 |
ঢাকা: ‘স্বৈরাচার’ না বলার জন্য জাতীয় সংসদের সকল সদস্যের প্রতি আহবান জানিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এমপি।
জাতীয় সংসদের মঙ্গলবারের অধিবেশনে ২০১২-১৩ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, “ভাইয়েরা, আমাকে স্বৈরাচার বলেন না। আমি দুঃখ পাই, ব্যথা পাই। আমি প্রতিটি নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছি। তারপরও যদি আমাকে স্বৈরাচার বলেন, আমার কেমন লাগে ? আমরা সহযাত্রী।”
এসময় অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত অধিকাংশ সাংসদই সমস্বরে বলে ওঠেন, “আর বলবো না।”
১০ নভেম্বর গণতন্ত্র দিবস পালন করার আহবান জানিয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, “আমি সামরিক প্রশাসক ছিলাম। শেষ করেছি গণতান্ত্রিক ধারায়।”
সকল সৈনিককে এক কাতারে দাঁড় না করানোর আহবান জানিয়ে সাবেক এই সেনা প্রধান বলেন, “আমিও সৈনিক ছিলাম। দয়া করে সব সৈনিকদের এক কাতারে দাঁড় করাবেন না। অনেকেই কটাক্ষ করে। জেলখানা থেকে প্রতিটি নির্বাচনে জয়ী হয়েছি। আমি এখন সংসদ সদস্য। মানুষের ভালবাসা না পেলে এখানে আসতে পারতাম না।”
“সৈনিকদের অবদানের কথা ভুলবেন না। আমি পার্বত্য চট্ট্রগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। সেনাবাহিনী না থাকলে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কত সৈনিকের রক্ত গেছে- তা জানতে চাননি”, যোগ করেন এরশাদ।
“আমি দু’বার জেল থেকে পাঁচ পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছি। আমি স্বৈরাচার হলে কী তা পেতাম ?”
বিদ্যুৎ ও পুঁজি বাজারকে সরকারের জন্য নেতিবাচক হিসাবে উল্লেখ করে মহাজোটের এই শরিক বলেন, “বিদ্যুৎ ও শেয়ার বাজার আমাদের মাইনাস পয়েন্ট। এটার উন্নয়ন করলে- আমরা আগামী নির্বাচনে ফল পাবো।”
“পুঁজি বাজারে আমরা এক কোটি ভোট হারিয়েছি। এই ভোট পেতে হলে পুঁজি বাজারকে চাঙ্গা করতে হবে” যোগ করেন তিনি।
স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালনা বোর্ড ভেঙ্গে দেওয়া পরামর্শ দিয়ে এরশাদ বলেন, “সর্ষের মধ্যে ভূত রয়েছে। ডি-মিউচুয়ালাইজেশন করতে হবে।”
এরশাদ বলেন, “পুঁজিবাজার, বার্নিং মার্কেট। এই মার্কেট যারা ধ্বংস করে দিয়েছে, তাদের নাম পেপারে এসেছে। কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
অর্থমন্ত্রীকে পুঁজিবাজার নিয়ে কোনো কথা না বলারও পরামর্শ দেন জাতীয় পার্টির চেয়াম্যান।
রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করে সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “রোহিঙ্গাদের আমরা কিছুতেই নিতে পারি না। সরকারের পলিসিকে আমি সমর্থন করি। তিন লক্ষ রোহিঙ্গা এসেছিলো। বন শেষ করে দিয়েছে। পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে আমাদের বদনাম করে।”
জাতিসংঘকে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার আহবান জানিয়ে এরশাদ বলেন, “আমাদের ওপর চাপিয়ে দেবেন না।”
তৈরি পোশাক শিল্পে অস্থিরতার বিষয়টি তুলে ধরে এরশাদ বলেন, “এটা বন্ধ হয়ে গেলে, কারা লাভবান হবে তা খুঁজে বের করতে হবে। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।”
মূল্যস্ফীতি যেভাবেই হোক নিয়ন্ত্রণে রাখার আহবান জানান এরশাদ।
জরিমানা দিয়ে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার প্রস্তাবকে সমর্থন করে এরশাদ বলেন, “কালো টাকা সাদা করা অবশ্যই অনৈতিক। কিন্তু, কী করার আছে। কলো টাকা বিনিয়োগ করতে না দিলে বাইরে চলে যাবে। জিডিপি’র ৩৬ শতাংশ ব্ল্যাক মানি। এই টাকা যেন বাইরে চলে যায়-সরকার তার ব্যবস্থা করেছে। আমি সমর্থন করেছি।”
প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘কল্পনাবিলাসী’ হিসাবে আখ্যায়িত করে এরশাদ বলেন, “যে স্বপ্ন দেখে না, সে স্বপ্ন দেখাতে পারে না। আশা নেই তো ভবিষ্যৎ নেই।”
“বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে আমি অর্থমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাবো। বাস্তবায়ন করতে পারলে বলবো, সতর্ক আশাবাদ। না পারলে বলবো, বিপদজনক আশাবাদ”, বলেন সাবেক এই স্বৈরশাসক।
তিনি বলেন, “সামনের দিন উত্তাল তরঙ্গ। আন্দোলন হবে। হরতাল হবে। রপ্তানি ব্যাহত হবে। যেমন করেই হোক আমাদের এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে।”
তিনি বলেন, “সরকার ব্যাংক থেকে অনেক লোন নিচ্ছে। এর জন্য, তারল্য সংকট হচ্ছে। অনেকে লোন পাচ্ছে না।”
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কথা উল্লেখ করে এরশাদ বলেন, “এই সংসদ আমাদের কপাল থেকে কলংকের তিলক মুছে দিয়েছে। আমরা সৎ নই। আমাদের বিশ্বাস করা যাবে না। পঞ্চদশ সংশোধনী করে আমাদের কলংকের তিলক মুছে দিয়েছে। এজন্য, সকলকে অভিনন্দন জানাই।”
ফলে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আহবান জানান এরশাদ বলেন, “সরকার কী কিছুই করতে পারে না ? খাদ্যে বিষ দিলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে বঙ্গবন্ধু একটি আইন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ওই আইন বলবৎ করুন।”
মাদকের ব্যবহার রোধ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহবান জানিয়ে এরশাদ বলেন, “আপনি তো মা। আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে। আপনি ব্যবস্থা নিন। আমরা আছি।”
ক্ষমতা ছাড়ার পর নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে এরশাদ বলেন, “আমরা স্ত্রী, ছেলে, মেয়েকে জেলে থাকতে হয়েছে। আমার ছেলের দু’বছর নষ্ট হয়ে গেছে। বয়স বেড়ে গেছে বলে কোনো স্কুল নেয়নি।
“দু’বছর নির্জন কারাবাস করেছি। আমি অসুস্থ হওয়ার পরও আমাকে পিজি হাসপাতালে নেওয়া হয়নি। রোজার সময় নামাজ পড়তে পারিনি। জেলখানা থেকে আদালতে যেতে কাপড় খুলে চেক করা হতো” যোগ করেন তিনি।
এরশাদ আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনী প্রধান ছিলাম। বাজেট ছিলো না বলে- কারাগারে ছয় বছর মিষ্টি খেতে পারিনি।”
নিজের শাসনের সময় দেশের উন্নয়নের কথা তুলে ধরে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, “৬৮ হাজার গ্রামে যাবেন- আমার উন্নয়নের ছোঁয়া পাবেন।”
বাংলাদেশ সময়: ১৯১৮ঘণ্টা, জুন ২৬, ২০১২
এসএইচ/সম্পাদনা: নূরনবী সিদ্দিক সুইন, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর;জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com