ঢাকা: শতকরা হিসেবে বাজেট ঘাটতির হার খুব বেশি না বাড়লেও (১.১ শতাংশ) গত চার বছরে বাজেট ঘাটতি বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। আর বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের গৃহীত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় তিনগুণ।
সরকারের গত চার বছরের বাজেট উপাত্ত থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বাজেট উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, বর্তমান মহাজোট সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, সেই চলমান অর্থবছরে অর্থাৎ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে প্রকৃত বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। এটা ছিল জিডিপির ৪ শতাংশ।
আর চলতি বিদায়ী অর্থবছরে (২০১১-১২) প্রকৃত বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা। এটা জিডিপির ৫ দশমিক ১ শতাংশ।
অবশ্য ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রকৃত বাজেট ঘাটতি কিছুটা বাড়লেও শতকরা হিসেবে তা কমে দাঁড়িয়েছিল জিডিপির ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
এর পরবর্তী অর্থবছরে (২০১০-১১) বাজেট ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা। এটা জিডিপির ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। পূর্ববর্তী অর্থবছরে (২০০৯-১০) ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক লাফে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে ৯ হাজার ১২১ কোটি টাকা।
আগামী ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫২ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। এটা জিডিপির ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে প্রকৃত ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা। টাকার অংকে ঘাটতির পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা।
এদিকে বিভিন্ন মহল প্রতিবছর সরকারের বিশাল বাজেট ঘাটতির সমালোচনা করলেও ‘বাজেট ঘাটতি খুব বেশি নয়’ বলে বরাবরই দাবি করে আসছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ‘বাজেট ঘাটতি থাকা দরকার’ বলেও বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য করে থাকেন তিনি।
অন্যদিকে প্রতিবছরই প্রধানত তিনটি উৎস থেকে বাজেট ঘাটতি পূরণ করা হয়ে থাকে। এ তিনটি উৎস হচ্ছে— বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান, ব্যাংকিং খাত এবং ব্যাংক বহির্ভূত (সঞ্চয়পত্র) খাত।
বাজেট উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি মেটাতে গিয়ে প্রতিবছরই সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়ছে।
মহাজোট সরকারের ক্ষমতায় আসার অর্থবছরে অর্থাৎ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা।
এর পরের অর্থবছরে (২০০৯-১০) সরকার ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ গ্রহণ করেনি, বরং ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করেছে ২ হাজার ৯২ কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তী দু’বছর এটা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
২০১০-১১ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। সর্বশেষ চলতি ও বিদায়ী ২০১১-১২ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে নেওয়া হয়েছে ২৯ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১০ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা বেড়েছে।
২০১২-১৩ অর্থবছরের নতুন প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকিং খাত থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বলাবাহুল্য, ব্যাংকিং খাতের ওপর সরকারের এ বিপুল পরিমাণ ঋণ নির্ভরতার সমালোচনা করছেন ব্যবসায়ীরা। বাজেট প্রতিক্রিয়ায় তারা বলছেন, সরকারের এ ব্যাংক ঋণ নির্ভরতার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ব্যাহত হবে, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট দেখা দিতে পারে এবং এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার আরো বাড়বে।
উল্লেখ্য, বাজেট ঘোষণার আগে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ কমানোর কথা বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু বাজেটে এর প্রতিফলন ঘটেনি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ সময়: ১৬৪০ ঘণ্টা, জুন ১৬, ২০১২
এসআর/সম্পাদনা: আহমেদ জুয়েল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর