 |
| ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
চট্টগ্রাম : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত সালাহউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে শহীদ নূতন চন্দ্র সিংহের সন্তান প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহের সাক্ষ্যগ্রহণ করার পর চট্টগ্রামের রাউজানে ঐতিহ্যবাহী কুণ্ডেশ্বরী ভবনকে ঘিরে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।
ভবনটিকে ঘিরে পুলিশি টহল বাড়িয়ে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া যে কোনো মুহূর্তে তাৎক্ষণিকভাবে ভবনের নিরাপত্তায় যে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাউজান থানা পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর নির্মম হত্যার শিকার রাউজানের কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয় ও কুণ্ডেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শহীদ নূতন চন্দ্র সিংহের সন্তান প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ বুধবার ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দিয়েছেন।
এতে তিনি তার পিতাকে গুলি করে হত্যার জন্য সাকা চৌধুরীকে অভিযুক্ত করেন। এমনকি পিতার মুখাগ্নি করতে না পারার বিষয়ে যে করুণ ও মর্মস্পর্শী বক্তব্য প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ ট্রাইব্যুনালে দিয়েছেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ বক্তব্যও রাউজানসহ চট্টগ্রামে নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে।
এ অবস্থায় বুধবার থেকেই কুণ্ডেশ্বরী ভবনের নিরাপত্তায় জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নেয়।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (উত্তর) ফরিদ উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, ‘প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। তার নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। এছাড়া কুণ্ডেশ্বরী ভবন ও তার পরিবারের নিরাপত্তায়ও আমরা রাউজান থানাকে সর্বোচ্চ সর্তকাবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছি। কুণ্ডেশ্বরী ভবনসহ পুরো এলাকা গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে আছে।’
রাউজান থানার ওসি আব্বাস উদ্দিন বাংলানিউজকে জানান, জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে নির্দেশ আসার পর কুণ্ডেশ্বরী ভবনের আশপাশের এলাকায় টহল বাড়ানো হয়েছে। টহল টিমে পুলিশের সদস্য সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি এবং সোর্স নিয়োগ করা হয়েছে।
ওসি বাংলানিউজকে বলেন, ‘রাতভর বেশ কয়েকবার টহল দিয়েছি। এছাড়া তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে যদি বিন্দুমাত্র কোনো ধরনের নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা করা হয়, তাৎক্ষণিকভাবে যাতে ব্যবস্থা নিতে পারি, সে ব্যবস্থাও আমাদের আছে।’
তবে সাক্ষী প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহের ছেলে রাজীব সিংহের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমি পুরো বিষয় সেভাবে অবগত নই। আর এ মুহূর্তে এসব বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য না দেওয়াটাই সমীচীন মনে করি।’
চট্টগ্রামের বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহের জন্ম ১৯০০ সালের পহেলা ডিসেম্বর ঐতিহ্যবাহী রাউজানের গহিরা গ্রামে। মাত্র দু’বছর বয়সে মা এবং আট বছর বয়সে বাবা হারানোর পর মাত্র তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হন তিনি।
এরপর বার্মার রেঙ্গুন এবং চট্টগ্রামে আয়ূর্বেদ চিকিৎসা চর্চার পাশাপাশি এ চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণাও করেন তিনি।
আর্য়ূবেদ শাস্ত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে নূতন চন্দ্র সিংহ উনিশ শতকের প্রথমার্ধে রাউজানে নিজ বাড়িতে নারী শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। আমৃত্যু তিনি শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে স্বাধীনতা সংগ্রাম, প্রগতিশীল আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে তৎকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী এ দেশীয় রাজাকার ও মুসলিমলীগারদের টার্গেটে পরিণত হন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের এ বরেণ্য শিক্ষাবিদকে রাউজানের গহিরায় নিজ বাসভবনের মন্দিরে প্রার্থনারত অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর এ দেশীয় রাজাকাররা।
বাংলাদেশ সময় : ১৩১০ ঘণ্টা, জুন, ২১, ২০১২
আরডিজি/সম্পাদনা: বেনু সূত্রধর, নিউজরুম এডিটর ও অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর