৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শনিবার মে ১৮, ২০১৩ ৩:২৮ পিএম BDST banglanew24
18 Jun 2012   05:40:24 PM   Monday BdST
E-mail this

আফগানিস্তানের ছোটগল্প

ঘৃণা


মূল: পারভিন ফায়েজ জাদাহ্ মালাল, অনুবাদ: ফজল হাসান
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ঘৃণা আফগানিস্তানের ছোটগল্প

‘ঠিক চার কিলো হয়েছে ।’
মহিলা যখন দোকানির মুখে কথাগুলো শুনলো, তখন তার ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে এক টুকরো আত্মতৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। সেই হাসি-মাখা দৃষ্টিতে সে তার ছোট ছেলের দিকে তাকায়।
দোকানি বলেই চলেছে, ‘বহেনজি, এই নিন। আট রুপি হয়েছে।’

মহিলা আরেকবার চাদরের ভেতর থেকে হাত বের করে দোকানির কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে শেষ বিকেলের নরোম রোদে তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার জন্য পা বাড়ায়। ছোট ছেলের হাত শক্ত করে ধরে সে দ্রুত গতিতে হাঁটতে থাকে। মহিলা এত শক্ত করে ছেলের হাত ধরেছে যে একসময় ছেলেটি বললো, ‘আম্মাজান, আপনি আমার হাতে ব্যথা দিচ্ছেন।’

‘তোমার আম্মাজান যা কিছু করে, সবই তোমার ভালোর জন্য করে। ঠিক আছে, হালকা ভাবে ধরছি। এখন আর ব্যথা পাবে না।’ আন্তরিকতা এবং সমবেদনার সাথে মহিলা বেশ মোলায়েম স্বরে বললো।

প্রায় এক বছর হলো মহিলা এবং তার ছোট ছেলে প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে এসেছে। এখন এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে দিনরাত মহিলাকে হতাশা গ্রাস করে রেখেছে। সাত-সকালে সে এবং তার ছেলে শরণার্থী তাবু থেকে বেরিয়ে শহরের বাজারে এবং সরু গলির আনাচে-কানাচে পুরনো কাগজ কুড়ায়। যখন সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসে, তখন তারা সমস্ত দিনের কুড়ানো কাগজ বিক্রি করার জন্য একটা দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়। সাধারণত তারা কুড়ানো কাগজ বিক্রি করে দৈনিক চার কিংবা পাঁচ রুপি উপার্জন করতে পারে। কিন্তু আজ তারা দারুন খুশি। কেননা কাগজ বিক্রি করে আট রুপি পেয়েছে। অনেক দিন, যেদিন তারা কোন কাগজ সংগ্রহ করতে পারে না, খালি হাতেই দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়। তখন কেন জানি তার মনে হয়, সমস্ত কাগজ যেন বাতাসে উড়ে গেছে কোন এক অচিন দেশে, সাথে নিয়ে গেছে তার সুখ আর আনন্দ। সেদিন তার মন খারাপ থাকে। কিন্তু আজ সে ফুরফুরে মন নিয়ে ফিরে আসে তাবুতে। ফেরার পথে দোকান থেকে রুটি, চা-পাতা এবং সামান্য চিনি কেনার পরও তার কাছে দুই রুপি রয়ে গেছে। গাদাগাদি অনেকগুলো ছাই এবং কালো রঙের তাবু পেরিয়ে সে তার নিজের তাবুতে পৌঁছায়। যখন সে তাবুর সামনের মোটা কাপড়ের পর্দা তুলে ভেতরে ঢোকে, তখনই মাগরিব নামাজের আযান হয়। অজু করে সে নামাজ আদায় করে। তারপর হ্যারিকেন তুলে দেখে কোন তেল নেই। ছেলের দিকে ঘুরে সে বললো, ‘হ্যারিকেনে কোন তেল নেই। রুপি আর বোতল নিয়ে যাও এবং দোকান থেকে তেল নিয়ে আসো।’

ছেলেটি উঠে দাঁড়ালো। মায়ের কাছ থেকে রুপি এবং বোতল নিয়ে সে বললো, ‘আম্মাজান, এটা হয়তো ভালো হবে ...’
‘যদি তুমি অন্য ছেলেদের সাথে খেলার জন্য রাস্তায় না থামো। এখন তাড়াতড়ি যাও। খুব শীঘ্রই অন্ধকার হয়ে যাবে।’

এ কথা বলার পর মহিলা চুল্লিতে অগ্নি সংযোগ করে। যেই মাত্র অগ্নিশিখা জ্বলে উঠলো, ঠিক তখনই তার মনের কোণে ভয়ংকর এক স্বপ্নের মতো ভেসে ওঠে যন্ত্রণার দগ্ধ স্মৃতি। চোখ থেকে ঝরে পরে কয়েক ফোঁটা অশ্রু। বাতাসের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা লিকলিক করে, যেমন করে নির্বাসন আর উদ্বাস্তু জীবনের দুঃসহ যন্ত্রণার দগ্ধ শিখা জ্বলে তার ক্ষত-বিক্ষত মনের ভেতর। তখন মাতৃভূমিতে ফিরে যাবার বাসনা তীব্র হয়।

অন্ধকার তাবুর ভেতর মহিলা দিন-রাত শুধু অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। অতীত নিয়েই তার সমস্ত ভাবনা। তবে অতীত খুব বেশি দিন আগের নয়, মাত্র গত বছরের। তখন তার সবই ছিল। স্বামী ছিল, সংসার ছিল, এমনকি রুজি-রোজগারও ছিল। তারচেয়ে বড় কথা, তখন তার নিজের একটা দেশ ছিল। কিন্তু এখন এসবের কিছুই নেই। থাকার মধ্যে আছে শুধু তার ছোট্ট ছেলেটি। মহিলা জানে না, তার আত্মীয়-স্বজনেরা কেমন আছে, কোথায় আছে, আদৌ তারা বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে। যে জিনিসটা তাকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয়, তাহলো এখানে ছেলেটি কোন শিক্ষা পাচ্ছে না। অথচ এ বয়সে ছেলেটির স্কুলে গিয়ে ভালো শিক্ষা পাবার কথা ছিল। তার মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা, যখন সে নিজের দেশের একটা এলিমেন্টারি স্কুলের শিক্ষিকা ছিল। তার ক্লাসে ছিল দশজন ছেলেমেয়ে। অথচ এখন তার নিজের ছেলে স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছে না। তবে সময় ও সুযোগ পেলে সে নিজেই ছেলেকে সামান্য পড়াশোনা দেখিয়ে দেয়। তার প্রচণ্ড ইচ্ছে, ছেলেকে সে স্কুলে পাঠাবে। কিন্তু এখন সে ইচ্ছেয় গুড়ে বালি। তাবুর ভেতরে যখন মনে পড়ে বিকেল বেলা স্কুল থেকে ছেলেমেয়েরা নিজেদের বাড়ি ফিরে যায়, তখন তার মনের ভেতর সমস্ত যন্ত্রণা মুছে গিয়ে অন্যরকম এক সোনালি স্বপ্ন এসে মনকে ভরিয়ে দেয়।

অন্যান্য সব সকালের মতোই আজ সকালে মহিলা যখন ছেলেকে নিয়ে তাবু থেকে বের হয়, তখন বাইরে ঠাণ্ডা বাতাস বইছিল। আকাশে মেঘেরা এলোমেলো ওড়াউড়ি করছিল এবং মাটিতে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়েছিল। আকাশে মেঘ জমতে দেখলেই সে তার মনের ভেতর এক ধরনের আশংকা বোধ করে। বৃষ্টি হলে তারা বেশি ঘোরাঘুরি করতে পারে না। এছাড়াও বৃষ্টিতে কাগজ ভিজে যায়। তবুও তাড়াতাড়ি পা ফেলে তারা বাজারের দিকে রওনা হয়। বাজারের কাছাকাছি পৌঁছানোর পরপরই তুমুল বৃষ্টি নামে। তারা একটা বন্ধ দোকানের সামনে এসে থামে। ছেলেটি তার মায়ের গা ঘেষে দাঁড়ায় এবং বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা করে। এক ঘণ্টা বাদে বৃষ্টি থেমে গেলে তারা আবার রাস্তায় নেমে আসে এবং শুকনো কাগজের আশায় শহরের অলিগলিতে হাঁটতে থাকে। কিন্তু বিকেল পর্যন্ত ঘোরাঘুরি করেও কোন শুকনো কাগজ খুঁজে পেল না। গতকাল থেকে মহিলা এবং তার ছেলে অভুক্ত। তাদের কাছে খাবার কেনার মতো কোন অর্থকড়ি নেই। বিকেলে ছেলেটি দারুণ ক্ষুধা অনুভব করে। কি আশ্চর্য, এ বছর তারা বেশ অনেকদিন না খেয়ে কাটিয়েছে। সে সব দিনগুলোতে তাদের কোন উপার্জণ কিংবা সঞ্চয় ছিল না। তখন ছেলেটি সকালবেলা শুধু চা খেয়ে বিকেল, এমনি অনেকদিন সন্ধ্যে অবধি অভুক্ত থেকেছে। যেদিন কাগজ সংগ্রহ করতে পেরেছে, সেদিন কুড়ানো কাগজ বিক্রি করে খাবার কিনেছে। মহিলা তার ছেলেকে এরকম অভ্যেসে গড়ে তুলেছে। তবে ইদানিং ছেলেটি ক্ষুধার্ত হলে প্রতিবাদ করে। তখন মহিলা তার ছেলেকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাতে কোন কাজ হয় না। মহিলা জানে না সে মুহূর্তে তার কি করা উচিত। কার কাছে যাবে, কোন দোকান থেকে ধারে খাবার আনবে, কিংবা কোন পথচারীর কাছে ভিক্ষা চাইবে। এ ধরনের কাজ করার জন্য যথেষ্ট মনোবল থাকা চাই। কিন্তু অনেক সাহসী মানুষ এ কাজ করতে পারবে না। সে কল্পনাও করতে পারে না যে এ ধরনের কাজ তাকে দিয়ে হবে। তাই বাস্তবে কেমন করে সম্ভব? ছেলেটি ভীষণ একগুঁয়ে। কোন অজুহাতই শুনতে চায় না। অনেক সময় সে মনে মনে ভেবেছে কোন দোকান কিংবা পথচারীকে বলবে, কিন্তু সে তা করতে পারেনি। না পারার কারণ হলো, ঠিক সেই মুহূর্তে অন্য আরেক চিন্তা এসে তার মস্তিস্কে ভর করে। তখন স্বগোক্তির মতো করে সে বললো, ‘যদি কারোর দরোজায় করাঘাত করি, তবে হয়তো ...।’

এ পরিকল্পনাটি তার কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হলো। কেননা বেশির ভাগ সময় মহিলারাই এসে দরোজা খুলে দেয়। মনে মনে ভেবে নিয়ে সে একটা বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। তার হাত কাঁপছিল, এমনকি শরীর থেকে ঘাম ঝরছিল। দরোজার কাছে পৌঁছে সে ভাবছিল আদৌ করাঘাত করবে কি করবে না। সে মুহূর্তে তার মনের ভেতর এক সাথে দু’টো বিষয় কাজ করছিল। একদিকে ছেলের জন্য মায়ের ভালোবাসা আর রক্তের টান, অন্যদিকে একধরনের লজ্জা এবং ভয়। এই দোদুল্যমান পরিস্থিতিতে সে রীতিমতো বিভ্রান্ত। ফলে তার বুকের ধুকপুকানিও সে নিজের কানে শুনতে পায়নি। মুখ শুকিয়ে কারবালা। অবশেষে সে দরোজায় কড়া নাড়ে। একজন বৃদ্ধা দরোজা খুলে দেয়। কম্পিত গলায় সে বৃদ্ধাকে বললো, ‘আমার ছেলে ... আমার ছেলেটা খুবই ক্ষুধার্ত। আমার কাছে কোন রুপি নেই। দয়া করে যদি ...’

কথা শেষ করার আগেই বৃদ্ধা মহিলা ঘুরে দাঁড়ায় এবং ঘরের ভেতরে ঢোকার মুহূর্তে বললো, ‘এ বাড়িটা তোমাদের।’

কিছুক্ষণ বাদে অর্ধেক খোলা দরোজার ফাঁক গলিয়ে মহিলা দেখলো বৃদ্ধা ফিরে আসছে। এক হাতে বাটি এবং অন্য হাতে রুটি। তখনই মহিলা ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা বাচ্চা মেয়ের কন্ঠস্বর শুনতে পেলো। ‘আম্মাজান, আপনাকে অনেকবার বলেছি, এগুলো কুকুরকে দেন, কক্ষণো কাবুলিদের দেবেন না।’

বাটি হাতে বৃদ্ধা দরোজার কাছে এসে দেখে মহিলা এবং তার ছেলে চলে গেছে। অর্ধেক খোলা দরোজা পেরিয়ে সে বাইরে এসে ডানে-বায়ে তাকিয়ে দেখে ইতিমধ্যে ওরা সরু গলির শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে।

লেখক পরিচিতি: পারভিন ফায়েজ জাদাহ্ মালাল একজন আফগান কবি এবং ছোটগল্প লেখিকা। তিনি আফগানিস্তানের কান্দাহারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি মাতৃভূমি ছেড়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যান।

প্রথমে তিনি কিছুদিন পেশাওয়ারে ছিলেন। পরে করাচিতে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। তিনি ‘পশতু’ ভাষায় লেখালেখি করেন। ১৯৮৭ সাল থেকে ২০০০ সালের মধ্যে তিনটি কবিতার বই ছাড়াও ১৯৯৬ সালে তার একমাত্র ছোটগল্প সংকলন ‘হোয়াইট পেইজেস্’ প্রকাশিত হয়।

‘ঘৃণা’ গল্পটি পারভিন ফায়েজ জাদাহ্ মালালের ‘পশতু’ ভাষায় রচিত এবং অ্যান্ডার্স উইডমার্কের ইংরেজিতে অনূদিত ‘হেইট্’ গল্পের অনুবাদ। গল্পটি ২০১১ সালের মে সংখ্যা ‘ওয়ার্ডস্ উইদআউট বর্ডার্স’-প্রকাশিত হয়। শরণার্থীদের দারিদ্র, দুঃসহ জীবন, নষ্টালজিয়া ও মাটির টানে মাতৃভূমিতে ফিরে যাবার আকুলতা, এমনকি তাদেরও যে আত্মসম্মানবোধ থাকতে পারে, সে সব বিষয়গুলোকে লেখিকা সাবলীল ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন এই গল্পে । গল্পটি তেলেগু ভাষায়ও অনূদিত হয়।

বাংলাদেশ সময় ১৭২১, জুন ১৮, ২০১২
সম্পাদনা : ফেরদৌস মাহমুদ, শিল্প-সাহিত্য সম্পাদক

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান