৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, মঙ্গলবার মে ২১, ২০১৩ ২:৪৯ এএম BDST banglanew24
17 Dec 2012   04:41:16 PM   Monday BdST
E-mail this

রায়হান রাইন-এর অনু্বাদে

মাহমুদ দারবিশের পাঁচটি কবিতা


অনুবাদ : রায়হান রাইন
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
মাহমুদ দারবিশের পাঁচটি কবিতা রায়হান রাইন-এর অনু্বাদে

মাতৃভূমি

খেজুর গাছের খাঁজের সঙ্গে ঝোলাও আমাকে।
আমাকে ফাঁসি দাও— খেজুর গাছের সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করবো না।

এই ভূমি আমার এবং বহুকাল থেকে,
দুঃখে বা খোশমেজাজে উটের দুগ্ধ দোহন করেছি আমি।

আমার মাতৃভূমি কিংবদন্তীর একটি গুচ্ছ নয়।
এটি কেবল স্মৃতি নয়, নয় বক্রচাঁদের এক দেশ।

আমার মাতৃভূমি কিছু কাহিনী এবং স্ত্রোত্র নয়,
নয় যুঁথিগুল্মের ডালপালার উপরে পড়া আলো।

আমার মাতৃভূমি পীড়নের জন্য দেয়া নির্বাসন থেকে সৃষ্ট ক্রোধ,
উৎসব-আনন্দ আর চুম্বন চায় যে শিশু।

কারাগৃহে আটকা পড়া হাওয়া,
একজন বৃদ্ধ যিনি শোক করেন তার দেশ ও সন্তানদের জন্য।

এই দেশ আমার হাড় ঢেকে রাখা চামড়া,
আর আমার হৃৎপিণ্ড
উড়তে থাকে তার ঘাসের উপর মৌমাছির মতো।

খেজুর গাছের খাঁজের সঙ্গে ঝোলাও আমাকে।
আমাকে ফাঁসি দাও— খেজুর গাছের সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করবো না।

(Homeland)


গালীলে পাখিরা মারা যায়

—কিছুকালের জন্য আমরা দেখা করবো
এক বছর পর
দু’বছর পর
এবং একটি প্রজন্ম...
আর সে ক্যামেরায় তুলে আনে
কুড়িটি বাগান
এবং গালীলের পাখিদের
আর সমুদ্রকে ছাড়িয়ে ক্রমাগত খুঁজতে থাকে
সত্যের নতুন কোনো মানে।
—আমার মাতৃভূমি প্রতি মিনিটে রক্তাক্ত হতে থাকা
রুমাল শুকাতে দেবার দড়ি।
আমি টেনে নিয়ে যাই
বালুরাশি আর পামগাছগুলো ভরা বেলাভূমিতে।

সে জানে না....
ও রিটা! মৃত্যু আর আমি তোমার জন্য মঞ্জুর করলাম
সুখের রহস্য যা শুকিয়ে যাচ্ছে অভ্যাসের দরজায়
আর পুনর্ভব হলাম আমরা, মৃত্যু এবং আমি,
তোমার একেবারে সামনে
এবং তোমার বাড়ির জানালায়।
মৃত্যু এবং আমি দুটি মুখ—
কেন এখন আমার মুখের কাছ থেকে পালাও,
কেন তুমি পালিয়ে যাও?
গোধূম ক্ষেতকে যা বানিয়ে দেয় ধরিত্রীর চোখের পাতা,
অগ্নিগিরিকে যা বানিয়ে দেয় জুঁইফুলের আরেকটি মুখ
কেন পালিয়ে যাও তুমি তার থেকে?
কেন পালাও?

রাতের বেলা কিছুই আমাকে ক্লান্ত করে না তার নিশ্চুপতা ছাড়া
যখন তা ছড়িয়ে যাচ্ছে দরজার সামনে
রাস্তাগুলোর মতো, পুরনো বাসাবাড়ির মতো।
হোক যেমনটা তুমি চাও, রিটা:
নিশ্চুপতা একটি কুঠার
কিংবা তারাদের সংস্থান
অথবা গাছগুলোর শ্রমযাতনার উপযোগী পরিবেশ।
চাকুর ফলা থেকে
আমি চুমুক দিই চুম্বনে।
আসো, আমরা হত্যাযজ্ঞে অংশ নিই!

