 |
বইমেলা থেকে: অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ‘ঐতিহ্য’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে শেখ লুৎফরের গল্পগ্রন্থ ‘ভাতবউ’। চেতনার আলোড়ন অথবা সৃষ্টিশীলতার কল্পনাশক্তি যেভাবেই বলতে চাই না কেন, সেটা খুব রক্ত হাড়ময় বাস্তবতা- যা বিভিন্নভাবে আজকের পাঠকে উসকে দেয়। তাই শুধু একটি সরল কাহিনী-ভাষ্য এসময়ের গল্পে বয়ন কতটুকু ন্যায্য...। আর এজন্যই বইয়ের গল্পগুলোর বিষয়, ভাষা, আঙ্গিক এবং সর্বোপরি গল্পের গন্তব্য নির্ণয়ে আমাকে সাহস যুগিয়েছে।
‘তলানি’ গল্পে রোগা শরীরের ষোল বছর বয়সী কাজের বুয়া তামাটে রঙের রহিমা। প্রতিদিন মাঝরাতে এক বদ্ধ মাতাল পাশের রাস্তা দিয়ে অবোধ্য ভাষায় গান গেয়ে যায়। সে আধো ঘুম-জাগরণে সেই গান শোনে। অপার কণ্ঠের সেই সুরের পুজারীকে সে কল্পনায় সহবত করে নেয়। তার জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে আড়াল করতেই যেন এই ইন্দ্রজাল। যখন মোহভঙ্গ হয়, তখন জীবন তার কাছে একটা বোঝার মতো দুর্বহ হয়ে ওঠে।
‘নিশি’ গল্পের চুড়িওয়ালী নিশি স্বামীর একঘেঁয়ে ভালবাসায় হাপিয়ে উঠে ছলনা, প্রবঞ্চনা আর মায়ার কুহকে জীবনের অধরার সন্ধানে ছুটতে ছুটতে এক সময় স্তম্ভিতের মতো চেয়ে দেখে, গরলের পেয়ালাটা উপচে উঠেছে, ডুবে যাওয়া ছাড়া আর কোনো গন্তব্য নেই।
দিনমজুর হেকমত আলী মুন্সি; অন্ধকার রাত যার রক্তে চুরির নেশার আগুন ধরায়। আবার পিতৃত্বের অতৃপ্ত কামনায় কখনও তার জীবনকে মনে হয় অর্থহীন। কারণ তার প্রত্যেকটি সন্তান জন্মের ছয় দিনের মধ্যেই মরে যায়। তার বিশ্বাস এটা চোরা-চোরনির আদি-ভৌতিক কারসাজি। জীবনের মৌল আকাঙ্ক্ষা আর আদিম ঘটনাবলির জটিল আবর্তনই ‘বাপ’ গল্প।
যাতায়াত গল্পের পালকি বাহক গঙ্গারাম, ফসল গল্পের সজল, ভাতবউ গল্পের জয়নাব এবং লাশ গল্পের লাশ বাহক চানু, অপঘাতে মৃত মানুষের পচা-গলা লাশ মর্গে পাঠানোই যার একমাত্র পেশা; এইসব ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে ভিন্ন বিষয় এবং সময়কে ধরতে চেয়েছেন গল্পকার।
কখনও এই জনমের সর্বব্যাপি চাওয়াকে মুছে দেয় কুটিল সময়, কখনও বৈরী প্রকৃতি তছনছ করে যায় নিম্নবিত্তের সংসার। আবার কখনও রাজনৈতিক পেশি শক্তি পিচাশের মতো মানুষকেও হার মানায়। বাস্তব পটভূমির সারটুকু অক্ষুণ্ণ রেখে দেহাতী মানুষের রক্তাক্ত ভাগ্য আর বাসনার লিপিচিত্রই ‘ভাতবউ’।
বাংলাদেশ সময়: ১৬০৮ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৩
দ্য-টিকে/সম্পাদনা: আসিফ আজিজ, নিউজরুম এডিটর