 |
মেহেরপুর: পুরনো ও নিম্নমানের যন্ত্রপাতি, অদক্ষ সেবিকা, টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক না থাকলেও প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা শহরে তাহের ক্লিনিক-২ নামে একটি ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ করা হয়েছে, ক্লিনিক স্থাপনের কোনো আইন না মেনেই সিভিল সার্জনকে ‘ম্যানেজ’ করে গাংনীতে গড়ে উঠেছে তাহের ক্লিনিক-২-সহ আরও কয়েকটি ক্লিনিক।
এখানে ডা. আবু তাহের শুধুমাত্র মেডিকেল অফিসার হলেও ক্লিনিকে বসে সব ধরনের অপারেশন করে থাকেন। যদিও একজন এনেসথেসিয়া চিকিৎসক দিয়ে অপারেশনের আগে অজ্ঞান করার কথা। কিন্তু ডা. আবু তাহের সিদ্দিক এনেসথেসিয়ার কাজটিও নিজে করে থাকেন।
ক্লিনিকে সেবিকাদের ডিপ্লোমাধারী সনদ থাকার কথা থাকলেও ওই ক্লিনিকের সেবিকা কুরসিয়া খাতুন কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেননি। ক্লিনিকে লক্কড়-ঝক্কড় ১০০ এমএল এক্স-রে মেশিন দিয়ে চলছে এক্স-রের কাজ। এক্স-রে টেকনিশান আহমেদ হুসাইন একজন অদক্ষ লোক। টেকনিশিয়ান আহম্মেদ হুসাইনের কোনো একাডেমিক সনদ না থাকলেও বহাল তবিয়তেই নামমাত্র বেতনে অনেকদিন ধরে চাকরি করে আসছেন।
প্যাথলজি টেকনিশিয়ান মাসুম আলী কম্পিউটার কম্পোজে একটি প্যাথলোজি পাস সনদ নিয়ে বিভিন্ন টেস্ট করে থাকেন। তিনি নিজেকে ‘প্যাথলোজি ডিপ্লোমাধারী’ দাবি করলেও তার সনদ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে এলাকাবাসীর।
এদিকে, ডা. আবু তাহেরের ভুল অপারেশনের শিকার হয়ে গাংনী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। এছাড়া অনেকে এখন পঙ্গুত্ব জীবনযাপন করছেন।
গত শুক্রবার ভোরে উপজেলার কসবা গ্রামের জাকারিয়া হোসেনের স্ত্রী রাজিয়া খাতুন নামে একজন প্রসূতি মাকে অপারেশন করে সন্তান হওয়ার পর নাড়ি সেলাই না করেই পেট সেলাই করে দেন। ১ ঘণ্টা পর প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় দ্বিতীয়বার পেটের সেলাই খুলে নতুন করে নাড়ি সেলাই দিয়ে পেটে সেলাই দেন। এর পর পরই রাজিয়া খাতুন মারা যান।
গাংনীর চৌগাছা গ্রামের মৃত আলম হোসেনের স্ত্রী রিজিয়া খাতুন বাংলানিউজকে জানান, সম্প্রতি, তার পেটে সমস্যা দেখা দেওযায় তাহের ক্লিনিকে ভর্তি হন। তার পেটে অ্যাপ্যান্ডিসাইটস হয়েছে বলে প্রতিবেদন দিয়ে তার অপারেশন করেন ডা. আবু তাহের।
কিন্তু ডা. তাহেরের অর্থলোভের কারণে অ্যাপ্যান্ডিসাইটস না হলেও তাকে অপারেশন করেন। পরে বিষয়টি নিয়ে এলাকার লোকজন ক্লিনিকে গেলে ডাক্তার আবু তাহের ক্ষমা চেয়ে তার চিকিৎসার ব্যয় বহন করেন।
এদিকে, তাহের ক্লিনিকে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে ‘ক্লিনিকের দালাল’ নামে পরিচিত গাংনী সিনেমা হলপাড়ার ‘সুদখোর’ আলাউদ্দনি ওরফে আলা সাংবাদিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। ভাড়াটে আলা নিজেকে ‘ক্লিনিকের পার্টনার’ ও পরে ‘স্টাফ’ পরিচয় দিয়ে নানাভাবে হুমকি দেন।
স্থানীয়রা বাংলানিউজকে জানান, আলা নিজেকে কখনও ‘র্যাবের সোর্স’, কখনও ‘ক্লিনিকের দালাল’ আবার কখনও ‘ক্লিনিকের মালিক’ দাবি করে থাকেন। তিনি সবসময় তাহের ক্লিনিকের সামনে বসে থাকেন। গ্রাম-গঞ্জ থেকে সাধারণ রোগী এলেই তার খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারাতে হয়।
তবে ক্লিনিকের ব্যবস্থাপক বাবলু বাংলানিউজকে জানান, আলা তাদের ক্লিনিকের কেউ নন। তার সঙ্গে ক্লিনিকের কোনো সম্পর্ক নেই।
ক্লিনিকে কর্মরত ডা. ইউসুফ আলী বাংলানিউজকে জানান, কোনো এনেসথেসিয়া চিকিৎসক না থাকলেও ডা. আবু তাহের সিজারিয়ানের মতো কোনো অপারেশন করতে পারেন না। তারপরেও তিনি অপারেশন করে থাকেন।
মেহেরপুর সিভিল সার্জন বাংলানিউজকে জানান, তাহের ক্লিনিকে রোগীর মৃতুর কারণ দেখতে হবে। এছাড়া এনেসথেসিয়া চিকিৎসক না-থাকা এবং ন্যান্য টেকনিশিয়ান না থাকার বিসয়টিও খোঁজ নেওয়া হবে।
দালাল আলার ব্যাপারে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৬) গাংনী ক্যাম্পের কমান্ডার এএসপি হারুন বাংলানিউজকে জানান, র্যাবের সোর্স পরিচয় দিয়ে কেউ কোনো কিছু করবে এটা র্যাব মেনে নেবে না।
বাংলাদেশ সময়: ২৩০০ ঘণ্টা, আগস্ট ২৫, ২০১২
সম্পাদনা: প্রভাষ চৌধুরী, নিউজরুম এডিটর