অনাকাঙ্ক্ষিত পাতাগুচ্ছের মতো
ঝরে পড়ে পাখির ঝাঁক
সময়ের কুয়োর ভেতর।
আর আমি কুড়িয়ে নিই নীল ডানাগুলো।
রিটা,
আমি কবরের শীর্ষে বসানো প্রস্তরখণ্ড যা বাড়তে থাকে।
রিটা
এই যে আমি যাকে পরানো বেড়ি
চামড়ার উপর নকশার মতো খোদাই করতে থাকে
মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাকে।

(Birds die in Galilee)


আহ্, আব্দুল্লাহ

আব্দুল্লাহ জল্লাদকে বললো:
আমার শরীর হলো বাক্য এবং একটি প্রতিধ্বনি
যার ভেতর নিজেকে হারিয়েছে বজ্র
এবং চাকুর উপর পড়া বিদ্যুচ্চমকের ঝলকানি—
আর রাজ্যশাসক শক্তিমান।
আর জীবন এরকমই,
আর এখন তুমি, জল্লাদ, তার থেকেও শক্তিমান।
ঈশ্বর জন্ম নিয়েছিলেন...
আর পুলিশেরা ওইভাবে এসেছে!

মৃতেরা, সাধারণত, বেড়াতে আসে না।
কিন্তু আমার বন্ধু
মন্ত্রমুগ্ধ ছিলো তার প্রতি।
প্রতি সন্ধ্যায়
আন্দোলিত হবে তার শরীর, বৃক্ষশাখার মতো, প্রতিটি ফাটল থেকে
আর আমি খুলে দেবো জানালা
যাতে আব্দুল্লাহ আসতে পারে ভেতরে
যাতে আমার কাছে সে সঙ্গে করে আনতে পারে নবীদের।

আব্দুল্লাহ ছিলো একটি ময়দান এবং মধ্যদিনের উত্তাপ।
সে মাওয়াল*-এর সহযোগী ছিলো ভালো—
আর মাওয়াল ছড়িয়ে গেল পুবদিকে বাগদাদ অবধি,
উত্তরে সিরিয়া অবধি,
এবং উচ্চকিত হলো উপদ্বীপগুলোতে।  
মাওয়াল চলাকালে, এক কাঠের তরবারি—
আর কেশগুচ্ছে চুম্বন করে তারা একবার হতবাক করে দিয়েছিলো তাকে।
যখন তারা বললো: এই সুর হচ্ছে  
আমাদের প্রার্থনার কিংবদন্তীগুলোতে পুঁতে রাখা মাইন,
আব্দুল্লাহ বললো:
আমার শরীর হলো বাক্য এবং একটি প্রতিধ্বনি
আর জীবন এরকমই।
এবং এখন তুমি, জল্লাদ, আরও শক্তিমান।
ঈশ্বর জন্ম নিয়েছিলেন....
আর ওইভাবে পুলিশেরা এসেছে!

মৃতেরা, সাধারণত, কাজ করে না,
কিন্তু আমার বন্ধু
তার অভ্যাস ছিলো চাঁদগুলোকে
কাদায় পুঁতে দেয়া,
এবং ভূমিতে রোপণ করা একটি আকাশকে।
আর আমি খুলে রাখবো আমার জানালা
যাতে আব্দুল্লাহ ঢুকে পড়তে পারে, মুক্ত এবং হাত-পায়ের বেড়ি ছাড়া
মৃত্যু ও মহিমার মতো।

আব্দুল্লাহ ছিলো এক ময়দান,
পুর্বপুরুষদের কাছ থেকে কিছুই পায়নি সে মধ্যদিনের তাপ,
ছোট হয়ে আসা ছায়া, আর বাদামী গাত্রবর্ণ ছাড়া।
আব্দুল্লাহ জানতো শুধু
মাওয়াল-এর ভাষা, আর মাওয়াল উন্মাদ ছিলো
লায়লার জন্য।
কোথায় লায়লা?
তাকে সে খুঁজে পায়নি মধ্যদিনের উত্তাপে।
মাওয়াল ছুটতে থাকে লায়লার গোড়ালির দিকে,
মাওয়াল লাফ দেয় ছায়ার ছোট বৃত্ত থেকে,
তারপর ছড়িয়ে যায় পুবদিকে সানা অবধি,
এবং ডাকতে থাকে উপদ্বীপগুলোতে:
কোথায় লায়লা?
মাওয়ালের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়তো আব্দুল্লাহ—
আর মাওয়াল নিষিদ্ধ।
জল্লাদ সাহেব বলেন:
মাওয়ালের মাঝের দূরত্বই মাইন
পুঁতে দেয়া হয়েছে আমাদের প্রার্থনার কিংবদন্তীগুলোতে।
আর ঝুলিয়ে দেয়া হলো আব্দুল্লাহর মস্তক
মধ্যদিনের তাপের উচ্চতা থেকে।

আহ্, আব্দুল্লাহ,
কোনো মৃত নেই সন্ধ্যাগুলোতে এখন আর
এবং তুমিই এখন সব সমাধানের সমাধান।
আহ্... আব্দুল্লাহ
আর নামগুলোই এখন দেহ
    প্রতীক
    এবং ঋতু
আহ্... আব্দুল্লাহ,
অচিরস্থায়ী ফুলগুলোর কোনো আকার নাই, রঙ নাই।
আহ্... আব্দুল্লাহ,
আমি আর মনে করতে পারি না কী বলতে তুমি।
আহ্... আব্দুল্লাহ,
ধরিত্রী শোনে না তোমার কথা,
লায়লাও না...
পামগাছগুলোর ছায়াও নয়।
ঈশ্বর জন্মেছিলেন
আর শাসকের পুলিশ ওইভাবে এসেছে
আর নিহত হয়েছে লক্ষ লক্ষ।

*মাওয়াল কথ্যভাষার এক ধরনের কবিতা, কখনো কখনো সাধারণ বাঁশি সহযোগে গাওয়া হয়।

(Oh, Abdullah)


স্ত্রোত্রগীতি ১১

কিছুই থাকে না আমার জন্য
তবে তোমার ছায়ায় ভ্রমণ করে এখন তা আমারও ছায়া
কিছুই থাকে না আমার জন্য
তবে তোমার কণ্ঠস্বর যাপন করে এখন তা আমারও কণ্ঠস্বর।

আমি নিচে গড়িয়ে পড়ি ক্রুশ থেকে যা অনন্ত দিগ্বলয়ে
ছড়িয়ে আছে মেঘমুক্ত আকাশের মতো,
সবচেয়ে ছোট যে পাহাড়টি চোখে পড়ে তার দিকে
আর আমি মুখোমুখি হইনি আঘাতের... এবং আমার মুক্তির।
তুমি ঠিক কার কাছাকাছি জানি না বলেই
আমি খুঁজে পাই না আমার পদক্ষেপ
এবং আমার পেছনটা তোমার সঙ্গে পেরেকে আটকানো  নয় বলেই
আমি আনত হয়ে পড়ি অত্যধিক
তোমার আকাশের মতো যা সঙ্গ দেয় উড়োজাহাজের জানালাগুলোকে।

আমাকে আমার নামের আদলটি ফেরৎ দাও
যাতে আমি গাছের আঁশগুলোর কাছে আমার প্রার্থনা জানাতে পারি।
আমাকে আমার মুখের অক্ষরগুলো ফেরৎ দাও
যাতে আমি আসন্ন ঝড়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।
আমাকে আমার আনন্দের কারণগুলো ফেরৎ দাও
যাতে আমি অকারণ প্রত্যাহারের একজন অধিসত্তা ঠিক করতে পারি।
আমার কণ্ঠস্বর যেহেতু পতাকাদণ্ডের মতো শুষ্ক
আমার হাত জাতীয় সঙ্গীতের মতো ফাঁকা
আর যেহেতু আমার ছায়া উৎসবের মতো বিস্তৃত
এবং আমার মুখের রেখাগুলো এ্যাম্বুলেন্সে চড়ে বেড়াতে যায়
কেননা আমি ওই রকম,
একজন অধিবাসী না-জন্মানো এক রাজ্যের।

(Psalm 11)


স্তোত্রগীতি ১৫

সীমান্তগুলো থেকে এক পলাতক যে শিকার করে আমার বন্ধুদের
এবং সীমান্তরেখাগুলো ধেয়ে আসে আমার পেছন পেছন।
সীমান্তগুলো নিকটতর হয় আরও
এবং ছুঁয়ে ফেলে আমার কণ্ঠনালী।

তোমার পক্ষে জানা কঠিন
কোনখানে কিংবদন্তীর শেষ
কোনখানে শুরু হয় আমার মুখ
কেননা সীমান্ত খুব নিকটেই।
ললাটে গেড়ে বসা এই খাঁজগুলো
আঙুলের ছাপ নয় বছরগুলোর।
আমার চোখের নিচের এই নীল রেখাগুলো
নারীদের সঙ্গে রাত্রীযাপনের সাক্ষ্য নয়—
এগুলোই সীমান্তরেখা যা ছড়িয়ে পড়ে আমার সারাদেহে।

আমি পরাজয়ের জন্য দণ্ডিত
আমার শত্রু বিজয়ের জন্য দণ্ডিত।
আমি পরাজয়ে অটল
এবং আমার শত্রু বিজয়ে অবিচল।

শহরে নেমে আসা ও অন্ধকার,
ঢলে পড়ো, ঢলে পড়ো,
কারণ আজ রাতে আমি দৃঢ়চিত্ত, আমার সীমান্তশাসিত মুখ থেকে আলাদা হয়ে
আমার হৃদয়ের দিকে যাবো,
যা বন্দীদশায় পড়েনি এমন একমাত্র শহর।

(Psalm 15)

বাংলাদেশ সময় : ১৬৩০ ঘণ্টা, ১৭ ডিসেম্বর ২০১২

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান