 |
| ছবি: দেলোয়ার হোসেন বাদল/ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
ঢাকা: নির্মাণাধীন ছয়তলা একটি ভবনে হঠাৎ আগুন লাগলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছড়িয়ে পড়লো লেলিহান শিখা। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো চারপাশ। ভেতরে আটকেপড়া মানুষের চিৎকার চেঁচামেচিতে ভারি হয়ে উঠলো আকাশ। বাঁচার প্রবল আকুতি সবার কণ্ঠে।
দেখতে দেখতে আরো একটি ভবনেও ছড়িয়ে পড়লো সে আগুন। এভাবে পরপর ৫টি ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় আশপাশের গোটা এলাকার সবাই হয়ে পড়লো আতংকিত। চারপাশে কেবল কান্না আর আহাজারির। এক সময় সাইরেন বাজাতে বাজাতে ছুটে এলো ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল। উদ্ধারকাজে লেগে গেলেন একঝাঁক দক্ষ কর্মী।
ঘটনাটির দৃশ্যায়ন হয়েছে বুধবার সকালে। সত্যিকারের আগুন কিংবা কোনো দুর্যোগের চিত্র না হলেও দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতি নেওয়া হয় এ মহড়ার মধ্য দিয়ে। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি মাঠে সশস্ত্র বাহিনীর উদ্যোগে ভূমিকম্প ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এ যৌথ অনুশীলন বা মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। ‘ডিজ্যাস্টার রেসপন্স এক্সারসাইজ অ্যান্ড একসেস’ শীর্ষক এই অনুশীলনে সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে অংশ নিয়েছে ২২টি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান।
সকাল ১০টায় অনুশীলনস্থলে উপস্থিত হন সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী ও ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা। এছাড়া মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি প্রতিনিধিদল এই অনুশীলন পরিদর্শনে আসে।
সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুশীলন উপস্থিত ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর অপারেশন ও পরিকল্পনা পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল আতাউল হাকিম সারওয়ার হাসান, ফায়ার সার্ভিন অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল আবু নাঈম মো. শহীদুল্লাহ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৌহিদ, নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আহমেদ আমিন আব্দুল্লাহ, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের সিনিয়র নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন) ব্রিগেডিয়ার (অব.) শেখ আহমেদ মুক্তাদির আরিফ, বসুন্ধরা গ্রুপের হেড অব প্রেস লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবদুল আওয়াল (বীর প্রতীক) প্রমুখ।
অনুশীলনস্থলের পাশে স্থাপন করা হয় সেনাবাহিনীর একটি ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল। আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ অস্থায়ী হাসপাতালে ভূমিকম্প ও দুর্যোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার জন্য রাখা হয়ে অপারেশন থিয়েটার, উন্নত ল্যাব, আইসিইউ, এক্সরে মেশিন। ৩০ শয্যার অস্থায়ী এ হাসপাতালে একসঙ্গে ৬০ জন রোগীর চিকিৎসা দেওয়া যাবে বলে জানান হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এফ এম শামীম।
জানা যায়, সশস্ত্র বাহিনীর এক হাজার কর্মীর সঙ্গে এই অনুশীলন মহড়ায় যুক্ত হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আরো এক হাজার জন। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্যোগে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে।
প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী মহড়ার মধ্যে ভূমিকম্পে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। এজন্য বেছে নেওয়া হয় মহড়াস্থলের পাশ্বর্বর্তী পাঁচটি নির্মাণাধীন ভবন। অনুশীলন মহড়া শুরু হওয়ার পরপরই ভবনগুলোর ভেতরে নির্ধারিত স্থানে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এসময় ভবনে আটকে মানুষগুলোকে উদ্ধার করার জন্য সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, র্যাব ও পুলিশের তৎপরতা দেখানো হয়।
বিভিন্ন কৌশলে ভবনে আটক মানুষজনকে বের করে আনার দৃশ্য দেখানো হয় এ অনুশীলন মহড়ায়। তার মধ্যে রুফ স্লাইডিং ও ক্রেন দিয়েও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ভবন কেটে আটকে পড়াদের বের করে আনতেও প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রাংশের ব্যবহার দেখানো হয় এ অনুশীলন মহড়ায়। সেই সঙ্গে ভবনের কোথাও কোন মানুষ আটকা পড়ে আছে কি না, তা খুঁজে বের করতে রাখা হয় সেনাবাহিনীর দক্ষ কুকুরদল (ডগ স্কোয়াড)।
উদ্ধারকৃতদের তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয় জরুরি মেডিক্যাল টিম। গুরুতর আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয় পর্যাপ্ত সংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স; ভবন ভাঙ্গার জন্য বুলডোজারও আনা হয় এ মহড়ায়। সেইসঙ্গে হেলিকপ্টারের সাহায্যে উদ্ধার তৎপরতা দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়।
অনুশীলন পরিদর্শন শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবার দেন। এসময় তিনি বলেন, “নিশ্চয়ই এমন উদ্যোগ আমাদের দুর্যোগ ও ভূমিকম্প মোকাবেলার ক্ষেত্রে সাহসী ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে। আমরা দুর্যোগ মোকাবেলার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সাড়ে তিন বছরে অনেকখানি সফল হয়েছি। ভবিষ্যতে আরো সফল হবো।”
``দুর্যোগ মোকাবেলার বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন?``-- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “পুরোপুরি প্রস্তুত এমন কথা বলা যাবে না। তবে এরই মধ্যে ভূমিকম্প ও দুর্যোগ মোকাবেলায় ৭০ কোটি টাকার সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে। আরো ১৬০ কোটি টাকার সরঞ্জাম দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।”
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, “নিঃসন্দেহে এটি দারুণ উদ্যোগ। এমন উদ্যোগ দিয়ে বাংলাদেশ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র অন্য কোনো দেশের সঙ্গে এ ধরনের মহড়ায় যৌথভাবে সম্পৃক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে, কীভাবে দুর্যোগ মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়।”
পুরো মহড়ায় সমন্বয়কারী ও সশস্ত্র বাহিনীর অপারেশন ও পরিকল্পনা পরিচালক বিগ্রেডিয়ার আতাউল হাকিম সরওয়ার হাসান একে মহড়া নয়, প্রকৃত অনুশীলন বলতেই বেশি আগ্রহী। তার ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল গার্ড থেকে আমরা ধারণা নিয়েছি। এটা কোনো মহড়া নয়, একেবারে প্রকৃত অনুশীলন। এর মাধ্যমে আমরা সহজেই বুঝতে পারবো, দুর্যোগ ও ভূমিকম্প প্রতিরোধে আমাদের প্রস্তুতিতে কি কি দুর্বলতা রয়েছে। এছাড়া এই বিষয়ে এরই মধ্যে ২০টি আলোচনা (টেবিল টক) হয়েছে। ফলে আমরা সহজেই দুর্যোগ মোকাবেলার বিভিন্ন বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারবো।”
সশস্ত্র বাহিনী সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে দুর্যোগ প্রতিরোধে ৬২ হাজার স্বেচ্ছাসেবক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ঢাকাতেই ৮ হাজার স্বেচ্ছাসেবক কাজ করবে। পাশাপাশি ঢাকাকে হেভি, লাইট ও মিডিয়াম নামে তিনটি স্তরে ভাগ করে দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতি নেওয়া করা হয়েছে।
ভূমিকম্প-দুর্যোগ প্রতিরোধে সশস্ত্র বাহিনীর এক হাজার কর্মীকেও দক্ষ করে তোলার কথা জানানো হয় সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে। অনুশীলন থেকে সবাই মনে করছেন, কেবল অনুশীলনেই নয়, দুর্যোগ মোকাবেলায় দক্ষ করে তোলাই এই অনুশীলনের প্রধান উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ সময়: ১৪২১ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১২
এমএ/সম্পাদনা: রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com