৫ আষাঢ় ১৪২০, বুধবার জুন ১৯, ২০১৩ ৪:৩৮ এএম BDST banglanew24
01 Sep 2012   06:45:49 PM   Saturday BdST
E-mail this

গল্প

সুলতানা বড্ড অস্বস্তি বোধ করছিল


ফজলুল হক সৈকত
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
সুলতানা বড্ড অস্বস্তি বোধ করছিল গল্প

এক.
সুলতানা ঘুমায়নি। বালিশে মাথার নিচে হাত রেখে চোখ বুজে শুয়ে আছে। সাধারণত সে এ সময় বিছানায় যায় না। দিনদুপুরে ঘুমানোর ব্যাপারটা সে একেবারেই আয়ত্ব করতে পারেনি। বলা যায়, ঠিক, হয়ে ওঠেনি। অনেকের হয়; যেমন তাঁর বড়বোন জাহানারা এটা পারে- মধ্যসকাল-দুপুর-বিকেল যে কোনো বেলায় ঘুমুতে তার কোনো ক্লান্তি কিংবা অলসতা ছিল না কখনো, এখনো নেই। ঘুমকাতুরে জাহানারা এদিক থেকে একরকম সুখীই ভাবে নিজেকে। সুলতানা ঠিক তার উল্টো। দিনের বেলা বিছানায় যাবার ব্যাপারটিকে সে নেহায়েত অসুস্থতা আর আলসেমি ছাড়া কিছু ভাবতে পারেনি কখনো। কিন্তু আজ দুপুরের খাবারের পর কম্পিউটারে একটা জরুরি লেখা তৈরি করতে গিয়ে সে শেষ করতে পারলো না; মাথা ধরে গেল, ঝিমুনিও এলো খানিকটা। গত কয়েক রাত ঠিকমতো ঘুম না হওয়ায় সম্ভবত এমনটি হয়েছে।

তার নিজের থাকবার ঘরটি মাঝারি আকৃতির। পশ্চিমে বেশ বড় জানালা। পর্দার ফাঁক গড়িয়ে বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছে সুলতানার খোলা দুটি পায়ের পাতায়। শেষমাঘের এই ঝরঝরে বিকেলবেলায় রোদের উষ্ণতা ভালো লাগছে তার। পা দুটি স্থির রাখে সে। কেবল একটি বৃদ্ধাঙ্গুল মাথা টানটান রেখে উত্তর-দক্ষিণ করছে। গত কয়দিন কী ঝড়ই না বয়ে গেল তার ওপর দিয়ে। সে ধাক্কা সামাল দিয়ে উঠতে পারেনি জীবনে প্রায় হোচট-না-খাওয়া পঁচিশ বছরের সুলতানা।

ছোট মফস্বল শহরে সুলতানার বেড়ে ওঠা। লেখাপড়াও এ শহরেই। তার ইচ্ছে রাজধানীতে গিয়ে একটা কাজের সন্ধান করা। মানসিক প্রস্তুতি-সম্মতিও সম্পন্ন। চাকুরি থেকে সম্প্রতি রিটায়ার করা বাবাও রাজি। তিনি মেয়ের যুক্তি মানেন- রাজধানীনির্ভর অর্থনীতির এই দেশে এমনটিই স্বাভাবিক। সারাদেশ থেকে কাজ-না-পাওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজধানীতে প্রবেশ করছে প্রতিবছর। প্রশাসনিক নানাবিধ কাজেও দেশবাসী ভয়ংকরভাবে রাজধানীমুখী। শিক্ষা-স্বাস্থ্য এমনকি নৈমিত্তিক কেনাকাটায়ও কেউ কেউ অসহায় রকম সমর্পিত এই রাজধানীর স্বপ্নজগতে। বাবা মতিন তাই, সুলতানার সিদ্ধান্তে কোনো আপত্তি করেনি। মা জান্নাত অবশ্য মেয়ের চাকুরি করার ইচ্ছার সঙ্গে একমত নন; যদিও তিনি চাকুরিজীবী। তার মত হলো- মেয়েরা বাইরে কাজ করলে সংসারের চাকা ঠিকমতো চলে না। ট্রেনকে সড়কপথে নামিয়ে দিলে যেমন দশা হয়, চাকুরিজীবী নারীর সংসারও ওরকম বেহাল-অচল অবস্থায় পড়ে- এ কথা গত কুড়ি বছরে কয়েক হাজার বার উচ্চারণ করেছেন স্নেহময়ী-ঘরকাতুরে মা জান্নাত। অবশ্য তার আপত্তি জোরালো তেমন কিছু নয়; মেয়ের চিন্তা-কর্মে তিনি প্রকৃতঅর্থে নিজের কোনো ভাবনা আরোপ করতে চান না। মতটা শুধু বলে রাখা; সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার কোনো চাপ নেই। সুলতানার জন্য সবচেয়ে বড় বাধা তার বড়বোন এবং ভাবী। তাদের মত, এতে কেবল ঘরের মেয়ে বাইরে যাবার প্রসঙ্গই জড়িত নয়; বাড়ির সম্ভ্রমের প্রশ্নও সংশ্লিষ্ট। সুলতানার বিয়ে করে ঘর করার মতো যথেষ্ট বয়স হয়েছে, বিধায়, বহির্মুখী না হয়ে তার নিরিবিলি সংসারি হওয়াই অধিক প্রাসঙ্গিক এবং একমাত্র পথ বলে ঠিক করে রেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া-সমাপ্ত-করা একরকম কর্মহীন অভিভাবকসম বড়বোন রাজিয়া আর পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি পাওয়া কলেজের-পড়া-শেষ-না-করা ফুলটাইম গৃহিণী ভাবী ফরিদা।

ঠিক শুরু থেকে না হলেও মফস্বল ছেড়ে রাজধানী যাবার প্রস্তুতি-অভিযানে সুলতানাকে সাহস-সহযোগিতা-সঙ্গ দিয়েছে তার একমাত্র বন্ধু শ্যামল। বছর চারেকের বন্ধুত্ব তাদের। এরই মধ্যে শ্যামল জানতে পেরেছে, ঘরমুখো-আড্ডাবিমুখ-আত্মনিবিড়-ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সুলতানাকে। পরিবার-পরিপার্শ্বের কোনো বিষয়েই তার তেমন কোনো সম্পৃক্ততা নেই। প্রচলিত সমাজচিন্তা কিংবা নেহায়েত পারিবারিক প্রাত্যহিক-সংশ্লিষ্টতা তাকে কোনোদিন আকর্ষণ করেনি। জীবনের আপাত সাফল্য, সংসারলগ্নতা, টাকাকড়িনির্ভর স্বার্থভাবনা আর প্রভাববিস্তার-প্রবণতার মোহ থেকেও সে ভয়ংকররূপে মুক্ত। নিজেকে জানা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আত্মপ্রতিষ্ঠা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয় অনুভবকে আলোকিত করার দারুণ নেশা তার ভেতরে কেঁদে মরে রাতদিন। নারীজীবনের যন্ত্রণা, স্বামী নামক পুরুষের ওপর নির্ভরতা এবং ফলত অশান্তি সে অন্তত কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছে। তাই, অর্থনৈতিক-সামাকিজভাবে সাফল্যের প্রতিযোগিতায় নিজেকে সমর্পণ করতে তার কোনো কুণ্ঠা কিংবা ক্লান্তি নেই। অবশ্য পারিবারিক- পিতামাতার সঞ্চিত-অর্জিত আর্থিকভিত্তিতে স্বাভাবিক উত্তরাধিকারজনিত অভিমানও সে বোধ করে না। বড়বোন রাজিয়া যেমন বাবার-মায়ের বাড়ি, ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার একতিল-অংশও ছাড়তে রাজি নয়। ভবিষ্যৎ-প্রাপ্তির শতভাগ লাভের প্রত্যাশায় সে এখন থেকেই আসন গেড়েছে পৈত্রিক ভিটায়; শ্বশুরবাড়ির সামাজিক দায় কিংবা ব্যক্তিগত আকর্ষণ তাকে বাঁধতে পারেনি। তার আরেকটি ভয়- সুলতানাকে ঘিরে, বাবা তার প্রিয় ছোটকন্যাকে আদরবশত বাড়ি কিংবা টাকার বড় অংশ দিয়ে দিতে পারে। এ হিসাব মাথায় রেখে মাঝে মাঝে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বাবার কাছ থেকে সে হাতিয়ে নেয় নগদ টাকা, জমা করে টান-না-পড়া নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে। কিন্তু সুলতানাকে একেবারে জরুরি পোশাক ক্রয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাসঙ্গিক খরচাদি ছাড়া বাড়তি পয়সা নিতে দেখেনি কেউ কখনো।

শ্যামল, কোনো এক বিকেলে, তাদের বাসার ছাদে বসে, সুলতানাকে বলেছিল: ‘জীবন তোমার, তাই, কোথায় থাকবে, কী করবে তারও ঠিকঠাক করবে তুমি। আমরা, আপনজনরা তোমাকে পরামর্শ দিতে পারি শুধু; দায় নিতে পারি না। আর বাবা-মা-বোন-ভাবীর কথা ভাবছো- ওদেরকে বোঝাবার দায়িত্বও তোমার। যতটুকু বুঝি, এ সমাজ, এ পরিবার যা দেয়, তার থেকে অনেক বেশি নেয়, মানুষের কাছ থেকে। তাই, সমাজ আমাকে তৈরি করবে, বাঁচবার জায়গা করে দেবে- না ভেবে বরং ভাবতে শেখা উচিত, সমাজ গড়ার কিছুটা দায়িত্বও আমার ওপর, আমরা কেবল নীরব ভোক্তা হতে যাবো কেন? পথ তৈরি করে দেবে কে? আমি বুঝি, আমার পথ আমি বানাবো।’
    
সুলতানা এমনভাবে ভাবে না, তা কিন্তু নয়; ভেবেছে বহুবার, নানান সংকটের কথাও মনে পড়েছে বারবার। শ্যামলের কথার পিঠে সে বলে- ‘কিন্তু দেখো, সমস্যা তো কম নয়, পরিবার-সংসার এসব ধারণাকে কীভাবে পাশ কাটাবে?’

-‘পাশ কাটানোর কথা উঠছে কেন? বরং ভাবো, যারা জীবনকে ভাত আর মাংসল শরীরের বৃত্তে বেঁধে রাখে, তাদের বিশ্বাসে আঘাত হানতে হবে; ভাত দরকার, শরীরও। কিন্তু ওটাই শেষকথা কিংবা একমাত্র সাধনার বস্তু নয়- এটা তাদেরকে বুঝাতে হবে। জীবনের মানে যে অনেক বড়, আনন্দটা যে কোনো অংশেই খাটো করে দেখবার ব্যাপার নয়, মানসিক-শারীরিক তৃপ্তি যে মাবনসভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করে, তা না বুঝলে, বুঝাতে না পারলে বেঁচে থাকা যে নিরর্থক হয়ে পড়বে!’

-‘এ তো কোনো সোজা পথ নয় দেখছি!’

-‘দেখো পৃথিবীর কোনো পথই সরল নয়; একেবেঁকে চলতে হয় সব সড়ককে। আর নদীর গতিপথও কি সোজা? না। কাজেই, তুমি যা চাইছো, তা সহজে পেয়ে যাবে, এমন ভাবনাটা স্বাভাবিক নয়। ক্রমাগত ছোটছোট আঘাত প্রয়োগ করে তোমার চলার পথের বাধাগুলো সরাতে হবে। আর কাজটি করতে হবে ধৈর্য এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে। মনে রাখবে, মাথা গরম করে কোনোকিছু অর্জন করা যায় না; নিজের শক্তি বা সাহসের দাপট হয়তো কিছুটা প্রকাশ করা যায়।’
    
নিজের জীবনের আগপাছ বিবেচনা আর কর্মপন্থা নির্বাচনে আপনসিদ্ধান্তে অটল সুলতানা। বড়চাচা অবশ্য ইতোমধ্যেই সাফ জানিয়ে দিয়েছে- সুলতানার রাজধানীতে যাওয়া চলবে না। এখানে- এই মফস্বল শহরে থেকে চাকরি-সংসার নিয়ে শান্ত-নির্মল জীবন গড়ার পক্ষে তার সহজ অবস্থান। আর তিনি এও মনে করেন, রাজধানীর আলোবাতাসে মফস্বলের মেয়েরা প্রায়শই বিপথগামী হয়ে পড়ে। অতএব, নষ্টজীবন না চাইলে তার রাজধানীমুখী না-হওয়াই উচিত। এসব পারিবারিক-সামাজিক প্রশ্নাবলি এবং সংশ্লিষ্টতা একেবারে না-জানা, না-বুঝার ভাগ করে থাকাটাও নিরাপদ নয়। তাই সুলতানা যুক্তি আর উদাহরণ টেনে সামলাতে চায় সাংসারিক জটিলতা। সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক অসহায়-বন্ধনের প্রতিকূলতা, নারী অধিকারের প্রাসঙ্গিকতা আর আত্মনির্ভরতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়াদি সামনে এনে সে বোঝাতে চায়- তার মনোভঙ্গির প্রকৃত স্বভাব।
    
এ বিষয়ক সিরিজ অভিযানের আপাত শেষপর্বটি তাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে গত রাতে। হঠাৎ-ওঠা ফাল্গুনের মাতাল বাতাসের মতো প্রবল ঢেউ এসে লাগে তার চেতনায়। মা প্রায় কথা পাকাপাকি করে ফেলেছেন সুলতানার বিয়ের ব্যাপারে। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পাত্র তিনি হাতছাড়া করতে নারাজ। স্বামীকেও বুঝাতে চেষ্টা করছেন আপ্রাণ। তাদের কথালাপের মাঝখানে, টেলিফোনের কর্ডলেস রিসিভার আনতে গিয়ে, আগন্তুকের মতো প্রবেশ করে সুলতানা। সে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, যদি তার সিদ্ধান্তের বাইরে কোনোরকম চিন্তা তারা চাপাতে চান, তাহলে সে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে, স্রেফ হাতে একটা ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে, সকালের ট্রেনে চেপে রওনা দিবে রাজধানীর পথে। কথাটি বলে, প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা না করেই, চলে আসে নিজের ঘরে। তারপর থেকে এতটা সময় কেটেছে পরিবারের কারো সাথে একরকম কথা না বলেই।
    
বিকেলবেলার নরম রোদের উষ্ণতা যখন স্নেহের হাত বুলাতে থাকে তার দুপায়ের পাতায়, তখন একধরণের তন্দ্রাচ্ছন্নতা অনুভব করে সুলতানা। চোখ বন্ধ করেই সে দেখতে পায়- বাড়ির সামনের সংকীর্ণ পথ, একটু দূরে দাঁড়িয়ে-থাকা বুড়ো নারকেল গাছ, তার গলার কাছে ঝুলতে-থাকা ডাব-নারকেলের তারুণ্য-বার্ধক্য, কিলোমিটারখানেক দক্ষিণের ক্ষীণধারা নদীর বাঁকা গতিপথ, তার দুপাশের অপ্রশস্ত তীর, বাজারে যাবার প্রায়-নির্জন রাস্তা, সুপারমার্কেটের মৃদু কোলাহল, বাবা-মায়ের সন্ধ্যাকালীন ঝগড়া, বড়বোনের সংসারনাটকে অভিনয়ের দৃশ্যাবলি, ভাবীর অহেতুক পাণ্ডিত্য আর নিজের অসহায়তার দৃশ্যরাজি। ফেলে-আসা আর চারপাশে ভিড়-করা কথা-ছবি তার চোখের সামনে ভিড় করে; যেন চেপে বসে চোখের পাতায়, ইচ্ছে করলেই যেন তাকাতে পারে না হাফপ্যান্ট-পড়া শৈশবের স্বাধীনতা আর বড় হতে থাকা নারীজীবনে চেপেবসা নেতির প্রলেপ। চোখ খুলতে চেষ্টা করে সুলতানা। যেন রাজ্যের ঘুম অতিক্রম করে প্রবেশ করে আলোর জগতে। ভারী চোখের দৃষ্টি মেলে ধরে জানালার সরুপথে; স্থির করে পাশের বাসার কার্নিশে বসে থাকা দুটি সাদা কবুতরের দিকে। একটু পরেই হয়তো তারা উড়াল দেবে জানা কিংবা অজানার পথে। কিছুক্ষণ বাদে; কতক্ষণ তা ঠিক অনুমান করা যায় না, সুলতানার চোখ নেমে আসে ঘরের নিজস্ব বিবরে; পুরো ঘরের ক্যানভাস ভেসে ওঠে দৃষ্টির পর্দায়। এক এক করে দৃশ্যগুলো নিবিড় মনোযোগ দাবি করে। অবশেষে চোখ ক্লান্ত হলে স্থির দাঁড়ায় পুবদেয়ালের গা-ঘেষে বসে-থাকা নীলরঙের ট্রাভেল ব্যাগটির ওপর। ব্যাগটি সে পরিষ্কার দেখতে পায় কি-না, কিংবা আদৌ তার চোখ খোলা কি-না অথবা তার অবস্থিতির প্রকৃত অবস্থা কী, বুঝতে অসুবিধা হয় সুলতানার।


