 |
| ছবি: নাজমুল হাসান/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
সারা পৃথিবীর সৃষ্টিকূলের জন্য যে মানুষটিকে আল্লাহ তায়ালা রহমত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন তিনি হলেন, আমাদের প্রিয় নবী, নবীদের নবী, রাসূলদের রাসূল, সর্বশ্রেষ্ট নবী, সর্বশেষ নবী হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা.)।
মহানবী (সা.) এর মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে নিজেই আমাদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘স্বয়ং আমি আল্লাহ্ আমার হাবীব (নবী সা.) ওপর দরুদ পাঠ করি তোমরাও আমার নবীর ওপর দরূদ পাঠ কর’। মহানবীকে (সা.) আল্লাহ পাক মেরাজে নিয়ে পুরো মানবজাতি যে সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ তার প্রমাণ করে দিয়েছেন এই অজেয় মর্যাদা দিয়ে।
নবীজী (সা.) তাঁর সাহাবাদের বলে গেছেন, ‘আমি দিনের আলোতে, রাতের অন্ধকারে, ব্যক্তিগত জীবনে, সামাজিক জীবনে, রাষ্ট্রীয় জীবনে যা কিছু করেছি সব তোমরা মানুষকে জানিয়ে দাও’।
বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে আম বয়ান থেকে শুরু করে আখেরি মোনাজাতের আগ পর্যন্ত হেদায়েতের বয়ানে মূল বক্তব্য ছিল বা উপস্থিত জনসমুদ্রকে ইজতেমার মুরব্বিরা একটিই সর্বশ্রেষ্ঠ ম্যাসেস দিয়ে দিয়েছেন আর তা হলো, আল্লাহ তায়ালার ভয় ও প্রিয় নবী হজুরের (সা.) প্রতি তীব্র মহব্বত ছাড়া হয়তো মানুষের মনে হেদায়েতের নূর প্রবেশ করতে পারবে না। তাঁরা বলেছেন, ‘হেদায়েত দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। কোনো নবী, রাসূল কিংবা কোনো সাধারণ মানুষের হাতে হেদায়েতের ক্ষমতার চাবি দেওয়া হয়নি। মানুষকে হেদায়েত দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ পাক বলেই আল্লাহ পাকের হাবীব হুজুরকে (সা.) যে ব্যক্তি ভালোবাসলো, মহব্বত করলো নিজের সন্তান, বাবা-মা থেকে বেশি, সেই ব্যক্তির মধ্যেই আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভয় সৃষ্টি হয় এবং সে আল্লাহ তায়ালার রহমতপ্রাপ্ত হন।
মুরুব্বিরা বয়ানে বলেছেন, ‘আপনারা যারা ইজতেমায় এসে ঈমান, আকীদা ও দ্বীনের কথা শুনছেন, মনে রাখবেন এখান থেকে তাদের একটি দেহ কাঠামো তৈরি হয়েছে মাত্র। এখন এই দেহের ভেতর রূহ ঢুকাতে হবে। সেই রূহ হচ্ছে গভীররাতে ঘুম থেকে উঠে নিজের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহ তায়লার কাছে নামাজের মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং নবীজীর (সা.) প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। মনে রাখতে হবে, নবীজী (সা.) এর প্রতি দরুদ পাঠ করা এমনই একটি দোয়া যা সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়ে যায়। দরুদ পাঠকারীর নামসহ তাঁর পিতা-মাতার নাম নিয়ে ফেরেস্তারা সঙ্গে সঙ্গে সে দরুদ নবীজীর (সা.) কাছে পৌঁছে দেন। এ কাজে আল্লাহ পাক অসংখ্য ফেরেস্তাকে নিয়োগ দিয়ে রেখেছেন। তাই যে কোনো দোয়া করার আগে মুরুব্বিরা বয়ানে বলেছেন প্রথমে দরুদ পাঠ করে দোয়া করতে থাকুন। আশা করা যায় আপনার দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভবনা অত্যন্ত বেশি।’
বয়ানে বলা হয়, ‘সব জিনিস অর্জন করতে যেমন কষ্ট করতে হয়, তেমনি ঈমান অর্জন করতে বা মজবুত করতে অবশ্যই কষ্ট করতে হবে। আমরা অনেকেই আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে বলি, আহা কী শীত, কী গরম বা এতো কষ্ট? আমরা তো ভাগ্যবান এ কারণে যে আমাদের হুজুর (সা.) ও সাহাবাদের মতো কষ্ট করতে হচ্ছে না বরং সাহাবাদের কাজটা আমরা করার চেষ্টা করে যাচ্ছি, যে কাজটা প্রত্যেক নবী, রাসূল (আলাইহিছাল্লাম) করে গেছেন, নবীজীর (সা,) সাহাবারা করে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন।’
মুরুব্বিরা বয়ানে বলেছেন, ‘আল্লাহ পাকের রাজি-খুশির জন্য আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নাই। ঈমানের ওপর মেহনত করতে হলে আল্লাহর রাস্তায় বের হতে হবে। নিজের ঈমানকে মজবুত করতে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার পর কোনো দুনিয়ার কাজ করা যাবে না। যেমন, ব্যবসা করা, কারো সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশে, কারো কাছে কিছু চাওয়া বা চাওয়ার ভান করা। একমাত্র হজের মধ্যে ব্যবসা করার অনুমতি রয়েছে। হজ ছাড়া আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার পর কোনো মানুষ তার প্রয়োজন মেটাতে, অন্য কোনো মানুষের কাছে বা মাখলুখের কাছে কিছু চাইতে বা চাওয়ার ভান করতে পারবে না। যদি ওই ব্যক্তি দুনিয়ার কোনো কিছু কোনো ব্যক্তি বা মাকলুখের কাছে চায়, তখন বেনিয়াজ আসমান ও জমিনের সমস্ত সম্পদের একমাত্র মালিক আল্লাহ পাকের অফুরন্ত ভা-ার থেকে প্রাপ্ত হওয়ার দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য মহান আল্লাহ পাকের কাছেই সব জিনিস চাওয়ার কথা বলা হয়েছে।’
বক্তারা বলেন, ’যে ব্যক্তি হজুরকে (সা.) মহব্বত করলো সে কখনোই ইসলামের হুকুমগুলো পালন না করে থাকতে পারবেন না। আল্লাহ তায়ালা পিতা-মাতা ছাড়া যে আদমকে (আ.) সৃষ্টি করেছিলেন, সেই আল্লাহ তায়ালাই পিতা ছাড়া হজরত ঈসাকে (আ.) তৈরি করেছেন। বরং দেখতে হবে হজরতে ঈসা (আ.) পর থেকে হুজুর (সা.) এর আগমনের মধ্যে সময়ের পার্থক্য ছিল প্রায় ৫০০ বছর। এ সময়ের মধ্যে দ্বীনের দাওয়াত খুব বেশি না থাকায় মানুষের মাঝে দ্বীন অপরিচিত হয়ে যায় এবং মানুষ গুমরাহিতে পরিণত হয়। হুজুর (সা.) আগমনের পর পৃথিবীতে দ্বীন আবার জিন্দা হয়। কারণ নবীজী (সা.) ও তাঁর প্রাণপ্রিয় সাহাবারা মানুষের দ্বারে দ্বারে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন। মহানবীর (সা.) ওফাতের পর সেই দাওয়াতের দায়িত্ব তাঁর উম্মতের ওপর পড়েছে। অতএব দাওয়াত থাকবে তো দ্বীন জিন্দা থাকবে, দাওয়াত থাকবে না তো দ্বীনকে হারাতে হবে। ফলে মানুষ গোমরাহে পতিত হবে। হুজুর (সা.) এর প্রতিটি উম্মতের কামনা হবে, ‘হুজুর (সা.) কোনো উম্মত যেন জাহান্নামে না যায়’। এজন্য যারা ইজতেমা থেকে ফিরে নিজ এলাকায় চলে যাবে তারা যেন প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকার মসজিদের সঙ্গে সেই এলাকার মানুষকে সম্পর্ক করিয়ে দেয়। দুনিয়াতে সবচাইতে শান্তির জায়গা হচ্ছে মসজিদ। কোনো মসজিদে যে ব্যক্তি যতটুকু সময় অতিবাহিত করলো সে ততোটুকু সময় পৃথিবীর সব গুনাহের কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রইলো এবং তার আমল নামায় সওয়াবের পাল্লা ভারী হতে থাকলো। এমন একটি ঘরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক করিয়ে দেওয়া প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব।’
তারা আরও বলেন, ‘প্রত্যেক ভালো কাজে নিয়তকে সহি করতে হবে। নিয়ত সহি না করলে হাজারো ভালো কাজ করলে সে ভালো কাজের ফল পাওয়া যাবে না। ইসলাম হচ্ছে সুশৃঙ্খল জীবন বিধান। এখানে কোনো জিনিস গোপন নাই। শুধু গোপন থাকে আপনার ইবাদতের অনুভূতিগুলো।’
বক্তারা বলেন, ‘আপনারা যারা ইজতেমায় এসেছেন, তাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জীবনে আমল রয়েছে। আবার ইজতেমায় আসার পর আপনারা যে আমলের কথা শুনলেন তা করতে গিয়ে কখনোই ব্যক্তিগত আমলটি ছেড়ে দেবেন না। জানা অজানা গুনাহ মাফের জন্য বেশি বেশি তওবা করতে হবে।’
প্রিয় পাঠক, অন্তরের গভীর থেকে মহান আল্লাহপাকের কাছে ক্ষমা চাওয়ার নাম তওবাতুন নসুহা। আসুন, আমরা সবাই আমাদের কৃত অন্যায় অপরাধের জন্য মহান আল্লাহ পাকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি, যা আমাদের নবী করিম (সা.) শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব থেকে আমাদের এই তওবাতুন নসুয়া বেশি বেশি করার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের হজুর (সা.) এর প্রতি সত্যিকারের মহব্বতকারী হিসেবে কবুল করুন, মহানবীর (সা.) সমস্ত উম্মতকে মহান আল্লাহ পাক ক্ষমা করে দিন (আমিন)।
লেখক: মো. রাশেদুল কবির আজাদ
সম্পাদনা: শিমুল সুলতানা,ইসলাম ডেস্ক মেইল-bn24.islam@gmail.com