 |
১.
অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছে তারা। চলার পথে নানা চড়াই-উতরাইও পার হতে হচ্ছে মাঝেমধ্যে। একটা আলগা শিরশিরানি রোমনকে প্রলুব্ধ করে। বিকেলের বাতাসের মেদুর পরশ তাতে উস্কানি দিচ্ছে সুযোগ পেলে। পাহাড়ের এই সাম্রাজ্যে সবার প্রবেশাধিকার নেই। অনেক কায়দা করে এই মুল্লুকে আসার সুযোগটা তৈরি করেছে সে। তাকে সঙ্গ দিচ্ছে এক পাহাড়ি যুবক। এক সময়ের নগর জীবনে অভ্যস্ত যুবক। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে পাহাড়েই গাঁট বেঁধেছে। আসার আগেই তার সাথে যোগসূত্র তৈরি করে রেখেছে প্রজেক্ট কর্তারা। তাকে জানানো হয়েছে এই অঞ্চলের কোনও কিছু অজানা নয় যুবকের। তাই স্বাভাবিক হয়তো। কিন্তু শুরু থেকেই একটা গাম্ভীর্য যুবককে ঘিরে আছে। এই নির্জনতায় নিজেরাও প্রকৃতির সাথে লীন হয়ে আছে। গাছের শেকড়, ডালপালা, এমনকি ঝরেপড়া পাতাগুলোও যেন নিজেদের সাথে কথা বলছে অনবরত। মনে হচ্ছে আশ্চর্য সুন্দর এই প্রকৃতির প্রতিটি ধুলিকণা পরস্পরের সমব্যথী। সাধারণের নাগালের বাইরে এক অবারিত ঐশ্বর্যের ঢালি নিয়ে নিজেদের সাজিয়ে রেখেছে। পরিবেশটা এখনও কেমন গুমোট হয়ে আছে। অবাধ যাতায়াত এই জনপদে নেই। এই জনপদের মানুষ এতে খুশি হতে পারে না। তারা চায় না পূর্বপুরুষের পবিত্র মাটি বাঙালিদের পদভারে দ্রুত কবজা হয়ে পড়ুক। তবু কেউ কেউ আসে। আবাস গাড়ে। এই নিসর্গে কী করে তাদের নজর পড়লো তা তারা বুঝতে পারে না। পাহাড়ি যুবক গুম মেরে আছে আগের মতো। কথা তেমন বলছে না। বোমা মারলেও যেন মুখ দিয়ে কথা বের হবে না। কানের কাছে শো শো শব্দ হয়। মনোযোগ দিয়ে শুনতে চেষ্টা করে রোমন।
শব্দটা কিসের?
যুবক জবাব দেয় না। আগের মতোই নির্লিপ্ত ঢঙে মাথাটা ঈষৎ বাঁকা করে হাঁটতে থাকে।
শব্দটা শুনছেন?
হুঁম।
কী নাম এই পাহাড়ের?
নাম নাই।
সত্যি কি নাম নেই?
এই পাহাড়ের নাম আপনার মুখে আসবে না।
আসবে না কেন? রোমনের গায়ে লাগে কথাটা।
তা আপনারা জানেন।
রোমন একটু বিরক্ত হয়। তবু বিষয়টা আমলে নেয় না। কথাটা গায়ে না মেখে বলে, এতো কম কথা বললে কাজটা সারবো কী করে!
থানচি থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টার পথ নৌকায় ভর করে এসেছে ওরা। মাঝখানে অনেকবার থামতে হয়েছে। তিনডুতে রাত কাটাতে হবে। যেতে হবে আরও অনেক ভেতরে। ফিরে গিয়ে পাহাড়ে তামাকের সর্বগ্রাসী বিস্তারকে কেন্দ্র করে একটা রিপোর্ট জমা দিতে হবে তাকে। তামাক তামাক! আহ।
এখানে কেউ বাড়তি কথা বলে না। সবাই প্রকৃতিকে অনুভব করে। যুবক উত্তর দেয়।
বেশ। মনে হচ্ছে এই বিশাল নিসর্গ-প্রকৃতির সবকিছু আপনার নখদর্পণে।
হুঁম।
পরিবারে কে কে আছে আপনার?
সবাই।
দাদি আছে? ভাই-ভাবী, মা, পিচ্চি বোন? পরিবেশটা একটু হালকা করার চেষ্টা করে রোমন।
হুঁম।
এখনও বিরক্ত হয়ে আছেন মনে হয়।
যুকক হঠাৎ প্রগলভ হয়ে ওঠে, ছোটবেলায় যখন কোনও অপরাধ না করেও বকা খেতাম তখন খুব
রাগ হতো। ভাবতাম আপনারাই শুধু না, আমার পিতৃপুরুষগণও খারাপ।
রোমন কোনও জবাব দেয় না। অপেক্ষা করে।
এখন ভাবি হয়তো ঠিকই ছিল। জগতের কোনও কিছুই ফেলনা না। ছোটবেলার সেসব ছোটখাটো অভিমানগুলোও আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
কেন নয়?
হয়তো আপনার সাথে যেসব কথা হচ্ছে এরও কোনও একটা অর্থ জীবনে আছে। আমরা হয়তো এক সময় এইসব কথার একটা সূত্র খুঁজে পাবো।
তা বটে। রোমন যেন একটা দীর্ঘ স্বপ্নের সাথে হাঁটছে। যুবকটা আগাগোড়া একটা স্বপ্ন। খানিকটা ঘোর তৈরি হয় তার মধ্যেও।
আপনার সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেবো না। আমার সব কথা ঠিকঠাকভাবে আপনি ধরতেও পারবেন না। কারণ আপনাদের মেদবহুল চোখ দিয়ে এখানকার সব কিছুকে একটা ইল্যুশান মনে হবে।
রোমনের খানিকটা অসহায় লাগে। সত্যিই সে সব কথা বুঝে উঠতে পারছে না। আলগোছে উত্তর দেয়, আপনার ধারণায় গলদ আছে। বাদ দিন এসব কথা। নির্জনতাটা উপভোগ করি দু’জনে মিলে। এই দৃশ্য তো খুব বেশি দিনের না। তাই না?
যুবক একটু নীরব থাকে। তার নিঃশ্বাসের সাথে বিষণ্ন বাতাস ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
তামাকের এই বিস্তার রোধ করার উপায় কী হতে পারে?
কিছু না। সবাই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। হয়তো একদিন আমাদের পূর্বপুরুষরা সইতে না পেরে মাটি ফুঁড়ে উঠে আসবে।
বাতাসের ধাক্কায় সে ফুলে ওঠে। একটু হাঁপায়। রোমন খানিকটা দমে যায়। কোনও কথা বলে না।
অসহ্য হয়ে উঠলে দাদা হয়তো মাটি ফুঁড়ে এসে আমাদের হাত ধরবে। তারপর টিলাভর্তি বিষের দরদাম হিসাব করবে। আঙ্গুলের কড়িতে হিসাব পোক্ত করবে— পাহাড়ি জাতির এই স্বভাবটা যে আমৃত্যু ছাড়তে পারে নাই। প্রকৃতির খেয়ালের প্রতি ছিলো তার অফুরন্ত আগ্রহ।
রোমনের শরীরে খানিকটা শীত জমা হতে শুরু করে।
যুবকের মাথায় কথার নেশা চাপে, দাদা হয়তো ভাববে খুব ভোরে পাখিরাও যখন ঘুম থেকে জাগে না তখন জেগে উঠবে। গয়ালগুলো একবার দেখে আসবে। সারাদিন পাহাড়ি টিলা চষে বিকেলের ঠাণ্ডা আলোতে ধানের গোছাগুলো পুতে দিয়ে তবেই শান্তি পাবে। সন্ধ্যার আঁধার জেঁকে বসলে শীতল হাওয়ায় প্রাণটা জুড়িয়ে নেবে।
যুবক একটু থামে।
তারপর আবার বলে, পরে আর কখনও যদি দেখা হয় আমি তাকে জিজ্ঞেস করে নেবো ফসলের হাল-হাকিকত। দাদা আমার কাছে ডলারের দরদাম জানতে চাইবে। আমি মুচকি হেসে বলবো কী করে মনুষ্যজাতি সামান্য একটা যন্ত্রের কারসাজিতে তামাম জাহানের দরদামই নিমেষে উলটে দিচ্ছে। নিসর্গ কী করে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তার খতিয়ান আমার ম্লান হাসিতে পেয়ে যাবে। সন্দেহ নাই, তার মনটা বিষণ্ন হয়ে উঠবে মুহূর্তেই। দাদার বিষণ্ন মুখটা দেখে আমার মায়া হবে। তখন তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করবো। বলবো, চিন্তা করো না। মনুষ্যজাতি আসবে তোমার নিসর্গরাজ্যেও। অবকাশ যাপনের আশায়। তারা তোমাকে ডলারের খবর দেবে। বিনিময়ে তোমার যুবতি হয়ে উঠা আদরের নাতনীকে রাতের সেবায় নিয়োজিত রাখবে। ভিনদেশী পরামর্শকরা আসবে তোমাকে পরামর্শ দিতে। তাদের সাথে দেশের সাহেবসুবোদেরও তুমি দেখবে। তারা সবাই মনুষ্যজাতির শ্রেষ্ঠতম সন্তান। তারা তোমাকে অনেক কায়দা কানুন শিখিয়ে দেবে। তুমি হয়তো ভাববে তোমার এতো কিছু দরকার কী। তোমার শুধু ডলারের দর জানলেই চলে।
মন খানিকটা বিষিয়ে ওঠে রোমনের। এখানে এসে মনটা আলো-হাওয়ায় পূর্ণ করার কথা। উলটো এই তরুণ তার মনটাই খারাপ করে দিয়েছে।
আপনার বক্তব্যে আমার কোনও দ্বিমত নেই।
না। দ্বিমত থাকতেও পারে। আমরা অভ্যস্থ হয়ে উঠছি সবকিছুতেই। নির্লিপ্ত গলায় উত্তর এলো।
হুঁম।
কথাগুলো আমি বলিনি। কী করে যেন বের হয়ে গেল।
সমতলের মানুষের উপর আপনার বিশেষ কোনও আস্থা নেই।
না। এই অনাস্থা কারও উপর আমার অশ্রদ্ধা তৈরি করেনি।
এই নিসর্গ ও প্রকৃতির অনেক কিছুই দেখার শখ ছিলো। সে ইচ্ছেটা লোপ পেল মনে হচ্ছে।
সব হয়তো আপনার দেখার সৌভাগ্য হবে না। আপনার সে-অর্থে বিশেষ কিছু দেখা হবে না। এক নজরে যা চোখে পড়ছে তাও কি দেখছেন? না। সবটা দেখেন নাই। আপনার নজরে যা আসছে তাও একটা বিভ্রম। আপনার চোখজোড়া নিসর্গরাজ্যের সৌন্দর্য দেখার মতো পুষ্ট নয়। চোখগুলো নষ্ট হয়েছে শৈশবেই।
খানিকটা মনোক্ষুণ্ন হলো রোমন। বিষয়টা আকারে-ইঙ্গিতে জানাতে পারলে ভাল হতো। সে বলে, হয়তো আপনার এ-ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক না। এমনও হতে পারে একটা আগাম ও অসম্পূর্ণ ধারণা তৈরি করে রাখছেন আমার সম্পর্কে।
আপনার সম্পর্কে আমার অনুমানগুলো আপেক্ষিক। এই অনুমান সমতলের মানুষের সাথে আমাদের চিরায়ত বৈরি সম্পর্কের জন্য জরুরি। এই বেড়ি আমি টপকাতে চাই না।
যুবক পুনরায় বলে, মানুষ্যজাতি যখন নিজেদের শ্রেষ্ঠ বা সুপিরিয়র ভাবতে শুরু করে তখন তার পতন শুরু হয়। তারা ভাবতে চায় না যে শ্রেষ্ঠত্ব সব সময় একরৈখিক নয়। আপনার ধর্মের কথাই ধরি। আদম-হাওয়ার জীবন শ্রেষ্ঠত্বের বীজ বুনতেই যদি শেষ হতো তাহলে আর কিছুর দরকার হতো না। আদমের বংশবৃদ্ধিরও প্রয়োজন হতো না। ছোটখাটো অনেকগুলো ক্ষত আদম সমাজের শরীরে বাড়তে বাড়তে ঘায়ে পরিণত হয়। কিন্তু পাহাড়ের সন্তানেরা, এই নিসর্গরাজ্যের প্রাণীরা সৃষ্টিমুখর থাকতে চায়। এই যে সম্পর্ক চেইন, এটা একদিনে তৈরি হয়নি। অনেক সমস্যা আমাদের আছে। কিন্তু তা একদিনে সমাধান হবে না। হয়তো অনেক সময় লাগবে। সেইসব ক্ষত সবাই মিলে সারাবো।
হুঁম। প্রত্যুত্তরে রোমন কিছু বলে না। মৌন থাকার চেষ্টা করে।
হয়তো একটা বা দুইটা প্রজন্মকে বিসর্জন দিতে হবে। কিন্তু সফল হবো। কোনও রকম যুদ্ধ বা লাঠালাঠি ছাড়াই একটা মনস্তাত্ত্বিক বিজয় আমাদের খুব নিকটে অবস্থান করছে। আমরা তাই বিকল্প অপশনের খোঁজে অন্যের বাড়া ভাতে ছাই ছিটাই না।
হুঁম। রোমন যুবকের কথায় সায় দেয়ার চেষ্টা করে। তার খানিকটা ক্লান্ত লাগে।
এইসব কথা শুনতে আপনার ভাল লাগবে না। যুবক পুনরায় মুখ খোলে, আপনাদের মানসিক দীনতা আমাদের এভাবে ভাবতে বাধ্য করে। আপনারা একটা ছকের বাইরে গিয়ে পৃথিবীটাকে দেখতে পারেন না। সেই চোখ আপনাদের তৈরি হয়নি। ফলত আপনাদের দৃষ্টিতে গলদটা বরাবরই থেকে যায়।
খোঁচাটা এবার বুকে লাগে। হজম করতে গিয়ে মাথাটা খানিক গরম হয়ে ওঠে।
মনুষ্যজাতির চোখের পোস্টমর্টেমের দায়িত্ব তাকে কেউ দেয়নি।
নিজেদের সম্পর্কে অতি উচ্চ ধারণা আপনাদের চিন্তাকে রুদ্ধ করে ফেলেছে। আপনারা দূষণ নিয়ে গদগদ হোন, অথচ একজন সাধারণ পাহাড়ি যুবক যখন তার স্বজাত্যবোধের কথা বলতে চায় তা সহজে গ্রহণ করতে পারেন না।
যুবকের মুখ থেকে একটা শ্লেষের হাসি ঝরে পড়ে। সারা শরীর রি রি করে ওঠে রোমনের।
সুবিধাভোগী মনোভাব আপনাদের মগজ দখল করে রেখেছে। আপনারা জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন নিয়ে উদ্বিগ্ন, অথচ প্রকৃতি ও নিসর্গের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে আপনাদের তেমন কোনও উদ্যোগ নেই। এসব আসল কিছু না। একটা বিভ্রম। বড়লোকি ভাবনা ছাড়া আর কিছু না। আমরা হয়তো আমাদের গণ্ডিতেই থাকব। এই ভূগোলে মনুষ্যজাতি থাকবে। আমরাও।
২.
মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে আচমকা। কিছু বুঝে উঠার আগেই বিষাদগ্রস্ত স্মৃতিটা কোথায় গায়েব হয়ে গেল। কার সাথে কথা হচ্ছিলো এতক্ষণ! নাহ, ঘুমায়নি সে। জেগেই আছে। সারাদিনের ক্লান্তি মগজের ভেতর নিয়ে রাতটা পার করার কথা মনে পড়ছে। স্মৃতিতে আর কিছু ধরা দিচ্ছে না। সে কি তাহলে পাগল হয়ে যাচ্ছে? বিভ্রমের লীলায় মাতিয়ে নিচ্ছে কে তাকে?
কী এই বিভ্রম?
ধক করে ওঠে বুকের ভেতরটা। দু’হাতের পিঠ দিয়ে চোখ দু’টো খানিকটা কচলে নেয়। ঘুমের ঘোরটা তাড়ানোর চেষ্টা করে।
চোখে মুখে আগুনের ফুলকি ঠিকরে বের হতে থাকে। একটা সাপ মুখের উপর ফণা তুলে আছে।
তার মনে হতে থাকে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণটা সে ধরে রাখতে পারছে না। একটা ভারী পাথর পিঠের উপর কেউ চাপিয়ে দিয়েছে। সে প্রাণপণে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। একটা ভয়ঙ্কর লু হাওয়া পুরো দেশটাকে উড়িয়ে নিচ্ছে। মানুষ বিশৃঙ্খল হয়ে দিকবিদিক ছুটছে। তাকেও উড়িয়ে নিচ্ছে সে-হাওয়া। তার চোখে ভাসতে থাকে অসংখ্য মানুষ। মানুষগুলো পিঠে পাথর বেঁধে এদিক-ওদিক দৌঁড়াচ্ছে। তাদের তাড়িয়ে নিচ্ছে একদল মত্ত হাতি। হাতির পিঠে কারা যেন সওয়ার হয়ে আছে।
তৃপ্ত মুখে একটা মোলায়েম হাসি ছড়িয়ে দিয়ে তারা উন্মত্ত হাতিগুলোকে লেলিয়ে দিচ্ছে পিঠে পাথরবোঝাই মানুষগুলোর উপর।
fazlulkabiry@yahoo.com
বাংলাদেশ সময় : ১৫৪০ ঘণ্টা, ০৮ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা : তানিম কবির, tanimkabir@gmail.com