 |
স্বশিক্ষিত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের জীবন, চিন্তা ও কর্ম বিষয়ে প্রথিতযশা লেখক-শিল্পী, বুদ্ধিজীবীদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘আরজ আলী মাতুব্বর পাঠ ও মূল্যায়ন’। বইটি প্রকাশিত হয়েছে সূচীপত্র থেকে। সম্পাদনা করেছেন রুদ্র সাইফুল এবং প্রচ্ছদ করেছেন চারু পিন্টু। বইটির মূল্য ৪৫০ টাকা।
এই বইতে লিখেছেন- বদরুদ্দীন উমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, শামসুর রাহমান, মুসা মনসুর, মোজাফ্ফর হোসেন, হাসনাত আব্দুল হাই, হাসান আজিজুল হক, সেলিম আল দীন, আবুল বারাকাত, আনু মুহাম্মদ, কাজী আবুল কাসেম, কায়সুল হক, কামাল লোহানী, যতীন সরকার, মুহাম্মদ শামসুল হক, আমজাদ হোসেন, আমিনুল ইসলাম, খালেকুজ্জামান, সেলিনা হোসেন, কাজী নূরুল ইসলাম, আবু সাঈদ খান, ড. মুকিদ চৌধুরী, মানস চৌধুরী, আবু সাঈদ তুলু, আব্দুল্লাহ আল নোমানসহ আরো অনেকে।
আরজ আলী মাতুব্বর সাধারণ মানুষের যাপনে অসাধারণ। তিনি সহজ-সরল জীবন যাপন করে গেছেন। তার মনন তাঁকে নতুনের দিশারী করে তুলেছে। প্রথাসিদ্ধ পথে তিনি চলেন নি। কারণ, সমাজ’কে সজীব দেখার বাসনা তাকে সবসময় জিজ্ঞাসার সম্মুখীন রেখেছে। স্বদেশের মানুষকে তিনি সত্যিকারের মানুষ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। যুক্তিবাদ’কে তিনি করেছেন অষ্ট প্রহরের সঙ্গী। অজ্ঞতার সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছেছেন তার আদর্শের ভিটায়। তিনি বস্তুত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পথপ্রদর্শক ছিলেন। জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থী, সত্য অনুসন্ধানী সজ্জনদের পক্ষে এবং ধর্মবিকৃতির অন্ধ প্রচারকদের বিরুদ্ধে আজ সেই সম্পদ অপার-বিশাল জ্ঞান-ভাণ্ডারের দুয়ার উন্মোচিত করে দিয়েছে।
মহামতি আরজ আলী মাতুব্বর আত্মা, ঈশ্বর, পরকাল, ধর্ম প্রকৃতি সম্পর্কে যে মৌলিক বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন যা আগে কেউ এভাবে উত্থাপন করেনি। আরজ আলী মাতুব্বর তাঁর জ্ঞানান্বেষী গ্রন্থে একথাও তুলে ধরেন কেবল যে বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন মত আছে এমন নয়। একই ধর্মে মতভেদের অন্ত নেই। যেমন হিন্দু ধর্মে বেদ, উপনিষদ, আর পুরাণ সবক্ষেত্রে একই কথা বলে না। তেমনি বাইবেলে নতুন ও পুরোনো টেস্টামেন্টের আবির্ভাব ঘটেছে বা ক্যাথলিক মতবাদ রয়েছে। ইসলামেরও শিয়া, সুন্নি, মুতাজিলা, ওহাবি, কাদিয়ানি এদের সবার মত এক নয়। সুন্নিদের মধ্যেও চারটি মাজহাব রয়েছে। যদি এক মতাদর্শী হবে, তবে ভিন্ন মাজহাব কেন? জগতের সকল লোকই যদি একেশ্বরবাদী হয় তবে তাদের মধ্যে একটা ভ্রাতৃভাব থাকা উচিত। কিন্তু আছে কি? আছে যত রকম হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ, কলহ। সেই কলহ থেকে প্রতিকূলতাকে ছাপিয়ে তিনি আপন আলোয় নিজেকে এবং সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন। আরজ আলী মাতুব্বর ১৯০০ সালে ১৭ ডিসেম্বর তারিখে বরিশাল জেলার লামচরি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
পারিবারিকভাবে আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া করতে না পারলেও তিনি নিজেকে গড়ে তুলেন বিজ্ঞানমনষ্ক, স্বশিক্ষিত মুক্তচিন্তার মানুষ হিসাবে। অসীম পাণ্ডিত্যের অধিকারী হয়েও কৃষিকাজ করে জীবনধারণ করতেন। আরজ আলী মাতুব্বরের ছিল অন্ধবিশ্বাস ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করার ক্ষমতা। ৮৬ বছর বয়সে ১৯৮৬ সালের ১৫ মার্চ দেহাবসানের পরও তাঁর জীবনজিজ্ঞাসা আমাদের জ্ঞানালোককে উন্মোচন করতে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর মত করে দর্শনচিন্তা আর কেউ করেনি বাংলাদেশে। তিনি ছিলেন অসীম সাহসী, কুসংস্কার ও অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক প্রতিবাদী চরিত্র। সত্য প্রকাশের জন্য সক্রেটিসের মতো তাঁকে মরতে হয়নি। কিন্তু তিনি বিজ্ঞানের এই যুগেও ‘হাজতবাস’ করেছেন মুক্তচিন্তার জন্য।
আরজ আলী মাতুব্বর অসীম নিষ্ঠা ও পাণ্ডিত্যের সাথে ৩০ বছরেরও অধিক সময়কালে ১১টি পাণ্ডুলিপি রচনা করে গেছেন। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা অসংখ্য পথের ঠিকানা জানেন, কিন্তু তারা পথ খুঁজে পান না সঠিক পথ কোনটি। আরজ আলী পথ খুঁজে বের করেছিলেন। তিনি মৌলিকভাবে চিন্তা ভাবনা করেছেন। তিনি কোটি কোটি মানুষের পক্ষ থেকে কথা বলেছেন। তাঁর একার যে সাহস তা আমাদের গোটা মধ্যবিত্ত সমাজে থাকার কথা নয়। আরজ আলী মাতুব্বরের পক্ষে অসম্ভব ছিল না দুঃসাহসিক চিন্তার। এই মহান ও চির অম্লান মানুষকে নিয়ে লিখেছেন কিংবদন্তিতুল্য লেখকবৃন্দ। তাঁদের মধ্যে শামসুর রাহমান আরজ আলী মাতুব্বর সম্পর্কে বলেন- ‘তিনি জ্ঞানে ছিল ঋদ্ধ, অসাধারণ ছিল ধ্যান-ধারণা। আপনি আমাদের সংকীর্ণ, অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে অসামান্য আলোকস্তম্ভ অনির্বাণ থাকবে বহুকাল, সৃষ্টি করবে আরও নতুন আলোকস্তম্ভ, আপনাকে সশ্রদ্ধ সালাম।’
প্রয়াত কবি শামসুর রাহমান আরো বলেন- ‘আরজ আলীর চেতনায় খাদ ছিল না বলে নিজের মৃতদেহ এবং চক্ষুদ্বয় দান করে গেছেন মানুষের কল্যাণে।’
বাংলাদেশ সময়: ১৭৪০ ঘণ্টা, ১২ আগস্ট, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস, নিউজরুম এডিটর