 |
হামলায় অংশ নেন মাহমুদুর রহমান, কেরামত উল্লাহ বিপ্লব, জ ই মামুন ও শওকত মিল্টন/ ছবি: একেএম মহসীন, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
প্রেসক্লাব থেকে: সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার বিচার দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে হামলা চালিয়েছেন এটিএন বাংলার সংবাদকর্মীরা।
রোববার বেলা ১২টার দিকে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণে প্রেসক্লাবের সামনে পূর্বঘোষিত এ সমাবেশ শুরু হয়। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), জাতীয় প্রেসক্লাব এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) যৌথভাবে এ মানববন্ধনে আয়োজন করে।
মানববন্ধন শুরুর পর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান মাইকে বলেন, “সাগর-রুনির মৃত্যুর জন্য এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান দায়ী। তিনি একজন খুনি, সেটা তার কথায় বোঝা যায়। আমি সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের কাছে এটিএন বাংলা কার্যালয় ঘেরাও করার কর্মসূচি ঘোষণা করার দাবি জানাচ্ছি।”
প্রধানের বক্তব্য শেষে এটিএন বাংলার বিশেষ প্রতিনিধি শওকত মিল্টন আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, “এই কর্মসূচি ষোষণা করার আপনি কে”। একই সঙ্গে তিনি প্রধানের শার্টের কলার চেপে ধরেন।
এ সময় এটিএন বাংলার হেড অব নিউজ জ ই মামুন, সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান , কেরামতউল্লাহ বিপ্লব, রাহাত মিনহাজসহ এটিএন বাংলার আরো কয়েকজন জাহাঙ্গীর আলম প্রধানকে ঘিরে ধরে হাতাহাতি শুরু করেন। তখন অন্যান্য সাংবাদিক এগিয়ে এলে জটলা প্রেসক্লাবের ভেতর ঢুকতে শুরু করে।
হাতাহাতির সময় শওকত মিল্টনের হাতে ধরা জাহাঙ্গীর আলম প্রধানের শার্টের কলার আলগা হয়ে যায়। সেই মুহূর্তে জাহাঙ্গীর আলম প্রেসক্লাব ভবনের বারান্দায় গিয়ে ওঠেন। তার পিছু ধাওয়া করে শওকত মিল্টন আবারো প্রেসক্লাবের বারান্দায় তার কলার চেপে ধরেন।
এ পরিস্থিতিতে কয়েকজন সাংবাদিক এটিএন বাংলার সাংবাদিকদের এ আক্রমন থামানোর চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরী, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপুর নেতৃত্বে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
সেখানে ঘটনার সময় আরও উপস্থিত ছিলেন শাবান মাহমুদ, আব্দুস শহীদ ছাড়াও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাংবাদিক নেতারা।
পরে কয়েকজন সাংবাদিক নেতা ও প্রেসক্লাবের কর্মীরা প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে হামলাকারী এটিএন বাংলার সাংবাদিকদের বের করে দেন।
অনাকাঙ্খিত ঘটনার পর মানবন্ধনে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, “মাহফুজুর রহমানের অর্থ-ক্ষমতা কতো বেশি, তা আমরা দেখতে চাই। সাংবাদিকদের ঐক্যের শক্তির কাছে তার ক্ষমতা কত বড় আমরা তা দেখতে চাই। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে যারা এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমানের পক্ষে অবস্থান নেবেন, তাদের পরিণতি কী হবে তা আমরা জানি না। অতএব যারা তার পক্ষ নেবেন তা নিজ দায়িত্বে নিতে হবে। তবে আমরা সাংবাদিকদের ঐক্যে বিভক্তি কোনোভাবেই মানবো না।”
সমাবেশের ঘোষণা দিয়ে ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, “সাগর-রুনি হত্যার বিচার এবং আজকের হামলার প্রতিবাদে কাল সোমবার সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। আগামীকাল সোমবারের সমাবেশকে সফল করতে হবে।” সোমবার মাহফুজুর রহমানের পক্ষে শিল্পীদের মানববন্ধন কর্মসূচিতে কোনো সাংবাদিক অংশ নিলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ইকবাল সোবহান বলেন, “সাংবাদিকরা সাগর-রুনির রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এটি বিনষ্টের অপচেষ্টা হচ্ছে। মাহফুজুর রহমানের মতো ‘ভিলেন’ এতে সফল হবেন না। অতীতেও এমন অনেক মাহফুজুর রহমান ছিল, তারা টিকতে পারেনি। এদেশের আন্দোলনে সাংবাদিকরা কারো কাছে মাথা নত করেনি। করবে না।”
বিএফইউজের আরেক অংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী বলেন, “সাংবাদিক সমাজকে অপমান করেছেন মাহফুজুর রহমান। এটিএনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যেহেতু আমাদের ওপর চ্যালেঞ্জ ছোঁড়া হয়েছে, তাই আমাদেরও বিষয়টি ভাবতে হবে। সারা বাংলার মানুষ আজ সাংবাদিক হত্যার বিচার চায়। ধানাই-পানাই করে পার পাওয়া যাবে না।”
বিএফইউজের মহাসচিব শওকত মাহমুদ বলেন, “সাংবাদিকরা নানা বাধা পেরিয়ে এক হয়েছে। আজ সাংবাদিক ঐক্যের ওপর আঘাত হানা হয়েছে। সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে সে অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ঐক্য প্রচেষ্টা বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্রে কাজ হবে না। অতীতে কোনো সময় এভাবে সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়নি। এটি সবাইকে মনে রাখতে হবে।”
তিনি বলেন, “মাহফুজুর রহমান তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন, কিন্তু বক্তব্য প্রত্যাহার করেছেন কি না জানি না। এটিএনের এক বন্ধুর কাছে যখন কাফনের কাপড় পাঠানো হয়েছে, তখনও আমরা প্রতিবাদ করেছি। মাহফুজুর রহমানের কাছে পাঠানো হলেও আমরা প্রতিবাদ করতাম।”
বিএফইউজের আরেক মহাসচিব আব্দুল জলিল ভূঁঞা বলেন, “নানাভাবে আজ সাংবাদিকদের ঐক্য ভাঙার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আশা করি না। আমাদের আন্দোলন হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে। আমাদের সংগ্রাম চলবেই।”
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি আবদুস শহীদ বলেন, “এটিএন বাংলার কর্মী বা মালিকরা আমাদের প্রতিপক্ষ নয়। কিন্তু সাংবাদিকদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা অবশ্যই নিন্দনীয়। আমরা এটিএন বাংলার কর্মীদের আহ্বান জানাব, আপনারা এটিএন বাংলার মালিকের পক্ষ না নিয়ে সাংবাদিক সমাজের পক্ষ নিন। সাংবাদিক সমাজের বিপক্ষে গেলে আপনাদের ডিইউজে, প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সদস্যপদ বাতিল করা হবে।”
ডিইউজের আরেক সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, “সাংবাদিকরা দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন করছে। আমরা এতোদিন কারো নাম বলিনি। মাহফুজুর রহমান নিজেই বলেছেন সাগর-রুনি পরকিয়ার বলি। তাকে তো এই কথা আমরা শিখিয়ে দেইনি। তিনিই বলেছেন তার কাছে অনেক ঘটনার ফুটেজ আছে। এখন তিনি ঘটনাকে অন্যখাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ”
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা সাংবাদিকের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, “যারা মাহফুজুর রহমানের হয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেছেন, প্রয়োজনে তাদের ডিআরইউয়ের সদস্যপদ বাতিল করা হবে।”
হামলাকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “এটিএন বাংলার চাকরিই আপনাদের শেষ নয়। আপনারা পুরো সাংবাদিক সমাজের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন না।”
বাদশা বলেন, “মাহফুজুর রহমান কী ব্যবসা করে মিডিয়ার মালিক হয়েছেন, তা আমরা জানি। তিনি যদি মনে করেন পুরো মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করবেন, তবে তার সে স্বপ্ন পূরণ হবে না।”
তিনি মাহফুজুর রহমানের উদ্দেশে বলেন, “সাংবাদিক সমাজের আন্দোলন থামানোর জন্য যে ম্যাসলম্যান আপনি মাঠে নামিয়েছেন, তা দিয়ে আমাদের আন্দোলন একদিনের জন্যও থামাতে পারবেন না।”
ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক শাবান মাহমুদ বলেন, “সাংবাদিকদের ঐক্য প্রচেষ্টায় কোনো ফাটল ধরানোর উদ্যোগ সফল হবে না। আমরা যে কোন মূল্যে সাংবাদিক সমাজের ঐক্য ধরে রাখবো। আজ যে ঘটনা ঘটেছে তা অনাকাংখিত।” তিনি এই ঘটনার নিন্দা জানান।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ বলেন, “মাহফুজুর রহমান, আপনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন না। আমাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির কোনো চেষ্টা করবেন না। সাংবাদিকরা কোনো ধরনের বাধা মানবে না। এই আন্দোলন সঢল করেই রাজপথ ছাড়বে।”
এটিএন বাংলার প্রধান বার্তা সম্পাদক ভানুরঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, “আমরা সব সাংবাদিকের মতো সাগর-রুনি হত্যার বিচার চাই। আমাদের ‘খুনি’ বলার কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এমনটা আমরা চাই না। আমরা চাই, হত্যাকাণ্ডে জড়িত দোষীদের বিচারের আওয়াত এনে শাস্তি দেওয়া হোক। আমরা সাংবাদিক সমাজের অংশ।”
বিএফইউজের সাবেক মহাসচিব আলতাফ মাহমুদ বলেন, “মাহফুজুর রহমান বিতর্কিত কথা বলেই উত্তেজনা তৈরি করেছেন। তাকে র্যাব জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। অাশাকরি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত হত্যাকারীর বিচার হবে। কিন্ত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে উত্তেজনা তৈরি করে মূল ইস্যুকে চাপা দেওয়া যাবে না। সাংবাদিক সমাজ সাগর–রুনি হত্যার বিচার চায়।”
ডিইউজের সাবেক সভাপতি শাহ আলমগীর বলেন, “আমরা সাগর–রুনি হত্যার বিচার চাই। আমরা সাংবাদিকদের মধ্যে কোনো বিভেদ চাই না। শুধু সাগর–রুনির হত্যার বিচার নয়, সেইসঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপদে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।”
বাংলাদেশ সময়: ১২৪৩ ঘণ্টা, জুন ২৪, ২০১২
এমআইআর/সম্পাদনা: রানা রায়হান ও আহমেদ জুয়েল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর;
জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
jewel_mazhar@yahoo.com