দুই.
-‘আপা নাস্তা দেব?’

ট্রেনের চা-বিক্রেতার আহ্বানে তাকায় সুলতানা। সামলে নিতে যেন সময় লাগে কিছুক্ষণ। ঘোরলাগা মানুষের মতো বলে- ‘দাও’।
    
সুলতানা এখন ট্রেনে। রাজধানীর উদ্দেশ্যে ট্রেনটি ছেড়েছে অল্পক্ষণ আগে- সকাল সাড়ে সাতটায়। সকালের তাজা রোদ চারদিকে সোনা ছড়াচ্ছে। মৃদু ঝাঁকি আর বাইরে থেকে আসা বাতাসে সুলতানার মনের ভেতরে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের দুলুনি; দুলতে দুলতে বুকের ভেতর জমে থাকা ভারি পাথরগুলো এক এক করে খসে পড়ছে পায়ের পাতার ওপর। নিচে তাকাতেই চোখে পড়ে পায়ের ওপর বসে থাকা ভারী নীল ব্যাগ। ব্যাগটি তুলে রাখে মাথার ওপরের বাঙ্কারে। গতকাল বিকেলের পর থেকে এখন পর্যন্ত ঘটে-যাওয়া ব্যাপারগুলো সুলতানা মনে করতে চেষ্টা করে- নীল ট্রাভেল ব্যাগের উপর স্থির চোখ তার মনে পড়ে; আকাশের রঙ নীল- সম্ভবত প্রসন্নতার ইঙ্গিত বহন করে, বেদনার রঙ কেন নীল তা তার কিছুতেই মনে আসে না! সে কিছুতেই মনে করতে পারে না ব্যাগের উপর থেকে সে চোখ সরাতে পেরেছিল কি-না? পারলে তার কতক্ষণ সময় লেগেছিল? তারপর সে কী করেছিল? রাতের খাবার, অন্যান্য দিনের মতো টিভি দেখা, ছাদে পায়চারি করা- সব ঠিকঠাক মতো ছিল তো? সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়া, স্টেশনে আসা, টিকিট কাটা, ট্রেনে চড়ে বসা- এসবের কিছুই মনে করতে পারে না সুলতানা। এমনকি রাতে কিংবা সকালে সে শ্যামলকে ফোন করেছিল কি-না অনেক চেষ্টা করেও স্মৃতির পাতা থেকে সে খবর খুলতে পারে না।

বেয়ারা নাস্তাসমেত ট্রে রাখে সামনের ছোট টেবিলে। দুটুকরো রুটি, ভেজিটেবল কাটলেট, অরেঞ্জ জেলি একটা ডিমসেদ্ধ আর পানির অপর নামের লেবেল-আটা খোদাই করা শাদা বোতলে ছোট এক বোতল পানি।
 
-বেয়ারা, লেবু চা হবে?

-জ্বী, আপা।

গরম চায়ের স্বাদ ঠোঁটে চেপে চোখ বুজে সুখ-সুখ অনুভব গিলতে গিলতে সুলতানা হারিয়ে যায় এক নীল নীল শহরের অলিতে গলিতে। দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু উঁচু দালান আর পিঁপড়ের সারির মতো চলতে থাকা গাড়িবহর খচিত এক স্বপ্নের শহরে ঘুরতে থাকে সে। রবিবারে সকালে হাতে আসে নিয়োগপত্রভর্তি শাদা খাম। বিকেলগুলো সব জট পাকায় পার্কের জটিল জামরুল আর হ্যাংলা ইউক্যালিপ্টাসঘেরা নোংরা কৃত্রিম লেকে। একদিন ফার্স্টফুডের দোকান থেকে উঠে পড়তে হয় একা একা। তারপর বড় সড়ক ধরে সোজা বাসায় নিজের ছোট কামরায়। অতঃপর ঘোরলাগা দিনরাত্রি। তারপর- আবার অফিস, ফেরার পথে কাঁচাবাজার, শপিং মল, রিক্সা, ট্রাফিক জ্যাম, নিবিড় ধুলাবালি পার হয়ে পুনরায় বাড়ি ফেরা।
    
শহরগুলোর এই এক দশা! এক ফালি জায়গা খালি নেই; অথচ প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষের প্রবেশ-অনুপ্রবেশ। গ্রামগুলোকে গ্রাস করে নতুন নতুন উপশহর-মডেলশহর গড়ে উঠছে প্রতিনিয়ত। কারো কোনো ক্লান্তি নেই। স্কুল-মাদ্রাসা-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি-এনজিওর হেডঅফিস, সুপার মার্কেট, হাসপাতাল-ক্লিনিক-প্যাথলজি, কলকারখানা, বাণিজ্যিক পরিষদ- সবই যেন পাল্লা দিয়ে স্থায়ী আসন গাড়তে বসেছে শহর নামক অসহ্য নর্দমায়। সে শহরের অনিবাযর্তার টানে আজ সুলতানার এই পরিভ্রমণ! আজ তার কেবলই নিজেকে অচেনা মনে হয়; একবার- সম্ভবত বছর পনেরো আগে এরকম এক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতে পারেনি সে। আজ আবার সুলতানা কৈশোরের সেই ঘোরলাগা মুহূর্তের অজানা এক অন্ধকার গলিতে প্রবেশ করছে যেন। সেবার এক নিকটাত্মীয়ের বিয়ে উপলক্ষে সমবেত শত জনতার ভিড়ে নিজেকে অসহায়-অভ্যাগত মনে হয়েছিল তার। উৎসবস্থল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেঁদেছিল অনেকক্ষণ। কতোক্ষণ ঠিক মনে নেই; তবে কান্নায় যে কোনো কৃত্রিমতা ছিলো না, তা স্পষ্ট মনে আছে। আজ আবার সে নিজেকে বড় শহরে অভ্যাগত ভাবতে শুরু করে। কিছুতেই বিশ্বাস করতে মন সায় দেয় না যে, তারও অধিকার আছে শহরের সুখ-সুবিধা লুফে নেওয়ার; লুফে নেওয়াই-বা ভাবছে কেন? বরং ভাবা উচিৎ অনুভব করার।

তিন.
সকালে খবরের কাগজ হাতে নিতেই সুলতানার চোখ পড়ে প্রথম পাতার ডানদিকে শেষকলামে বাক্সেআঁটা একটি বাক্যে- ‘এক ব্যাগ চাল: দারিদ্র্যের রূপ কতটা করাল!’ বস্তার স্তুপের ফাঁকে এক কিশোরের নির্বাক মুখের রঙিন ছবিতে দৃষ্টি থামে তার। নিচে ক্যাপশান লেখা: ‘চাল চুরি করতে গিয়ে আড়তে বস্তা চাপা পড়ে মারা যায় অজ্ঞাত এই কিশোর।’
    
দশ বছরের রিয়াজ নামক এই কিশোরটি হয়তো নোবেল পুরস্কারের কথা শোনেনি। তার এটাও জানার কথা নয় যে, সে যে দেশে জন্মেছে সে পোড়ার দেশেও একজন নোবেলবিজয়ী বিশ্বখ্যাত মানুষ আছেন, যিনি এই স্বপ্ন দেখিয়েছেন, দারিদ্র্যকে আমরা ইতিহাসে পরিণত করবো। তিরিশ বছর বা আরো কিছু পরে গরিব মানুষ বলে কিছু থাকবে না। গরিব মানুষের ছবি দেখা যাবে জাদুঘরে। এসব কথায় রিয়াজের কোনো দরকারও ছিলো না। ও বুঝতো শুধু এক মুঠো ভাত চাই। মুঠো মুঠো শাদা ধবধবে জুঁই ফুলের মতো ভাতের স্বপ্ন ক্ষুধার্ত শরীরে ক্লান্ত ফ্যাকাশে চোখে ক্রমে ঝাপসা হলুদ শর্ষে ফুল হয়ে মিলিয়ে যেত। ক্ষুধা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া। রাজধানী ঢাকার বস্তিতে বাস। উত্তর বিশিলের বালুমাঠ বস্তি। বাবা পরিবার ফেলে চলে গেছে- কোথায় কে জানে! মা তো তার বুকের ধন ফেলতে পারে না। একা মায়ের বাসাবাড়িতে কাজ করার রোজগারে তিনটি পেট ভরে না। মা ও বোনকে ছেড়ে রিয়াজ কি কোথাও কিছু খেতে পারে? তাই সে গিয়েছিলো বাজারে চালের আড়তে ঢুকে চুপিসারে একটি ব্যাগ নিয়ে বস্তা ছিদ্র করে কিছু চাল নিয়ে আসতে। মালিকের হাতে যদি ধরা পড়তো, কানমলা বা লাথিগুতো-পিটুনিতে শরীর কয়েকদিন ব্যথা করতো। খিদের যন্ত্রণায় আবার বেরুতো। কিন্তু না মালিক নয়- রিয়াজের চারদিকে ছাদ পর্যন্ত ঠাসা বস্তার স্তুপ। ভেতরে রাশি রাশি চাল! এত চালে তার কোনো প্রয়োজন নেই। তার ছোট্ট ব্যাগটি ভরে গেলেই চলবে। মা রেঁধে দিলে মাকে নিয়ে দুই ভাইবোন খাবে। জুঁই ফুলের মতো শাদা ধবধবে গরম ভাত! ভাপ ওঠা। বোনের মুকে হাসি দেখা যাবে। বিকেলে বস্তিতে তারা একসঙ্গে খেলবে। কিন্তু হঠাৎ! ধবধবে ভাতের বদলে ধপাস ধপাস করে রিয়াজের এতটুকুন শরীরের ওপরই পড়লো স্তুপের বস্তার পর বস্তা। ঢেকে গেল রিয়াজ। আর্তচিৎকার কিংবা অস্ফুট গোঙানির আওয়াজ কী কেউ কিছু শুনেছিল!
    
সুলতানা শুনতে পায় রিয়াজের চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যাবার শব্দ! আর শুনতে পায় বিড়বিড় করে বলতে থাকা কিশোরের কথামালা! সুলতানার চোখের সামনে ভেসে ওঠে রিয়াজের মুখ। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না; কেবল কম্পমান ঠোঁটগুলো ছবির মতো ছায়া মেলে। রিয়াজের কি শীত লেগেছিলো তখন! মায়ের কথা মনে হয়েছিল খুব। মাকে কিংবা বোনকে দেখতে ইচ্ছে হয়েছিল! কে জানে সেসব কথা! সুলতানার চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। যেন কিছুই ভাবতে পারছে না। বন্ধ চোখের পাতার ওপর ভেসে ওঠে মফস্বলের তার শোবার ঘরটি- পরিপাটি বিছানা, জানালার ফাঁক গড়িয়ে ঘরে ঢুকে-পড়া নরম রোদের স্নেহ, মায়ের বকুনি, ফেরিওয়ালার গলাখোলা হাঁক, নদীর ধানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা কাশবন। সে টের পায় বাতাসে ভেসে আসছে মায়ের আদর মাখা গরম ভাতের ওম। তারপর, ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সে, কেমন যেন ঘুম ঘুম লাগতে থাকে সুলতানার!

(লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক, কথানির্মাতা ও সংবাদ-উপস্থাপক।)

বাংলাদেশ সময়: ১৮৩৫ ঘণ্টা, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস, নিউজরুম এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
banglanews24 All Apps
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
IIMEJ
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান