চট্টগ্রাম: সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির মরুর বুকে সবুজ সবজির আবাদ করে সাফল্য ছিনিয়ে এনেছেন সেলিম। সোনাঝরা বালুসমুদ্রে এখন দোল খায় তার হাতে গড়া সবজিক্ষেত। জমি লিজ নিয়ে দুহাতে ফলাচ্ছেন শসা, টমেটো, মরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ নানা জাতের রবিশস্য।
বাংলানিউজের কাছে সম্প্রতি দেশে আসা সেলিম তুলে ধরেন সাফল্যগাথা। আত্মপ্রত্যয়ী তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সততা, মেধা, পরিশ্রম ও কাজের প্রতি ভালোবাসা থাকলে আমার মতো যেকোনো কঠিন কাজেই সাফল্য আসবেই। এখনো আমি আবুধাবি থেকে নিজে গাড়ি চালিয়ে নিয়মিত যাই সবজিক্ষেতে। বাগানের পরিচর্যা করি, নিজের হাতে বীজ বুনি, সবজি বোঝাই করে ফের শহরে ছুটি বিক্রির জন্য।
তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে দুবাই পাড়ি দিয়েছিলাম। খরচ পড়েছিল বাংলাদেশি মুদ্রায় দেড় লাখ টাকা। বড় কষ্টের ছিল প্রবাসজীবন। চাকরি করেছি তৈরি পোশাক কারখানা (গার্মেন্টস) ও সবজির দোকানে। এখন আমার ১০০টি সবজিবাগান, সবজির পাইকারি দোকান, ২টি রেস্তোরাঁ ও একটি সুপারশপ আছে। ২২ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে আমার দেশ-বিদেশে বিনিয়োগের পরিমাণ।
জীবনযুদ্ধের ফেলে আসা বাঁকগুলো এখনো সেলিমের চোখে উজ্জ্বল। প্রথম বিদেশ পাড়ি দেওয়ার সময় তাদের তেমন কোনো সম্পদ ছিল না। দুবাই পৌঁছার ২০ দিন পর খবর আসে বাবা আবদুল কুদ্দুস চলে গেছেন না ফেরার দেশে। দেখতে দেখতে কেটে যায় ১৮টি বসন্ত। ইতিমধ্যে তিন বোনের বিয়ে দিয়েছেন, ভাইকে বিদেশ নিয়েছেন। করেছেন অগণিত স্বজনের সহযোগিতা-উপকার।
সেলিমদের গ্রামের বাড়ি বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার উত্তর সর্তা গ্রামে। নগরীর কাতালগঞ্জের শেখ বাহারউল্লাহ মসজিদের পাশে গড়েছেন স্থায়ী ঠিকানা।স্ত্রী ফারজানা আক্তার, দুই ছেলে মোহাম্মদ সিফাত ও মোহাম্মদ সিদ্দিককে নিয়েই আবুধাবিতে বসবাস করেন।
জীবনের মোড় ঘুরিয়েছেন কীভাবে?
‘সবজির দোকানে চাকরি করতে করতে একসময় ভাবলাম নিজেই সবজির ব্যবসা শুরু করলে কেমন হয়। এ ভাবনাটা বাস্তবে রূপ দিতে চেষ্টার ত্রুটি করলাম না। শুরু করলাম সবজি বিকিকিনির ব্যবসা। এভাবে কিছু দিন গেল, মাথায় এল তাজা সবজি উৎপাদন ও সরবরাহের। আবুধাবি থেকে আড়াই’শ কিলোমিটার দূরে লিউওয়াতে জমি লিজ নিয়ে নতুন উদ্যমে শুরু করলাম সবজির আবাদ। এ কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য দরকার পড়ল লোকবল। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে দেশ থেকে নিয়ে গেলাম ১২০ জন লোক, যাদের কাছ থেকে বাড়তি কোনো টাকা নিইনি।’ সেলিম জানালেন।
তিনি বলেন, আমাদের প্রতিটি সবজিবাগানের দৈর্ঘ্য ৫০ মিটার এবং প্রস্থ ১৫ মিটার। বাগানের ওপরে প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকা, পাশে ফাইবার গ্লাস। বাগানের ভেতরে থাকে কুলার, ফ্যান ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে পানি ছিটানোর যন্ত্র। এভাবে যত্ন ও পরিচর্যায় সারা বছরই সবজি আবাদ করি । এর বাইরে বছরে চার থেকে পাঁচ মাস খোলা আকাশের নিচেও সবজি উৎপাদন করি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের দেশের মাটির উর্বরাশক্তি, এখানকার আবহাওয়া ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মরুভূমির মতো যত্ন নিলে এখানে সোনা ফলানো সম্ভব। তরুণ-যুবকদের মেধা ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি বিপ্লবে আত্মনিয়োগ করলে একদিকে স্বাবলম্বী হওয়া যাবে অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি-রপ্তানি করে প্রচুর আয় করা সম্ভব।
বাংলাদেশ সময়: ২০৩০ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১২
টিসি, tapan692003@yahoo.com