 |
| আড্ডায় তিন কবি- শহীদ কাদরী , সৈয়দ শামসুল হক ও ফরহাদ মজহার। |
কবিতার মেলা, কবিদের মেলা জমে উঠেছিল নিউইয়র্কে। আমেরিকা-বাংলাদেশ-কানাডা (এবিসি) সম্মেলনে ছুটে এসেছিলেন অভিবাসী বাঙালিরা বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে। বিশ্বখ্যাত `এস্টোরিয়া ওয়ার্ল্ড ম্যানর` হয়ে উঠেছিল মিনি বাংলাদেশ।
সম্মেলনটির আহ্বায়ক ছিলেন সাপ্তাহিক ঠিকানা`র সিইও, ক্রিড়াবিদ-সাংবাদিক সাঈদ উর রব। ২৩ ও ২৪ জুন ২০১২ শনি ও রোববার দুদিনের কনভেনশনে উপস্থিত ছিলেন বাংলা কবিতার তিন অন্যতম কবি শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক ও ফরহাদ মজহার।
প্রথমদিন কাব্যপাঠের আসরে কবিতা পড়েন ফরহাদ মজহার। আর শহীদ কাদরী বললেন কবিতা নিয়ে কথা। অংশ নিলেন-- ফকির ইলিয়াস, শামস আল মমীন, মুজিব বিন হক, ফারুক ফয়সল, মনজুর কাদের, ফারুক আজম প্রমুখ।
শহীদ কাদরী বললেন, কবিতা মানুষের প্রাণের প্রয়োজনেই বেঁচে থাকবে। `প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই` !
এদিন সন্ধ্যায় ছিল একটি প্রানবন্ত টক শো। ‘বিশ্ব সাহিত্যে বাংলা সাহিত্যের অবস্থান’ বিষয়ে টকশোতে অংশ নিয়ে ফরহাদ মজহার বললেন, বিশ্ব সাহিত্যে যেতে হলে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্বের যেসব ভাষা ও সাহিত্যকে নিঃশেষ করে দেয়া হয়েছে তাদেরকে পড়ুন। দেখবেন তাদের আপ্ত বিশ্বাস কত শক্তিশালী। আত্মবিশ্বাস ও আপ্তবিশ্বাসের মাঝে নিশ্চয়ই একটা পার্থক্য আছে। সেটা পরখ করতে শিখতে হবে।
তিনি বলেন, শহীদ কাদরী-সৈয়দ শামসুল হক এরা বিশ্ব সাহিত্যের অন্তর্গত মানুষ। বিশ্ব সাহিত্যে, বাংলা সাহিত্য নিজ শক্তি নিয়েই প্রতিষ্ঠিত।
শহীদ কাদরী বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে বিশ্বসাহিত্য বলতে আমরা কি বুঝি? এই সময়ে পোল্যান্ড কিংবা নেদারল্যান্ডে কী লেখা হচ্ছে তা কি আমরা জানি? না, জানি না। আপাত দৃষ্টিতে বিশ্বসাহিত্য বলতে আমরা ইংরেজি সাহিত্যকে বুঝি।
প্রকৃতঅর্থে বিশ্বসাহিত্য বলতে কিছুই বুঝায় না, যোগ করেন শহীদ কাদরী। তিনি বলেন, ইংরেজদের গোলামী করার ফলে যে সাহিত্য আমরা পেয়েছি, সেটাই চর্চা করছি মাত্র। বাংলা সাহিত্যে সমৃদ্ধ অনেক কিছুই রয়েছে। যা অন্য ভাষার সাহিত্যে নেই। এই ধনভাণ্ডারকে কাজে লাগাতে হবে।
সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ভাষাকে বাঁচাতেই লিখতে হবে। পাঠক ক’জন তা বিবেচনায় না রেখেই লেখককে তার সৃষ্টি চালিয়ে যাওয়া দরকার।
তিনি বলেন, ‘পাওয়ার অব ওয়ার্ডস’ এর বিকল্প কিছু নাই। এই শক্তি সব ভাষাতেই আছে। শুধু ব্যবহারের অপেক্ষায় থাকে সেই শক্তি। সৈয়দ হক বলেন, রিজেকশন থেকে শিক্ষা নেবার অনেক কিছুই আছে। এই বয়সে এসে আমি আপনাদেরকে খুব দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, আমি চাইলে যে কোনো ইংরজি ভাষাভাষি লেখকের চাইতে ভালো লিখতে পারতাম। কিন্তু লিখিনি। কারণ বাংলা আমার ভাষা। বাংলা আমার গর্ব। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি যে কোনো ভাষার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে বাংলা ভাষা।
সৈয়দ হক আরও বলেন, রোমান হরফে বাংলা ভাষার প্রতি ‘ভাষার আগ্রাসন’ চলছে।
যা পাকিস্তানিরা পারেনি, কর্পোরেট আগ্রাসন এখন তা আমাদেরকে গেলাচ্ছে। প্রতিদিন বাংলাদেশে লাখ লাখ এসএমএস হয় মোবাইল ফোনে, বাংলিশে। এটা চলতে পারে না। বাংলাদেশ টেলি কম্যুনিকেশনের প্রধানের সাথে আমার কথা হয়েছে। তিনি আমাকে বলেছেন, যেসব মোবাইল ফোনে বাংলা লেখা যায় না, এমন মোবাইল ফোন আমদানি বন্ধ করবে বাংলাদেশ। তা আগামী বছর নাগাদ কার্যকর হবে বলে আমরা আশা করছি। যেসব মোবাইল ফোনে বাংলা লেখা যায় তেমন ফোন বাংলাদেশে তৈরিরও চেষ্টা করা হচ্ছে।
সৈয়দ শামসুল হক বলেন, মালদ্বীপের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। সেদেশের একজন তরুণী লেখিকা আমাকে জানিয়েছেন, তিনি নিজে টাইপ করে বাঁধাই করে ৫০০ পৃষ্ঠার একটি বই লিখেছেন। তা ছেপেছেন দেড়শ কপি। তার বই তিন বছরে একশ কপি বিক্রি হয়েছে। তাই আমাদের হতাশ হবার কী আছে। ষোলো কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ।
কনভেনশনের দ্বিতীয় দিন ছিল সাহিত্য আড্ডায় ভরপুর হল প্রাঙ্গণ। ‘সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে প্রবাসের অবস্থান’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ পড়েন ফকির ইলিয়াস। মূল প্রবন্ধের উপর আলোচনা করতে গিয়ে মুখ্য আলোচক সৈয়দ শামসুল হক বলেন, সাহিত্যের দেশ-পরদেশ নেই। এই গ্লোবাল সময়ে সবই একই মেরুর বাসিন্দা। সকলেরই মূল বিষয় যদি বাংলা সাহিত্য হয়, তবে তাদের স্থানিক পরিচয় কোনো ব্যাপার হতে পারে না। বাংলা হচ্ছে বিশ্বের ৫ম বৃহত্তম ভাষা- মনে করিয়ে দেন সৈয়দ শামসুল হক।
তিনি বলেন, লেখককে পড়তে হবে। এখন পড়ার দরোজা দিন দিন ব্যাপৃত হচ্ছে। আসুন আমরা সেই দরোজায় শক্ত হাতে কড়া নাড়ি।
বাংলাদেশ সময় ১৩১০, জুন ২৭, ২০১২
সম্পাদনা : ফেরদৌস মাহমুদ, শিল্প-সাহিত্য সম্পাদক