 |
দিনদিন বাড়ছে বায়ুম-লের তাপমাত্রা, তীব্র গরম হচ্ছে আমাদের আবহাওয়া। যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। পরিবেশের এ ভয়ঙ্কর পরিবর্তনে বিজ্ঞানীরা সত্যিই আতঙ্কিত।
এ ভূম-লের সাধারণ পরিবেশের আমূল পরিবর্তন এবং বিশ্ববাসীর অসহনীয় দুর্দশার দুঃখজনক চিত্র দেখে সচেতন সমাজ আজ বিচলিত।
এসব বিপদকে সামনে রেখে ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গঠিত হয় ‘ইউনাইটেড ন্যাশনস এনভাইরনমেন্ট প্রোগ্রাম’। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি করার উদ্দেশে এ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি বছর জুন মাসের ৫ তারিখ পালন করা হয় ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’।
বছর ও দেশ ভেদে এরা নতুন নতুন প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে মানুষকে পরিবেশ বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা করে।
বিজ্ঞানীদের প্রায় সবাই একমত যে পরিবেশের এ হুমকির অন্যতম কারণ গাছপালার সংখ্যা হ্রাস পাওয়া। মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে নির্বিচারে গাছ ধ্বংস করছে, এতে আমাদের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।
অথচ এ গাছই আমাদের জন্য বাতাসে অক্সিজেনের যোগান দেয় এবং কার্বনডাই অক্সাইড শোষণ করে। গাছপালা ধ্বংসের কারণে এ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া বিঘিœত হচ্ছে।
প্রযুক্তির বদৌলতে আজ তৈরি হচ্ছে নিত্য নতুন যন্ত্রপাতি, কল-কারখানা। যা থেকে প্রতিনিয়ত নির্গমন হচ্ছে ক্ষতিকর গ্যাস, রাসায়নিক পদার্থ। এসব রাসায়নিক পদার্থ বৃদ্ধি করছে পৃথিবীর উষ্ণতা। ফলে কলুষিত হচ্ছে আমাদের বায়ুম-ল, বেড়ে যাচ্ছে তাপমাত্রা এবং বদলে যাচ্ছে জলবায়ু। এতে গলছে বরফ এবং বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে মালদ্বীপ, শ্রীলংকাসহ নিচু দেশগুলোর, এ তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণত ৪টি ক্ষেত্রে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (১৯৯৫) বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ এবং মাটিদূষণ এ ৪টি দূষণক্ষেত্র নির্ধারণ করেছে।
সব মিলিয়ে এসবের পাশাপাশি ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ নিয়েও আশঙ্কা বাড়ছে বিশ্বময়। পরিবেশের এ দুর্দশার জন্য বিশেষভাবে উন্নত বিশ্ব ও তাদের ভোগ-বিলাসকেই দায়ী করছে অনেক গবেষক। ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ নিয়ে অনেক গবেষণা ও পরিসংখ্যান হয়েছে এবং হচ্ছে- কিন্তু কাজের কাজ হচ্ছে সামান্যই।
অথচ আমরা বিশ্ববাসী একটু আন্তরিক হলেই এসব হুমকি কমিয়ে আনতে পারি। গাছপালা রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ এবং সচেতনতা তৈরি করা, কল-কারখানার কালো ধোঁয়া থেকে পরিবেশ সুরক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা, পাহাড় কাটা এবং নদী ভরাট বন্ধ করার জন্য সবার মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করা, বিষাক্ত দ্রব্য যেখানে সেখানে নিক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকা, আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে বিলাস সামগ্রীর ব্যবহার কমিয়ে আনা- ইত্যাদীর মাধ্যমে আমরা প্রচেষ্টা চালাতে পারি একটি দূষণমুক্ত সুন্দর পরিবেশ গড়ার।
প্রতিবছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বিশ্বের নামী দামী সংগঠন, ব্যক্তিবর্গ এবং সংবাদমাধ্যম এগুলো নিয়ে নিজেদের মায়াকান্না প্রকাশ করে। কাঁচ ঘেরা শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত সেমিনার হলে বসে তারা নিজেদের পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা ও কর্মপন্থা তুলে ধরে। দিনের সূর্যাস্তের সাথে সাথে তাদের অনেকেরই পরিবেশের প্রতি সব ভালোবাসা ও সচেতনতা বিদায় নেয়।
গবেষক ও বিজ্ঞানীরা আমাদের পরিবেশ রক্ষার উপদেশ দিলেও এর মূল উৎস ও কারণ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে তারা। মানসিক শুদ্ধতা এবং আল্লাহ পাকের নেয়ামত সম্পর্কে সচেতনতা ও কিয়ামতের দিন এসব বিষয়ে জবাবদিহির ভয় অন্তরে না থাকলে এসব ‘কাগুজে নীতিবাক্য’ আর বিধিমালা দিয়ে কী লাভ?
আল্লাহর রাসুল (সা.) সাহাবীদের কোনো গাছ কাটা, গাছ পুড়িয়ে ফেলা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।
অথচ নিজেদের পার্থিব লোভ ও দাবি আদায়ের জন্য আমরা গাছ কেটে ফেলছি, আগুন ধরিয়ে দিচ্ছি গাছে, পাহাড় কাটছি নির্বিচারে, জলাশয় ভরাট করছি?
পবিত্র কুরআনের বেশ কয়েক জায়গায় আল্লাহ পাক পরিবেশের কথা উল্লেখ করে নিজের নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যাতে বান্দারা এসব দেখে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। আল্লাহ এমন লোকদেরই বুদ্ধিমান বলেছেন, যারা তাঁর সৃষ্টজগত নিয়ে ভাবে এবং তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, কোনো মুসলিম যদি কোনো গাছ রোপন করে তবে এটি তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে। (মুসলিম)
আরেক হাদীসে তিনি তাগিদ দিয়ে সতর্ক করে বলেছেন, তোমরা কোনো গাছের ছায়ায় কিংবা রাস্তাঘাটে মলত্যাগ করবে না।
সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ পবিত্র এবং পরিচ্ছন্ন, তিনি পবিত্রতা এবং পরিচ্ছন্নতা ভালবাসেন, তিনি দয়াবান, দয়া করাকে তিনি ভালবাসেন, তিনি দানশীল, দান করাকে তিনি পছন্দ করেন। তাই তোমরা তোমাদের ঘরবাড়ির আঙ্গিনাকে পরিষ্কার করে রাখো,...। (তিরমিযী শরীফ)
এমন হাদীস ও আয়াত থেকে নির্দেশনা অনেক। কিন্তু এর কয়টি আমরা অনুসরণ করি, সেটিই এখন প্রশ্ন।
আমাদের বাড়িঘর কিংবা শিক্ষাঙ্গনের আশেপাশে এবং রাস্তাগুলো কি অপরিষ্কার ও নোংরা হয়ে আছে, ময়লা আবর্জনা ছড়িয়ে আছে এখানে ওখানে, আমরা কি চাইলে রাসুল (সা.) এর সত্যিকারের উম্মত হিসেবে নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে এসব পরিস্কার করতে পারি না?
আমাদের চারপাশে তাকালে দেখা যায়, নিছক অসতর্কতা ও বেখেয়ালের বশে এখানে ওখানে পানের পিক, কলার খোসা, বাদামের খোসা আর মুড়ির ঠোঙ্গা ফেলে ময়লা করছি নিজেদের পরিবেশ।
এতে শুধু আমাদের চারপাশ নোংরা হচ্ছেনা, কলুষিত হচ্ছে আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যও।
প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে এর চেয়েও অনেক বেশি। প্রযুক্তি বিপ্লবের এ সময়ে অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে দিনদিন আমরা গাছপালা ও অরণ্য হারাচ্ছি। ফলে একদিকে পরিবেশে কার্বনডাই অক্সাইড বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেখা দিচ্ছে খাদ্য সংকটও। যা আমাদের ঠেলে দিচ্ছে ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের দিকে।
এভাবে দূষিত পরিবেশ ও বদলে যাওয়া বিরুপ জলবায়ু হয়ে উঠছে আমাদের প্রধান শত্র“। দূষণে দূষণে আজ উত্তপ্ত পৃথিবী, অতিষ্ঠ বিশ্ববাসী।
আমি অনেকের মুখে এমন কথাও শুনেছি, ধুর এসব গবেষণা ও ভাবনা দিয়ে কিছুই হবে না। আল্লাহর দুনিয়া আল্লাহ-ই বাঁচিয়ে রাখবেন। এ নিয়ে আমাদের মাথাব্যথার কিছু নেই। ওই দায়িত্ব আমাদের না।’ আহা বেচারা! একটু সজাগ হয়ে দেখুন, কুরআন কিন্তু অন্য কথা বলছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক কোনো জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তনের সূচনা না করে।’ (সূরা রাদ-১১)
এ সুজলা সুফলা সবুজ পরিবেশ আল্লাহ পাকের দান। আমাদের জন্যই তিনি এসব সৃজন করেছেন এবং এসবের শুকরিয়া আদায় করতে বলেছেন। সুতরাং পরিবেশের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং অন্যকে সচেতন করার মাধ্যমে আমরা এ মহান নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারি।
লেখক-কাতার করেসপন্ডেন্ট, দোহা
tamimraihan@yahoo.com
বাংলাদেশ সময়: ১১২৯ ঘণ্টা, জুন ০৫, ২০১২
সম্পাদনা: শিমুল সুলতানা