়াল টক’ আছে, ওমনি রাজি হয়ে গেল প্রথমা। আসলে, সম্পর্কটা খারাপ যাচ্ছিল জনসনের সঙ্গে। তাই এসময়ে সঙ্গ পাওয়াটা বেশ কাজের ভেবেই রাজি হয়ে যায়। আফসারের সঙ্গে সম্পর্কটা নিজের অজান্তেই গুছিয়ে আনতে চায় প্রথমা। আর কত দিন র্যাম্পে হাঁটা! তার নায়িকা হওয়ার কি হলো! থাক ওসব কথা। আপাতত তাই...। অফিসারও রাজি প্রথমাকে বিয়ে করতে। কিন্তু সন্তানহীন সংসার কারো কারো ক্ষেত্রে অগোছালো। তাই, কথায় কথায় ঝগড়া বাড়ে আফসার আর প্রথমার। প্রথমাকে বেশ হতাশ দেখায়, অবশ্য সে মানতে রাজি নয়, সে হতাশ। প্রথমা অনুভব করে, আসলে আফসারের সঙ্গে তার সম্পর্কটা লাভলেস। শুধু দু’জনের থাকার জন্য থাকা, সেজন্য ঘর বাঁধা। এতে কোনো ধরনের দায় অনুভব করে না আফসার। এমনকি সে নিজেও। তাহলে? আফসার চায় সন্তান। ভালোবাসা নয়, সংসারও নয়, ঘর তো নয়ই। হয়তো এই অপূর্ণতাই প্রথমার কাছে পূর্ণতা। র্যাম্পে অনেকখানি হেঁটে ফেলার পর, নায়িকা হিসেবে তার কিছুই হাঁটার থাকলো না বলেই হয়তো আনন্দিত প্রথমা। হয়তো যে মানুষটি, অনেক দূর নিজের ইচ্ছায় হেঁটে আসার পর পরিপূর্ণ হয় বাসনা, আর কোথাও যাওয়ার থাকে না, সেই মানুষটিই প্রথমা। হয়তো তাই চেয়েছিল সে, জীবনের বিকেলটা আরো উন্মুক্ত হোক।
আফসারকে ছেড়ে আসার পর আজ অনেক বছর পর আবার সে আফসারের কাছেই গেল। হয়তো এই অনিচ্ছাই প্রথমার সুপ্ত ইচ্ছা।
আর যে কিনা মমতা, গানের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে, ভাসাতে ভাসাতে সেও পেয়ে গেছে ঠিকানা। সে এখন দেশের সংস্কৃতির মন্ত্রী। কালচারাল মিনিস্টার।
আজ সকালে পুলিশ অফিসার আফসার প্রথমাকে দ্বিতীয় বারের জন্য তার বাসায় নিয়ে যাওয়ার আগে, কালচারাল মিনিস্টার মমতা গাড়ির কালো গ্লাসের ভেতর দিয়ে প্রথমার নৃত্যের একঝলক দেখে গেছেন।
বাংলাদেশ সময়: ১৩১০ ঘণ্টা, ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস